মেহেরপুরের ইটভাটায় পুড়ছে কাঠ, ইটের সাইজও ছোট

মেহেরপুর প্রতিনিধি:

132
মেহেরপুরের
Social Share

মেহেরপুরের – নেই পরিবেশ ছাড়পত্র, অবৈধভাবে কাঠ পোড়ানো, ইটের সাইজের পরিমাপ কম দেওয়াসহ নানা অভিযোগ থাকলেও জেলা জুড়ে চলছে শতখানেক ইটভাটা। পরিবেশ বিপর্যয় ঘটানো, ক্রেতাদের সাথে প্রতারণা এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে দেদারছে চলছে ইটভাটাগুলো। আরএসব কিছু দেখেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি জেলা প্রশাসন।
গত কয়েকদিন জেলার বেশকিছূ ইটভাটা পরিদর্শন করে দেখা গিয়েছে অধিকাংশ ইটভাটাগুলোতেই পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। কিছু ইটভাটা কয়লা পোড়ানো হলেও নেই কোনটির পরিবেশ ছাড়পত্র। এছাড়াও বিএসটিআইয়ের নির্ধারিত মাপের চেয়ে সাইজে ছোট ইটের মাপ।
মেহেরপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, কাঠ পোড়ানোর ফলে ইটভাটার নির্গত কালো ধোয়ায় মানুষের হাঁপানি, শ^াসকষ্ট, ফুসফুসের ক্যানসারসহ নানা রোগের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়াও অতিরিক্ত কার্বনডাই অক্সাইডের কারণে মাঠের ফসল ও এলাকার পরিবেশ দূষণ হয়। শিশু ও বয়স্কদের জন্য এই দূষণ খুবই ক্ষতিকর।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ বলা আছে, কোন ব্যক্তি ইটভাটায় ইট পোড়ানোর কাজে জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করেন, তাহলে তিনি অনধিক তিন বছরের কারাদ- বা অনধিক তিন লাখ টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হবেন।
এছাড়া বিএসটিআইয়ের নিয়ম অনুযায়ী ইঠের দৈর্ঘ্য ২৪ সেমি. প্রস্থ ১১.৫ সেমি. এবং উচ্চতা ৭সেমি. হতে হবে। এর কম হলে ভোক্তার সাথে প্রতারণার শামিল। এমন অপরাধের শাস্তি হিসেবে ভোক্তা অধিকার ও সংরক্ষণ আইনের ৪৮ ও ৪৫ ধারা মতে এক বছরের জেল অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এমনকি উভয়দ-ের বিধান রয়েছে।
মেহেরপুরের শহর সংলগ্ন ভিড়ভিড়ি মাঠে এমএম ইটভাটায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কয়লা দিয়ে কাঠ পোড়ানো হলেও ইটের সাইজ কম। দৈর্ঘ্য ২৪ সেমির স্থলে ২২ সেমি একটু বেশি, প্রস্থ সাড়ে সেমির স্থলে ১০ সেমি এবং উচ্চতা ৭সেমির স্থলে ৬ সেমি ইট প্রস্তুত করা হচ্ছে। একই চিত্র দেখা গেছে সদর উপজেলার মুহিদ ব্রিকস, ভাইভাই ব্রিকস, একেবিসি ব্রিকসের মত অধিকাংশ ভাটাগুলোতেই যে ইট প্রস্তুত করা হচ্ছে সবগুলোতেই ইটের সাইজের পরিমাপ ছোট।
এম এম ইটভাটার ম্যানেজার সাজু আহমেদ বলেন, আমাদের ফর্মার মাপ বেশি আছে। কিন্তু এটেল মাটির কারণে সাইজ ছোট হয়েছে।
ইটভাটা মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, মেহেরপুর জেলায় ১০৩টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি হাওয়া (কয়লার) ভাটা। পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র না থাকার কারণে জেলা প্রশাসন থেকে লাইসেন্স দেওয়া হয়নি। প্রতিটি ভাটা মালিক ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্সেই ইট তৈরি ও বিক্রি করছেন। এই ১৮টি ভাটাতেও আবার প্রায় ৩০০-৪০০ মণ কাঠ ব্যবহার করা হয়। যদিও জেলা প্রশাসন থেকে শুধুমাত্র ভাটাতে আগুন জ্বালানোর জন্য অল্প পরিমাণ কাঠ পোড়ানোর জন্য মৌখিকভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তবে বেশ কয়েকজন ভাটা মালিক অভিন্ন দাবিতে বলেন, সরকারের নীতিমালা মেনে ভাটা স্থাপনে তারা পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেছেন। কিন্তু কোনো অনুমোদন পাচ্ছেন না বছরের পর বছর। সরকারিভাবে বিভিন্ন দিবস পালনের ব্যয় মেটাতে এসব ভাটা মালিক সমিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে মালিকদের দাবি। অবৈধ হলেও ভাটাগুলো থেকে প্রতিবছর রাজস্ব আদায়েও ভূমিকা রাখছে।
জেলা ভাটা মালিক সমিতির সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম রসুল বলেন, পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র পেতে, যেসব শর্ত পালন করতে হয়, তার কোনোটিই ভাটাগুলো পালন করতে পারে না। তাই ভাটাগুলোকে ছাড়পত্র দিতে পারছে না। আমরা পরিবেশ অধিদফতরের কাছে অনুরোধ করব, উন্নয়নমূলক কাজের অংশীদার হিসেবে শর্ত কিছুটা শিথিল করে ভাটাগুলোকে যেন ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
মেহেরপুরের দায়িত্বে থাকা কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো: আতাউর রহমান জানান, মেহেরপুর জেলায় ৯৮টি ইটভাটার মধ্যে আর.আর.এস নামে মাত্র একটি ইটভাটার পরিবেশ ছাড়পত্র রয়েছে। এছাড়া ৩৫ থেকে ৪০টি জিগজাগ ভাটা রয়েছে। তাদের পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। আমরা হেড অফিসে চিঠি পাঠিয়েছি সেখান থেকে নির্দেশনা আসলেই মেহেরপুরের ইটভাটাগুলোতে অভিযান চালানো হবে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার ও সংরক্ষণ অধিপ্তরের চুয়াডাঙ্গার সহকারী পরিচালক (মেহেরপুরের অতিরিক্ত দায়িত্ব) সজল আহমেদ জানান, খুব শিঘ্রই মেহেরপুরের ইটভাটাগুলোতে ইটের সাইজ পরিমাপে অভিযান চালানো হবে। ইটের সঠিক সাইজ না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ইটভাটাবে আইনের আওতায় আনা হবে।
মেহেরপুরের স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মৃধা মো: মোজাহিদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি এ ব্যাপারে কথা বলতে অপরাগতা প্রকাশ করেন।