মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করতে পারা ভারতের জন্য সর্বোচ্চ সম্মানের বিষয়

Social Share

প্রতিবেশী ভারত তার পররাষ্ট্র নীতিতে বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় বলে জানিয়েছেন ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী। সাক্ষাৎকারে তিনি আরো জানান, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করতে পারা ভারতের জন্য সর্বোচ্চ সম্মানের বিষয়। একাত্তরের জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে ভারত সব কিছু করবে। মুজিব বর্ষ, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনেও বাংলাদেশের প্রত্যাশা অনুযায়ী পুরোপুরি সম্পৃক্ত থাকবে ভারত। সীমান্তে হতাহতের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকলেও গুলিতে মৃত্যু তাদের প্রাপ্য নয়।

প্রশ্ন: জামাই বাবু তার স্ত্রীর আদি পুরুষের দেশে এসেছেন। জামাই বাবু এখন কেমন আছেন?

ভারতীয় হাইকমিশনার : এই দেশে এর আগেও আমার আসার সৌভাগ্য হয়েছে। কিন্তু এবার আপনাদের এই সুন্দর দেশে আমার স্ত্রীকে নিয়ে আসতে পারা নিছক সম্মানের বিষয় নয়। ভারতীয় কূটনীতিক হিসেবে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার রাষ্ট্র বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করা আমাদের জন্য সর্বোচ্চ সম্মানের। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে, আমি বাংলাদেশের সংস্কৃতি এবং আমার নিজের বাড়িতে এর অনেক প্রভাব দেখতে পাই। তাই আমি এখন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের সংস্কৃতি, মনোভাবের গুরুত্ব, সম্মান জানানোর গুরুত্ব এবং আতিথেয়তার গুরুত্ব সম্পর্কে আরো বেশি জানতে ও বুঝতে পারি। এটি অবশ্যই পৃথিবীর সবচেয়ে অতিথিপরায়ণ স্থান।

 

প্রশ্ন: আপনি ত্রিপুরা থেকে সড়ক পথে বাংলাদেশে এসেছেন। এর পেছনে কি বিশেষ কোনো কারণ ছিল? ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য, বিশেষ করে ত্রিপুরার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদারে আপনার কি বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে? এটি কীভাবে উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক হতে পারে?

ভারতীয় হাইকমিশনার : কভিডের কারণে আমার আসার সুযোগ ছিল সীমিত। তবে আমি দৃঢ়ভাবেই ঠিক করেছিলাম, সড়ক পথেই ভারত থেকে বাংলাদেশে আসবো। কারণ ফ্লাইটযোগে বা আকাশ পথে তো আপনি যে কোনো স্থানে যেতে পারেন। ভারতীয় হিসেবে আমার জন্য খুব কম দেশই আছে যেখানে আমি আকাশ পথের বদলে সড়ক পথেও যেতে পারি। সড়ক পথে বাংলাদেশে আসার অন্য একটি অর্থ আছে। এর মাধ্যমে আপনি দেখতে পারবেন—প্রতিদিন সেই পথ দিয়ে লোকজন যাতায়াত করে, তাদের সেই যাতায়াতটা কত সহজ; কানেক্টিভিটি কেমন সহজ, আর চারপাশের পরিবেশটাইবা কেমন। তাৎক্ষণিকভাবে আপনি বুঝতে পারবেন, আপনি কোথায় আছেন। তাই এটি অনেক অন্য ধরনের একটি অনুভূতি। হ্যাঁ, আমি সড়ক পথেই আসতে চেয়েছিলাম।

আমার নিজের অভিজ্ঞতা হলো, উত্তর পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে, ত্রিপুরা বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের অংশীদারির ক্ষেত্রে অত্যন্ত আগ্রহী। ভারতের সবাই বেশ আগ্রহী। কিন্তু বিশেষ করে, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী, রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে প্রতিটি সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারি আরো বাড়াতে আগ্রহী হয়েছে। তাই ত্রিপুরা দিয়ে বাংলাদেশে আসার কারণ আছে।

বাংলাদেশিদের হৃদয়ে ত্রিপুরার জন্য আলাদা একটি স্থান আছে। আপনাদের মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই ত্রিপুরা বাংলাদেশের অত্যন্ত জোরালো সমর্থক ও সহযোগী ছিল। আমি সেই স্মৃতিকেও সম্মান জানাতে চেয়েছিলাম। এছাড়া ত্রিপুরায় আমাদের অনেক প্রকল্প আছে যেগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সংযুক্ত করছে। সাব্রুমের মৈত্রী সেতু থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে সোনামুড়া-দাউদকান্দি পণ্য পরিবহন শুরু হওয়া—এসব কিছু আমাদের সামনে আরো এগিয়ে যাওয়ার ভালো ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। তাই সব দিক বিবেচনায় ত্রিপুরা দিয়েই এসেছি।

