মহামানব ও মহানায়ক বঙ্গবন্ধু

783
Social Share

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী:

পৃথিবীর সব দেশেই সব মহানায়কেরই যুগে যুগে নতুন করে মূল্যায়ন হয়। অনেকে জীবিতকালে পূজিত হন। মৃত্যুর পর সমালোচিত হন। যেমন- স্তালিন, গান্ধী, মাও জে দং ও চার্চিল। স্তালিন ও মাও জে দং তাঁদের জীবনকালে দেশ-বিদেশের মানুষের দ্বারা পূজিত হয়েছেন। তাঁদের মৃত্যুর পর দারুণভাবে সমালোচিত হয়েছেন। তাঁদের বড় বড় ভুল-ত্রুটির কথা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। গান্ধীর মৃত্যুর পর তিনি ভারতের মানুষের শ্রদ্ধা হারাননি। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সমালোচিত হয়েছেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর চার্চিল হয়েছিলেন ব্রিটিশ জনগণের চোখে সেভিয়ার অব দ্য নেশন। মৃত্যুর পর অনেক সমালোচক তাঁকে আখ্যা দিয়েছেন সাম্রাজ্যবাদী দানব।

বাংলাদেশেও জাতীয় নেতা ফজলুল হক, ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর জীবন ও চরিত্রের ভালো-মন্দ দুই দিকেরই মূল্যায়ন হয়েছে। হক সাহেব, ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দী- এ তিন নেতাকেই জীবনকালে ভারতের দালাল, দেশ বিক্রয়কারী, ইসলাম ও পাকিস্তানের শত্রু এ খেতাব পেতে হয়েছে। তৎকালীন শাসক সাম্প্রদায়িক চক্র এই নেতাদের এভাবেই চিহ্নিত করতে চেয়েছে। এমনকি হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর সমসাময়িক রাজনীতিক ও সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ পর্যন্ত তাঁর ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ শীর্ষক আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে ফজলুল হক সাহেবকে যেভাবে তুলে ধরেছেন তা তাঁর প্রকৃত চরিত্র নয়।

হক সাহেবকে জনসাধারণের কাছে হেয় করার জন্য জেনারেল আইয়ুব খান তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্স’ বইতে তাঁর সম্পর্কে অসত্য তথ্য দিয়েছিলেন। আইয়ুবকে কেউ বিশ্বাস করেনি। তাঁর বইটিও আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। হক সাহেবকে বাংলার মানুষ তাদের হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসনে স্থায়ীভাবে বসাতে দ্বিধা করেনি। পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে প্রকাশ্য জনসভায় গালি দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভারতের লেলিয়ে দেওয়া পাগলা কুকুর।’ সেই ‘কুকুরের’ কবরে প্রতি বছর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মানুষের ঢল নামে। আর সেই নবাবজাদার কবরের খোঁজও কেউ রাখে না।

Bangladesh Pratidinবুদ্ধদেব বসু বলেছেন, ‘আমরা সকলেই কালের পুতুল’। এই কালের বিচারের ঊর্ধ্বে উঠে যিনি মানুষের মনে বেঁচে থাকেন তিনিই মহামানব। একই ব্যক্তি যে মহামানব ও মহানায়ক হবেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু কোনো কোনো মানুষের মধ্যে এ দুই চরিত্রের মিশ্রণ দেখা যায়। যেমন গান্ধী, আবরাহাম লিংকন বা লেনিন। সমকালীন ইতিহাসে তাঁরা নিন্দিত ও প্রশংসিত হয়েছেন। কিন্তু কালান্তরের মূল্যায়নে তাঁরা মহামানব ও মহানায়ক এ দুই পরিচয়েই ইতিহাসে স্থায়ী আসন পেয়েছেন।

কালান্তরের মূল্যায়নে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও মহানায়ক ও মহামানব হিসেবে ইতিহাসে স্বীকৃতি পেতে চলেছেন। তিনি আমাদের একেবারে কাছের মানুষ বলে সমকালীন চোখে আমরা দীর্ঘকাল তাঁর চরিত্রের মহত্ত্ব ও বিশালতা বুঝতে পারিনি। এ বুঝতে না পারার জন্যই যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মারা যেতে হয়েছে। লিংকন ও গান্ধীকে স্বজাতির হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মরতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু-চরিত্রের মহত্ত্ব ও বিশালতা বুঝতে না পেরেই একদল অন্ধ ও মূর্খ ঘাতক তাঁকে হত্যা করেছে। হত্যার পর এ ঘাতকদের প্রভু ও সমর্থকরা দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বঙ্গবন্ধুর চরিত্রহননের চেষ্টা করেছে। ইতিহাসের পাতা থেকে তাঁকে মুছে ফেলতে চেয়েছে।

