মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধ : কুষ্টিয়ার জনযুদ্ধ

5
Social Share

মাহবুব উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গভীর রাতে যখন ঢাকায় ইয়াহিয়ার নির্দেশিত হত্যাযজ্ঞ চলছে তখন আমি ঝিনাইদহ মহকুমার পুলিশের প্রধান হিসেবে নিয়োজিত। রাজারবাগ পুলিশ লাইন থেকে ওয়ারলেসের বার্তা ঝিনাইদহ থানায় যথারীতি ধরা পড়ে। রাজারবাগ আক্রান্ত হয়েছে পাকবাহিনী কর্তৃক এ খবর নিয়ে কনস্টেবল ছুটে আসেন। আমার মানসিক প্রস্তুতি ছিল। কেননা আমি ৮ মার্চ থেকে ঢাকায় অবস্থান করছিলাম ঢাকার সেগুনবাগিচায় অবস্থিত পুলিশ কন্ট্রোল রুম, ডিআইজি অফিসে। ৭ মার্চ সাতকানিয়া থেকে চাটগাঁয় এসেছিলাম ৭ মার্চের ভাষণ শুনতে রেডিও মারফত। শোনা হয়নি। কারণ পাক সরকার রেডিও মারফত সংবাদ রিলে বন্ধ করে দেয়। এর প্রতিবাদে বাঙালি রেডিও কর্মচারীরা রেডিও বন্ধ করে দেন। রেডিও শুনতে অপরাগ হয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে চাটগাঁ ছেড়ে সেদিন সন্ধ্যায়ই বাসে চড়ে বসি জমি জরিপের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ছেড়ে। ৮ মার্চ সোজা পুলিশ কন্ট্রোল রুম। সেখানে বাংলাদেশের সব শহরের খবর আসতে থাকে প্রতি মুহূর্তে। দেশ তখন জ্বলছে, ঢাকা জ্বলছে। দিবানিশি হরতাল, মিছিল, সভা। জায়গায় জায়গায় সেনাবাহিনীর সঙ্গে জনগণের প্রতিবাদ, গুলি। মানুষ হত্যায় পাগলা কুকুরের মতো পাকবাহিনী। আর তার বিরুদ্ধে জনগণের রুদ্র আক্রোশ দেশটাকে অগ্নিগর্ভে পরিণত করেছে। এ অবস্থা কি কোনো বাঙালি উপেক্ষা করতে পারে? আমি ছাত্রলীগের পোড়-খাওয়া কর্মী, নেতা। হোক পুলিশের চাকরি। চাকরির ক্ষেত্রটাকেই কাজে লাগাতে হবে। পূর্বাপর বিবেচনা করেই ১৭ তারিখ ছুটলাম। সন্ধ্যায় পৌঁছলাম ঝিনাইদহে। ডাকলাম সব নেতা-কর্মীকে। ছুটে এলেন নেতা-কর্মীরা। এমএনএ, এমপি এরা। বঙ্গবন্ধু তো ঝিনাইদহের আওয়ামী লীগ নেতা আজিজ সাহেবকে ডেকে ৯ মার্চেই বলে দিয়েছেন ঝিনাইদহে সংগ্রাম কমিটি তৈরি করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে। আর ৭ মার্চের পর পাকিস্তানিরা শোষণ, নিপীড়ন, গণহত্যা যেভাবে চালিয়ে যাচ্ছে তা তো সব শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করতেই হবে। দেশের এহেন সার্বিক পরিস্থিতিতে ২৬ মার্চ এলো। রাতের আঁধারে পাকবাহিনী গোপনে বেরিয়ে পড়ল। যশোর ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে। যেতে হলে পথিমধ্যে ঝিনাইদহ পাড়ি দিতে হবে। ওরা ক্যান্টনমেন্ট গেট পেরোনোর আগেই যশোর টেলিফোন এক্সচেঞ্জের কর্মচারীরা টেলিফোনে খবর পাঠালেন, ‘স্যার, পাকিস্তানি কনভয় যশোর ঝিনাইদহ রোডে অগ্রসর হচ্ছে। ঝিনাইদহ পৌঁছতে বেশি সময় লাগবে না। বারোবাজার কালীগঞ্জ পেরিয়ে ওদের কনভয় ঝিনাইদহ শহরের উপকণ্ঠে হামদো মোড়ে পৌঁছতে পৌঁছতে আমার পুলিশের অস্ত্রাগারের ৪০০ রাইফেল স্থানীয় যুব-শ্রমিক ও উৎসাহী জনগণের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হলো।

