মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর নারী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে গার্ড অব অনার না দেয়ার প্রস্তাব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা, সরকারের ভিন্ন সুর

65
Social Share

বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর নারী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে গার্ড অব অনার না দেয়ার যে প্রস্তাব সংসদীয় কমিটিতে এসেছে, তা নিয়ে তীব্র আলোচনার মুখে সরকার ভিন্ন সুরে কথা বলছে।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বিবিসিকে বলেছেন, এমুহূর্তে এমন প্রস্তাব তারা বিবেচনায় নিচ্ছেন না।

মি: হক এই প্রস্তাবকে একজন এমপির ব্যক্তিগত মত বলে বর্ণনা করেন।

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির রোববারের বৈঠকে প্রস্তাবটি আসার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার দেয়ার ক্ষেত্রে নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা ইউএনওদের ব্যাপারে আপত্তির ক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটিতে যুক্তি হিসাবে দেখানো হয়েছে ধর্মীয় এবং সামাজিক কারণকে।

মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানিয়ে দাফন করা হয় একটি নীতিমালার আওতায়।

সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের ডিসি বা ইউএনওরা গার্ড অব অনার দেয়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন।

সংসদীয় কমিটিতে নারী ইউএনওদের নেতৃত্বে গার্ড অব অনার দেয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রস্তাবে গার্ড অব অনার দেয়ার ক্ষেত্রে নারী কর্মকর্তার বিকল্প খুঁজতে বলা হয়েছে।

তবে এনিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মুখে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাপতি শাজাহান খান বলেছেন, প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা হলেও সুপারিশ হিসাবে তা গ্রহণ করা না করার প্রশ্নে সংসদীয় কমিটি এখন সংবিধান এবং আইনগত বিষয় খতিয়ে দেখছে।

“সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম এই প্রশ্ন তোলেন কয়েকটা উপজেলার উদাহরণ দিয়ে। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর নারী কর্মকর্তার নেতৃত্বে স্যালুট দেয়া নিয়ে আপত্তি করেন ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে।”

শাজাহান খান আরও বলেছেন, তাদের বৈঠকে এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবার পর সিদ্ধান্ত নেয় হয়েছে যে মন্ত্রণালয় এ বিষয়টা দেখবে।

“এখন আমরা সংবিধান স্টাডি করছি। এটা যদি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে এ ধরনের কোন সুপারিশ আমরা পাঠাতে পারবো না। সব বিষয় আলোচনা করে আমরা মন্ত্রণালয়ে একটা ব্যাখ্যা দেব,” বলেন মি: খান।

মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমাণ্ডার এবং এখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর রফিকুল ইসলাম যিনি এই প্রস্তাবটি এনেছেন, তিনি এনিয়ে কোন বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

তবে শাজাহান খান জানিয়েছেন, সংসদীয় কমিটিতে প্রস্তাবটি নিয়ে বলা হয়েছে যে, উপজেলা পর্যায়ে সাধারণত জানাজার আগ মুহূর্তে এবং অনেক সময় কবরস্থানের পাশেই গার্ড অব অনার দেয়া হয়। ধর্মের বিধানমতে নারীরা জানাজায় অংশ নিতে পারেন না। সেজন্য নারী ইউএনও যখন গার্ড অব অনার দিচ্ছেন, তখন তা নিয়ে অনেক এলাকায় সামাজিক দিক থেকেও আপত্তি আসছে।

তিনি বলেন প্রস্তাবের পক্ষে এসব যুক্তিই বৈঠকে দেয়া হয়।

তবে মানবাধিকার কর্মীরা সংসদীয় কমিটির এসব যুক্তি মানতে রাজি নন।

মানবাধিকার কর্মী এলিনা খান বলেছেন, এধরনের প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে নারীদের হেয় করা হবে।

“জানাজা আলাদা বিষয়। তাতে মেয়েরা অংশ নিতে পারে না। আর গার্ড অব অনার একটা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। এই রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়ার দায়িত্ব যে পদের কর্মকর্তার, সেই পদে যে থাকবে, সেই দেবে।”

এলিনা খান আরও বলেন, “আমি বলবো, নারী যে মর্যাদায় বা পদে থাকুক না কেন, তাকে সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। সেটা যদি খর্ব করা হয় কোন কারণ ছাড়া, তাহলে অবশ্যই সেই নারীকে অমর্যাদা করা বা হেয় করা হয়ে থাকে,” তিনি মনে করেন।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক অবশ্য সংসদীয় কমিটিতে আসা এ ধরনের প্রস্তাবকে এমুহূর্তে গুরুত্ব দিতে রাজি নন।

তিনি বলেছেন, “রাষ্ট্র, সরকার বা তাদের দল- কোন ফোরামেই বিষয়টিতে পরিবর্তন আনার কোন চিন্তা এখন নেই।

“নারীরা গার্ড অব অনার দিতে পারবে না-এরকম কোন আইন বাংলাদেশে নেই। কারও ব্যক্তিগত মত থাকতে পারে যে নারীরা দিতে পারবে না। সেটা কারও ব্যক্তিগত মত। কিন্তু দলের বা সরকারের বা রাষ্ট্রের এখন পর্যন্ত এরকম কোন সিদ্ধান্ত নাই,” তিনি উল্লেখ করেন।

কিন্তু সংসদীয় কমিটিতে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং সেই বৈঠকে মন্ত্রী নিজেও উপস্থিত ছিলেন।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মন্ত্রী মি: হক বলেছেন, তিনি উপস্থিত থাকলেও একজনের কথা বলার অধিকার আছে। সুপারিশ যে কেউ করতে পারে।

“আপনি মত দিতে পারেন। সংসদীয় কমিটির একজন সদস্য হিসাবে তার কথা বলার বা মতামত দেয়ার অধিকারতো আছে। কারও অধিকারতো হরণ করে নিতে পারি না যে কোন কথা বলতে পারবেন না।”

কিন্তু বিষয়টাতে পরিবর্তন আনার কোন চিন্তা তাহলে নাই- এই প্রশ্নে মন্ত্রী মি: হক পাল্টা প্রশ্ন করেন: “না এরকম নাই। কেন পরিবর্তনের চিন্তা থাকবে? এই মুহূর্তে পরিবর্তনের কোন চিন্তা নাই।”

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এর আগে ১৯৯৬ সালে যখন ক্ষমতায় এসেছিল, তখন সেই সরকারের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানোর এই ব্যবস্থা শুরু করা হয়েছিল।

পরে সে জন্য একটি নীতিমালাও করা হয়।

মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, নীতিমালা অনুযায়ী ডিসি বা ইউএনও’ রা গার্ড অব অনারে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। এখানে নারী বা পুরুষ হিসাবে কিছু দেখানো হয়নি। এতে পরিবর্তন আনা হবে না, সেটিই তারা মনে করেন।