আমি আমার মেয়াদে প্রতিটি স্থলবন্দর, নদী বন্দর দিয়েই ভ্রমণ করতে চাই। ইতিহাস ও ভূগোল যে আমাদের একসঙ্গে করেছে তার আরো স্বীকৃতি প্রয়োজন। ঐতিহাসিকভাবেই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সড়ক, রেল ও নদী পথে আজকের বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কানেক্টিভিটি বের করা কেবল মানুষে মানুষে যোগাযোগের জন্যই নয়, অর্থনীতির জন্যও ভালো। আপনি যদি এমন অংশীদারি চান যেখানে উভয় পক্ষের উন্নতি-সমৃদ্ধি হবে তাহলে উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। আপনি ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে আমার স্ত্রীর পারিবারিক যোগসূত্র আছে। তাই, এ কারণেও আমি ওই পাশ দিয়ে এসেছি।

প্রশ্ন: পররাষ্ট্রনীতি ও এর অগ্রাধিকারগুলো সময় সময় বদলায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কি কোনো পরিবর্তন আছে? ভারতের চোখে বাংলাদেশের গুরুত্ব কেমন? ভারতের প্রতিবেশীদের মধ্যে, বিশেষ করে, ‘প্রতিবেশীই প্রথম’ নীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

ভারতীয় হাইকমিশনার: ভারতে দল নির্বিশেষে সব সরকারই আমাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার এটিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ অর্থাৎ ‘প্রতিবেশিই প্রথম’। এটি স্লোগান হিসেবে নয়, নীতি হিসেবেই তিনি গ্রহণ করেছেন। এটি আমাদের প্রকল্প, অংশীদারি উদ্যোগ, বাণিজ্য, রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে দৃশ্যমান। আমরা চাই, আমাদের সঙ্গে আমাদের  প্রতিবেশিদেরও বিকাশ হোক। কারণ আমরা স্বীকার করি, ভারত একা অগ্রসর হতে পারে না। আমাদের প্রতিবেশিরা আমাদের সঙ্গে আছে। ভারতের স্বার্থেই সমৃদ্ধ, সফল প্রতিবেশি প্রয়োজন। আবার একইভাবে প্রতিবেশিদেরও তাদের স্বার্থে সমৃদ্ধ, সফল ভারতকে প্রয়োজন।

আমাদের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত সুষমা স্বরাজ ২০১৮ সালে ঢাকা সফরের সময় বলেছিলেন, ‘পড়শি পেহলে, অর উসমে বাংলাদেশ সবসে পেহলে’। এটি তিনি আন্তরিকভাবেই বুঝিয়েছেন। আমরা যখন বলি ‘প্রতিবেশিই প্রথম’, কার সঙ্গে আমাদের সবচেয়ে বড় সীমান্ত? বাংলাদেশ। কোন প্রতিবেশির সঙ্গে আমাদের সবচেয়ে বেশি যাতায়াত? বাংলাদেশ। আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধুসুলভ প্রতিবেশি কে? বাংলাদেশ। আমরা যখন বলি ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ তখন আমরা কোথায় তাকাই? আমাদের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ এর শুরু কোথায়? বাংলাদেশ। তাই প্রতিটি দৃষ্টিকোণ থেকেই বাংলাদেশ ‘অ্যাক্ট ইস্ট’, ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’সহ আমাদের সব অগ্রাধিকারের মেলবন্ধন হলো বাংলাদেশ। এমনকি ‘ব্লু ইকনোমি’ অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ মূখ্য অংশীদার হতেই হবে। লোকজন যাই ভাবুক না কেন, বাংলাদেশ ভারতের পররাষ্ট্র নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।

প্রশ্ন: হাইকমিশনার হিসেবে আপনি প্রায় নিয়মিতভাবেই এ দেশের মন্ত্রী, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগামী মাসেই ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলন করতে যাচ্ছেন। সেখান থেকে আমরা কী আশা করতে পারি? বাংলাদেশ ও ভারত মুক্তিযুদ্ধ ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর বা সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করতে যাচ্ছে। এটি স্মরণীয় করে রাখতে ভারত কী করতে পারে?

ভারতীয় হাইকমিশনার: আমরা দুই নেতার শীর্ষ সম্মেলনের তারিখ চূড়ান্ত করার কাজ করছি। সহযোগিতার খাতগুলো চিহ্নিত করতে আমরা শীগগীরই বাংলাদেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে ভারতে বৈঠক আয়োজন করছি। এগুলো চূড়ান্ত হওয়ার আগে আমার বলা ঠিক নয়। আমরা যাতে আমাদের বন্ধুত্বের গুরুত্ব বোঝাতে পারি সেজন্য আমাদের দুই দেশের জনগণ, এই অঞ্চল ও সারা বিশ্বের জন্য ভালো ফলাফলের প্যাকেজ যাতে পাওয়া যায় সেজন্য উত্সাহিত করা হচ্ছে। সেখানে অর্থনৈতিক, কানেক্টিভিটি, মানুষে মানুষে সম্পর্ক এবং এমনকি কভিডের মধ্যে আমরা দেখাতে পারি এমন বিষয় থাকতে পারে। আমরা ভ্রমণ স্থগিতাদেশ কাটাতে সক্ষম হয়েছি। ব্যবসা-বাণিজ্য, যাতায়াত, পড়ালেখা এগুলো শুরু করার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের অংশীদারি নতুন করে শুরু করতে পেরেছি। আমি আসন্ন শীর্ষ সম্মেলন নিয়ে এতটুকুই বলতে পারি।

