মুকসুদপুর সাব-রেজিস্টার অফিসের অনিয়ম দুনীর্তি : নাবালকের জমি দলিল রেজিস্ট্রি

39
Social Share

সুব্রত বিশ্বাস সজিব, গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি: গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর সাব রেজিস্টার অফিসের অনিয়ম দুর্নীতি এখন ওপেন সিক্রেট। সাব-রেজিস্টারের চাহিদা মত টাকা দিলে সে যে কোন দলিলই রেজেস্ট্রি করে দিতে পারে। চাহিদা মত টাকা না দিতে পারলে কোন পার্টি’র দলিল হয় না। এমন সব কাগজ পত্র চেয়ে বসেন যে, দাতা-গ্রহীতা কেউই জোগাড় করতে পারেন না। আবার তার চাহিদা মত টাকা দিলে নাবালকের সম্পত্তি তিনি অবলীলায় রেজিস্ট্রি করে দেন(এমনই একটি দলিল যার নং ১৬৯৮ তারিখ ১০ মার্চ ২০২১)। এই সাব-কবলা দলিলে দাতা ১১ জন গ্রহীতা ৩ জন। জমির পরিমান সাড়ে ১৬ শতাংশ। মৌজা পৌরসভার পশ্চিম গোপিনাথপুরের প্রাইমারি স্কুলের পাশে এখনই বাড়ী করার উপযুক্ত এসএ খতিয়ান ৪৫৫ দাগ ৫৭৮, বিআরএস খতিয়ান ৬১১ দাগ ৩৬১। জমির বর্তমান মুল্য ৪৪ লাখ টাকা এবং দলিলে বিক্রয় মুল্য লেখা হয়েছে ৩৩ লাখ টাকা।

এই জমির মালিক ছিলেন জিন্নাত আরা বেগম। তার স্বামী  রফিকুল ইসলাম গ্রাম নগর সুন্দরদী, মুকসুদপুর, গোপালগঞ্জ। রফিকুল ইসলাম ১১ জন ওয়ারিশ রেখে ইন্তেকাল করেন। রফিকুল ইসলাম ফরিদপুর জেলা স্কুলে শিক্ষকতা করার সুবাদে তারা স্থায়ীভাবে ফরিদপুরে বসবাস করতেন। রফিকুল এবং জিন্নাত আরা’র সংসারে আজাহারুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম নিলু এবং তাজুল ইসলামকে ওয়ারিশ রেখে ইন্তেকাল করেন। এর পরে আজাহার হঠাৎই জোবাইদা গুলশান আরা ও কাজল ইসলাম  নামে দুই স্ত্রী  এবং সাহেবুল ইসলাম, জান্নাতুল ফেরদৌস, ফাতেমা-তুজ জোহরা, সাদিকা ইসলাম, সারা ইসলাম ও সাদিয়া ইসলাম রিয়া নামের সন্তান রেখে ইন্তেকাল করেন।

নগদ টাকার প্রয়োজনে উক্ত মাতৃক এবং দাদীর ওয়ারিশ হিসেবে জমি বিক্রি প্রস্তাব করায় মুকসুদপুর উপজেলার উজানী গ্রামের বাসুদেবপুর গ্রামের আরফিন সরদারের ছেলে হাফিজুর সরদার ও একই গ্রামের তোতা সরদারের ছেলে মফিজুল সরদার এবং চাদপুর জেলার মতলব থানার পাদুয়া গ্রামের রুস্তম খায়ের মুন্সীর ছেলে কাউছার আলম জমি কেনার প্রস্তাব করেন। জমি কেনা-বেচার মিডিয়া হিসেবে কাজ করেন ওই জমির পার্শ্ববর্তী ওয়ারিশ আরিফুর রহমান রাজু। তিনি দাতা গ্রহীতার সাথে সমন্বয় করে দেন। তিনি বলেন, জমি দাতাদের জমিটি বিক্রির খুব প্রয়োজন ছিল, ক্রেতাদেরও জমির প্রয়োজন। এটা বেচা কেনা এবং দলিল পর্যন্ত আমি জানি। বয়স কম-বেশী এটা আমার জানার বাইরে। জমির দখল পজিশন, এসএ, আরএস এবং বিআরএস কাগজপত্র দেখে ক্রেতা বিক্রেতাদের সাথে দর দাম করে ৪৪ লাখ টাকা ঠিক হয় গত ফেব্রুয়ারি মাসে। মার্চ মাসের ১০ তারিখে দলিল করার আগে দলিল লেখক রিয়াজ মিয়া গিয়ে সাব রেজিস্টার কামরুল হাসানের সাথে দেন-দরবার করেন।এর মধ্যে জমির মালিক জিন্নাত আরার মৃত ছেলে আজহারুল ইসলামের ৮ জন ওয়ারিশের মধ্যে ছেলে সাহেবুল ইসলাম বয়স ১৭ একটু বেশী, ছোট মেয়ে সাদিয়া ইসলাম রিয়া ১৪ বছরের একটু বেশী। অথার্ৎ জমির ১১ জন দাতার মধ্যে দু’জন সাবালক হননি। সাবালক না হলে দলিল রেজিষ্ট্রি করা যায় না। দাখিলকৃত সনদে এর প্রমাণ রয়েছে।

