ভারতে টিকেটের জন্য হাহাকার, বিমান ফিরছে খালি!

Social Share

টিকেটের জন্য রীতিমতো হাহাকার করছেন ভারতে আটকে পড়া বাংলাদেশিরা। দীর্ঘ দিন ধরে দেশে ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন তারা। ওই তালিকা আছেন রোগী, তাদের স্বজন (অ্যাটেন্ডেন্টস), বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। করোনার কারণে ভারতজুড়ে সর্বাত্মক লকডাউনে অনেকটা দমবন্ধ অবস্থায় রয়েছেন তারা। বহু চেষ্টার পর বাংলাদেশ সরকার তাদের উদ্ধারে সম্মত হয়। শুরুতে রোগীদের অগ্রাধিকার দেয়া হলেও পরবর্তীতে ‘আগে আসলে আগে পাবেন’ ভিত্তিতে টিকেট বিক্রি হয়। এতে অস্বাভাবিকভাবে  প্রতিযোগিতা বেড়ে গেলেও দিল্লি ও কলকাতা রুটে পরিচালিত বিমানের প্রায় প্রতিটি ফ্লাইটেই রহস্যজনক কারণে কিছু না কিছু আসন ফাঁকা রেখে ফিরে। টিকেটের জন্য শত শত মানুষ অপেক্ষায় থাকলেও বুধবার দিল্লি ছেড়ে আসা (এ যাত্রা শেষ ফ্লাইটটি) ফিরে ৩২ টি আসন খালি রেখে! ১৬২ আসনের বোয়িং-৭৩৭ উড়োজাহাজ ফিরেন ১৩০ যাত্রী।

এভিয়েশন এক্সপার্টরা বলছে, যেখানে চাহিদা প্রচুর, সেখানে ক্যাপাসিটির প্রায় ২০ ভাগ আসন শূণ্য রেখে কোনো স্পেশাল ফ্লাইটের ফেরা অবহেলা না হয় মার্কেটিং সংশ্লিষ্টদের অদক্ষতা। তারা বলছেন, এতে উভয়ের ক্ষতি। বিমান টেকঅফ হওয়ার সঙ্গে যত দামি টিকেটই হোক না কেন তার ভেল্যু জিরো। তাছাড়া আসন ফাঁকা রেখে  বিমানটি ফেরার কারণে করোনার এই কঠিন সময়ে যারা আটকে গেলেন তাদেরও খরচ বাড়বেই, সঙ্গী হবে অনিশ্চয়তা, অপেক্ষা আর ভোগান্তি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (পাবলিক রিলেশন্স) তাহেরা খন্দকার অবশ্য টিকেট কম বিক্রি হওয়ার দায়টি বাংলাদেশ মিশনের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু দিল্লিস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা তা উড়িয়ে দেন। জানান, টিকেট বিক্রির বিষয়ে  মিশনের কোনো সংশ্লিষ্টতাই ছিল না। এটা একান্তই বিমানের এখতিয়ার। তবে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের তালিকা বিমানের দিল্লি অফিসকে সরবরাহ করেছে মিশন। রহস্যজনক কারণে বিমানের ওয়েব সাইটে ওই তালিকাটিও যথাসময়ে আপলোড করা হয়নি বলে পাল্টা অভিযোগ করেন তারা। এ বিষয়ে জানতে দিল্লিস্থ বিমানের স্টেশন বা কান্ট্রি ম্যানেজার মেসবাহ উদ্দিনের ফোনে বার্তা পাঠানোসহ দফায় দফায় যোগাযোগ করা হয়। তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