এটি মুজিব বর্ষ। এরপর মুক্তিযুদ্ধের ৫০তম বার্ষিকী। এরপর আমাদের ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি। আমরা অন্তত আগামী ২৫ বছরে এ ধরনের ঐতিহাসিক সুযোগ পাবো না। তাই একসঙ্গে কাজ করা, এই গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিকী উদযাপন আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ প্রথম দু’টি স্মরণ অনুষ্ঠানের (মুজিব বর্ষ ও মুক্তিযুদ্ধে ৫০ বছর) কারণে এটি বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক বছর। আমরা আপনাদের এসব উদযাপনে অংশীদার হতে পেরে গর্বিত। আমি এটি কেন বলছি? কারণ আমাদের প্রধানমন্ত্রী আপনাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে যেমন বলেছেন, বঙ্গবন্ধু অবশ্যই বাংলাদেশের জাতির পিতা। তবে ভারতীয়দের কাছেও তিনি একজন নায়ক। তাই তিনি আমাদেরও নায়ক। আপনারা যখন আমাদের আপনাদের জাতির পিতার জন্মশত বার্ষিকী উদযাপনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেবেন, তখন আপনারা আমাদের নায়ককেও সম্মান জানানোর সুযোগ দিচ্ছেন। এ কারণে আমরা কৃতজ্ঞ। তবে আপনারা যা বলবেন সেটিই আমরা অনুসরণ করবো। এটি আপনাদের উদযাপন। আর আপনারা যা বলবেন সে অনুযায়ী আমরা কাজ করবো।

একইভাবে মুক্তিযুদ্ধ। আমরা যে আপনাদের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন, সহযোগিতা করতে পেরেছিলাম এটি সব সময় ভারতের সর্বোচ্চ সম্মানের বিষয়। কিন্তু আমরা জানি, মুক্তিযুদ্ধ প্রথমত বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির সংগ্রাম। বাংলাদেশের জনগণের যুদ্ধ ছিল। আর আপনারা আজ যে স্বাধীনতা উপভোগ করছেন তা মূলত বাংলাদেশের জনগণই তাদের আত্মত্যাগ, রক্ত, নারীদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জন করেছে। শুরু থেকে সমর্থন, সহযোগিতা দেওয়া কিছু দেশের মধ্যে আমরা ছিলাম। আর আমরাই একমাত্র দেশ যারা সামরিকভাবে সহযোগিতা করেছিল। তবে এটি ছিল প্রথমত ও মূলত বাংলাদেশের সংগ্রাম। এই চেতনা থেকে আমরা আপনাদের যে সব উদযাপনে আমাদের অংশগ্রহণ চান, আমরা অংশ নেবো।

প্রতিটি বিজয় দিবসে আমরা আপনাদের আত্নত্যাগকে সম্মান ও উদযাপন করি। আর আমরা সব সময় তা করবো। এর বাইরে আমরা বাংলাদেশের প্রত্যাশা অনুযায়ী আপনাদের আত্নত্যাগ ও ‘জেনোসাইডের’ স্বীকৃতি আদায় নিশ্চিত করতে সব কিছু করতে প্রস্তুত। বিশ্ব এখনও এগুলোর স্বীকৃতি দেয়নি।

বাংলাদেশের জনগণ তাদের যৌক্তিক অধিকারের জন্য বিশাল আত্মত্যাগ করেছে। ‘জেনোসাইডের’ বিরুদ্ধে তারা সংগ্রাম করেছে। ব্যাপক শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর নিপীড়নের বিরূদ্ধে তারা সংগ্রাম করেছে। যে সেনাবাহিনী তাদের হওয়ার কথা ছিল কিন্তু সেই সেনাবাহিনীই তাদের আক্রমণের পথ বেছে নিলো। এসব বিষয় আমরা জানি ও বুঝি। আমরা আপনাদের উদযাপনে অংশ নেবো। আপনাদের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে আমরা এ বছরটি বিশেষ করে তোলার উদ্যোগ নেবো। আপনারা নেতৃত্ব দেবেন, আমরা অনুসরণ করবো।

প্রশ্ন: আমাদের সম্পর্কের অসাধারণ অগ্রগতি সত্ত্বেও তিস্তার পানিবন্টন চুক্তি এখনও ঝুলে আছে। তিস্তার পানিবন্টন চুক্তি নিয়ে কোনো অগ্রগতির খবর কি জানাতে পারেন? আমাদের দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীরা আরো কয়েকটি নদ-নদীর পানিবন্টন চুক্তি দ্রুত সম্পাদনের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। আমরা কি কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি আশা করতে পারি?