কিন্তু,মুকসুদপুরের সাব রেজিস্ট্রার জমির মুল্য কমিয়ে এবং দাতাদের জন্ম সনদ জাল জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে নিজের পকেট ভারী করে জমির দলিল রেজিস্ট্রি করে দেন। গোপন সুত্রে জানা, তিনি এই দলিল রেজিস্ট্রি করতে ২ লাখ টাকার বেশী পকেটস্থ করেছেন। আর এই লেনদেনে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন ওই দলিল লেখক এবং তার সহকারি। এ বিষয়ে গোপালগঞ্জ জজ কোর্টের দুদকের প্যানেল এ্যাডভোকেট ফায়েক উজ্জমামান জানান, জন্ম সনদে সাবালক না হলে সাব-রেজিস্টার কোন দলিল রেজিস্ট্রি করতে পারেন না। এটা তার এখতিয়ারে নেই। জাল জালিয়াতি একটা বড় অপরাধ। এটার সাথে যারা জড়িত তাদের বিচারের আওতায় আনা উচিৎ। এব্যাপারে জমির দলিল লেখক রিয়াজ মিয়া জানান, পার্টি যে কাগজপত্র এবং এনআইডি বা জন্মসনদ দেয় এবং জমির ২৫ বছরের ইতিহাসসহ আরএস, এসএ বিআরএস, পরচা, সংশ্লিষ্ট দলিল এবং খাজনা পরিশোধের কাগজপত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে দলিলের প্রকৃতি এবং সরকারি দামের কম না রেখেই দলিল প্রস্তুত করে রেজিস্ট্রি করার জন্য অফিসে দেই। অফিসে কাগজপত্র যাচাই করে জমি রেজিস্ট্রি করেন। এখানে বয়স কম বা বেশী কি হয়েছে সিটি বিষয় না। পার্টি যে কাগজপত্র দাখিল করেছেন তা যদি ভুয়া বা ভিত্তিহীন হয় তাহলে পার্টি দায়ী। আমি যদি নিজে কোন কাগজপত্র সৃজন করি তবে সেই অপরাধ আমার হতে পারে। ফলে এ ব্যাপারে আমি নির্দোষ।

রেজিষ্ট্রি অফিসের প্রধান সহকারি মাহফুজুর রহমান জানান কম বয়সী কারোই জমির দলিল করা আইনত দ-নীয় অপরাধ।এই দলিলে কারও গাফলতিতে জন্ম তারিখ কম-বেশি দেখানো হয়েছে তার অনুসন্ধান কর্তৃপক্ষ অবশ্যই করেবন। তবে বয়স কম হলে ওই দাতার জমি দলিল করতে হলে আদালতের আদেশ পত্র বা সাকসেশন প্রয়োজন হবে।

সাব-রেজিস্টার কামরুল হাসান জানান, জমির কাগজপত্র দাতা গ্রহীতাদের সমন্বয়ে হয়।এক্ষেত্রে আমার যাচাই করার সুযোগ নেই। এখতিয়ারের বাইরে, তার পরেও বর্ডার লাইনে থাকা কিছু কিছু এনআইডি বা জন্ম সনদ অনলাইনে যাচাই করি। তবে এ ব্যাপারে কোন কাগজ পত্রে ত্রুটি থাকলে দলিল লেখক, সনাক্তকারি, এবং স্বাক্ষীরা দোষী সাব্যস্ত হতে পারে। তবে আমি কোন অনৈতিক সুবিধা নিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করিনি।

মুকসুদপুর উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম জানান, একজন নয় দু’জন নাবালকের সম্পত্তি কিভাবে রেজিস্ট্রি হয়। এমন অনৈতিক কাজ যদি হয়ে থাকে সেখানে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি খুব জোর দিয়ে কাজ করবে।