মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ ও রণাঙ্গন — এ এস এম সামছুল আরেফিন

42
Social Share

পটভূমী ‘৭১

সংগ্রাম যেখানে শেষ যুদ্ধ সেখানে শুরু। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস এমনি একটি ধারায় প্রবাহিত। ৪৮, ৫২, ৬২, ৬৬, ৬৯, ৭০ বাঙ্গালির স্বাধীকার আন্দোলনের মাইল ফলক। ‘৭১ মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র অধ্যায়। চুড়ান্ত এই যুদ্ধে নেমেছিল বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ছাত্র, কৃষক, জনতার সাথে সমন্বিত হয়েছিল সেনা বাহিনী, ইপিআর, পুলিশ, আনসার এবং সরকারী, আধা সরকারী ও বেসামরিক কর্মকর্তাগণ। এটি ছিল জনযুদ্ধ।

২৫ মার্চ ‘৭১। দিনপঞ্জির এই তারিখ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসাবে চিহ্নিত। স্বায়ত্ব শাসন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২৫ মার্চের রাত একটি চুড়ান্ত সিদ্ধান্তের সীমারেখা অতিক্রম করে। বঙ্গবন্ধুর একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সমগ্র বাঙালি জাতিকে মুক্তির লক্ষে অস্ত্র তুলে নিতে সাহায্য করে।

আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষনে দেখা যায়, ১ মার্চ ‘৭১ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কর্তৃক সংসদ অধিবেশন মুলতুবি ঘোষনার পর থেকে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারা পরিবর্তিত হয়। স্ব-শাসনের আন্দোলনে অংশ গ্রহনকারী বাংলার জনগণ কতৃক নির্বাচিত সদস্যবৃন্দ এই সময়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। এই পর্যায়ে পূর্ব বাংলার প্রশাসনিক কাঠামোয় পাকিস্তান সরকারের সকল নির্দেশ অকার্যকর হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রিয় দপ্তর থেকে প্রেরিত প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকারী আধা সরকারী দপ্তরের সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। শুধুমাত্র সামরিক বাহিনীর কাঠামো ছাড়া প্রশাসনের সকল স্তরে পাকিস্তান সরকারের আদেশ এবং নির্দেশ সামগ্রিকভাবে অকার্যকর থাকে। এই সময়ের মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত এবং জাতীয় মিলিশিয়া গঠনের মত বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার আকাংখা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। প্রশ্ন ওঠে কখন এবং কিভাবে আসবে সেই স্বাধীনতা। বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা স্বাধীনতার এই আকাংখা অবশ্যই মিমাংশিত হবে একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যদিয়ে। এবং এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়ার একমাত্র আইনগত ভিত্তি আছে শুধুমাত্র জনগনের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণের।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় উল্লেখ করা যায়, ১৯৭০ এর নির্বাচন ছিল বাঙালির অধিকার আদায়ের লক্ষে একটি গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট। বাংলার সাড়ে সাতকোটি মানুষ মুক্তির লক্ষে ভোট দিয়েছিল তাদের মনোনিত রাজনৈতিক দলকে। এই নির্বাচনী ম্যান্ডেটে একটি কথায় উল্লেখিত ছিল “বাংলার মানুষের ন্যায্য অধিকার, অন্যথায় স্বাধীনতা”। ১৯৬৬ সালের স্বায়ত্ব শাসনের ৬দফার রাষ্ট্রিয় কাঠামো এবং ১৯৬৯ সালের ১১ দফা ভিত্তিক গড়ে ওঠা পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন বাংলার মানুষের স্বাধীনতার চেতনাকে জাগিয়ে তোলে। রাজনৈতিক আন্দোলনের ভাষায় “স্বায়ত্ব শাসন দিতে হবে” উচ্চারিত হলেও বৃহত্তর যুব সমাজের শ্লোগান ছিল ”তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা। পিন্ডি না ঢাকা- ঢাকা, ঢাকা”। “বীর বাঙ্গালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর”। অতএব ঘটনা পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই সময় থেকেই স্বায়ত্ব শাসনের আন্দোলন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনা পাশাপাশি অবস্থান নিয়ে এগিয়ে চলে। ১৯৭০ এর নির্বাচনের ফলাফল বাংলার জনগণের এই সুপ্ত আকাংখাকে আরো অনেকাংশে বাড়িয়ে তোলে। এক কথায় বলা যায়, ভাষা ভিত্তিক একটি জনগোষ্ঠি স্ব-শাসনের বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহন করার মত শক্তি অর্জন করে।

 

৭ মার্চ ‘৭১। বাংলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। বাঙালি জাতির জীবনের একটি স্বরনীয় দিন। পাকিস্তান সামরিক শাসকের রক্তিম চোখ উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধু লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে তার নীতি নির্ধারনী বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি এই ভাষনে পরবর্তি দিনসমূহের রাজনৈতিক আন্দোলন এবং করণীয় বিষয়গুলি সম্বন্ধে বিস্তারিত দিক নির্দেশনা প্রদান করেন। ৪৮ থেকে ৭১ সাল এই লম্বা সময়ে রাজপথ থেকে কারার অন্তরালে বাংলার মানুষের যে ভালবাসা তিনি অর্জন করেছিলেন, একইভাবে এই লম্বা সময়ের পথ চলায় বাংলার মানুষ তার উপর যে আস্থা অর্জন করেছিল, ৭ মার্চ ‘৭১ তিনি বাংলার মানুষের সেই ভালবাসা এবং আস্থার উপর নির্ভর করে তার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোঘনা করেন। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বাঙ্গালী কর্মকর্তাগন বঙ্গবন্ধুর এই নিদের্শনাকে একটি চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত  হিসাবে বিবেচনা করেন। তিনটি বিশেষ রাজনৈতিক নির্দেশনায় জনগণের প্রতি তার এই আহ্বান উচ্চারিত হয়।