ভারতীয় হাইকমিশনার: আমরা তিস্তা ও অন্যান্য নদী নিয়ে বাংলাদেশের মনোভাব বুঝি। বাংলাদেশকে আমরা অব্যাহতভাবে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছি, বড় ফেডারেল রাষ্ট্র ব্যবস্থার কারণে আমাদের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে রাষ্ট্র ও রাজ্যের ক্ষমতা নির্দিষ্ট করা আছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে একতরফাভাবে পানিবন্টন চুক্তি করা সম্ভব নয়। এমনকি আমাদের নিজেদের দেশের ভেতরও পানিবন্টন চুক্তি জটিল। আমাদের রাজ্যগুলো পানিবন্টনে কী ধরনের জটিলতা মোকাবিলা করছে তা ইন্টারনেট ঘাটলেই দেখতে পাবেন। সাধারণত এ ধরনের বিষয় আদালত পর্যন্ত গড়ায়। বর্তমান আইনি সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠে ন্যায্যভাবে পানি বন্টন চুক্তি সইয়ের লক্ষ্যের ব্যাপারে আমরা আমাদের বাংলাদেশি বন্ধুদের আশ্বস্ত করেছি। অন্য নদীগুলো, বিশেষ করে, অন্তত যে নদীগুলোর পানিবন্টন করা যায় বলে উভয় পক্ষের মধ্যে বোঝাপড়া আছে সেখানে আমরা শুরু করতে পারি।

৫৪টি নদী আমাদের সংযুক্ত করেছে। গঙ্গা ও তিস্তার বাইরে আরো ৫২টি আছে। ওই ৫২টি নিয়ে অনেক কাজ করতে হবে। প্রতিটি নদী নিয়েই আমাদের সহযোগিতার সুযোগ আছে। আপনাদের ও আমাদের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় কাজ করছে। আগামী মাস বা কাছাকাছি সময়ে আরেকটি সচিব পর্যায়ের বৈঠক আয়োজন আমাদের লক্ষ্য। এরপর মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক, দীর্ঘদিন ধরে যা হয়নি। আমরা মনে করি, পানিবন্টনের সব ক্ষেত্রে আমাদের পক্ষে অগ্রগতি করা সম্ভব—এটি অন্তত আমাদের জনগণকে দেখানোর জন্যও অগ্রসর হতে পারি। তিস্তার ন্যায্য সমাধানের বিষয়ে আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ। এটি আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার। আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রীও এই অঙ্গীকার করেছিলেন। বাংলাদেশের প্রতি আমাদের রাজনৈতিক আশ্বাস আছে। অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের বিষয়ে যতটা সময় লাগা উচিত তার চেয়ে বেশি সময় লাগে। তবে আপনারা জানেন, এটি রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থার বিষয়। অনেক সময় ভালো ফল পেতে আমাদের একটু ধীরে এগুতে হয়। কিন্তু সেই ভালো ফলটা আমরা চাই।

প্রশ্ন: এয়ার ট্রাভেল বাবলের আওতায় ফ্লাইট চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়েছে। আমরা কি খুব দ্রুত টুরিস্ট ভিসা এবং স্থলবন্দরগুলো দিয়ে যাতায়াতের সুযোগ পাবো?

ভারতীয় হাইকমিশনার: হ্যাঁ। আমরা যত দ্রুত সম্ভব শুরু করতে চাই। আমরা ভ্রমণের ক্ষেত্রে পুরোপুরি স্বাভাবিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় জোরালো চেষ্টা চালাচ্ছি। এ ক্ষেত্রে একমাত্র সমস্যা হলো মহামারি এখনও চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। স্থল পথে যাতায়াত আবারও শুরু করার জন্য আমরা একই ধরনের স্বাস্থ্যবিধিসহ প্রয়োজনীয় প্রটোকল নির্ধারণের চেষ্টা চালাচ্ছি। রাজ্য সরকারগুলোকেও আমাদের এ উদ্যোগের মধ্যে সম্পৃক্ত করতে হবে।

সারা বিশ্বের মধ্যে আমাদের বৃহত্তম ট্যুরিস্ট ভিসা সেবা বাংলাদেশে। তাই আমরা ট্যুরিস্ট ভিসা শুরু করতে চাই। কারণ এটি আমাদের জন্য ভালো, বাংলাদেশের জন্যও ভালো। চ্যালেঞ্জ হলো, কভিডের কারণে আমরা সারা বিশ্বেই আমাদের ট্যুরিস্ট ভিসা বন্ধ রেখেছি। অন্যতম প্রথম রাষ্ট্র হিসে বে বাংলাদেশে আমরা অন্যান্য ভিসা ব্যবস্থা আবারও চালু করেছি। আমরা আশা করি, নিকট ভবিষ্যতে আমরা ট্যুরিস্ট ভিসা আবার চালু করবো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি কোনো তারিখ বলতে পারছি না। কিন্তু নিকট ভবিষ্যতে মহামারিতে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা যদি আয়ত্ত্বের মধ্যে থাকে আমরা আবারও ট্যুরিস্ট ভিসা শুরু করতে চাই।

প্রশ্ন: অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম রেল। শীগগীরই কি রেল সেবা আবারও চালুর সম্ভাবনা আছে?

