মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী

47
Social Share

মেজর জেনারেল ড. মো. সরোয়ার হোসেন (অব.):

যুবসমাজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। সেদিনও পুলিশের গুলিতে নিহত মিয়ানমারের তরুণী অ্যাঞ্জেল সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে তা-ই প্রমাণ করলেন। যখন বিভিন্ন মিছিল ও জনসমাবেশে এই তরুণ আর যুবসমাজকে চে গুয়েভারার টি-শার্ট পরে যোগ দিতে দেখি তখন মনে হয় ওরা কি আপসহীন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর কথা জানে? এ বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত না থাকায় এ প্রবন্ধটি ওদের জন্যই লেখা।

রাজনীতির ব্যাপারে আমাদের ধারণা যা-ই হোক, রাজনীতি ছিল বলেই আজ অখ- ভারতের এতগুলো জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে বাঙালি মুসলমান হিসেবে শুধু আমরাই নিজেদের জন্য একটা পতাকা আর মানচিত্র জয় করে এনেছি। সেই বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত কোথায় নেই রাজনীতি! বাংলাদেশকে আজকের অবস্থানে নিয়ে আসতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।

একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে সীমিত সম্পদের ন্যায্য অংশীদারি, সুষ্ঠু বিচার, আইনের শাসন আর মৌলিক অধিকারসমূহের নিশ্চয়তা থাকবে এটাই কাম্য। David Easton-এর মতে রাজনীতি হলো সমাজের মূল্যবান বিষয়গুলোর কর্তৃত্বপূর্ণ সুষম বণ্টন। যার মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু বিশ্বের সর্বত্র আজ অস্বাভাবিক হারে গুটিকয় ব্যক্তির কাছে সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠছে। বাংলাদেশের ২০% ধনী ৪২.৮% সম্পদের মালিক আর দরিদ্রতম ২০% মাত্র ৩.৯% সম্পদের মালিক। এমন নিয়মের বিরুদ্ধেই ছিল ভাসানীর আমৃত্যু সংগ্রাম।

এমন একটা সময়ে আমরা মওলানা ভাসানীর কথা স্মরণ করছি যখন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিরল। মিথ্যাচার, লোভ, স্বজনপ্রীতি আর তোষামোদী গ্রাস করে নিয়েছে সর্বস্ব। সমস্যাগ্রস্ত এ পৃথিবীতে ভ্লাদিমির পুতিন, শি জিন পিংয়ের মতো নেতৃত্ব আমৃত্যু রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকতে প্রস্তুত আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো প্রেসিডেন্ট গোটা পৃথিবীর ভারসাম্যই নষ্ট করে গেছেন। এ অবস্থায় আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ডান বা বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত সবারই উচিত মওলানা ভাসানীর জীবন ও রাজনীতি থেকে শিক্ষা নেওয়া।

ভাসানী ১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা হাজী শরাফাত আলী ও মা মাঝিরান বিবির চার সন্তানের মধ্যে হামিদ ও তাঁর বোন ছাড়া সবাই মহামারীতে মৃত্যুবরণ করেন। শিশু বয়সে হামিদ কখনো মানুষের বোঝা বহন করেছেন, শ্রমিকের কাজ করেছেন, খেতে কৃষিকাজ করেছেন, এমনকি গ্রাম্য বাজারে দোকানির কাজও করেছেন। ওই বয়সেই হামিদ বাবাকে হারান। জীবন-মৃত্যু আর দুর্ভিক্ষের অভিজ্ঞতা হামিদ শৈশবেই অর্জন করেছেন। শৈশবে চাচা ও ইরাকের আলেম নাসিরুদ্দিন বাগদাদি সিরাজগঞ্জে এলে তাঁর সাহচর্যে কাটে। এরপর ১৮৯৭ সালে সৈয়দ নাসিরুদ্দিনের সঙ্গে আসাম গমন করেন। আসামে বসবাসরত বাঙালি মুসলমানদের দুঃখ দেখে মর্মাহত হন। ভাসানী প্রচলিত সুদপ্রথার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করেন। ১৯০৭ সালে তিনি ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের জন্য উত্তরপ্রদেশের দারুল উলুম দেওবন্দ গমন করেন। ওই সময় হামিদ বেশ কিছু ইসলামী চিন্তাবিদ যেমন মুহাম্মদ কাসিম নানুতুবি ও মাহমুদুল হাসানের সান্নিধ্যে এলে তাঁর মধ্যে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনার বিকাশ ঘটে।