“এক” ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল-এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘটনা পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই দিনের পর থেকে বাংলার সংগ্রামী জনগণকে আর পিছে তাকিয়ে দেখতে হয়নি। গ্রামে, মহল্লায় স্বেচ্ছা সেবক বাহিনীর তত্বাবধানে সামরিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়, আপদ কালীন সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক সদস্য, ইপিআর, পুলিশ, আনসার ও ইওটিসি সদস্যরা দলবদ্ধ হতে শুরু করে। শুরু হয় যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি। রাতের আঁধারে থানার বড় বাবু সম্পূর্ণ নিজ দায়ীত্বে রাইফেলসহ পুলিশ সদস্যকে দিয়ে গ্রাম্য যুবকদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। বাংলার প্রতিটি ঘর হয়ে ওঠে এক একটি দূর্গ। সামনে একটাই লক্ষ্য বাংলার স্বাধীনতা।

“দুই” ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি’। একজন জন নন্দিত রাজনৈতিক নেতার এটাই একটি চুড়ান্ত নির্দেশনা। এটাই সফলতা। তার অবর্তমানে তার নির্দেশনা পালিত হবে এটাই ছিল তার বিশ্বাষ। পাকিস্তানের সামরিক শাসকগণ তাকে বেশীদিন মুক্ত রাখবেন এটা তিনি কোন ভাবেই বিশ্বাস করতে পারেন নি। তাই তিনি প্রতিটি স্তরের নেতৃবৃন্দকে তাদের করণীয় সম্বন্ধে তার নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছিলেন। নির্দেশনার এই স্থানে তিনি বলেছিলেন “তোমাদের কাছে আমার দাবী রইল”। মানুষের মাঝে কতটুকু ভালবাসা থাকলে এই রক্তের দাবী উত্থাপন করা সম্ভব হয়েছিল এটাই ইতিহাসের বিচার্য। বাংলার জনগন বঙ্গবন্ধুর এই বিশ্বাসের মর্যাদা দিয়ে সার্বিক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিল।

“তিন” ‘আর যাদি একটি গুলি চলে’। এটাই ছিল রাজনৈতিক ভাষায় তার “সঠিক সময়ের” নির্দেশ। যেদিন পাকিস্তান সামরিক বাহিনী বাঙালিদের উপর আক্রমন করে, সেইদিন বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা ঘোষনা করবে। তার রাজনৈতিক সহকর্মীগন তার এই নির্দেশনার অর্থ জানতেন এবং বাস্তবে তাই ঘটেছিল। জেনারেল জিয়া (পরবর্তিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি)৭২ সালে তার একটি  লেখার উল্লেখ করেছিলেন “বঙ্গবন্ধুর এই ভাষন আমাদের জন্য একটি গ্রীন সিগন্যাল ছিল”। একই ভাষায় জেনারেল শফিউল্লাহ, জেনারেল শওকত এবং কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর এই ভাষনের ভাষাকে জাতির দিক নির্দশনা হিসাবে উল্রেখ করেছেন। এই সময়কালে ২৫ মার্চের পূর্ব পর্যন্ত অনেক সামরিক কর্মকর্তাকে বঙ্গবন্ধুর বাসভবন অথবা আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী নেতৃবৃন্দের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন। এই সমস্ত অফিসারেদের মধ্যে বিগ্রেডিয়ার মজুমদার, কর্নেল চৌধুরী, ক্যাপেটন রফিক, ক্যাপ্টেন আমিন আহমেদ চৌধুরী, মেজর খালেদ মোশারাফ, গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার, লে: কর্নেল আব্দুল হাই, মেজর সফিউল্লাহ, মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

পাকিস্তানের বর্বর সামরিক বাহিনী ২৫ মার্চ মধ্যরাতে নিরস্ত্র বাঙালি জনগনের উপর আক্রমন রচনা করে। ২৬ মার্চ বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা ঘোষনা করে। ২৫ মার্চ মধ্য রাতেই বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষনার ‘মূল বানী’ দেশের টি এন্ড টি, ইপিআর বেতার মাধ্যম, পুলিশ বেতার মাধ্যমে দেশের সম্ভাব্য প্রতিটি স্থানে প্রেরিত হয়। ২৬ মার্চ থেকেই দেশব্যাপি শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ।

 

বাংলাদেশ সরকার গঠন

২৬ মার্চ ‘৭১ স্বাধীনতা ঘোষিত হওয়ায় সাথে সাথে বাংলাদেশ একটি নিদ্দিষ্ট সীমারেখায় স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। বাংলা ভাষায় সমৃদ্ধ এই জাতিরাষ্ট্রের ভৌগলিক এলাকা দেশের পতাকায় উপস্থাপিত হয়। এই সময় থেকে বাংলাদেশে পাকিস্তানের রাষ্ট্রিয় কাঠামোর সকল কার্যক্রম অকার্যকর ঘোষিত হয়। বাংলাদেশে পাকিস্তান সরকারের বেসামরিক প্রশাসনে কর্মরত ব্যক্তিবর্গ এবং সামরিক বাহিনীর সকল সহযোগি সদস্যগণ একটি দখলদার বাহিনীর সদস্য হিসাবে চিহ্নিত হয়ে পড়ে। সরকার গঠন এবং দেশকে শত্রু মুক্ত করার লক্ষ্যে ১০ এপ্রিল ‘৭১, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় বাংলাদেশের জাতীয় এবং প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সদস্যদের উপস্থিতিতে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে মুক্তিবাহিনী গঠন ও পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের জন্য সাহায্য ও স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ কর্তৃক গঠিত এই সরকার “গণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার” হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। উল্লেখ করা যায়, একই প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষিত হয়েছিল।

এই সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুকে সরকার প্রধান এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে ৫ সদস্যের একটি মন্ত্রীসভা গঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী এই সরকারকে আওয়ামী লীগের দলীয় আভ্যন্তরীণ বিতর্কের উর্দ্ধে রাখার লক্ষ্যে শুধুমাত্র উচ্চপদস্থ কেন্দ্রিয় নেতৃবৃন্দের  মধ্যে এই মন্ত্রী সভা সীমিত রাখা হয়। যে সমস্ত নেতৃবৃন্দ এই মন্ত্রী সভার সদস্য হিসাবে দায়ীত্ব গ্রহণ করেনঃ-

১।  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান               রাষ্ট্রপতি                  সভাপতি                  পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ

২। সৈয়দ নজরুল ইসলাম                       উপরাষ্ট্রপতি          সহ সভাপতি                 পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ

৩। জনাব কামরুজ্জামান                       মন্ত্রী                         সাধারন সম্পাদক       পাকিস্তান আওয়ামী লীগ

