ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু

19
Social Share

অজিত কুমার সরকার: ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ২৪ বছরের এই আন্দোলন-সংগ্রামে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় যোগ হয় গণতন্ত্র, শোষণ-বৈষম্য, ধর্ম ও ছয় দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন। এসব ইস্যুতে জনমত সংগঠিত করে স্বাধীনতার আন্দোলনে পরিণত করায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার দূরদর্শী, বিচক্ষণ ও কৌশলী নেতৃত্বে বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে স্বাধীনতার আন্দোলনে পরিণত করে।

বাঙালির স্বাধীনতার চিন্তার উদ্ভব মূলত ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভাজনকে কেন্দ্র করে। পাকিস্তান স্বাধীন হলেও সেই স্বাধীনতা যে বাঙালিদের হবে না তা খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করেন তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিব। লর্ড মাউন্টব্যাটনের ফর্মুলায় ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগে বাংলার অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিভাজন তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবসহ বাংলার নেতারা মেনে নিতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে (পৃষ্ঠা ৭৩) লিখেছেন, ‘কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা বাংলাদেশ ভাগ করতে হবে বলে জনমত সৃষ্টি করতে শুরু করল। আমরাও বাংলাদেশ ভাগ হতে দেব না, এর জন্য সভা করতে শুরু করলাম। আমরা কর্মীরা কি জানতাম যে, কেন্দ্র্রীয় কংগ্রেস ও কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ মেনে নিয়েছে এই ভাগের ফর্মুলা? বাংলা যে ভাগ হবে, বাংলাদেশের নেতারা তা জানতেন না। সমস্ত বাংলা ও আসাম পাকিস্তানে আসবে এটাই ছিল তাদের ধারণা।’ তা হয়নি। সেই সময়ে বঙ্গবন্ধু ইসলামিয়া কলেজের সিরাজ-উদ-দৌলা হলে বন্ধু সহকর্মীদের নিয়ে রুদ্ধদার বৈঠকে বলেছিলেন, পাকিস্তান স্বাধীন হলেও তা বাঙালিদের হবে না। আমাদের স্বাধীনতার জন্য আমাদেরই লড়াই করতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ভারতের প্রখ্যাত সাহিত্যিক অন্নদা শঙ্কর রায়ের বঙ্গবন্ধুকে করা প্রশ্নের উত্তর থেকে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধুকে শ্রী শঙ্করের প্রশ্ন ছিল, ‘বাংলাদেশের আইডিয়াটা আপনি কোথায় পেলেন? উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘সেই ১৯৪৭ তখন আমি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের দলে।’ (ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু, প্রকাশক :বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ)।

শেখ মুজিব যা ভেবেছিলেন তাই হলো। ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত পাকিস্তান সৃষ্টির এক বছরেরও কম সময়ে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার ৫৪ দশমিক ৬ ভাগ মানুষের ভাষা বাংলার পরিবর্তে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেয়। এ ঘোষণার মধ্যে নিহিত ছিল বাঙালিদের ওপর কর্তৃত্ব ফলানো, চাকরির ক্ষেত্রে উর্দুভাষীদের প্রাধান্য দেওয়ার শর্ত জুড়ে দিয়ে তাদের বঞ্চিত করার কৌশল এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ভারতের সংস্কৃতির অংশ বলে বাঙালি সংস্কৃতি চর্চা ও বিকাশের পথ রুদ্ধ করা।

বাঙালিরা সব সময়ই ভাষাভিত্তিক সাংস্কৃতিক বন্ধনে আবদ্ধ। বাংলা ভাষা তাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই ভাষার ওপর আঘাত মানে সংস্কৃতির ওপর আঘাত। বাংলা ভাষায় সংস্কৃতি চর্চা, কথাবার্তা ও ভাব প্রকাশে বাঙালিরা যতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে আর কোনো ভাষায় তা তারা করে না। পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিক হয়েও বাঙালিরা বাঙালিত্ববোধ ও জাতিসত্তাকে কখনও বিসর্জন দেয়নি। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ মাত্র ৭ দশমিক ২ ভাগ মানুষের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার প্রতিবাদে বাঙালিরা রাজপথে নামে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই দাবিতে আন্দোলনে শেখ মুজিব সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। পাকিস্তানে তার প্রথম গ্রেপ্তার ছিল ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সচিবালয়ের সামনে ধর্মঘট পালনকালে। মুসলিম লীগ সরকার আন্দোলনের চাপে শেখ মুজিবসহ গ্রেপ্তারকৃতদের ৫ দিন পরই মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। পরবর্তী সময়ে যখনই গ্রেপ্তার হয়েছেন, বন্দি অবস্থায় ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। ১৯৫২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অনশন ধর্মঘটের ঘোষণা এবং জেল থেকে আন্দোলনকারী ছাত্র নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার দায়ে শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিন আহমেদকে ঢাকা থেকে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তর করা হয়।

বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের শুরু থেকেই জাতীয়তাবোধ জাগ্রত ও সুসংহত করার ওপরও জোর দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বলতেন, ‘আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদ যদি কখনও দুর্বল হয়, তাহলে স্বাধীনতার ভিতও দুর্বল হতে বাধ্য।’ লন্ডন থেকে প্রকাশিত দ্য অবজারভারের ২৮ মার্চ ১৯৭১ সংখ্যায় ‘বেঙ্গলস নিউ হিরো’ শিরোনামে সিরিল ডান যথার্থভাবেই পাকিস্তান সৃষ্টির এক বছরেরও কম সময়ে শেখ মুজিবের বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু করা, মানুষকে সংগঠিত ও উদ্বুদ্ধ করার অসাধারণ ক্ষমতার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি আরও লিখেছেন, ‘শেখ জনগণের ওপর নির্ভর করেছেন। বক্তৃতার মাধ্যমে জনমতকে সংগঠিত করেছেন।’ তিনি পাকিস্তানিদের শোষণ ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র মানুষের সামনে তুলে ধরেন।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু কৌশলী ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ২৩ বছরের আন্দোলন ১৯৭১ সালের মার্চে সশস্ত্র রূপ নেওয়ার আগ পর্যন্ত কখনোই তা সহিংস রূপ নিতে দেননি। ফলে পাকিস্তানি শাসকরা এ আন্দোলনকে সন্ত্রাসী আন্দোলন হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে পারেনি। তারা শুধু ভাষার দাবিতে আন্দোলনে নয়, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ২৩ বছরের আন্দোলন নস্যাতে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার এবং সাম্প্রদায়িকতাকে বারবার কাজে লাগানোর অপচেষ্টা করে। পাকিস্তানি শাসকদের ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিপরীতে বঙ্গবন্ধু বাঙালিত্ববোধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে জাগ্রত রাখায় সচেষ্ট হন। তিনি নিজ দল আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দেওয়ায় উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৫ সালের ২১ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া আওয়ামী মুসলিম লীগের তিন দিনব্যাপী কাউন্সিলের দ্বিতীয় দিনে ‘মসুলিম’ শব্দ প্রত্যাহার করে নামকরণ করা হয় আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিপরীতে আন্দোলনের একপর্যায়ে জয় বাংলা স্লোগান সামনে নিয়ে আসেন। এই জয় বাংলা ধ্বনিই সম্প্রদায়গত বেড়া ডিঙিয়ে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে। জয় বাংলা শুধু মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি নয়, অসাম্প্রদায়িক জাতীয় সত্তার রক্ষাকবচ হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ছয় দফার ঘোষণা ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের পথে এগিয়ে যাওয়ার টার্নিং পয়েন্ট। ছয় দফা এবং পরবর্তী সময়ে ছাত্রদের ১১ দফা থেকে উদ্ভূত হয় ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু সামরিক সরকারের জারি করা লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কের (এলএফও) অধীনে ‘৭০-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণের মতো কৌশলী ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেন। অনেকের মনেই তখন প্রশ্ন জেগেছিল, ওয়েস্টমিনস্টার টাইপের গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বঙ্গবন্ধু কী কারণে একটি সামরিক ফরমানের অধীনে নির্বাচনে রাজি হলেন। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ে পরিস্কার হয়ে যায় বঙ্গবন্ধু কতটা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ইয়াহিয়া-ভুট্টোর চক্রান্তে আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় আন্দোলন-স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপ নেয়।

পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক স্বৈরশাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সুদীর্ঘ ২৩ বছরের আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু লক্ষ্য অর্জনে ছিলেন অবিচল। জেল-জুলুম, নির্যাতন, হত্যার হুমকি কোনো কিছুই তার লক্ষ্য অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বাংলার মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য তিনি সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেন। জীবনের ১৩টি বছর কাটান কারাগারে। তার বিচক্ষণ ও কৌশলী নেতৃত্বেই ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের আন্দোলন স্বাধীনতার আন্দোলনে পরিণত হয় এবং নয় মাসের রক্তস্নাত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। তাই বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলন স্বাধীনতার আন্দোলনে পরিণত করার কৃতিত্ব শুধু বঙ্গবন্ধুরই।

সিনিয়র সাংবাদিক ও সাবেক সিটি এডিটর, বাসস