রাশিয়ার বিপ্লবের কারণে ১৯১৭ ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের এ মাহেন্দ্রক্ষণে হামিদের সঙ্গে ভারতের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নেতা চিত্তরঞ্জন দাশের দেখা হয়। চিত্তরঞ্জন দাশের সঙ্গে ভাসানীর এ যোগাযোগ ও সাহচর্য তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনা ও মতাদর্শ গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। দেওবন্দে দুই বছর অধ্যয়নের পর তিনি আসামে ফিরে আসেন। ১৯১৯ সালে তিনি কংগ্রেসে যোগ দিয়ে খেলাফত আন্দোলনসহ ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলন করে ইংরেজের চক্ষুশূল হন। এজন্য প্রায় ১০ মাস কারাবরণ করেন। ১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ স্বরাজ পার্টি গঠন করলে তিনি দল সংগঠনে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন।

১৯২৫ সালে তিনি জয়পুরে এক জমিদার পরিবারে বিয়ে করেন। এ সময় হামিদের সব রাজনৈতিক কর্মকান্ডের মনোযোগ ছিল কৃষক-প্রজা আর ছিন্নমূল মানুষের কল্যাণ সাধন। তদানীন্তন সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করা ছাড়া কৃষকের অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব ছিল না। এ জমিদারি প্রথার মাধ্যমেই ইংরেজরা ভারতবর্ষের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে শোসন করত। জমিদারি প্রথা বিশেষভাবে সন্তোষের মহারাজার বিরোধিতা করার জন্য ১৯২৬ সালে ইংরেজরা হামিদকে ময়মনসিংহসহ বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে।

১৯২৬ সালে তিনি তাঁর সহধর্মিণীসহ আসামে গমন করেন এবং প্রথমবারের মতো কৃষক-প্রজা আন্দোলন সংগঠিত করেন। আসামের ডুবরি জেলার ভাসানচরে এক বিশাল কৃষক সম্মেলনের আয়োজন করেন। এর পর থেকেই তিনি ভাসানী খেতাবে ভূষিত হন। ১৮২৬ সালে ব্রিটিশ জেনারেল ক্যাম্পবেল বর্মী বাহিনীকে পরাস্ত করলে চুক্তি মোতাবেক আসাম ইংরেজের অধীন চলে আসে। আসামের কৃষিকার্য করতে ইংরেজরা ময়মনসিংহ ও ঢাকা থেকে কয়েক লাখ মুসলমানকে সেখানে নিয়ে আসে। এরা আসামসহ ভারতের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