ভারতীয় হাইকমিশনার: অবশ্যই। আমরা এ ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী। কারণ আকাশ যোগে যাতায়াতের সামর্থ্য সবার নেই। তবে রেল যোগাযোগ আসলে সবাইকে দুই দেশে বন্ধু, আত্নীয়স্বজনের সাক্ষাত ও তাদের বাড়ি যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে আমাদের নাগরিকরা সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণের সুযোগ পায়। আবার এটিও মহামারির ওপর নির্ভর করছে। আমরা আশা করি, পরিস্থিতির উন্নতি হবে। ভারতে ভ্যাকসিন ট্রায়াল শুরু হওয়ার আমরা কভিড নিয়ে উদ্বেগ কমাতে পারবো বলে আশাবাদী। এরপর আমরা যাতায়াত-যোগাযোগে দ্রুত অগ্রগতি করতে পারবো বলে আশা করছি।

প্রশ্ন: সাধারণ মানুষদের জন্য ভারতের ভিসা পাওয়া বেশ পুরনো সমস্যা। লোকজন ভিসা প্রক্রিয়া, বিশেষ করে, মেডিকেল ভিসা প্রক্রিয়া সম্পর্কে তেমন জানে না। এজেন্ট সেজে প্রতারণা করা ব্যক্তিদের আশ্বাসে তারা প্রলুব্ধ হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেদের কোনো দোষ না থাকা সত্বেও কালো তালিকাভুক্ত হয়ে যায়। ভারতীয় হাইকমিশন ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে কী পরিকল্পনা করছে?

ভারতীয় হাইকমিশনার: ভিসা নিয়ে যারা প্রতারকদের প্রতারণার শিকার হয়েছে, বিশেষ করে যাদের মেডিকেল ভিসা জরুরি প্রয়োজন, তাদের প্রতি আমার পূর্ণ সহানুভূতি রয়েছে। এ ধরনের প্রতারণা সত্যিই লজ্জার। কোনো পরিস্থিতিতেই এ ধরনের প্রতারণা গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা যখন দেখি, লোকজন প্রতারণার শিকার হচ্ছে তখন আমরা তাদের আবেদন পর্যালোচনা করে এবং ভিসার বিষয়ে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত আছি। আমরা বাংলাদেশের জনগণকে বলবো, ভারতের ভিসার জন্য বিশ্বস্ত নয় এমন লোকদের কাছে যাবেন না। কোনো এজেন্টের কাছে যাবেন না।

বিশ্বে আমাদের সর্ববৃহৎ ভিসা ব্যবস্থা বাংলাদেশে। আমরা একে আরো উন্নত করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। বর্তমানে ১৬টি জেলায় ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র চালু আছে। আমরা এমন ব্যবস্থা চালু করেছি যাতে আপনারা আপনাদের কাছাকাছি কেন্দ্র থেকেই ভিসা আবেদন করতে পারেন। আমরা আবেদন প্রক্রিয়া যতটা সম্ভব নির্ঝঞ্ঝাট করার চেষ্টা করছি। আবেদনপত্র অনলাইনে পাওয়া যায়। আবেদন কেন্দ্রেও ব্যবস্থা আছে। আমাদের উপদেষ্টা সেখানে বসে আছে। আরো সেবা প্রয়োজন হলে আমরা ‘ব্লাইন্ড চেক’ করবো। সেখানে ভিডিও সার্ভিস আছে যাতে লোকজন প্রতারণা, দুর্ব্যবহারের শিকার না হয়। আমরা সবচেয়ে সেরা সেবা দেওয়া নিশ্চিত করবো।

আমি পাঠকদের বলবো, কারো কোনো খারাপ অভিজ্ঞতা থাকলে কিংবা যদি মনে হয় প্রতারকরা তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে বা তাদের কালো তালিকাভুক্ত করা ন্যায্য হয়নি, তারা আমাদের ভিসা আবেদন কেন্দ্রে স্বাগত। তারা যদি পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করে আমরা সর্বোচ্চ সহানুভূতি দিয়ে তা বিবেচনা করবো। আমরা কেবল বলবো, ভিসার বিষয়ে যার ক্ষমতা নেই তার কাছে যাবেন না। কারণ তারা আপনাদের টাকা নিচ্ছে এবং উল্টো আপনাদের বিপদে ফেলছে। আমরা আশ্বাস দিচ্ছি, আইভ্যাক সেন্টারের ফির বাইরে আর কোন ফি নেওয়া হবে না।

বাংলাদেশ আমাদের বন্ধু। আমাদের বাংলাদেশি বন্ধুরা যাতে সম্ভাব্য সবচেয়ে সহজে ভ্রমণ করতে পারে তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করবো। যতটা সম্ভব সহজ করার চেষ্টা করবো।

প্রশ্ন: ভারত তার কভিড ভ্যাকসিন বাংলাদেশকে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। ভারতের ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের প্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে আছে? বাংলাদেশে কি ভারতীয় ভ্যাকসিনের কোনো ট্রায়াল হবে?