সেই ২৫ মার্চ রাতে ইপিআর ৪নং উইংয়ের কমান্ডার ছিলেন বাঙালি মেজর আবু ওসমান চৌধুরী। তাকে সামরিক সলা-পরামর্শের জন্য যশোর মার্শাল’ল এডমিনিস্ট্রেটর ডেকে পাঠিয়েছেন কুষ্টিয়া সার্কিট হাউসে। কর্তব্যের খাতিরে তাকে যেতে হয়েছিল। এজন্য তিনি সস্ত্রীক সেই রাতে কুষ্টিয়া অবস্থান করছিলেন। কিন্তু বিকালবেলা অবস্থা বেগতিক দেখে তিনি পালানোর পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনামাফিক শহর ছেড়ে পালাতে রাত হয়ে যায়। ইচ্ছা ছিল সকালেই চুয়াডাঙ্গা পৌঁছবেন। কিন্তু বিধিবাম। বেলা ১১টার দিকে চুয়াডাঙ্গার পথে ঝিনাইদহে আটকা পড়ে নাস্তানাবুদ হওয়ার পালা। সস্ত্রীক পালানোর সময় ঝিনাইদহের মানুষ তাকে আটক করে। তিনি এবং তার স্ত্রী দুজনই অত্যন্ত সুশ্রী। গায়ের রং টকটকে, ঠিক পাঞ্জাবিদের মতো। ঝিনাইদহের লোকজন সন্দেহ করে তারা পাকিস্তানি। আমি খবর পেয়ে ছুটে যাই। কথা বলে বুঝতে পারি তারা বাঙালি অফিসার ও বেগম। সসম্মানে তাদের চুয়াডাঙ্গায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে দিই। তিনি যখন চুয়াডাঙ্গা পৌঁছলেন তখন বেলা বয়ে গেছে। চুয়াডাঙ্গার ইপিআর বাহিনী সুবেদার মুজিবর ও ও.আর. ইউনুসের নেতৃত্বে ২৫ মার্চ রাতেই বিদ্রোহ করে একজন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনকে হত্যা করে। অবাঙালি জওয়ানদের আক্রমণ করে বন্দী করেছে অথবা হত্যা করেছে। মেজর ওসমান ওই অবস্থায় ৪নং উইংয়ের দায়িত্ব নিলেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাহায্য-সহযোগিতায় গড়ে তুললেন মুক্তি বাহিনীর দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গন। তিনি প্রধান সেনাপতি। ড. আসহাবুল হক বেসামরিক উপদেষ্টা। আমি, তৌফিকসহ যারা ইতিমধ্যে বিভিন্ন রণাঙ্গনে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছি তাদের সমন্বয়ে কুষ্টিয়া রণাঙ্গন সৃষ্টি হলো। যুক্ত হলো দক্ষিণে খুলনা থেকে উত্তরে কুষ্টিয়া, অন্যদিকে সেই গোয়ালন্দ ঘাট থেকে বরিশাল পটুয়াখালী অবধি। পশ্চিম সীমান্তের ওপারে ভারতের নদীয়া, চব্বিশ পরগনায় আমাদের আপদকালীন আশ্রয়ের দুয়ার খুলে দেওয়া হয়। পশ্চিমের খোলা জানালা দিয়ে সেদিন আমি আর বন্ধু তৌফিক মিলে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাহেবকে নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠিয়েছিলাম ভারতের মাটিতে। মিসেস গান্ধীর সার্বিক সাহায্য-সহযোগিতায় সেখানে তিনি গঠন করলেন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু সেই ঘটনার আগেই ৩০, ৩১ মার্চ ও ১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার জনগণ ইতিহাস সৃষ্টি করল এক মহারণে জনযুদ্ধ ঘটিয়ে। পরের দিবাগত রাতে যে আক্রমণ পরিকল্পনা করা হলো তার নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন এআর আজম চৌধুরী। কুষ্টিয়ায় ওরা অবস্থান নিয়েছিল স্থানীয় জিলা স্কুল প্রাঙ্গণে, ওয়ারলেস কলোনিতে আর পুলিশ প্রাঙ্গণে।