একসময় মুসলিম জনগোষ্ঠী ও আসামের স্থানীয় জনগণের মধ্যে স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে আসাম সরকার লাইন প্রথার মাধ্যমে স্থানীয়দের স্বার্থ সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়। ইংরেজরা সর্বত্রই Devide and Rule কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে সমস্যা জিইয়ে রাখে। ভাসানী এ নিপীড়নমূলক লাইন প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। এ সময় তিনি আসাম চাষি-মজুর সমিতি গঠন করেন এবং ডুবরি, গোয়ালপাড়াসহ অন্যান্য জায়গায় আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৩৭ সালে জিন্নাহর আহ্বানে ভাসানী কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং ১৯৪৪ সালে মুসলিম লীগের আসাম প্রাদেশিক সভাপতির পদ লাভ করেন। ১৯৪৬-এ আসামে ‘বঙ্গাল খেদাও’ আন্দোলন শুরু হলে ভাসানী বাঙালিদের স্বার্থ সংরক্ষণে গৌহাটি, বারপেটাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে জনমত তৈরির জন্য ঘুরে বেড়ান। ভাসানীর জনপ্রিয়তা দেখে আসামের মুখ্যমন্ত্রী সৈয়দ মুহাম্মদ সাদুল্লাহ বলেছিলেন, ‘ভাসানীর মতো তিনজন নেতা হলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে দেওয়া যেত।’ এপ্রিল, ১৯৪৬ সালে লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির নির্বাচনে মুসলিম লীগ তিনটি আসনে জয়লাভ করে। ভাসানীর জীবনী লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদের মতে এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব ছিল মওলানা ভাসানীর। শুধু ইংরেজরাই ভাসানীকে ভয় করত তা নয়; এমনকি ১৯৪৭ -এর ভারত বিভাজনের সময় ভাসানী স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে আসামকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন এমন শঙ্কা থেকে ভাসানীকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। ভাসানীর সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকান্ডের জন্যই গণভোটের মাধ্যমে সিলেট পাকিস্তানের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। আসামে ১৫ বছর রাজনীতি করে তিনি মোট আটবার কারাবরণ করেন। ১৯৪৮-এ তিনি টাঙ্গাইলের সন্তোষে ফিরে আসেন এবং ওই বছর পূর্ববাংলা মুসলিম লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৮-এর ১৯ মার্চ বাজেট বক্তৃতায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘পূর্ববঙ্গ থেকে কেন্দ্রীয় সরকার যে কর সংগ্রহ করে তার ৭৫% প্রদেশে খরচ করতে হবে।’ ওই সময় পূর্ব পাকিস্তানের বার্ষিক বাজেট ছিল মাত্র ৩৬ কোটি টাকা। দলীয় সদস্যদের সমালোচনা করায় মওলানা ভাসানীর নির্বাচন ত্রুটিপূর্ণ ছিল- এ মর্মে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রজু করা হয়। ভাসানী ব্যবস্থাপক সভা থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ভাসানীর নির্বাচন বাতিল করেন।

২৩ জুন, ১৯৪৯ মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে একটি বিরোধী দল আত্মপ্রকাশ করে। তুখোড় বক্তৃতার পাশাপাশি ভাসানীর লেখনী ক্ষমতাও ছিল প্রখর। তাঁর হাত ধরেই বহুল প্রচলিত ইত্তেফাক পত্রিকার গোড়াপত্তন হয়েছিল। ১৯৪৯-এ এটি সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে মুসলিম লীগ সরকারের সমালোচনা করে সমাদৃত হয়। এ ছাড়া ভাসানী আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, এশিয়া রেভলিউশন নামে একটি আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিনের সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য হিসেবে কাজ করেন।

১৯৪৯-এর মাঝামাঝি পূর্ববঙ্গে খাদ্যাভাব দেখা দিলে ১১ অক্টোবর আওয়ামী মুসলিম লীগ জনসভায় খাদ্যাভাবের জন্য পূর্ববাংলা মন্ত্রিসভার পদত্যাগ দাবি করেন এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ভুখামিছিলের নেতৃত্ব দেন। এজন্য ১৪ অক্টোবর তিনি কারাবরণ করেন। এরপর ১৯৫০ সালে রাজশাহী কারাগারে বন্দীদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হলে এর প্রতিবাদে ভাসানী ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। ১০ ডিসেম্বর, ১৯৫০-এ তিনি মুক্তি লাভ করেন।

ভাসানীর নেতৃত্বেই ভাষা আন্দোলনে গতি সঞ্চারিত হয়। ১৯৫২-এর ৩০ জানুয়ারি ঢাকা জেলা বার লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত সভায় তাঁর নেতৃত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ গঠিত হয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ায় তিনি প্রায় ১৬ মাস কারাভোগ করেন। জনদাবির মুখে ১৯৫৩ সালে কারামুক্তি লাভ করেন। একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান ও আধ্যাত্মিক পীর হলেও ভাসানী ছিলেন আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক নেতা। তাঁর নেতৃত্বেই আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বিলুপ্ত করা হয়েছিল।

পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন সামনে রেখে তিনি ৩ ডিসেম্বর, ১৯৫৩ সমমনা দলগুলোকে সংগঠিত করে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। ফজলুল হকের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর ১৯৫৪-এর ২৫ মে ভাসানী বিশ্বশান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে গমন করেন। ৩০ মে, ১৯৫৪ পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকার ভেঙে দেওয়া ও ভাসানীর দেশে প্রত্যাবর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। প্রায় ১১ মাস লন্ডন, বার্লিন, দিল্লি ও কলকাতায় অবস্থানের পর ১৯৫৫ সালের ২৫ এপ্রিল তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

পূর্ব পাকিস্তানের খাদ্যাভাব রোধে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ৫০ কোটি টাকার দাবিতে ১৯৫৬-এর মে মাসে ঢাকায় অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। সরকার দাবি মেনে নিলে তিনি ২৪ মে অনশন ভঙ্গ করেন। একই বছর ১২ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে পার্লামেন্ট অনাস্থা আনলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। এ ছাড়া ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে আনীত খসড়া শাসনতন্ত্রে পাকিস্তানকে ইসলামিক রিপাবলিক ঘোষণা করলে ভাসানী বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন।

৮-১০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৭ কাগমারীতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ভাসানী দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারণ করেন, যদি পূর্ব পাকিস্তানকে স্বায়ত্তশাসন না দেওয়া হয় তাহলে জনগণ একদিন পাকিস্তানকে আসসালামু আলাইকুম বলতে বাধ্য হবে। কাগমারী সম্মেলনেই মূলত আওয়ামী লীগে ভাঙনের সুর বেজে ওঠে। ১৯৫৭ সালে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের কেন্দ্রে ও পূর্ব পাকিস্তানে সরকার গঠন করে। এর বিনিময়ে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে দলীয় নীতিমালার সঙ্গে আপস করতে হয়েছিল। এ ছাড়া ভাসানী সোহরাওয়ার্দীকে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সামরিক চুক্তি বাতিলের দাবি জানালে সোহরাওয়ার্দী তা প্রত্যাখ্যান করেন।

এরপর ১৮ মার্চ, ১৯৫৭ ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করে একই বছর ২৫ জুলাই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নামে একটি নতুন দল গঠন করেন। এ সময় ভাসানী বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে তাঁকে ‘লাল মওলানা’ও বলা হতো। ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে সব সম্পদ সৃষ্টিকর্তার আর মানবকুল এর রক্ষকমাত্র। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি কনফুসিয়ানিজমে বিশ্বাস করলেও সেখানে সব উৎপাদনক্ষম সম্পদ রাষ্ট্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বোধহয় এমন একটি ধারণা থেকেই ভাসানী মুসলিম লীগ বা সমমনা দলগুলোর চেয়ে বামধারার রাজনীতি বা ইসলামী সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

৭ অক্টোবর, ১৯৫৭ আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করলে সব রাজনৈতিক কর্মকান্ড ও রাজনৈতিক দল অবৈধ ঘোষিত হয়। এ সময় পাকিস্তানের বৈদেশিক সম্পর্কের ভিত্তি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল থাকায় যে কোনো বামপন্থি দলই সরকারের রোষানলে পড়বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও এর নেতা-কর্মীরা অনেক চাপের মধ্যে ছিলেন। ১২ অক্টোবর মওলানা ভাসানীকে কুমুদিনী হাসপাতাল থেকে গ্রেফতার করা হয়। ঢাকায় তিনি প্রায় চার বছর ১০ মাস কারারুদ্ধ থাকেন। নভেম্বর, ১৯৬৩ সালে মওলানা ভাসানী চীনের জাতীয় দিবস উদ্যাপনের জন্য সেখানে প্রায় ৪০ দিনের মতো অবস্থান করেন। ওই সময় বিভিন্ন নেতৃবর্গের সঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনীতি ও বিশ্বপরিস্থিতি নিয়ে চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ-এন-লাইয়ের সঙ্গে আলোচনা করেন। এ ছাড়া তিনি চাইনিজ কমিউনিস্ট পার্টির সামরিক কমান্ডার চেন ই এর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। এ সময় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভাসানীর শক্ত অবস্থানসহ আফ্রো-এশিয়ার নিপীড়িত মানবগোষ্ঠীর মধ্যে অধিকতর সংহতি ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন।

