ভাঙ্গায় বাম্পার ফলনের লক্ষে মাঠে কাজ করছে পেয়াজ আবাদকারীরা

ফরিদপুর প্রতিনিধি:

85
বাম্পার
Social Share

বাম্পার ফলন – ঘুর্ণিঝড় “জাওয়াদের” প্রভাবে স্বপ্ন অনেকটাই ভেস্তে যেতে বসেছিল! কিন্ত সেই দুঃসময় কাটিয়ে উঠে আজ পেয়াজ আবাদকারী কৃষক পরিবারগুলো নতুন আশায় বুক বেঁধে মাঠে কাজ শুরু করেছেন। পেয়াজের বাম্পার ফলন উৎপাদন করে এবছর ভাল বাজার মূল্য পাওয়া যাবে বলে নিজের প্রত্যাশার কথাগুলো বলছিলেন পেয়াজ উৎপাদনের বিশেষ উপজেলা হিসেবে পরিচিত ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার আলগী ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামের পিয়াজ আবাদকারী নান্নু মিয়া। প্রতি বছরে তিনি নিজের ব্যক্তিগত জমিতে প্রায় ৫ থেকে ৬ বিঘা পেয়াজের চাষ করে থাকেন বলে জানান।

অনুরূপ কৃষক নান্নু মিয়ার মত প্রতিবছর ব্যক্তিগতভাবে ৩ থেকে ৪ বিঘা জমিতে পেয়াজের ফলন উৎপাদন করে লাভবান হয়ে থাকেন হামিরদী ইউনিয়নের মুন্সুরাবাদ গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম। তার মতে, লাভ লোকসানের খতিয়ান পেরিয়েও তিনি পেয়াজ চাষ করে আজ সংসারে সবচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন বলে অভিমত প্রকাশ করেন। সবকিছু মিলিয়ে পেয়াজের পেয়াজ চাষের মৌসুমে ভাঙ্গা উপজেলার দিগন্ত জুড়ে শুধু চলছে পেয়াজের চাষাবাদ। তবে আগ পেয়াজ রোপণের ফলে মুরিকাটা পেয়াজ ও হালি পেয়াজের বেশ কিছু ফলন ফাল্গুন মাসে কৃষকেরা ঘরে তুল্বে বলেও জানান মাঠের বিভিন্ন প্রান্তিক কৃষকেরা।  

সরজমিনে উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের গ্রামে ও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ফিরে দেখা গেছে প্রত্যন্ত এলাকার মাঠের পরে মাঠে শীত মৌসুমের সকাল বেলায় শরীরে শীতের চাদর, মাথায় ও মাফলার, হাতে কাঁচি-কোদাল নিয়ে দলবদ্ধভাবে পিয়াজ চাষাবাদ করতে জমিতে নেমে পড়েছেন জমির মালিকসহ কৃষকেরা। এক কথায় ভাঙ্গা উপজেলার ঘারুয়া, আলগী, চান্দ্রা, তুজারপুর, কালামৃধা, নাসিরাবাদ, মানিকদাহ, হামিরদী, চুমুরদী, আজিমনগর, কাউলীবেড়া ও নুরুল্লাগঞ্জ ইউনিয়নসহ ভাঙ্গা পৌর সদর এলাকায় প্রতিবছরের মত বেশ জোরেশোরে শুরু হয়েছে পেঁয়াজের আবাদ। ভাঙ্গা উপজেলায় মোট আবাদি জমির প্রায় ৯০% জমিতে পিয়াজের আবাদ করা হয়ে থাকে। এখন জমিতে পুরোদমে হালি পেঁয়াজ, কদম পেয়াজ, মুরিকাটা পেয়াজ রোপণের ধুম পড়ে গেছে। বিশেষ করে অধিক মুনাফা অর্জনের লক্ষে কৃষকেরা বীজ থেকে উৎপাদিত কদমবীজ চারা রোপণ করছেন মাঠের পর মাঠ জুড়ে।