রাত ৩টায় মর্টার ছুড়ে আজম চৌধুরী প্রথম আক্রমণের সূচনা করলেন। লড়াই হলো সামনা-সামনি। আর সেই আক্রমণে অংশগ্রহণ করতে বেরিয়ে পড়ল হাজারো মানুষ বাঁশের লাঠি হাতে আর মুখে জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান নিয়ে। শেষ রাতের গোলাগুলির শব্দ আর হাজার হাজার উত্তাল মানুষের স্লোগানে মুখরিত শহর কেঁপে উঠল। ভীত-সন্ত্রস্ত পাকবাহিনী তড়িঘড়ি করে একত্র হলো জিলা স্কুলে। ক্ষিপ্ত জনতা আগুন জ্বালিয়ে দিল ওদের অস্ত্রাগারে, বাসস্থানে। আর জনতার শেষ আক্রমণ থেকে বাঁচতে পাকিস্তানিরা রাতের আঁধারে পালাতে চাইল ওদের ক্যান্টেনমেন্টের আশ্রয়ে যশোরে। পথিমধ্যে গ্যারাগঞ্জে জনতার তৈরি খাদে পড়ে সম্মুখপানে ছুটে আসা গাড়িগুলো নিয়ে সরাসরি সলিল সমাধিতে। সকালের সূর্যরশ্মির আলোয় ওদের গ্যারাগঞ্জের গ্যাঁড়াকলে ফেলে ঝিনাইদহের অধিবাসী ছেলে, মেয়ে, পুরুষ, যুবক সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল ওই হত্যাকারীদের ধ্বংস করতে। হাতের লাঠি, বাঁশের কঞ্চি, শাবল, গাইতি কুড়াল, দা, খন্তা আর বর্শার আঘাতে ওরা সবাই নিহত হলো। আমার হাতে এলো অসংখ্য অটোমেটিক রাইফেল, ৬টা এসিএল গান। ধরা পড়ল লে. আতাউল্লাহ শাহ। বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম প্রিজনার অব ওয়ার। 