টিকেটের উচ্চমূল্য এবং…

ভারতে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের উদ্ধারে বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্স ভাড়া করার  চিন্তা সেই শুরু থেকে। বাংলাদেশ হাই কমিশনের  অনুরোধে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ভারতের বিভিন্ন রুটে স্পেশাল ফ্লাইট পরিচালনায় যে ভাড়া প্রস্তাব (অফার) করে বিমান তাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পিছু হটে। করোনার মত কঠিন পরিস্থিতিতেও বিমানের বাড়তি ভাড়া চাওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করেন খোদ পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. মোমেন। নির্দেশনা দেন বিকল্প খুঁজতে। বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস বাংলা তুলমামূলক কম ভাড়ায় ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তাব করলে তাদের দিয়ে শুরু হয় চেন্নাই এলাকায় আটকে পড়াদের উদ্ধার কার্যক্রম। ৮টি বিজনেস ক্লাস আর ১৫৬ ইকোনমি ক্লাস থাকা ১৬৪ আসনের বোয়িং উড়োজাহাজ দিয়ে পরিচালিত ৫টি ফ্লাইটে (৮২০ আসনে) মায়ের কোলে বসা ১৩ শিশুসহ মোট ৮৩৩ জনকে ফিরেন চেন্নাই থেকে। ওই রুটে তাদের ইকোনমি ক্লাসের ভাড়া ছিল ৩১ হাজার ৫ শ। আর বিজনেস ক্লাসের ভাড়া ছিল ৪৬ হাজার ৫ শ। উভয় ক্লাসের সব ক’টি আসন বিক্রি হয় এবং উড়োজাহাজ বোঝাই হয়ে ফিরেন বিপাকে থাকা বাংলাদেশিরা। সেই যাত্রায় শেষ সময়ে এসে দিল্লিতে একটি ফ্লাইট পরিচালনায় যুক্ত হয় বিমান। ১৬২ সিটের ওই ফ্লাইটটি এক দুগ্ধজাত শিশুসহ ১৬৩ যাত্রী নিয়ে ঢাকায় ফিরে। প্রথম ধাপের মোট ৬ ফ্লাইটে ৯৯৬ বাংলাদেশিকে ফেরানোর পরও হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীসহ আটকে পড়াদের উদ্ধারে দ্বিতীয় ধাপে ৪টি রুটে আরও ৮টি ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। যথারীতি চেন্নাই রুটে অতিরিক্ত ৩ ফ্লাইট পরিচালনার দায়িত্ব পায় ইউএস-বাংলা। আর কলকাতায় ২, দিল্লি ২ এবং মুম্বাইতে ১ মোট ৫টি ফ্লাইট পরিচালনার নির্দেশনা ও অনুমোদন পায় বিমান। দিল্লি ও মুম্বাই রুটে ১২ বিজনেস ক্লাস এবং ১৫০ ইকোনমি ক্লাসের ১৬২ আসনের বোয়িং-৭৩৭ এবং কলকাতা রুটে ৭৪ (ইকোনমি) সিটের ড্যাশ সিরিজের উড়োজাহাজ দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তাব করে টিকেট বাজারে ছাড়ে বিমান। কলকাতা রুটে ভাড়া ধরা হয় ১০ হাজার দুই শ টাকা। দিল্লি রুটে ইকোনমি ক্লাস ২৫ হাজার ১শ আর  বিজনেস ক্লাসের (ওয়ানওয়ে) ভাড়া ধরা হয় ৬৯ হাজার ৬ শ টাকা। মুম্বাই রুটে ইকোনমি ক্লাস ৩১ হাজার টাকা (ট্যাক্সসহ) হলেও বিজনেস ক্লাসের ভাড়া ধরা হয় ৭৫ হাজার ৫ শ টাকা। ফ্লাইটের ওই মাত্রাতিরিক্ত বাড়তি ভাড়াতেও মুম্বাই থেকে যাত্রীরা উড়োজাহাজ ভর্তি হয়ে ফিরেন। একটি সিটও খালি যায়নি। কিন্তু দিল্লি ও কলকাতা রুটে (যাত্রীর ব্যাপক চাপ থাকা সত্ত্বেও) সিট খালি ছিল! বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পিআর সেকশনের পাঠানো বার্তা মতে, ১লা মার্চ কলকাতার প্রথম ফ্লাইটে ৭৩ জন ফিরেন। ১ টি আসন খালি ছিল। ২রা মার্চ দিল্লির ফ্লাইটে টিকেটের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল যাত্রীরা, তারপরও ১১ টি আসন খালি রেখে ফ্লাইটটি টেকঅফ করে বিমান। ৩ রা মে কলকাতায় ছিল এ ধাপের শেষ ফ্লাইট। যাত্রী ছিলের প্রচুর, কিন্তু ৫৯ জন নিয়ে অর্থাৎ ১৫টি আসন খালি রেখে ফিরে বিমান। এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ বিমানের সাবেক পরিচালক বর্তমানে ভ্রমণ বিষয়ক পাক্ষিক দ্য বাংলাদেশ মনিটরের সম্পাদক কাজী ওয়াহিদুল আলমের সঙ্গে। পুরো ঘটনায় বিষ্ময় প্রকাশ করে এভিয়েশন এক্সপার্ট মিস্টান আলম বলেন, এটা স্রেফ মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টের অদক্ষতা। তার মতে আটকে পড়াদের উদ্ধারের মত ক্রাইসেস মুমেন্টে বিমানের মুনাফা মূখ্য হওয়া উচিত নয়।    যারা আটকে আছেন তারা এমনিতেই নানা সমস্যার মধ্যে আছেন। ন্যায্য ভাড়াতেই তাদের ফেরার ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। কিন্তু বিমান বা ইউএস বাংলা ইকোনমি ক্লাসের যে ভাড়া নির্ধারণ করেছে তা নিয়মিত ভাড়ার তুলনায় অনেক বাড়তি। আর বিজনেস ক্লাসের ভাড়া সে তো অনেক অনেক বেশি। মুম্বাই থেকে যারা ইকোনমি ক্লাসের টিকেট পাননি তারা ৭৫ হাজার ৫ শ টাকার টিকেটে বাধ্য হয়ে ফিরেছেন। ওই রুটে একটা ফ্লাইট থাকায় কোনো আসন ফাঁকা যায়নি। কিন্তু দিল্লি রুটে ৬৯ হাজার ৬ শ টাকা দামের বিজনেস ক্লাসের একটি আসনও হয়তো বিক্রি হয়নি। দুটি ফ্লাইটে ২৪টি বিজনেস ক্লাস টিকেটসহ আরও ১৯টি ইকোনমি ক্লাসের আসন খালি এসেছে। যা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। মূল্য একটা ফ্যাক্টর মন্তব্য করে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ওই এক্সপার্ট বলেন, মানুষ টিকেটের জন্য ফিরতে পারছে না, আর বিমান টিকেট বিক্রি করতে পারছে না, এটা ঠিক মিলছে না। কোথায় যেনো একটা গ্যাপ অাছে। ভবিষ্যতের জন্য সেই গ্যাপটি চিহ্নিত হওয়া বা খুঁজে বের করা দরকার। মিস্টার আলম বলেন, এমন অপারেশনে টিকেট প্রাইসে তাতক্ষনিক ছাড়া দিয়েও সমন্বয় করা যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তার চেষ্টা হয়েছে বলে মনে হয় না। হলে এতো সিট ফাঁকা আসতো না, অন্তত কলকতা আর দিল্লি মিলে আরও ৫৯ জন মানুষের অপেক্ষার কষ্ট লাঘব করা যেতো।
উল্লেখ্য সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য মতে, ভারতে আটকে পড়াদের উদ্ধারে আরও ৯টি ফ্লাইট পাঠানোর অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।