৪। জনাব তাজ উদ্দিন আহমেদ                প্রধানমন্ত্রী                     সাধারন সম্পাদক    পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ

৫।  খন্দকার মোশতাক আহমেদ                মন্ত্রী                         সহ সভাপতি            পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ

৬।  ক্যাপ্টেন মুনসুর আলী                     মন্ত্রী                         সহ সভাপতি            পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ

মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী এই বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ছিল। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের উপর রাষ্ট্রপতির দায়ীত্ব অর্পিত হয়। জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ এই সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়ীত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর নামে এই সরকার “মুজিব নগর সরকার” হিসাবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।

১১ এপ্রিল ‘৭১ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে দেশবাসির উদ্দেশে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের প্রথম বেতার ভাষন প্রচারিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের দিক নির্দেশনাসহ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের উপর পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ বন্ধের বিষয়ে সরকারের আবেদন এই ভাষনে উল্লেখিত হয়। এই বেতার ভাষনে প্রধানমন্ত্রী মেজর জিয়াউর রহমান কর্তৃক স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে “স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষনার” ধারাবাহিকতার বিষয়টি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজ উদ্দিন আহমেদ তার এই বেতার ভাষনে বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনায় মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক অধিনায়কদের দায়ীত্বের বিষয়টি উল্লেখ করেন। বাংলাদেশকে বিভিন্ন যুদ্ধ অঞ্চলে বিভক্ত করে সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে এই যুদ্ধ অঞ্চলের দায়ীত্ব বন্টন করা হয়। যে সমস্ত সামরিক কর্মকর্তা বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক দায়ীত্বপ্রাপ্ত হনঃ-

১।           মেজর খালেদ মোশাররফ                    সিলেট ও কুমিল্লা অঞ্চল

২।            মেজর জিয়াউর রহমান                  চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চল

৩।          মেজর কে এম সফিউল্লা               ময়মনসিংহ ও টাংগাইল অঞ্চল

৪।           মেজর আবু ওসমান চৌধুরী                                        কুষ্টিয়া ও যশোর, রাজশাহী অঞ্চল (দক্ষিন পশ্চিম অঞ্চল)

৫।           মেজর আব্দুল জলিল মিয়া                                    ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী অঞ্চল

প্রধানমন্ত্রী তার এই ভাষনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহনকারী সামরিক কর্মকর্তাদের উপর আস্থার সাথে মুক্তিবাহিনী সংগঠের দায়ীত্বভার অর্পন করেন।

৪ মার্চের পর থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সেনা অধিনায়কগন নিজ নিজ রেজিমেন্টের পুনর্গঠনসহ এবং অন্যান্য ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা শুরু করেন। এই সময় বাংলাদেশের পক্ষে অংশ গ্রহণকারী সামরিক, আধা সামরিক এবং পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের সঠিক অবস্থান সামগ্রিকভাবে কারো জানা ছিলনা। প্রধানমন্ত্রীর এই বেতার ভাষনে যুদ্ধ এলাকা ভিত্তিক দায়ীত্ব বন্টনের পর সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী যুব শ্রেনী নিকটস্থ সামরিক ইউনিটের সাথে যোগাযোগ স্থাপন শুরু করে। দেশের বিশাল যুব সমাজের মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন যুদ্ধ পরিস্থিতিকে সামগ্রিকভাবে প্রভাবিত করে একটি জনযুদ্ধে পরিনত করে। এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি রাজশাহী এবং রংপুর এলাকায় ইপিআরের ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী এবং ক্যাপ্টেন নওয়াজেস আহমেদের উপর দায়ীত্ব অর্পিত হয়। ১১ জুলাই ‘৭১ বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পুণরায় সেক্টর বিভক্তির পূর্ব পর্যন্ত আঞ্চলিক কমান্ডারগন তাদের উপর  এই দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট ছিলেন।

১৭ এপ্রিল আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহনের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়সহ সরকারের সকল মন্ত্রনালয় ও দপ্তর কার্যক্রম শুরু করে।

 

মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা।

১৭ এপ্রিল ‘৭১, উপরাষ্ট্রপতি এবং মন্ত্রী পরিষদ সদস্যদের শপথ গ্রহন অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশ সরকার পরিচিতি লাভ করে। বাংলাদেশের সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রম মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী রাজনীতিবিদ, সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা এবং সর্বস্তরের জনগণের সমন্বয়ের মাধ্যমে জন-যুদ্ধের কাঠামো শক্তিশালী করার চেষ্টা গ্রহণ করে। মন্ত্রী পরিষদ সদস্যদের মধ্যে মন্ত্রনালয় বন্টন, প্রশাসনে কর্মকর্তা নিয়োগ, প্রশাসনিক কাঠামো ও ক্ষমতা বিকেন্দ্রিকরণে আঞ্চলিক দপ্তর গঠণ ও কর্মকর্তা নিয়োগের মত কার্যক্রম শুরু হয়। গণমাধ্যমে স্বাধীন বালা বেতার কেন্দ্র এবং জয় বাংলা পত্রিকা গুরুত্বের সাথে বাংলাদেশ সরকারের কার্যক্রম প্রচার সহ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশের ভাবমুর্তি তুলে ধরাসহ জন সংযোগ কার্যক্রমে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাকিস্তান সরকারের বৈদেশিক মিশনের বাঙালি কর্মকর্তাদের মধ্য হতে অনেকেই এই সময়ে বাংলাদেশ সরকারে যোগদান মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জোরালো প্রচার কার্যক্রম শুরু করেন। বাংলাদেশ সরকারে যোগদানকারী এই সমস্ত কর্মকর্তাদের কর্মতৎপরতায় মুক্তিযুদ্ধ পৃথিবীর বৃহত্তর পরিমন্ডলে উপস্থাপিত হয়।

বাংলাদেশ সরকারের সাংবিধানিক ভিত্তি “The Proclamation on Independece”এ সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রমে উল্লেখ করা হয়  “—that the President shal be the Supreme Commander of all the Armed Forces of the Republic. Shall Exercise all the Exicutive and Legislative powers of the Republic including the power to grant pardon. Shall have the power to appoint a Prime Minister and such other Ministers as he considers necessary”.

বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধ পরিচালনার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার কার্যক্রম শুরু করে। মুক্তি বাহিনী সংগঠনে সরকারের এক নির্দেশনায় বলা হয়, “The newly formed government, on April 10 set about the task of transforming the liberation Army into an organized force by setting up a full-fledged operational base and an interim capital and naming commanders for well-defined liberated zones.

Col. Osmani of the Bengal Regiment, who had retired from active service some time before the flare-up in East Bengal, has been appointed the General Officer Commanding –in Chief of the Mukti Fouj.

Besides the interim capital located in the western zone, a regional unit had been set in the Sylhet-Comilla zone with full administrative authority for the Eastern zone”.

সরকারের এই সময় উপযোগি পদক্ষেপ অতি অল্প সময়ের মধ্যে একটি কার্যকরি মুক্তি বাহিনী গঠিত হয়। দলে দলে দেশপ্রেমিক যুবক শ্রেনী মুক্তিযুদ্ধে যোগদান এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ গ্রহণ করে। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনী সদস্যদের যুদ্ধ সফলতা এবং কার্যক্রম দেশের মুক্তিকামী মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করে। উল্লেখ করা যায় স্ব-পক্ষ ত্যাগকারী পাকিস্তান সামরিক ও ইপিআর বাহিনীর বাঙালি অফিসার এবং সদস্যদগণ প্রাথমিক অবস্থা থেকেই মুক্তিবাহিনী গঠনে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর নিয়মিত সদস্যদের মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ বাঙালির জাতিয় মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। পাকিস্তান কেন্দ্রিয় সরকারের বৈষম্য মুলক আচরণ, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে দেশের সকল স্তরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে। সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যগণও এই প্রক্রিয়ার বাইরে ছিলনা। পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামো থেকে মুক্তির লক্ষ্যে সামরিক কর্মকর্তাদের পরিকল্পনা আগরতলা মামলার বিবরনে বিষদভাবে উল্লেখিত হয়ে আছে। অতএব সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ সব সময় বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিল এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়।

জনযুদ্ধ পরিচালনায় বাঙলাদেশ সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো জন প্রতিনিধিদের সাথে একত্রিত হয়ে দক্ষতার সাথে কার্যক্রম পরিচালনা। মুক্তিযোদ্ধাদের নির্বাচন, প্রশিক্ষণ এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থান গ্রহনের মত কার্যক্রমে এই সমস্ত নেতৃবৃন্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রখেন। এক কথায় বলা যায়, মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি ছাড়া বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ এই জনযুদ্ধে সার্বিকভাবে অংশ গ্রহণ করে।

বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো স্ব-পক্ষ ত্যাগকারী পাকিস্তান সরকারের বাঙালি কর্মকর্তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় অল্প সময়ের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করে। বেতার ও পত্রিকার মাধ্যমে পাকিস্তান সরকারকে ত্যাগ করে সকল কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ সরকারে যোগদান করার জন্য বার বার আহ্বান জানানো হয়। বাংলাদেশ সরকার আশা করেছিলেন সকল বাঙালি কর্মকর্তা পাকিস্তান সরকারকে বর্জন করলে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর পক্ষে বাংলাদেশে প্রশাসন চালানো সম্ভব হবেনা এবং স্বাভাবিক ভাবেই তারা দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হবে।

১৪ মে ‘৭১, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এক নির্দেশ নামায় বলেন ”No Bengali employee should co-operate with the enemy; employees of all ranks should act according to the directive of the Bangladesh Government.  সরকারের এই নির্দেশনায় অনেক সরকারী কর্মকর্তা শত্রু সরকার পরিত্যাগ করে বাংলাদেশ সরকারে যোগদান করে সরকার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়ীত্ব পালন করেন।

বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজ উদ্দিন আহমেদ একই সাথে প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী এবং কর্নেল এম এ জি ওসমানী মন্ত্রীর পদমর্যাদায় মুক্তিবাহিনী প্রধান হিসাবে দ্বায়ীত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। জনাব এম এ সামাদ এই মন্ত্রনালয়ের সচিব এবং জনাব আকবর আলী খান, শাহ আলী ইমাম ও নুরুল ইসলাম চৌধুরী উপ-সচিব হিসাবে দায়ীত্ব পালন করেন। মুক্তি বাহিনীর সকল সংগঠন সরাসরি এই প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয় কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ছিল। একইভাবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের অধীনে সেনা সদর গঠিত হয়। সেনা সদরের অধীনে কর্নেল আব্দুল রব চিফ অব ষ্টাফ (পূর্বাঞ্চলের দায়ীত্বে) এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার ডেপুটি চিফ অব ষ্টাফ হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। এছাড়ায় সেনা সদরে আরো ১৬ জন সেনা কর্মকর্তা কর্মরত ছিলেন।

সরকারের শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রশাসনিক কাঠামো (জোনাল কাউন্সিল) মুক্তিবাহিনীর আঞ্চলিক অধিনায়কদের অধিনস্ত সশস্ত্র ইউনিট সমূহকে স্থানীয় পর্যায়ে সার্বিকভাবে সহযোগিতা প্রদানে নিয়েজিত ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়োগ এবং প্রশিক্ষনের দায়ীত্ব এই সমস্ত আঞ্চলিক প্রশাসনিক কার্যালয়ের মাধ্যমে সমন্বিত হত। স্থানীয় সংসদ সদস্যগণ মুক্তিযোদ্ধাদের বাছাই এবং নিয়োগের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়ীত্ব পালন করেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়মিত প্রশিক্ষনের জন্য আঞ্চলিক প্রশাসকদের নিয়ন্ত্রনে প্রায় ৫৪টি যুব শিবির এবং ৩২টি উচ্চতর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গঠিত হয়। জনযুদ্ধের প্রস্তুতিতে প্রতিটি প্রশিক্ষণ শিবিরে সামরিক প্রশিক্ষণ ছাড়াও নিয়মিত রাজনৈতিক মতাদর্শের বিষয়টিও উপস্থাপিত হত। এই সকল প্রশিক্ষণ শিবির ছাড়াও বিভিন্ন সেনা ইউনিট সমূহে ছাত্র যুবকদের নিয়মিত প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশের বিশাল যুব শ্রেনী সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সাথে মিলিত হয়ে এই জনযুদ্ধে অবতীর্ন হয়।