পেয়াজ আবাদকারী বিভিন্ন ভূমি মালিকের সাথে আলাপকালে জানা যায়, গত বছরের ডিসেম্বর মাসে ঘুর্ণিঝড় জাওয়াদ সারাদেশে একটি প্রভাব ফেলে। ঘুর্ণিঝড় জাওয়াদ এর প্রভাবের কারনে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর বীজতলার আংশিক বিনষ্ট হয়। এতে করে পেয়াজ চাসাবাদ কাজে সম্পৃক্ত পরিবারগুলো চরমভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পরে। একই সাথে তারা নতুন করে বীজতলা উৎপাদনেও বেশ নিরাশার মাঝে দোদুল্যমান হয়ে উঠে। কিন্ত বেশীর ভাগ কৃষক পরিবার পেয়াজ চাষাবাদ কাজে জড়িত হয়ে জীবন-জীবিকা পরিচালনা করে আসছেন বলে তারা উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তাদের সু-পরামর্শ নিয়ে নতুন আশায় ফের বীজতলার কাজ শুরু করার পাপাশাশি পেয়াজের বাম্পার ফলনের লক্ষে মাঠে কাজ শুরু করেছেন। পেয়াজের চারা রোপণ করার মধ্যে দিয়ে একেকজন কৃষক পরিবা্রের স্বপ্ন এবছর পেয়াজের বাম্পার ফলন হবে এবং বাজারে পেয়াজের ভাল মুল্যে পেয়ে ঘুর্ণিঝড় জাওয়াদ এর প্রভাবে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন পেয়াজের কৃষক পরিবারের হতে হয়েছে তা তারা অনেকটাই কাটিয়ে উঠবেন।        

ভাঙ্গা উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ উপজেলায় চলতি মৌসুমে ৫৯০ হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পিয়াজ এবং ৪৩৫ হেক্টর জমিতে দানা পিয়াজের আবাদ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ১৫ দিনে এর আবাদ আরও বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া ২৫০০ হেক্টর জমিতে হালি পেয়াজ এর চাষাবাদ করেছে ভাঙ্গায় পেয়াজ কৃষকেরা। গত বছরে (২০২১ সাল) ভাঙ্গায় পেয়াজের লক্ষমাত্রা অর্জন হয়েছে। এবছর সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগ কাটিয়ে গত বছরের চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাপে এবছরে পেয়াজের লক্ষমাত্রা অর্জিত হবে বলে মনে করছেন উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা।

সূত্র মতে, পেয়াজ চাষের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলোর উপর বেশী গুরুত্ব দিয়ে থাকেন এবং পেয়াজ চাষের মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের পরামর্শ দেন তার মধ্যে নির্ধারিত সময়ে পেয়াজের রোপণ করা, পেয়াজের পাতা আসার পর পচে যাওয়া বা পাতার রোগসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিলে কোন ধরণের ওষুধ ব্যবহার করতে হবে পরামর্শ প্রদান করায় ভাঙ্গার পেয়াজ চাষের ক্ষেত্রে একটি ব্যাপকট্যাঁ ছড়িয়ে পড়েছে। ভাঙ্গা উপজেলার কৃষকদের নিয়ে মাঠ পর্যায়ে মাঠ দিবস পালনের মধ্য দিয়ে সচেতনা করে আসছে উপজেলা কৃষি অফিস। সেই দিক থেকে বিবেচনায় গত কয়েক বছর ধরে ভাঙ্গার পেয়াজ চাষের বেলায় ব্যপক সচেতনায় পেয়াজ আবাদ করে আসছেন পেয়াজ চাষের প্রতিটি কৃষক পরিবার। পেঁয়াজের চাষের লক্ষ্যমাত্রার মোট আবাদী জমির প্রায় ৯১% পেঁয়াজ চাষ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। এ উপজেলায় লাল তীর কিং, তাহেরপুরী, ফরিদপুরী, বারি-১সহ বিভিন্ন জাতের পেঁয়াজ রোপণ করা হচ্ছে। স্থানীয় কৃষদের ক্ষেতে উদপাদিত পেয়াজ উপজেলার প্রায় চারলক্ষাধীক জনগণের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ভাঙ্গার পেয়াজ সরবরাহ হয়ে থাকে বলে জানান পেয়াজ ব্যবসায়ীরা।  

