ভূটানকে চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা সমুদ্র এবং সৈয়দপুর বিমানবন্দর ব্যবহার করতে দেবে বাংলাদেশ

7
Social Share

ভুটান চাইলে বাংলাদেশের তিন সমুদ্র বন্দরের যেকোনটি এবং সৈয়দপুর বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারবে। বাংলাদেশকে ভূটান স্বীকৃতি দেয়ার বর্ষপূর্তিতে দেশটিকে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া ভূটানকে বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধাও দেয়া হচ্ছে।

প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে এই দিনে প্রথম দেশ হিসাবে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ভূটান। নয়মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ছয়ই ডিসেম্বরের সেই স্বীকৃতি ছিল বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক একটি মুহূর্ত।

বিপদের সময়ের সেই বন্ধুকে পরবর্তীতে নানাভাবে প্রতিদান দেয়ার চেষ্টা করেছে বাংলাদেশ। গত এক দশকে সেই সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে অনেকগুলো চুক্তি স্বাক্ষতির হওয়ার পাশাপাশি সহযোগিতামূলক অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনাও চলছে।

আজ স্বীকৃতি দেয়ার বর্ষপূতিতে এক টেলিকনফারেন্সে দুই দেশের বাণিজ্য সচিব নানা চুক্তিতে সই করে। এতে যোগ দেন ভূটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশ ও ভূটানের মধ্যে যেসব সহযোগিতামূলক চুক্তি হয়েছে:

অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি

বিশ্বের অন্য কোন দেশের সঙ্গে করা এটাই বাংলাদেশের প্রথম অগ্রাধিকার বাণিজ্য চুক্তি বা পিটিএ।

ভূটানের সঙ্গে বাংলাদেশের এই চুক্তি হওয়ায় বাংলাদেশের ১০০টি পণ্য ভুটানে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে আর ভূটানের ৩৪টি পণ্য বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক আরো বাড়বে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-২০১৯ সালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য হচ্ছে ৫৭.৯০ মিলিয়ন ডলারের।

ভূটান থেকে বাংলাদেশে সবজি ও ফলমূল, খনিজ দ্রব্য, নির্মাণ সামগ্রী, বোল্ডার পাথর, চুনাপাথর, কয়লা, পাল্প, রাসায়নিক আমদানি করা হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে ভূটানে তৈরি পোশাক, আসবাব, খাদ্য সামগ্রী, ওষুধ, প্লাস্টিক, বৈদ্যুতিক পণ্য রপ্তানি হয়।

বাংলাদেশের বাণিজ্য সচিব সাংবাদিকদের বলেছেন, বাংলাদেশি পণ্যের অন্যতম গন্তব্যস্থল না হলেও ভূটানকে দিয়েই অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি শুরু করেছে বাংলাদেশ। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য দেশের সঙ্গেও এধরণের চুক্তি হতে পারে।

ভুটানের আর একটি বড় পর্যটক আকর্ষণ 'পুনাখা জং'
ভুটানের আর একটি বড় পর্যটক আকর্ষণ ‘পুনাখা জং’

শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা

২০১০ সাল থেকে ভূটানকে ১৮টি পণ্যের ওপর শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দিচ্ছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি ভূটানের বাজারে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পাচ্ছে বাংলাদেশের ৯০টি পণ্য।

ভূটান থেকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় পাথর। বাংলাদেশ হচ্ছে ভূটানের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজার।

ভুটানের জন্য উম্মুক্ত সব বন্দর

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ভূটান চাইলে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রাবন্দর ও সৈয়দপুর বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারে। এছাড়া আন্তঃদেশীয় পরিবহন ব্যবস্থার সুবিধার্থে তারা চাইলে, বাংলাদেশের যেকোনো স্থানে গুদামও তৈরি করতে পারে।

ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্টের ব্যাপারে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলো দিয়ে মালামাল পরিবহন করতে চায় ভূমি বেষ্টিত দেশ ভূটান। তবে এক্ষেত্রে কিছুটা মাশুল ছাড়ের জন্য তারা দাবি করছে।

বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর থেকে আমাদের নদীপথগুলো ব্যবহার করে ভারতের ধুবড়ি বন্দরে মালামাল নিয়ে যেতে চায় ভূটান। ধুবড়ি থেকে ভূটান অনেক কাছে, ফলে তারা বাংলাদেশের নদীপথগুলো তারা ব্যবহার করে সেখানে পণ্য পরিবহন করতে চায়।

নৌপথে রৌমারী-চিলমারী হয়ে পণ্য আনা-নেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে বাংলাদেশ।

পাশাপাশি রেলপথেও ভূটানকে পণ্য আমদানি-রপ্তানির সুযোগ করে দিতে বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে রাজি হয়েছে। এজন্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রোহনপুর-সিংগাবাদ রেলরুটটি চালু করা হবে।

তিন স্থলবন্দর উন্মুক্ত

একসময় ভূটানের সঙ্গে শুধুমাত্র বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়েই বাণিজ্য সম্পাদিত হতো।

তবে এখন স্থলপথে বাণিজ্য বৃদ্ধির উদ্যোগ হিসাবে তামাবিল, বাংলাবান্ধা ও নাকুগাঁও স্থলবন্দর ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ।

চার দেশের মধ্যে যান চলাচল

বাংলাদেশ, ভূটান, ভারত ও নেপালের মধ্যে (বিবিআইএন) সড়কপথে যাত্রীবাহী, ব্যক্তিগত ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করার ব্যাপারে একটি আলোচনা হয়েছে। এই চুক্তি সম্পন্ন হলে চারটি দেশের বাসিন্দারা এক দেশ থেকে অন্যদেশে চলাচলে অনেক সুবিধা পাবেন।

তবে বাকি তিনটি দেশ এই সমঝোতার ব্যাপারে একমত হলেও পরিবেশের কারণে ভূটানের সংসদ এখনো এই চুক্তিতে সম্মতি দেয়নি।

জলবিদ্যুৎ রপ্তানি

ভূটানে মোট যত জলবিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, তার বেশিরভাগই তাদের প্রয়োজন হয় না। এই বিদ্যুৎ কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে বাংলাদেশ।

তবে সেটি ভারতের মধ্যে দিয়ে আনতে হবে বলে ত্রিপাক্ষিক আলোচনার ওপর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ভূটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং। এ বিষয়ে এখনো কোন চুক্তি হয়নি, তবে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।