মুক্তিবাহিনীর সেক্টর গঠণ।

বাংলাদেশ সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের সদর দপ্তরে পরিবর্তিত যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যালোচনা, মুক্তি বাহিনীর অধিনায়কদের মধ্যে যুদ্ধ কৌশল সমন্বয় এবং যুদ্ধ এলাকা বন্টনের মত বিষয় নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ এই সভার উব্দোধন করেন। ১১ জুলাই ‘৭১ থেকে ১৫ জুলাই ‘৭১ আনুষ্ঠানিকভাবে এই সভার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ১৬ এবং ১৭ জুলাই ৭১ প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে সেক্টর অধিনায়কদের প্রশাসনিক বিষয়ে বিভিন্ন আলোচনা সম্পাদিত হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয় আয়োজিত এই সম্মেলনে মুক্তিবাহিনী প্রধান কর্নেল এম এ জি ওসমানী, গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারসহ উচ্চ পদস্থ সকল সামরিক কর্মকর্তা যোগদান করেন এবং এই সম্মেলনের ফলাফল মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধন করে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের এই সম্মেলনে বাংলাদেশের সমগ্র যুদ্ধ এলাকাকে ১১টি যুদ্ধ সেক্টরে বিভক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ এলাকা পূনর্বিন্যাস করা হয় এবং প্রতিটি সেক্টরে সেক্টর অধিনায়কের নিযুক্তি প্রদান করা হয়। উল্লেখ করা যায় মুক্তি যুদ্ধের ১০ নম্বর সেক্টর বার্মা সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত ছিল। এই সময় বার্মা (বর্তমানে মায়ানমার) সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহানুভূতিশীল না থাকায় এই সেক্টরটি নিদ্দিষ্ট এলাকায় সংগঠিত হতে পারেনি। পরবর্তিতে ১০ নম্বর সেক্টর প্রধান সেনাপতির তত্বাবধানে বিশেষ সেক্টর হিসাবে গঠিত হয়। এই সেক্টরের নিয়ন্ত্রনে নৌ কমান্ডো এবং সি এন সি স্পেশাল বাহিনী গঠিত ও পরিচালিত হয়। সেক্টর অধিনায়কদের এই সম্মেলনের পূর্বেই বাংলাদেশ সরকারের যুদ্ধ কালীন গঠিত প্রথম বিগ্রেড “জেড ফোর্স ব্রিগেড” গঠনের জন্য মেজর জিয়াউর রহমান দায়ীত্বপ্রাপ্ত হন। ১ম, ৩য়, ৮ম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ২য় ফিল্ড আর্ঠিলারী এবং জেড ফোর্স সিগন্যাল কোম্পানীর সমন্বয়ে এই ব্রিগেড গঠিত হয়। ময়মনসিংহ সীমান্তের তেলঢালায় ৭ জুলাই এই বিগ্রেডের সদর দপ্তর স্থাপিত হয় এবং ময়মনসিংহ এবং টাংগাইল জেলা (কিশোরগঞ্জ মহকুমা বাদে) এই ব্রিগেডের অপারেশন এলাকা নির্ধারিত হয়। পরবর্তিতে এই এলাকায় ১১ নম্বর সেক্টর গঠিত হলে জেড ফোর্সের অবস্থান পরিবর্র্তিত হয়। সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবর মাসে ‘এস ফোর্স ব্রিগেড এবং ‘কে ফোর্স ব্রিগেড’ গঠিত হয়।

সেক্টর এবং ব্রিগেড ফোর্স গঠিত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধ কৌশলে পরিবর্তন আসে। বাংলাদেশ সরকার গুরুত্বের সাথে যুদ্ধ বিষয়ক সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট হন। ১৭ জুলাই ‘৭১ এক ক্যাবিনেট মিটিংয়ের সিদ্ধান্তে উল্লেখিত হয়, “It was decided that, henceforth the Cabinet would regularly meet on Mondays and Fridays–the meeting on Fridays being exclusively devoted to discuss defence matters.

The Cabinet deliberated on the report submitted by the C-in-C on defence matters with special reference to the meeting of the Sector Commanders held on 10th to 15th July, 1971.

 

 

সমন্বিত যুদ্ধ পরিকল্পনা।

১৩ অক্টোবর ‘৭১ মুক্তিবাহিনী সদর দপ্তর কর্তৃক পরিকল্পিত যুদ্ধ পরিকল্পনার একটি নিদ্দিষ্ট গাইড লাইন প্রদান করা হয়। এই নির্দেশনার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সমন্বিত যুদ্ধ পরিকল্পনা। এই নির্দেশ নামায় উল্লেখ করা হয়, “With a view to immidiate intencification of operations inside, in an effective manner, for the speediest attainment of the objectives specified, all forces `regular’ and `gono bahini’ shall operate from bases inside Bangladesh and simultaneously strike at objectives deep inside.

The commanders shall have full freedom of action to act according to the prevelling sisuation to attain the objectives taske alloted them.

 

বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরের যুদ্ধের সফলতা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আড়োলন সৃষ্টি করে। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন যুদ্ধের উপর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ফ্রেন্স টেলিভিশন ২ নম্বর সেক্টরের উপর একটি যুদ্ধ চিত্র ধারণ করে। বিবিসি, এবিসি ও গ্রানাডা টেলিভিশন কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধের উপর ধারনকৃত এইসব যুদ্ধ চিত্র বর্তমান দিনেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসাবে বিবেচিত।

প্রয়োজনীয় সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ প্রশিক্ষণ, নিয়মিত সামরিক বাহিনী গঠন এবং যুদ্ধ সহযোগিতায় প্রশাসনিক কাঠামো পূনর্গঠনের মধ্যদিয়ে কেন্দ্রিয় সরকার যুদ্ধ পরিকল্পনা এবং যুদ্ধ পরিচালনার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের উচ্চস্তরের মনোবল রক্ষায় সরকারের উচ্চ পর্যায়ের তত্বাবধানে উন্নত অস্ত্র সরবরাহ, উন্নত যোগাযোগ মাধ্যম, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, নিয়মিত মাসিক ভাতা, আহত এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পূনর্বাসন, শীতকালীন বস্ত্র সরবরাহের মত বিষয়ে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। সরকারের এই সিদ্ধান্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল অনেকাংশে বৃদ্ধি পায় বলে উল্লেখ করা যায়।

