মহামারিতেও বাংলাদেশের অর্থনীতি নিরাপদ

ড. মিল্টন বিশ্বাস : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
Social Share

সবার কষ্ট লাঘব করাটাই বর্তমান সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। অন্যদিকে ভারত, চীন ও বাংলাদেশের মতো দেশের প্রচেষ্টা সমন্বিত হলে অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় সামষ্টিক ক্ষমতা বাড়বে। এসব দেশের সরকারের নেয়া প্রণোদনামূলক পদক্ষেপগুলো এক্ষেত্রে ‘ইতিবাচক’ হিসেবে কাজ করবে। সুতরাং করোনা মহামারিতেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থানে আছে বলে গবেষকরা মনে করছেন। এমনকি ভারত, পাকিস্তান, চীন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতির চেয়েও কম ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাপী স্থবির হয়ে পড়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সংকটের অশনি-সংকেতের মুহূর্তে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ প্রকাশ করেছে এই আশাবাদের কথা। দুর্যোগে এদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এখনো ভালো, ফলে করোনাকবলিত অন্যান্য দেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করবে এটাই স্বাভাবিক। ব্রিটিশ পত্রিকাটি লিখেছে, করোনা ভাইরাসের মহামারি পরিস্থিতিতেও উদীয়মান সবল অর্থনীতি ৬৬টি দেশের। এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। অর্থাৎ নবম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ। ‘ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্সে’র সূত্র উল্লেখ করে দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে- উদীয়মান এসব অর্থনীতির দেশের বন্ড ও শেয়ারবাজার থেকে করোনা ভাইরাসের প্রথম চার মাসে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি তুলে নিয়েছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। যা ২০০৮-২০০৯ সালের বিশ্বমন্দার সময়ের চেয়ে তিনগুণ বেশি। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা গবেষণার তালিকাটিতে শীর্ষে রয়েছে বতসোয়ানা। আর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ভেনেজুয়েলা। এছাড়া চীনের অবস্থান বাংলাদেশের পরে; ১০ নম্বরে। আর সৌদি আরবের অবস্থান বাংলাদেশের এক ধাপ আগে, অর্থাৎ আটে। খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদদের গবেষণায় উঠে আসা এই তালিকায় ভারতের অবস্থান ১৮, পাকিস্তানের ৪৩, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ১৭। অবশ্য করোনা ভাইরাস বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলছে। যেমন ঘোষিত কঠোর লকডাউনের কারণে লোকজন ঘরে থাকতে বাধ্য হওয়ায় উৎপাদন বন্ধ। আর আকাশপথে বিশ্বজুড়ে যোগাযোগ বন্ধ থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্ষতির পরিমাণ বিশাল। এরপরও তুলনামূলক ‘সবল’ এ দেশের অর্থনীতি। ‘সবলতা’র অন্যতম কারণ হলো করোনাকবলিত বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে।
দুই.
ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনের আগে এপ্রিল (২০২০) মাসের প্রথম সপ্তাহে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) জানিয়েছিল করোনায় বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতার মধ্যেও বাংলাদেশে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হবে। তবে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থ হলে অর্থনীতিতে বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করে সংস্থাটি। অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় সরকারের আর্থিক প্রণোদনা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করবে বলে সংস্থাটি ভেবেছে। ৩ এপ্রিল এডিবির আউটলুক ২০২০-এ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে। তবে প্রবৃদ্ধি কমলেও এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হবে বাংলাদেশে। এছাড়া আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আবার ৮ শতাংশ হবে। এদিকে এশিয়ার গড় প্রবৃদ্ধিও কমে যেতে পারে বলে জানিয়েছে এডিবি। মহামারির কারণে যেখানে গত বছর গড়ে ৫.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল সেখানে ২০২০ সালে এশিয়ার গড় প্রবৃদ্ধি হবে ২ দশমিক ২ শতাংশ। উল্লেখ্য, গত অর্থবছরে ৮.১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। চলতি অর্থবছরে ৮.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল সরকার। তবে গবেষকদের আশা, মহামারি শেষ হলে বিদেশে কর্মী প্রেরণ ও প্রবাসীদের কর্মে ফিরে যাওয়া নিশ্চিত হলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে। তৈরি পোশাকের রপ্তানির বড় বাজারগুলোতে চাহিদা বাড়লে ২০২১ সালে প্রবৃদ্ধি কিছুটা এগিয়ে ৮ শতাংশে উঠতে পারে। ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ যে এদেশের অর্থনীতিকে কম ঝুঁকিপূর্ণ বলেছে তার কারণ হলো এই বিশাল অঙ্কের প্রণোদনা প্যাকেজ। এই প্রণোদনা প্যাকেজে এদেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক গতিশীলতা অব্যাহত থাকবে। আর ঘোষিত আর্থিক সহায়তা প্যাকেজসমূহ দ্রুত বাস্তবায়ন হলে আমাদের অর্থনীতি পুনরায় ঘুরে দাঁড়াবে এবং আমরা কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারব। উপরন্তু রপ্তানি খাতের পাশাপাশি দেশীয় পণ্যের প্রতিও বিশেষ নজর দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে সবাইকে দেশীয় পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধির আহ্বানও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। মূলত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করা, শ্রমিক-কর্মচারীদের কাজে বহাল রাখা এবং উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখাই হলো আর্থিক সহায়তা প্যাকেজের মূল উদ্দেশ্য।
তিন.
২০২০ সালের শুরু থেকে করোনার ধাক্কায় পৃথিবীর চিত্রই বদলে যাচ্ছে। ফলে নতুন এক অর্থনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে পৃথিবীর মানুষ। গবেষকদের মতে, করোনার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্ষতির পরিমাণ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। যেমন- সব ধরনের পণ্যসামগ্রীর কাঁচামালের ক্ষেত্রে চীনের ওপর যে অতিনির্ভরতা গড়ে উঠেছে, তা থেকে এবার সবাই বেরিয়ে আসতে চাইবে। সেক্ষেত্রে একটি বড় সুযোগ আসতে পারে ভারত, বাংলাদেশ আর ভিয়েতনামের। এজন্য দরকার সুপরিকল্পিত এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রস্তুতি নেয়া। বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ২০ শতাংশ মানুষের জীবিকার উৎস ভ্রমণ ও পর্যটন। যে দেশের অর্থনীতিতে পর্যটনের গুরুত্ব যত বেশি, সেখানে আঘাতের তীব্রতাও হবে ততটাই। কৃষিনির্ভর আমাদের দেশ এ হিসাবের বাইরে থাকবে। মহামারির কারণে অর্থনৈতিক মন্দার চাপে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০ শতাংশ শিল্প সংস্থা দেউলিয়া হতে পারে, তার সঙ্গে থাকবে অসংগঠিত বা ক্ষুদ্র শিল্পে কাজ হারানোর ভয়াবহ ভবিতব্য। একথা সত্য, কৃষি উৎপাদন ছাড়া স্থবির হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের সব খাতের উৎপাদন কার্যক্রম। শিল্প-কারখানা টিকিয়ে রাখতে এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে সরকারকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে। আগেই বলা হয়েছে রপ্তানিমুখী শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনভাতা প্রদানে ২ শতাংশ সুদে প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। সুখের খবর হলো- পোশাক খাতের বড় বড় ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন। তারা ক্রয়াদেশগুলো বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। শিপমেন্টের অপেক্ষায় থাকা পণ্য নেয়ার বিষয়েও ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। ক্রেতাদের এমন সিদ্ধান্তের ফলে করোনার প্রভাবে যে ৩০০ কোটি ডলারের পোশাক ক্রয়াদেশ স্থগিত বা বাতিলের কথা বলা হচ্ছিল, এখন সেই পরিমাণ কমে আসবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবসময় বলে থাকেন, বাংলাদেশের মানুষের রয়েছে আশ্চর্য এক সহনশীল ক্ষমতা এবং ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা। ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে যে জাতি মাত্র ৯ মাসের মধ্যে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে, যুদ্ধে বিজয় অর্জন করতে পারে- সেই জাতিকে কেউ কখনো দাবিয়ে রাখতে পারবে না, এটা জাতির পিতা নিজেই বলে গেছেন। কাজেই মহামারিতে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট দূর করার জন্য জাতির পিতার সেই অমর বাণী বুকে ধারণ করে এগিয়ে যেতে হবে; ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তার নেতৃত্বে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে ভবিষ্যতে মানুষের আর কোনো সমস্যা হবে না। সবার কষ্ট লাঘব করাটাই বর্তমান সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। অন্যদিকে ভারত, চীন ও বাংলাদেশের মতো দেশের প্রচেষ্টা সমন্বিত হলে অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় সামষ্টিক ক্ষমতা বাড়বে। এসব দেশের সরকারের নেয়া প্রণোদনামূলক পদক্ষেপগুলো এক্ষেত্রে ‘ইতিবাচক’ হিসেবে কাজ করবে। সুতরাং করোনা মহামারিতেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

ড. মিল্টন বিশ্বাস : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।