এটা ছিল মূর্খদের দাম্ভিক প্রচেষ্টা। ইতিহাসকে চ্যালেঞ্জ জানানো। কালান্তরের বিচারদন্ডকে অবহেলা। তাই মৃত্যুর ৪৬ বছর পরেও বঙ্গবন্ধু সমাধি থেকে যিশুর জেগে ওঠার মতো জেগে উঠেছেন এবং তাঁর দুঃখী মানুষের কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু যখন স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানি কারাগার থেকে ফিরে আসেন, তখন তিনি এসেছিলেন রণজয়ী জাতীয় নেতা হিসেবে। এ দিবসটির অবশ্যই ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে। কিন্তু জন্মশতবর্ষে সমাধি থেকে তাঁর আবির্ভাব একজন মহামানব ও মহানায়ক হিসেবে। এখন তিনি শুধু আর বাংলার বাঙালির নেতা নন, সারা বিশ্বের শোষিত মানুষের নেতা।

আমার এ কথাটা কতটা সঠিক তার একটা উদাহরণ দিই। সত্তর দশকের শেষের দিকে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে বিশ্বশান্তি সম্মেলন হয়। এ সম্মেলনে সারা সম্মেলন কক্ষের দেয়ালে গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের নেতাদের ছবি টাঙানো হয়েছিল। সে ছবির সারির মধ্যে হো চি মিনের ছবির পাশেই ছিল বঙ্গবন্ধুর ছবি। সে ছবিতে সব দেশের প্রতিনিধিরা ফুলের মালা পরিয়েছিলেন।

১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে বঙ্গবন্ধু আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে ৭৩ জাতি জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে তিনি তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, ‘পৃথিবী আজ দুই ভাগে বিভক্ত। একটি শোষকের বিশ্ব, আরেকটি শোষিতের। আমি শোষিতের পক্ষে।’ তাঁর এ ভাষণের পর চা-বিরতি পর্বে তাঁর কাছে ছুটে আসেন তানজানিয়ার জুলিয়াস নায়ারে এবং কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো। বঙ্গবন্ধুকে নায়ারে বলেন, নেহরু ও নাসের দুজনই আজ নেই। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন আজ নেতৃত্বহীন। আপনি, ইন্দিরা গান্ধী ও মার্শাল টিটো মিলে আমাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করুন। বঙ্গবন্ধু হেসে বলেছিলেন, ‘আমি তো আপনাদের সঙ্গেই আছি।’

ফিদেল কাস্ত্রো এক পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর হাভানা চুরুট টানছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে তিনি একটি চুরুট অফার করেন এবং বলেন, সম্মেলনে আপনি যা বলেছেন তা আমি শুনেছি। আমার বক্তব্যে আপনাকে হিমালয়ের সঙ্গে তুলনা করেছি। কিন্তু এ হিমালয়েরও এখন বিপদ ঘনিয়ে আসবে। একটা গুলি আপনাকে তাড়া করবে। এ গুলি এখন আলেন্দেকে তাক করেছে। জানি না তিনি রক্ষা পাবেন কিনা। আপনাকেও সাবধান হতে বলছি।

কাস্ত্রোর সাবধানবাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসতে না আসতেই খবর আসে, সিআইএর চক্রান্তে সামরিক অভ্যুত্থানে আলেন্দে নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন। মৃত্যুর আগে বঙ্গবন্ধুকে আলজিয়ার্সে থাকাকালে একটি চিঠি লিখেছিলেন। চিঠির বয়ান ছিল, ‘আপনার সঙ্গে দেখা করার একান্ত ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আমার দেশে যে গোলযোগ শুরু হয়েছে, তাতে এ মুহূর্তে দেশ ছাড়তে পারছি না।’

১৯৭৫ সালে মার্কিন ষড়যন্ত্রে জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনের আরেক নেতা নিহত হন। তিনি সৌদি আরবের বাদশাহ কিং ফয়সল। তাঁর অপরাধ, তিনি ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রামের সমর্থক ছিলেন এবং ইসরায়েলিদের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি তাঁর এক ভাষণে ফিলিস্তিনিদের

মুক্তিসংগ্রামে সাহায্যদানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে বলেছিলেন, ‘ইনশা আল্লাহ, আগামী বসন্তের আগেই আমরা মসজিদ আল আকসা মুক্ত করব এবং সেখানে নামাজ পড়ব।’

এ ঘোষণার পরপরই সম্ভবত ১৯৭৫ সালের জুলাইয়ে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রের দ্বারা তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয় আগস্টে। ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কিং ফয়সলের বৈঠক হয়েছিল। আলজিয়ার্সে জুমার নামাজ পড়ার জন্য কিং ফয়সল, মিসরের আনোয়ার সাদাত এবং বঙ্গবন্ধু গ্র্যান্ড মসজিদে একসঙ্গে গিয়েছিলেন। বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের গণহত্যার সমর্থনদানের জন্য কিং ফয়সল আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও তাঁর আচার-আচরণে দুঃখ প্রকাশ করেন। কিং ফয়সল ফিলিস্তিনিদের মুক্তিসংগ্রামে সমর্থন ও সাহায্য দান সম্পর্কেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু যে নির্যাতিত বিশ্বের অন্যতম নেতা হয়ে উঠেছিলেন তার প্রমাণ তিনি যখন আলজিয়ার্সে, তখন নামিবিয়ার মুক্তিযুদ্ধ প্রায় সফল হওয়ার পথে। তারা স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি তখনো দেশটিকে কেউ দেয়নি। বঙ্গবন্ধু তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনকে ডেকে বলেন, নামিবিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণাকারী সরকারকে অবিলম্বে বাংলাদেশের স্বীকৃতি দিতে হবে। তাঁর সিদ্ধান্তের কথা শুনে তানজানিয়ার জুলিয়াস নায়ারে তাঁকে বলেন, মি. শেখ, আপনার এ সিদ্ধান্তে আমেরিকা রুষ্ট হবে। কারণ তারা নামিবিয়ার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে।