 

যুদ্ধ সময়কালে আহত সৈনিকদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান এবং শহীদ সদস্যদের দাফনের মত আনুষ্ঠিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হিসাবে বিবেচিত। যুদ্ধ পরিকল্পনা এবং যুদ্ধ পরিচালনায় অধিনায়কগন এই বিষয়টির উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। বাংলাদেশ সরকারে পরিকল্পনায় বিভিন্ন সেক্টরের হাসপাতাল এবং চিকিৎসা ইউনিটকে জরুরী চিকিৎসা সহযোগিতা প্রদানের বিষয়টি ৭ অক্টোবর ‘৭১ মন্ত্রী পরিসদ বৈঠকের সিদ্ধান্তে উল্লেখিত হয়, It was decided to open a new head of account under the title ‘Health (Defence Madical Service) Account. An amount of rupees 10,00,000/ (ten lacs) was sanctioned under this head of account.

একই পরিকল্পনায় এক নম্বর সেক্টরে ৪টি, দুই নম্বর সেক্টরে ৪টি, তিন নম্বর সেক্টরে ২টি, চার নম্বর সেক্টরে ৭টি, পাঁচ নম্বর সেক্টরে ৫টি এবং ছয় নম্বর সেক্টরে ৩টি অতিরিক্ত এ্যামবুলেন্স প্রদানসহ সকল সেক্টরে প্রয়োজনীয় মেডিকেল অফিসার নিয়োগ করা হয়। যুদ্ধ সেক্টরের এই সকল মেডিকেল ইউনিট ছাড়াও প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের মেডিকেল ডাইরেক্টরেটরের সরসরি তত্বাবধানে করিমগঞ্জ মুক্তিবাহিনী হাসপাতাল, বালাত এডিএস, বেলুনিয়া এডিএস, ডাউকি এডিএস, শোলা এডিএস এবং বেছারা এডিএস সমূহকে যুদ্ধ উপযোগি করে তোলা হয়।

একইভাবে বিভিন্ন যুদ্ধে আহত এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত আর্থিক সহযোগিতা প্রদান এবং আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরিকল্পনায় ৭ অক্টোবরের ‘৭১ মন্ত্রী পরিষদের সিদ্ধান্তে বলা হয়, “Scheme for the Madical Care and Welfare of the injured Mukti Bahini members as well as the dependents of the Shaheed. The Cabinet approved the sceme in principal.

It was decided to impliment the treatment of the wounded and provision for their pocket allowance, the provision for the disabled, the burial/cremation of the dead and pension for the dependents of the shaheed”. যুদ্ধ সেক্টর এলাকায় অবিলম্বে এই কার্যক্রম শুরুর জন্য প্রতিটি আঞ্চলিক দপ্তরে এই নির্দেশ প্রদান করা হয়। কেবিনেট সচিব কর্তৃক প্রতিটি আঞ্চলিক প্রশাসককে প্রদত্ত ৫ নভেম্বরের সরকারে নির্দেশের বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। এই নির্দেশে বলা হয়, Please set up a disabled soldiers home with capacity of 20 beds immidiately (.) Some recreational facilities for these soldiers should also be provided (.) Also arrenge to collect the disabled soldiers for admission in this home (.) A some of Rs 15,000 fifteen thousand is being placed immediately (.) This amount should also cover running expenses for two months.  সরকারের এই সিদ্ধান্ত এবং প্রয়োজনীয় দায়ীত্ব গ্রহন সেক্টর/সাবসেক্টর অধিনায়কদের যুদ্ধ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।

 

বাংলাদেশ সরকারের বৈদেশিক মিশন।

উল্লেখ করা যায়, মুক্তিযুদ্ধে গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বৈদেশিক মিশন সমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক অবস্থা থেকেই বিভিন্ন দেশে কর্তরত পাকিস্তান সরকারের বৈদেশিক মিশনের কর্মকর্তাগন স্ব-পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ শুরু করেন। ৬ এপ্রিল ‘৭১ পাকিস্তানের দিল্লি দুতাবাসের বাঙালি কর্মকর্তা জনাব শিহাব উদ্দিন এবং আমজাদ হোসেন স্ব-পক্ষ ত্যাগ করেন। ১০ এপ্রিল গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হলে উভয়েই সরকারে যোগদান করেন। ১৮ এপ্রিল ‘৭১ পাকিস্তান বৈদেশিক মিশনের কলকাতা অফিসের ডেপুটি হাইকমিশনার জনাব হোসেন আলীর নেতৃত্বে সকল বাঙালি কর্মকর্তা একযোগে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে এই মিশনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। গণপ্রাজতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের এটিই ছিল প্রথম বৈদেশিক মিশন।

২১ এপ্রিল ‘৭১ গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিচারপতি আবু সায়ীদ চৌধুরীকে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের কুটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি হিসাবে নিয়োগ দান করেন। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক লিখিত পত্রে উল্লেখিত হয়, “Our formation of Sovereign Independent Peoples` Republic of BANGLADESH you Mr. Justice Abu Sayed Choudhury, are hereby appointed as the Special Representative of the Government of Bangladesh for presenting and receiving communication to and from foreign countries, various Heads of States, Diplomatic Mission abroad, United Nations Organization and other International Bodies as you may specifically assigned and instructed to act and represent from time to time by the Government of Bangladesh”. বিচারপতি আবু সায়ীদ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে বহির্বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ দায়ীত্ব পালন করেন।

জুন- জুলাই ‘৭১ সময়কালে পাকিস্তান কুটনৈতিক মিশনের অধিক সংখ্যক বাঙালি কর্মকর্তা বাংলাদেশ সরকারে যোগদান করেন এবং সরকারের অনুমোদনে মিশন গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা গ্রহণ করেন। এই সমস্ত কর্মকর্তাদের চেষ্টায় যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানীসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতার জন্য সহায়ক সমিতি গঠিত হয়। পৃথীবির উল্লেখযোগ্য গণ-মাধ্যম সমুহ এই সময় থেকে বাংলাদেশে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অত্যাচারের চিত্র গুরুত্বের সাথে তুলে ধরতে শুরু করেন। বাংলাদেশের গণ-মানুষের এই যুদ্ধ সমগ্র পৃথীবিতে আবেদন সৃষ্টি করে।

৪ জুলাই ‘৭১ বাংলাদেশ সরকারে বৈদেশিক মন্ত্রনালয়ের এক আবেদনের বিষয়ে উল্লেখ করা যায়, Bangladesh now at war. It is a total war of a total population of Bangladesh. Our present struggle for liberation. There is no difference between our struggle and the struggle of the people of Russia, China, Cuba and Algeria, which they had to sustain for their liberation. Our struggle is the same in the nature as that of the American struggle for independence in the eighteenth century.