১৯৬২-১৯৬৪ সালের মধ্যে শেরেবাংলা ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমউদ্দিন মৃত্যুবরণ করলে বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে ভাসানী রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে নিতে এগিয়ে আসতে পারতেন। তবে ষাটের দশকে বাঙালি মুসলমানরা ভাসানীকে ভালোবাসলেও বামধারার রাজনীতির ব্যাপারে উৎসাহ দেখায়নি। বুদ্ধিদ্বীপ্ত তরুণরা বামধারার রাজনীতি পছন্দ হলেও এরা কখনো বাংলাদেশের মূলধারায় আসতে পারেনি। এমনই এক প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা নিয়ে এগিয়ে এলে মুক্তিকামী বাঙালির পূর্ণ সমর্থন লাভ করেন।

১৯৬৫-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভাসানীর হস্তক্ষেপেই ফাতিমা জিন্নাহ সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আইয়ুবের বিরুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। একই বছর পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে ভাসানী বিরোধিতা করেননি। সম্ভবত চীনের সঙ্গে আইয়ুব খানের ঘনিষ্ঠতার জন্যই ভাসানী নীরব ছিলেন। ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে তিনি ত্রিমহাদেশীয় সম্মেলনে যোগদানের জন্য কিউবা গমন করেন এবং বিশ্বশান্তি স্থাপনে অন্যান্য দেশের নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেন।

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ-পরবর্তী ছয় দফা আন্দোলন দমিয়ে রাখতে আগরতলা মামলায় ইতিমধ্যে শেখ মুজিবকে কারাবন্দী করা হয়। ৫ ডিসেম্বর, ১৯৬৮ আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তানে Decades of Development শীর্ষক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকা এলে এজেন্সিগুলো শান্তি-শৃঙ্খলার ব্যাপারে আশ্বস্ত করলেও বাস্তবচিত্র ছিল আলাদা। ৭ ডিসেম্বর ভাসানীর আহ্বানে পূর্ব পাকিস্তান অচল করে দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ঞরসব ম্যাগাজিনের সাংবাদিক Dan Coggin তাঁর লেখায় ১৯৬৯-এর গণ-আন্দোলনের পুরো কৃতিত্বই ভাসানীকে দিয়েছিলেন। Christophe Jaffrelot-এর মতে ভাসানী শুধু পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদেরই সংগঠিত করেননি; বরং পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের চ্যাম্বার জেলা ও নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রদেশের হাশিমনগরের কৃষকদেরও সরকারবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত করেছিলেন।

ভাসানীই একমাত্র নেতা যিনি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে একইভাবে গ্রহণযোগ্য ছিলেন। ভাসানী ২৩ মার্চ, ১৯৭০ পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবের তোবা টেক সিংয়ে সবচেয়ে বড় কৃষক সমাবেশে সভাপতিত্ব করেছিলেন। সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও করাচি থেকে হাজার হাজার কৃষক ট্রেনে করে সভাস্থলে হাজির হয়। অনেকের মতে পাকিস্তানের উদীয়মান বুর্জোয়া শ্রেণি ভীতসন্ত্রস্ত হয়েই বাংলাদেশ স্বাধীন করতে ভূমিকা রাখে। নইলে হয়তো ভাসানীর নেতৃত্বে সংগঠিত পাকিস্তানের কৃষকসমাজ মূলধারার রাজনীতি ও সরকার পরিচালনায় অংশীদার হতো।

