মিয়ানমার সেনা অভ্যুত্থান: ব্যর্থ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জাতিসংঘের আহ্বান

41
Social Share

মিয়ানমারে সোমবারের সেনা অভ্যুত্থান ব্যর্থ করে দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টনিও গুতেরেস।

তিনি বলেন, নির্বাচনের ফল উল্টে দেয়াটা “অগ্রহণযোগ্য” এবং সেনা অভ্যুত্থানের নেতাদের বোঝাতে হবে যে, একটি দেশকে শাসন করার এটা কোন পদ্ধতি নয়।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সম্ভাব্য একটি বিবৃতির বিষয়ে আলোচনা করছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে যে, সেনা অভ্যুত্থানের নিন্দা করা হয় এমন যেকোনো বিবৃতি আটকে দেবে চীন।

সামরিক বাহিনী ক্ষমতা নেয়ার পর নির্বাচিত নেতা অং সান সু চিকে গ্রেফতার করা হয়।

মিয়ানমারের পুলিশ পরে মিস সু চি-র বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ দায়ের করেছে। আগামী ১৫ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি রিমান্ডে রয়েছেন।

আটক হওয়ার পর থেকে মিস সু চি কিংবা পদচ্যুত প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সেনা অভ্যুত্থানের নেতা ও সেনাপ্রধান মিন অং লাইংকে দেখা গেছে যে তিনি ১১ সদস্যের জান্তা গঠন করেছেন।

সামরিক বাহিনী এক বছর দেশটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে এবং তাদের নেয়া পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই হিসেবে গত নভেম্বরের নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছেন। ওই নির্বাচনে জয় পায় সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি এনএলডি।

খবর পাওয়া যাচ্ছে যে সামরিক সরকার দেশটিতে ফেসবুক বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কারণ তাদের মতে, সামাজিক যোগাযোগের এই প্ল্যাটফর্মটি “স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা” সৃষ্টি করছে।

বৃহস্পতিবার ব্যবহারকারীরা জানিয়েছে যে তারা ফেসবুকে ঢুকতে পারছে না। সেনা অভ্যুত্থানের বিরোধিতার জন্য খোলা একটি পেইজে লাখ লাখ লাইক রয়েছে।

অং সান সু চিকে আটক রেখেছে মিয়ানমারের সেনা বাহিনী
 

“সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য”

জাতিসংঘের মহাসচিব মিয়ানমারে সাংবিধানিক নীতি পুনঃ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তিনি আশা করছেন যে নিরাপত্তা পরিষদে এ বিষয়ে একটি মতৈক্য হবে।

তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক সব সম্প্রদায়কে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী করার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই করবো আমরা। যাতে করে মিয়ানমারের উপর পর্যাপ্ত চাপ প্রয়োগ করে এই অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করা যায়।”

“নির্বাচনের ফল এবং জনগণের ইচ্ছা উল্টে দেয়াটা সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য।”

“আমার মনে হয় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে বোঝানো সম্ভব হবে যে, এটি একটি দেশকে শাসন করার কোন পদ্ধতি হতে পারে না এবং এভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।”

পশ্চিমা দেশগুলো এরইমধ্যে শক্তভাবেই সেনা অভ্যুত্থানের নিন্দা জানিয়েছে কিন্তু চীনের বিরোধিতার কারণে নিরাপত্তা পরিষদে এনিয়ে কোন একক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। পরিষদের ৫ স্থায়ী সদস্যের মধ্যে চীন একটি যার ভেটো দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে।

বরাবরই আন্তর্জাতিক রোষের মুখ থেকে মিয়ানমারকে রক্ষায় ভূমিকা পালন করে আসছে বেইজিং এবং সাথে সতর্কও করেছে যে, অভ্যুত্থানের কারণে দেশটির উপর নিষেধাজ্ঞা বা আন্তর্জাতিক চাপ পরিস্থিতিকে শুধু আরো খারাপের দিকেই নিয়ে যাবে।

মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর নির্যাতনের ঘটনায় নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়ার পাশাপাশি চীনও মিয়ানমারকে সমালোচনার হাত থেকে রক্ষা করেছে।