Bangladesh bleeds today. Its people are crying aloud in torment and agony. The blood bath the world has seen on the soul of Bangladesh remains unsurpassed in brutality and bestiality.

Cities and Towns of this unfortunate land have been soaked with blood. For Bengalis it is a battle for survival. It is war we never wanted. It is a war which has been thrust on us by the power hungry military junta of Pakistan”.

মুক্তিযুদ্ধ সময়কালে জাতিসংঘে বিশেষ মিশনসহ বাংলাদেশ সরকারের ১২টি বৈদেশিক মিশন বিভিন্ন দেশে কার্যকর ছিল। অক্টোবর মাসে বিচারপতি আবু সায়ীদ চৌধুরীর নেতুত্বে ১৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল জাতিসংঘে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জোরালো বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

 

মুক্তিযুদ্ধে যৌথ কমান্ড গঠন

অক্টোবর-নভেম্বর মাস থেকে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ সাফল্যে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী দিন দিন কোনঠাসা হয়ে পড়তে শুরু করে। মুক্তিবাহিনীর আক্রমনে যোগাযোগ ব্যবস্থার সেতু, কালভার্ট ধংষ এবং ফেরী চলাচল ব্যহত হওয়ায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্ষুদ্র ইউনিট সমূহ সীমান্ত ঘাটি ছেড়ে নিরাপদ এলাকায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেষ্টা করে। একই সময়ে ভারতের উপর দিয়ে পাকিস্তানের বিমান চলাচলে আপত্তি এবং বাংলাদেশের নৌ-কামান্ডোদের দু:সাহসিক অভিযানে নৌ-বন্দর সমূহ অকার্যকর হওয়ায় পাকিস্তানের ভূখন্ডের সাখে বাংলাদেশে দখলদার হিসাবে চিহ্নিত পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর যুদ্ধরত অংশ মূলত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। নিয়মিত সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ মারাত্বকভাবে ব্যহত হওয়ায় পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর এই অংশ এই সময় থেকে শহর ভিত্তিক আত্মরক্ষা মূলক (strong point defence) প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়।

বাংলাদেশর মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সহযোগি শক্তি ভারতীয় সামরিক বাহিনী কর্তৃক যুদ্ধ কৌশলে সর্বরকম সহযোগিতা মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ অগ্রযাত্রাকে শক্তিশালী এবং তরান্বিত করে। সেক্টর নিয়ন্ত্রিত মুক্তিবাহিনীর গ্রুপ সমূহ মুক্ত এলাকায় শক্তিশালী যুদ্ধ ঘাটি গড়ে তোলে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অবস্থান পর্যালোচনা এবং সময় উপযোগি যুদ্ধ পরিকল্পনায় বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ কমান্ড গঠিত হয়। ২২ নভেম্বর ‘৭১ বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তরের পত্রে এই যৌথ বাহিনী গঠনের বিস্তারিত বিবরণ উপস্থাপন করা হয়। মুক্তিবাহিনী প্রধানের সাক্ষরিত এই নির্দেশনায় উল্লেখ হয়,

Mission ‘To distroy the enemy occupation forces, earliest, in conjunction with the supporting forces, and liberate BANGLADESH.

AimThe aim of this operational directive is to clearly specify, the role-of Bangladesh Forces in relation to Supporting Forces in the event of war between the host country and the enemy. We are now fighting alone, with the help from Supporting Forces. To ensure timely action, formations/sectors of Bangladesh Forces shall with immidiate effect come under command of Supporting Forces”. Formations, subject to the contents of this operational directive.

Role of Supporting Forces “The Supporting Forces will be responsible for destroying the enemy occupation forces, in conjunction with Bangladesh Forces, and liberate Bangladesh. They will provide full logistic support to Bangladesh Formations/Sectors placed under their command”.

Personal note for all ranks—The operations envisaged in this directive shall be crucial-of decisive importance-for the liberation of our nation of seven and half million and the establishment of a sovereign and independent country-Bangladesh. All Commanders will, therefore, stress it on all ranks and ensure strict discipline and selfless and dedicated efforts at all levels and unreserved co-operations with Supporting Forces- in the speediest destruction of the enemy forces”.

 

২২ নভেম্বর ‘৭১ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় সামরিক বাহিনীকে সমন্বিত করে যৌথ বাহিনী গঠন এবং পরবর্তি যুদ্ধ পরিচালিত হয়। মুক্তিবাহিনীর অধিনায়কের মনোবল এবং অধিনস্থদের উপর তাদের আস্থা যুদ্ধ ক্ষেত্রের সকল বাধাঁ অতিক্রম করতে সাহায্য করে। যৌথ বাহিনীর এই সামরিক কাঠামো দেশ শত্রুমুক্ত হওয়া পর্যন্ত কার্যকরি ছিল।

এখানে উল্লেখ করা যায়, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সেক্টর সমূহকে প্রশাসনিক সহযোগিতা প্রদানের লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে ৫টি প্রশাসনিক সেক্টর গড়ে ওঠে। বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ পরিকল্পনায় প্রাথমিকভাবে গঠিত ৬টি যুদ্ধাঞ্চল এবং পরবর্তিতে গঠিত ১১টি সেক্টর ভারতীয় এই প্রশাসনিক সেক্টরের সাথে সমন্বিত ছিল। ভারতীয় সেনাবাহিনীর এই সমস্ত প্রসাশনিক সেক্টর মুক্তিবাহিনীকে যুদ্ধ সরঞ্জাম সরবরাহসহ যোগাযোগ এবং প্রশিক্ষন বিষয়ে সহযোগিতা প্রদানে নিয়োজিত ছিল।