১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে ১২ নভেম্বরের সাইক্লোনে ভোলা জেলাসহ উপকূলীয় অঞ্চলে বহু লোক মৃত্যুবরণ করে। মওলানা ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও পত্রিকা দেখে দুর্গত এলাকা সফরের জন্য মনস্থির করেন। দুর্গত এলাকায় সফরে গিয়ে তিনি সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। দুর্গত মানুষের কষ্ট দেখে নির্বাচনের প্রচারণার কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাননি। তিনি ’৭০-এর নির্বাচনে অংশ নিলে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ইতিহাস অন্য রকম হতে পারত।  দুর্গত এলাকা থেকে ফিরে এসে ২৩ নভেম্বর ঢাকা পল্টনের জনসভায় মওলানা ভাসানী আবারও পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার হুমকি দেন। ভাসানী মনে করতেন তিনি অংশগ্রহণ করেন বা না করেন স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সময়টা সঠিক ছিল। ভাসানী নির্বাচনে অংশ নিলে ভোটারদের মধ্যে বিভেদ চরম পর্যায়ে পৌঁছে যেত। তিনি মনে করতেন ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হলেও সত্যিকারের মুক্তি সম্ভব নয়। তবে তিনি বারবার শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করতে বারণ করেছিলেন।

যুদ্ধ শুরু হলে ভাসানী সন্তোষ ছেড়ে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে ভারতের আসাম পৌঁছেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়ককে ব্যক্তিগতভাবে পত্র লেখেন। ভাসানী সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি যখন নিশ্চিত হন ভারত বাংলাদেশের যুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে তখন তিনি বাংলাদেশের যুদ্ধ বাংলাদেশকে করতে দেওয়ার পক্ষে মত দেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ সরকারকে বামপন্থিদের প্রভাবমুক্ত রাখাও ছিল ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার অন্যতম কাজগুলোর একটি। আর এজন্যই যুদ্ধের পুরোটা সময়জুড়ে ভারত ভাসানীর ব্যাপারে ছিল বেশ সতর্ক ও সন্দেহপ্রবণ।

দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২-এর ২২ জানুয়ারি সিলেটের সীমান্ত দিয়ে সড়কপথে টাঙ্গাইল সার্কিট হাউসে এসে পৌঁছেন ভাসানী। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়ে ভাসানী খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলেন না। এমনকি বিভিন্ন সভা-বক্তৃতায় তিনি বঙ্গবন্ধুকে দেশের পরিস্থিতি উন্নয়নে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। জীবনসায়াহ্নে এসেও এই বিপ্লবী নেতা ভারত কর্তৃক একতরফা পানি প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে ভারত সীমান্তের দিকে লংমার্চের নেতৃত্ব দেন। সে অনুষ্ঠানটিকে স্মরণ করে আজও বাংলাদেশে ‘ফারাক্কা দিবস’ পালন করা হয়। এই মহান রাজনৈতিক নেতা ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

১৯৭১ সালে কলকাতায় সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত একটি পত্রিকায় আহমদ ছফা ‘বাংলার ইতিহাস প্রসঙ্গ’ শিরোনামে একটি লেখায় প্রমথ চৌধুরীর সূত্র দিয়ে বলেছিলেন বাঙালি গড়ে ওঠে না, এরা ঢালাই হয়। ঢালাই বলতে তিনি যারা অন্যের নির্দেশ মেনে চলে, তাদের বুঝিয়েছিলেন। কিন্তু ভাসানী ছিলেন একজন গড়ে ওঠা নেতা। যিনি বাংলার আকাশ-বাতাস, নদ-নদী আর মেঠোপথে গড়ে উঠেছিলেন। তিনি ছিলেন এ অঞ্চলের অবহেলিত আর নিপীড়িত মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র আপসহীন নেতা।

লেখক : শিক্ষক, গবেষক ও রাষ্ট্রপতির সাবেক সামরিক সচিব।