ভারতীয় হাইকমিশনার: আমাদের বিশাল ভ্যাকসিন উৎপাদন শিল্প আছে। বিশ্বের মোট ভ্যাকসিনের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ভারতে উৎপাদিত হয়। এর ফলে সব ভ্যাকসিনের ‘সায়েন্টিফিক রুট’ (বৈজ্ঞানিক মূল) আমরা অন্বেষণ করছি। আমাদের সেরাম ইনস্টিটিউট অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন উৎপাদন করছে। এটি সম্ভাব্য সবচেয়ে ভালো দামে ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে তিন কোটি ডোজ দেওয়ার ব্যাপারে চুক্তি করেছে। অন্য ভ্যাকসিনও তৈরি করা হচ্ছে। এর মধ্যে দুই থেকে তিনটি ‘ইনডিজেনাস ভ্যাকসিন রুট’। সেগুলোর একটির প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের ট্রায়াল শেষ। তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়ার কথা। এটি বেশ বড় সংখ্যায় ভারতজুড়ে শুরু হবে।

আমরা আমাদের প্রতিবেশী, বিশেষ করে, বাংলাদেশকে ওই ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে প্রস্তুত। বাংলাদেশের ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহের সক্ষমতা আছে। বাংলাদেশ কী চায় তার ভিত্তিতে আমরা এ ক্ষেত্রে কাজ করবো। বাংলাদেশ যদি ভ্যাকসিন সরবরাহের আগে ট্রায়াল করাতে চায় তাহলে আমরা আপনাদের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করবো। আপনাদের যদি মনে হয়, ট্রায়ালের পর ভ্যাকসিন প্রয়োজন নেই বা ট্রায়ালের প্রয়োজন নেই তাতেও সমস্যা নেই।

আমরা আমাদের লোকজনকে দিয়ে চেষ্টা করছি। আমরা যা করবো তা প্রথমে ভারতে করবো। এরপর যদি মনে হয়, এটি কোনোকিছু। বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ যদি তা চায় আমরা তা সানন্দে দেবো। তবে আমরা আপনাদের চাহিদা অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে কাজ করবো।

প্রশ্ন: আমাদের সীমান্তে হত্যা বা বেসামরিক জনগণের মৃত্যুতে বাংলাদেশ উদ্বিগ্ন। সীমান্তে মৃত্যুর সংখ্যা শূণ্যে নামিয়ে আনা নিশ্চিত করতে আপনি কী করছেন?

ভারতীয় হাইকমিশনার: আমরা বুঝি, এর কারণ সীমান্তের উভয় পাশে অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। লোকজন একই ভাষায় কথা বলে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের একটি গ্রাম হয়তো সীমান্ত রেখায় ভাগ হয়েছে। সীমান্ত দিয়ে পণ্য ও সেবা চলাচল অব্যাহত আছে। সেগুলোর সব বৈধ নয়। আমরা বুঝি, কেন এটি হয়। কিন্তু আধুনিক পরিস্থিতিতে এটি হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা অবশ্যই বলবো না যে আমরা এটি থামাতে শক্তি প্রয়োগ করতে চাই। কিন্তু আপনারা যদি এসব ঘটনা ও এ বছরের মাঝামাঝি সময়ের তথ্য উপাত্ত দেখেন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। বড় সংখ্যক লোক মিলে আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর হামলা করেছে। দেখা যায়, ২০/২৫ জন লোক মিলে দু’তিন জন কনস্টেবলের ওপর হামলা করেছে ছুড়ি, কুড়াল দিয়ে। আর কোনো উপায় না থাকায় বাধ্য হয়ে গুলি করতে হয়। এরপরও দেখা যায়, আমাদের তথ্য উপাত্তে প্রায় ৫০ শতাংশ হতাহত ভারতীয়। অর্থাৎ কেবল বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে এটি ঘটছে না। সীমান্তের দুই পাশের লোকজন একই ধরনের। তারা এ ধরনের কাজে সহযোগিতা করে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী এ ধরনের নিরূপায় পরিস্থিতিতে গুলি করার আগে তাদের ওপর হামলাকারীদের পরিচয় যাচাই করবে—এটি অসম্ভব। খুব ভোরে গভীর রাতে হামলাগুলো হয়। তারা জানেও না হামলাকারীরা কারা। তারা শুধু জানে, ধারালো কিছু দিয়ে তাদের ওপর হামলা হচ্ছে। গুলি করার পর তারা জানতে পারে ওই ব্যক্তি বাংলাদেশি না ভারতীয়। এটি তাদের পরিচয়পত্র যাচাই করার পরই কেবল সম্ভব।

এটিই সীমান্তের আসল পরিস্থিতি। আমরা পুরোপুরি একমত যে, একটি মৃত্যুও অনেক। এমনকি তারা অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকলেও গুলিতে মৃত্যু তাদের প্রাপ্য নয়। আমরা এটি বুঝি।

আমরা যা করবো তা হলো সীমান্তের দুই পাশে নজরদারি বাড়িয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করবো। উন্নতমানের সীমান্ত বেড়া নিশ্চিত করবো যাতে কেবল আইনগতভাবে অনুমোদিত এলাকা দিয়েই দিনের আলোতে লোকজন যাতায়াত করবে। লোকজনকে নিয়ন্ত্রণের চেয়ে ব্যবস্থার জন্য আমরা আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ বাড়াবো এবং প্রাণঘাতী অস্ত্রের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা কমাবো।