নভেম্বর মাসে মুক্তি বাহিনীর ১১টি সেক্টর ও ৩টি ব্রিগেড এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৩টি কোর, ১টি কমিউনিকেশন জোন, ১টি প্যারা বিগেড, ৩টি ব্রিগেড গ্রুপ এবং ৫টি প্রশাসনিক সহযোগি সেক্টর সমন্নিত হয়ে পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড গঠিত হয়। যৌথবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের এই যুদ্ধ পরিকল্পনায় সমগ্র বাংলাদেশকে পুনরায় ৪টি যুদ্ধ সেক্টরে বিভক্ত করে সৈন্যবাহিনীর পুনর্বিন্যাস করা হয়। যৌথবাহিনীর এই ৪টি যুদ্ধ এলাকা দক্ষিন সেক্টর, উত্তর সেক্টর, মধ্য সেক্টর এবং পুর্ব সেক্টর হিসাবে পরিচিত ছিল।

স্বাধীকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা। পূর্ব বাংলার জনগনের ২৫ বছর ব্যাপি নিরলস আন্দোলন, সীমাহীন ত্যাগ, পাকিস্তান সামরিক সরকারের অবর্ননীয় অত্যাচার এবং সর্বপরি সশস্ত্র অধ্যায়ে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ পরিকল্পনা  বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আলোকিত করে রেখেছে। নিপিড়িত, নির্যাতিত জনগনের গণতান্ত্রিক অধিকার অস্বীকৃত হওয়ায় ৯ মাসব্যাপি এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যদিয়ে শত্রুমুক্ত হয় অধিকার বঞ্চিত মানুষের ‘স্বপ্নের এই বাংলাদেশ’।

 

উপসংহার।

১৬ ডিসেম্বর ‘৭১, পাকিস্তানের দখলদার সামরিক বাহিনীর আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়। ২৫ মার্চ ‘৭১ মধ্যরাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী দেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের লক্ষে যে হত্যাযঞ্জ শুরু করেছিল ১৬ ডিসেম্বর ‘৭১ বাংলার দামাল ছেলেরা তাদের সমস্ত অহংকার গুড়িয়ে দিয়ে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য করে। বাংলাদেশের এই জনযুদ্ধে এক কাতারে দাড়িয়েছিল রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি, সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্য, ছাত্র, শিল্পি, কৃষক- শ্রমিকসহ বাংলার নারী সমাজ। একটি মাত্র লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

এই স্বাধীনতা অর্জনে দেশের জন্য আত্মাহুতি দিয়েছে বাংলার অসংখ্য মানুষ। তাদের উৎসর্গের মূল চেতনা ছিল “আমরা আমাদের বর্তমানকে উৎসর্গ করলাম তোমাদের ভবিষ্যতের জন্য”। গাংগেয় উপতক্যার পলিমাটি ঘেরা শস্য-শ্যামলা এই বাংলার যে সন্তানেরা ছুরি কাচি নিয়ে মারামারিতে ভীত ছিল, সেই দামাল ছেলেরা মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিনের প্রশিক্ষনে কাপিয়ে তুলেছিল পাকিস্তানের অত্যাআধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনীকে। সবই সম্ভব হয়েছিল আত্মবিশ্বাস আর দেশের প্রতি ভালবাসা থেকে।

৪৮ থেকে ৭১ একটি দীর্ঘ সময়। ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা সায়ত্বশাসনের অধিকারের আন্দোলন থেকে সশস্ত্র আন্দোলন তথা মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালি জাতির এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল ভাষা, সংষ্কৃতি এবং অর্থনৈতিক মুক্তি। ‘৭১ এর ৯ মাস সশস্ত্র অধ্যায়ের মধ্যদিয়ে সমগ্র জাতির মধ্যে জেগে ওঠে একটি সংগ্রামী চেতনা। আর এই চেতনার ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠবে আগামী দিনের স্ব-নির্ভর বাংলাদেশ। বাংলাদেশের আপামর জনগণের এই চিন্তা চেতনাকে মুল্যায়ন করে যুদ্ধ কালীন সময়ে জাতির উদ্দেশে দেয়া এক ভাষনে প্রধান মন্ত্রী জনাব তাজ উদ্দিন বলেছিলেন, “As we win the war, we must prepare to win the peace. The edifice of ‘Golden Bengal’ must be laid on the ruins left by a cruel war, and every one of her sons and daughters must take part in the exhilataring and humbling task of reconstruction and development. The revolution began by the Bangabandhu will end only when his ideals of democracy, socialism and secularism are fully realised”.

২২ ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ঢাকায় তার অবস্থান পরিবর্তন করে কার্যক্রম শুরু করে। মুক্তিযুদ্ধের এই চেতনাকে সামনে রেখে দেশ গঠন, স্বাধীন দেশে সরকারের সামনে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সমস্যা মোকাবেলার বিষয়গুলি একটি বড় ধরনের সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ফেলে যাওয়া বিধ্বস্থ অর্থনীতি, যুদ্ধ কালীন সময়ে ভেঙ্গে যাওয়া প্রশাসনিক কাঠমো পুনর্গঠন এবং সর্বোপরি মুক্তি বাহিনীর সদস্যদের জন্য প্রয়োজনীয় এবং কার্যকরি পরিকল্পনা গ্রহণের মত বিষয়গুলিকে প্রাধান্য দেয়া হয়। সরকারের কাঠামো এবং অর্থনৈতিক পূণ:র্গঠনের পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়, “The new government of Bangladesh will be fundamentally different in character and ideology from previous government. The Government of Bangladesh is commited to a socialist pattern of economy based on democracy and democratic values. This will involve social and economic planning on a massive scale. The entire planning will involve a three integrally connected stage. (a) Immediate and short-term planning to deal with post-war problems (b) mid-term planning on a five years basis and (c) a long-term perspective planning extending over a period of 20 to 25 years.

The form of government shall be parliamentary in which the executive shall be responsible to the legislature. The political control of bureaucracy is one of the most effective methods of keeping the administration democratic. সরকারের এই পরিকল্পনায় সংসদীয় কার্যক্রমের যাত্রা শুরু হয়।

১০ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু মুক্ত স্বাধীন দেশে ফিরে আসার পর ১২ জানুয়ারী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়ীত্বভার গ্রহণ করেন।

(মুক্তিযুদ্ধ গবেষক)

সমাপ্ত