ভারত কি তালেবানের সঙ্গে আলোচনায় বসবে?

Social Share

আফগান শান্তিপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে ইচ্ছুক ভারত। দুই বছর আগে শান্তিপ্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে ভারতকে কখনো এতটা সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যায়নি। পরিস্থিতি দেখলে মনে হয়—ভারতের সে অবস্থানের পরিবর্তন ঘটেছে বা ঘটতে চলেছে। গত মাসে কাতারের রাজধানী দোহায় অনুষ্ঠিত আন্তঃআফগান আলোচনার উদ্বোধনী পর্বে (ভিডিওর মাধ্যমে) অংশ নেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রেমেনিয়াম জয়শঙ্কর অংশ নিয়েছিলেন। এ থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, আফগান শান্তিপ্রক্রিয়া এখন নয়াদিল্লি পররাষ্ট্র কর্মসূচির শীর্ষ তালিকায় রয়েছে।

জয়শঙ্কর তার বক্তব্যে আফগান শান্তিপ্রক্রিয়ার প্রতি ভারতের সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, তার দেশ এমন একটি সমর্থন করে যা হবে আফগান উদ্যোগে ও নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে পরিচালিত। এই আলোচনায় জয়শঙ্করের অংশগ্রহণ থেকে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ভারত হয়তো অদূর ভবিষ্যতে তালেবানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে পারে। দুই পক্ষের মধ্যে এখনপর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা হয়নি।

২০১১ সালের অক্টোবরে ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ চুক্তি সই হয়। এরপর ভারত আফগানিস্তানকে সামরিক সরঞ্জাম, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহযোগিতা করলেও আফগানিস্তানের মাটিতে কোনো ভারতীয় সৈন্য যায়নি। প্রতিরক্ষা ছাড়াও চুক্তিতে নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো চুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। চুক্তির উল্লেখযোগ্য দিক ছিল আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ও অপরাধী নেটওয়ার্কের আঞ্চলিক ঘাঁটি নির্মূলে পারস্পরিক সহযোগিতা আরো বাড়ানো।

রাজনৈতিক দিক থেকে কাবুল ও নয়াদিল্লির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সুসম্পর্ক বিদ্যমান। মার্কিন অভিযানে তালেবান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০০১ সালের ডিসেম্বরে জার্মানির বন শহরে যে আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয় তাতে ভারত অংশগ্রহণ করে। আফগানিস্তান নতুন সরকার গঠন ও সেই সরকারকে সহযোগিতার বিষয়ে ঐ সম্মেলন হয়েছিল। সেই থেকে আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে এসেছে ভারত।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির অবকাঠামো ও সামাজিক উন্নয়নে পুনর্গঠনে ভারত ইতিমধ্যেই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে। যদিও পশ্চিমা দেশগুলোর আর্থিক সহযোগিতার সঙ্গে ভারতীয় বিনিয়োগের পরিমাণটি তুলনীয় নয়, তা সত্ত্বেও কাবুল নয়াদিল্লিকে নির্ভরযোগ্য আঞ্চলিক উন্নয়ন সহযোগী বিবেচনা করে থাকে।

আফগান শান্তিপ্রক্রিয়ায় বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে মিলকরণের বিষয়টি নীতিগতভাবে সমর্থন করে ভারত। তবে ভারত মনে করে এই মিলকরণ অবশ্যই আফগানদের নিজেদের মধ্য থেকে হতে হবে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল তালেবান। পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব ছাড়া বহির্বিশ্বে কোনো দেশের তালেবানের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না।

ঐ সময় নয়াদিল্লি তালেবানের প্রতিপক্ষ নর্দার্ন অ্যালায়েন্সকে সমর্থন করত। উল্লেখ্য, নর্দার্ন অ্যালায়েন্সের সঙ্গে রাশিয়া, ইরান ও ভারতকে নিয়ে একটি কূটনৈতিক বলয় তৈরি হয়েছিল। ২০০১ সালের ডিসেম্বর থেকে নর্দার্ন অ্যালায়েন্সই ক্ষমতায় আছে এবং নয়াদিল্লির সমর্থন পেয়ে এসেছে। বর্তমান শান্তি প্রক্রিয়ার অন্যতম ইস্যু—তালেবানের সঙ্গে নর্দার্ন অ্যালায়েন্সের মিলকরণ।

সেপ্টেম্বরে দোহায় আলোচনায় বসার আগে চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে তালেবানের সঙ্গে চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানের শান্তিচুক্তি হয়। তালেবান মার্কিন আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তখন পাকিস্তান একটি ভূমিকা পালন করে। ঐ সময় ভারতের জোরাল উপস্থিতি লক্ষ করা যায়নি। সে কারণে সেপ্টেম্বরের আলোচনা দিল্লির কাছে কিছুটা গুরুত্ব পায় বলে মনে করা হচ্ছে। দোহায় এবারের আলোচনাকে হিসেবের মধ্যে রাখতে হয়েছে আফগানিস্তানের দুই আঞ্চলিক প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানকে।

এই বৈঠকের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার দুই বৈরী প্রতিবেশীর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সম্পর্ক আছে। দুই দেশই আফগানিস্তানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা চায়। তবে সেটি কোন পথে আসতে পারে তা নিয়ে নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদের চিন্তাধারার মধ্যে রয়েছে বিশাল ফারাক। এই দুই প্রতিবেশীর কেউই চায় না তাদের কেউ একতরফা আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তার করুক। ভারত চাইছে শান্তিপ্রক্রিয়া ও মিলকরণের পুরো বিষয়টি আফগানিস্তান অভ্যন্তরীণভাবে করুক। অন্যদিকে পাকিস্তান চায় আফগানিস্তানে এমন একটি সরকার ক্ষমতায় থাকুক যাদের সঙ্গে ভারতের চেয়ে তাদের ঘনিষ্ঠতা বেশি হবে। এ কারণে ক্ষমতায় কারা থাকল—সেটি ইসলামাবাদের কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়।

চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে বৈরিতার জন্যও আফগানিস্তান ভারতের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে। আফগানিস্তানের উত্তরে ইরান ছাড়াও মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশের অবস্থান। বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, এ কারণে গত এক দশকে আফগান অর্থনীতি, নিরাপত্তা, শিক্ষা, সংস্কৃতিতে ভারত নিজের উপস্থিতি বাড়িয়েছে। সামাজিক অবকাঠামো এবং রাস্তাঘাট সেতু, বাঁধ ইত্যাদি প্রকল্পে ভারতের বিনিয়োগ প্রায় ৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আফগানিস্তানে ব্যাংকিং, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাতে ১ হাজার ৭০০ ভারতীয় কর্মরত আছে। অনেক ভারতীয় কোম্পানি সেদেশে অফিস খুলে ব্যবসা করছে। আর সে কারণেই আফগানিস্তানের ক্ষমতায় রদবল ঘটলে সেটি নয়াদিল্লিকে উদ্বিগ্ন করতে পারে।