এই সবগুলো একসঙ্গে হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। শুধু একটি উদ্যোগ নিলে তা সম্ভব নয়। সবগুলো একসঙ্গে করতে হবে যাতে সীমান্তের ওপর থেকে চাপ কমে।

আমরা সীমান্তে একটি মৃত্যুও চাই না। কিন্তু আপনারা যদি ২০ বা ১০ বছর আগের হিসাব দেখেন তাহলে সীমান্ত এখন অনেক শান্ত। আমরা সীমান্তে শূণ্য মৃত্যু ও শূণ্য অপরাধ এবং পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ সীমান্ত চাই। এই লক্ষ্যে আমরা বিজিবির সঙ্গে কাজ করতে চাই।

প্রশ্ন:  ‘চীনা আগ্রাসন’ ও ‘ঋণের ফাঁদ’ নিয়ে অনেক দেশ উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ভূমিকাকে ভারত কীভাবে দেখছে?

ভারতীয় হাইকমিশনার: আমাদের অংশীদাররা কেমন সাড়া দেয় তার ভিত্তিতে আমরা তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক মূল্যায়ন করি। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের অগ্রাধিকারমূলক সম্পর্কের ভিত্তি হলো আমরা জানি যে বাংলাদেশও আমাদের অগ্রাধিকার দেয়। অন্যরা কী করছে তা আমরা দেখি না।

আপনারা আপনাদের অন্য অংশীদারদের সঙ্গে কী করছেন এটি মৌলিকভাবে আপনাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়। আমাদের স্বার্থ, নিরাপত্তা উদ্বেগ আছে। আমরা যৌথভাবে কী করতে পারি তা নিয়ে আমাদের বাংলাদেশি অংশীদারদের সঙ্গে এ বিষয়ে স্পষ্টভাবেই বলি। অন্যরা কী করছে সে দিকে আমরা দৃষ্টি দেই না।

আমরা যা করি তা হলো, প্রতিটি প্রকল্পে, প্রতিটি কাজে নিজস্ব ‘খরচ ও মূল্য’ ট্যাগ এবং শর্ত আছে। আমরা জানি, বাংলাদেশের নেতৃত্ব, সিভিল সার্ভিস, অত্যন্ত দক্ষ, অভিজ্ঞ। আপনারই আপনাদের ব্যবস্থাপনা ঠিক করেন। এটি ঋণের ফাঁদ কি না তা আপনারাই ঠিক করবেন। আপনারাই এ বিষয়ে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের অংশীদারি নিয়ে যে ভাবনা তা হলো এটি আমাদের দ্বিপক্ষীয় কর্মকাণ্ডের ভিত্তি। আপনারা আমাদের সঙ্গে কীভাবে কাজ করছেন বা আমরা আপনাদের সঙ্গে কীভাবে কাজ করছি এটিই এখানে মূখ্য। আমরা বাংলাদেশকে বাংলাদেশের চোখে দেখি, অন্য কারো চোখে দেখি না।

প্রশ্ন: কাশ্মীর ও অন্যান্য ইস্যুতে ঢাকায় পাকিস্তান মিশন ভারতবিরোধী প্রচারণায় ব্যস্ত। আপনি এ বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?

ভারতীয় হাইকমিশনার: আমি খোলাখুলিই বলবো যে এটি কূটনৈতিক সুবিধা, বাংলাদেশের আতিথেয়তা ও উদারতার অপব্যবহার। পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদসহ অন্যান্য কর্মকাণ্ড নিয়ে কোনো প্রেসরিলিজ আমরা আপনাদের পাঠাই না। বাংলাদেশের আতিথেয়তার বিপরীতে আপনাদের দেশে তাদের আচরণ ও কাজকর্ম তাদের নিজস্ব বিষয়। তবে, বৈধতা, ইতিহাস ও মাঠ পর্যায়ের তথ্য-উপাত্ত ইউনিয়ন টেরিটরি জম্মু ও কাশ্মীর নিয়ে ভারতের অবস্থানের বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রমাণ করে। আর ওই অবস্থানটি হলো জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবে না। অন্য দেশের বিষয়ে অভিযোগ করে আমরা আপনাদের আতিথেয়তার অপব্যবহার করবো না।

প্রশ্ন: রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ভারত কী ভূমিকা রাখছে? সংকট সমাধানে ভারত কী মিয়ানমারের সঙ্গে তার সম্পর্ককে কাজে লাগাবে?