আলজিয়ার্সে থাকাকালেই তাঁর কাছে সমর্থনলাভের আশায় ছুটে এসেছিলেন কম্বোডিয়ার ক্ষমতাচ্যুত রাজা প্রিন্স সিহানুক। মার্কিন চক্রান্তে কম্বোডিয়ায়ও সামরিক শাসকরা ক্ষমতা দখল করেছিল। সিহানুক এ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বাংলাদেশের নেতা বঙ্গবন্ধুর সমর্থন কামনা করে তাঁর ভিলায় এসে সাক্ষাৎ করেন। প্রিন্স সিহানুক তখন চীনের সাহায্যে সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছিলেন। তিনি আশ্রয়ও নিয়েছিলেন বেইজিংয়ে। চীন তখনো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। তথাপি চীনের সাহায্যে কম্বোডিয়ায় যে মুক্তিযুদ্ধ চলছে, তাতে সমর্থন জানাতে সম্মত হন বঙ্গবন্ধু।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় প্রিন্স সিহানুক বলেন, চীনের সাহায্য গ্রহণ ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না। মার্কিন নীতি আমাদের বিরুদ্ধে। ‘হিজ এক্সেলেন্সি শেখ মুজিব, আপনি এখন শুধু বাংলাদেশের নন, আফ্রো-এশিয়ার নির্যাতিত মানুষের নেতা। আপনার নৈতিক সমর্থনই আমাদের যথেষ্ট সাহায্য জোগাবে।’

অন্যান্য দেশের নেতাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বৈঠকের মতো এ বৈঠকেও আমি ছিলাম। ইংরেজিতে লেখা বঙ্গবন্ধুর একটি জীবনী পুস্তিকা প্রিন্স সিহানুককে উপহার দিয়েছিলাম। মুজিব-সিহানুক এ বৈঠকে ড. কামাল হোসেন, তোয়াব খানসহ বাংলাদেশের আরও কয়েকজন মন্ত্রী, কূটনীতিক ও সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।

এবার আসি মূল প্রসঙ্গে। আমার বক্তব্য, বঙ্গবন্ধু গ্রিক ট্র্যাজেডির হিরো হওয়া সত্ত্বেও আজ বিশ্ববরেণ্য একজন নেতা। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর ৪৬ বছর পরও গান্ধী বা লিংকনের মতো তাঁর চরিত্রের কোনো যথার্থ মূল্যায়ন হয়নি। তাঁর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে দেশ-বিদেশে উৎসব চলছে। কিন্তু এ উৎসবের মধ্যে কালান্তরের শেখ মুজিবকে আবিষ্কারের কোনো চেষ্টা হচ্ছে না। এ চেষ্টাটা চালাবেন দেশের ইতিহাসবিদ, গবেষক ও বুদ্ধিজীবীরা। স্তাবকতা দ্বারা সঠিক ইতিহাস লেখা যায় না। তা লেখার জন্য নিরপেক্ষ, পক্ষপাতহীন দৃষ্টিভঙ্গি ও গবেষণা দরকার। ১৯৭১-এর বঙ্গবন্ধু এবং ২০২১ সালের বঙ্গবন্ধু এক নন। কালান্তর বঙ্গবন্ধুর নবজন্ম ঘটিয়েছে। এ কালান্তরের বঙ্গবন্ধুও বাংলাদেশের নির্যাতিত মানুষের নেতা। মুক্তিদাতা।

একাত্তরের চরিত্র থেকে তাঁর উত্তরণ ঘটেছে মহামানব ও মহানায়কে। বাংলাদেশ এবং বিশ্বের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কালজয়ী বঙ্গবন্ধুর আসল ভূমিকা ও অবদান কী, তা আজ খুঁজে বের করা দরকার। কালান্তরের মুজিবকে খুঁজে বের করা না গেলে তাঁর চরিত্রের এবং আদর্শেরও বিবর্তিত রূপ ধরা যাবে না। বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন তাঁর জীবন ও কর্মের মধ্যে। সে জীবন ও কর্ম স্থবির নয়। চলমান ধারা। সে ধারাকে বুঝতে হবে, অনুসরণ করতে হবে। নইলে শুধু উৎসবের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

লেখক : লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।