 

উপজেলার কাউলী বেড়া ইউনিয়নের কাউলীবেড়া গ্রামের পেঁয়াজ চাষী আলমাস মাতুব্বর জানান, তার ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের মাঠগুলতে পেঁয়াজ চারা রোপণের ধুম পড়ে গেছে। প্রতিদিন ভোর থেকে পেঁয়াজের চারা উত্তোলনের পর জমিতে রোপণ করা হয়। গত বছরে বৃষ্টিতে পেঁয়াজের চারার ক্ষতি হওয়ায় পেঁয়াজ চাষ কিছুটা কমে গেলেও আগামী ১০/১৫ দিনের মধ্যেই কিং জাতীয় পেঁয়াজ রোপণ সম্পন্ন হবে। তিনি আরও জানান প্রতি বছর কাউলীবেড়ায় ১০ হেক্টর জমিতে পেয়াজের আবাদ করা হয়। এবছরে আবহাওয়া পেয়াজ চাষের অনুকুলে থাকলে নির্ধারিত আবাদের ফলন সবার ঘরে উঠে আসবে।  

মুন্সুরাবাদ গ্রামের পিয়াজ চাষী মোহাম্মাদ সম্রাট বলেন, আমি প্রতি বছর ২ বিঘা জমিতে পেঁয়াজের চাষ করি। তাই এ বছর সেই জমিতে পেঁয়াজের চাষ করতে ১২ কেজি দানা কিনে বীজতলা তৈরি করেছিলাম। কিন্তু গত ডিসেম্বর মাসের প্রবল বৃষ্টিতে কিছুটা ক্ষতি হয়েছে সত্য কিন্ত উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে নতুন করে পেয়াজের ২০ হাজার টাকা খরচ করে কদম পেয়াজের চাষ করেছি। আশাকরি এবছর ভাল ফলন হলে কমপক্ষে কদম পিয়াজের থেকে তার ২ লাখ টাকা ঘরে আসবে।

ভাঙ্গা বাজারের পেয়াজ ব্যবসায়ী সাহাবুদ্দিন আলম গেদু বলেন, গত বছরে পেয়াজের ভাল ফলন হয়েছিল ভাঙ্গায়। কিন্ত পেয়াজের ভরা মৌসুমে কৃষকেরা পেয়াজের ন্যায্য দাম না পেয়ে কিছুটা হতাশ ছিল। তবে গত বছরের ডিসেম্বর নাসের ভারী বর্ষণে পিয়াজের বীজতলার ক্ষতি কাটিয়ে উঠে এ বছর নতুন করে পেয়াজ চাষের ফলে বাম্পার ফলন  ভাল হবে এবং দামেও কৃষকেরা ভাল পাবেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।  

ভাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুদর্শন শিকদার জানান, ঘুর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে ভাঙ্গায় পেয়াজের বীজতলার আংশিক ক্ষতি সাধিত হলেও চলতি মৌসুমে পেঁয়াজ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের ২৩জন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক কৃষকের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও পেয়াজ চাষের ক্ষেত্রে যে একটি বিশেষ রোগবালাই পাতা পরা রোগ বিষয়ে সজাগ থেকে সার্বিকক্ষন কাজ করছে উপজেলা কৃষি অফিস।

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকদের মাঝে প্রণোদনা প্রদান করার পাশাপাশি রাজস্ব প্রদর্শনীর মাধ্যমে ভাঙ্গার প্রান্তিক কৃষকদের নিয়ে আমরা তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি বলে জানান কৃষিকর্মকর্তা।