ভারতীয় হাইকমিশনার: আমরা অব্যাহতভাবে বলছি যে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত প্রায় ১০ লাখ লোককে আপনাদের আশ্রয় ও আতিথেয়তার আমরা প্রশংসা করছি। এতে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে তা আমরা বুঝি এবং এ ব্যাপারে সহানুভূতিশীল। প্রথমত, এটি একটি মানবিক সংকট। আমরা তাদের প্রত্যাশা ও আপনাদের প্রত্যাশার সঙ্গে একমত যে লোকজনের যত শীগগীরই সম্ভব, দ্রুত ও টেকসইভাবে রাখাইন রাজ্যে তাদের বাড়িঘরে ফিরে যাওয়া উচিত। আমরা অনুধাবন করি যে তাদের ফেরার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এ বিষয়ে আমরা মিয়ানমারে কাজ করছি। সেখানে আমরা ঘর নির্মাণ করছি। তাদের ফেরার পর উন্নয়নের বিষয়েও কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো লোকজনের ফিরে যাওয়া উচিত যাতে তাদের আবারও আসতে না হয়। আমরা বাংলাদেশের উদ্বেগ ও সংবেদনশীলতা বুঝি। আমরা আমাদের বন্ধুপ্রতীম উভয় প্রতিবেশি দেশের সঙ্গেই নিরবে কাজ করছি। আমরাই একমাত্র দেশ যার সীমান্ত আছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—দুই দেশের সঙ্গে। আমরা এ বিষয়টি সমাধানে সহযোগিতা করতে চাই যাতে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং বন্ধুত্ব থাকে। এটিই আমাদের অবস্থান।

প্রশ্ন: আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর মধ্যে বিমসটেকের কর্মকাণ্ড বাড়ছে। কিন্তু সার্ক সংকটে আছে। সার্কের এই অচলাবস্থার কারণ কী? সার্ক সক্রিয় ও ফলভিত্তিক সংস্থা হোক—এটি কি ভারত চায়?

ভারতীয় হাইকমিশনার: আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার ব্যাপারে বাংলাদেশের নেতাদের স্বপ্ন, ভাবনা এবং পরবর্তীতে এক আরো এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে উদ্যোগকে আমরা সর্বোচ্চ সম্মান দেই। কিন্তু আপনারা জানেন, আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য সবাইকে একই অঞ্চলের এবং সহযোগিতার ব্যাপারে একই মনোভাবের হতে হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখানে তা হয়নি। পরিবহন, বাণিজ্য, নিরাপত্তাসহ সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার জন্য অব্যাহতভাবে চেষ্টা চালানো হয়ে থাকে। এটিই যদি হয় তাহলে শীর্ষ সম্মেলন করার তেমন কোনো অর্থ নেই। এর বাইরে, আমরা সবাই জানি, যখন গত সম্মেলন একটি বিশেষ দেশে আয়োজনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল তখন কেবল ভারতই বলেনি যে ওই দেশ থেকে সন্ত্রাস আসছে। আরো অনেক নেতাও এমনটি বলেছিলেন। তাই আমরা দেখছি, একটি দেশ সার্ককে এগিয়ে নিতে আগ্রহী নয়। বাকি সবাই কিন্তু প্রস্তুত। এর প্রমাণ হলো অন্য সব ফোরামে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল উপআঞ্চলিক সহযোগিতা, বিমসটেক—এগুলো এগিয়ে যাচ্ছে। কারণ আমরা জানি কীভাবে এগুতে হয়। সবাই একসঙ্গে উদ্যোগ নিচ্ছে। এখন উপআঞ্চলিক সহযোগিতায় আরো গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে। অন্তত আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত এবং আমাদের বন্ধুদের জন্য ভালো ফল দেয় এমন কিছু করা উচিত। আর এটি এমনভাবে হওয়া উচিত যা সবাইকে সার্কে অগ্রসর হওয়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করে। হ্যাঁ, আমরা সার্ক নিয়ে অগ্রসর হতে চাই। কিন্তু অগ্রগতির জন্য সার্কের অভিন্ন এজেন্ডা থাকতে হবে। এটি এমন হওয়া উচিত না যে একটি রাষ্ট্র আমাদের অগ্রগতি থামাতে চাইবে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী? হাইকমিশনার হিসেবে এ সম্পর্ক কোথায় নিতে চান?

ভারতীয় হাইকমিশনার: আমি ভারত ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীদের দিক নির্দেশনার একটি মাধ্যম। সম্পর্কে কোথাও নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা আমার কাজ নয়। তবে আমি বুঝতে পারি, আমাদের নেতারা এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের জনগণ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্ভাব্য সবচেয়ে নিবিড়তম সম্পর্ক চায়। আমি আমাদের মেয়াদে কেবল অংশীদারির নতুন খাতগুলোতে ভূমিকা রাখাই নয়, ব্যবসা সহযোগিতা সৃষ্টি, আমাদের কম্পানিগুলোর মধ্যে যৌথ উদ্যোগ প্রতিষ্ঠা, প্রযুক্তি খাতে অংশীদারি বাড়ানোয় কাজ করতে চাই। তবে সবকিছুর আগে, আমি এমন একটি অংশীদারি চাই যেখানে প্রত্যেক বাংলাদেশি ও প্রত্যেক ভারতীয় আমাদের বন্ধুত্বের উষ্ণতা অনুভব করে। আর প্রত্যেক ভারতীয় ও প্রত্যেক বাংলাদেশি যেন পুরো অঞ্চলজুড়ে শান্তি, মৈত্রী ও সম্প্রীতি থেকে উপকৃত হতে পারে। কেবল দক্ষিণ এশিয়া  নয়, পুরো বিশ্বের সামনে এই শান্তি, মৈত্রী ও সম্প্রীতির মডেল হওয়া উচিত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক।

সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