সু চি কোথায় রয়েছেন তা স্পষ্ট নয়

ধারণা করা হচ্ছে যে, মিয়ানমারের বেসামরিক নেতা অং সান সু চি নেপিডোতে তার বাসভবনে আটক রয়েছেন।

তার বিরুদ্ধে আমদানি-রপ্তানির আইন ভঙ্গ এবং অবৈধ যোগাযোগ ডিভাইসের মালিকানা থাকার অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশের নথিতে সু চির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে।
 

এসব অভিযোগ পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট বা এফআইআর এ উল্লেখ করা হয়েছে যা একটি আদালতে দায়ের করা হয়েছে।

এ সম্পর্কিত নথিতে বলা হয় যে, তাকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে যাতে তাকে “সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা, প্রমাণ হাজিরের অনুরোধ করা এবং আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদের পর আইনি পরামর্শ চাওয়া সম্ভব হয়।”

প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টের বিরুদ্ধে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনের আওতায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে যে, তিনি সমর্থকদের সাথে দেখা করতে কোভিডের নির্দেশনা ভঙ্গ করে ২২০টি যানবাহনের একটি গাড়ির মহড়ায় অংশ নিয়েছিলেন।

অং সান সু চি: কিছু মৌলিক তথ্য

সু চি

•কয়েক দশকের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে প্রচারণার কারণে ১৯৯০ সালে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন।

•শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং মুক্ত নির্বাচনের দাবিতে র‍্যালি সংগঠনের কারণে ১৯৮৯ সাল থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ১৫ বছর আটক ছিলেন তিনি।

•১৯৯১ সালে গৃহবন্দী থাকা অবস্থাতেই শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার পান তিনি।

•২০১৫ সালে ২৫ বছরের মধ্যে প্রথমবার মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত অবাধ নির্বাচনে তার নেতৃত্বে এনএলডি পার্টি অংশ নিয়ে জয় পায়।

•দেশটির সামরিক বাহিনীর নির্যাতনের কারণে মুসলিম রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ৫ লাখের বেশি মানুষ বাংলাদেশে গিয়ে আশ্রয় নেয়ার ঘটনায় নিন্দা জানানোয় তার খ্যাতি ফিকে হয়ে আসে।

আইন অমান্যের আহ্বান অ্যাক্টিভিস্টদের

মিয়ানামরে এখনো বড় ধরণের কোন বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ চোখে পড়েনি। মঙ্গলবার ও বুধবার রাতে ইয়াঙ্গনের রাস্তায় গাড়ির হর্ন বাজায় চালকরা এবং বাসিন্দারা রান্না করার হাড়ি-পাতিল বাজিয়ে প্রতিবাদ জানায়।

প্রতিবাদী চিকিৎসকরা
 

সেনা অভ্যুত্থানের পর মূলত দেশটি শান্ত রয়েছে। শহরে টহল দিচ্ছে সেনারা এবং রাতে কারফিউ জারি করা হয়েছে।

তবে হাসপাতালগুলো বিক্ষোভ করছে। অনেক চিকিৎসক কাজে ইস্তফা দিয়েছেন। আবার অনেকে মিয়ানমারের স্বল্পদিনের গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে থাকা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে নির্দিষ্ট প্রতীক পরেছেন।

বিক্ষোভকারীরা বলছেন যে, তারা সু চি-র মুক্তি দাবি করছেন।

প্রতিবাদের অংশ হিসেবে তারা কালো কিংবা লাল ফিতা পরেছেন এবং তিন আঙুল দিয়ে স্যালুট দিয়ে ছবিও তুলছেন। এই স্যালুট হাঙ্গার গেমস চলচ্চিত্র এবং গত বছর থাইল্যান্ডের বিক্ষোভের কারণে পরিচিতি লাভ করে।

সু চির দলের প্রতি সমর্থন দেখাতে অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে তাদের প্রোফাইল পিকচার বদলে লাল রঙের করে দিয়েছেন।

– বিবিসি বাংলা