আরও আছে। গ্যারাগঞ্জে মার খেতে খেতে যশোর থেকে এক কন্টিনজেন্ট ওদের উদ্ধার করতে এলো। বিষখালীতে মার খেয়ে ফিরে এলো। একই সঙ্গে পাকবাহিনী যশোর ক্যান্টনমেন্টে প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টের ওপর চালাল হত্যাযজ্ঞ। মাত্র একশ আটানব্বই জন সেনা নিয়ে ক্যাপ্টেন হাফিজ বেরিয়ে এলেন। আরও কত কি। সময় গড়িয়ে যায় তীব্রগতিতে এগিয়ে যায় যুদ্ধ। আমরা অবস্থান নিই বারোবাজার রেললাইনের পাশে। তখন ১১ এপ্রিল চলে এসেছে। এরপর আরও অনেক ঘটনা। একসময় পাকিস্তানিরা আমাদের প্রতিরোধ সহ্য করতে না পেরে ত্রিমুখী আক্রমণ রচনা করল। যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে এসে আক্রমণ করল বারোবাজার। পাকশী সেতু আক্রমণ করল। ঢাকা থেকে বিমান বাহিনী পাঠিয়ে আক্রমণ করল চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ। এ অবস্থায় আমরা আত্মরক্ষার্থে বর্ডারের দিকে পাড়ি দিলাম হাজার হাজার সৈন্য-সামন্ত, গাড়ি-ঘোড়া, রসদপত্র, দুই ট্রাক সোনা-দানা, আর টাকা-পয়সা নিয়ে। ঝিনাইদহ থেকে চুয়াডাঙ্গা হয়ে মেহেরপুর পৌঁছতে ১৬ এপ্রিল এলো। আমরা বেতাই বিওপি দিয়ে সীমান্তের ওপারে চলে গেলাম। ১৭ এপ্রিল সকালে খবর এলো ফিরতে হবে মেহেরপুরে বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে। সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। তাই সাত সকালে আবার বেরিয়ে পড়লাম সীমান্ত পাড়ি দিয়ে। বৈদ্যনাথতলায় আম্রকাননে পৌঁছতে সকাল ১০টা বেজে গেল। সেখানে জড়ো হয়েছে হাজারো মানুষ। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানে মুখরিত আম্রকানন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, জনগণ ও গ্রামবাসী আর চারদিক থেকে ছুটে আসা মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের পদভারে প্রকম্পিত আম্রকানন। স্বাধীন বাংলার পতাকা পতপত করে উড়ছে একটা বাঁশের খুঁটিতে। একপাশে চলছে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ এই গানের রিহার্সেল। আরেক পাশে মঞ্চ তৈরি হচ্ছে শপথ গ্রহণের জন্য। বাংলার নতুন সূর্য উদয়ের নবজাগরণী সংগীত, সকালে কাঞ্চন-রঙে রঙিন সূর্যোদয় তির্যক রশ্মিতে, সবুজ ঘাসের চত্বর চকচক করছে। এমন সময় ছুটে এলেন তৌফিক। বললেন স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রধান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ‘গার্ড অব অনার’ দিতে হবে।

কথা ছিল ওসমান ভাই আসবেন, তিনি ‘গার্ড অব অনার’ দেবেন। কিন্তু সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। নেতৃবৃন্দ চলে যাবেন, বসে থাকবেন না। প্রশ্ন করলেন, ‘কী করি বল তো?’ উত্তরে পাঁচ মিনিট সময় চেয়ে নিয়েছিলাম। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই মলিন কাপড়ে সজ্জিত, টুটাফাটা বিভিন্ন রকমের জুতা পরিহিত হরেক রকম টুপিতে মাথা ঢাকা, বেল্টওয়ালা কিংবা বেল্টহীন পনেরো-ষোলো জন থ্রি-নট-থ্রি রাইফেলধারী যোদ্ধাকে দাঁড় করিয়ে ‘গার্ড অব অনার’-এর প্রস্তুতি নিলাম। তারপর কয়েক মিনিটের মধ্যে সামরিক কায়দায় ভারপ্রাপ্ত মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে বুক চিতিয়ে মাথা উঁচু করে হৃদয়ভরা ভালোবাসা, উৎসাহ ও উদ্দীপনা দিয়ে ‘গার্ড অব অনার’ শেষ করলাম। মুহূর্তের মধ্যে সেই ছবি ছড়িয়ে পড়ল সারা বিশ্বে।

সেদিন ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার জন্য ওসমান ভাই আসার কথা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য তিনি কেতাদুরস্ত হওয়ার জন্য সাথী-সিপাহিদের অপরিচ্ছন্ন কাপড় পরিচ্ছন্ন করে শুকিয়ে ইস্ত্রি করার জন্য কালক্ষেপণ করে দেরি করে ফেললেন। তাই ‘গার্ড অব অনার’ তার ভাগ্যে জুটল না। কারণ তিনি যখন আম্রকাননে পৌঁছলেন ততক্ষণে ‘গার্ড অব অনার’ অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেছে।

 

লেখক : খ্যাতিমান মুক্তিযোদ্ধা।