বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় শেখ হাসিনা ও মার্কিন

61
Social Share

জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলির বিশ্ব ফোরামে স্বল্পোন্নত দেশসমূহের মুখপাত্র হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সংকট।

গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিশ্বের ৪০ নেতাকে বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। দুইদিনের এই সম্মেলন ২২ এবং ২৩ এপ্রিল ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হবে। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন কনফারেন্সের পথে এটি হবে গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন। ২০২১ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘে জলবায়ু কনফারেন্স হওয়ার কথা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করে কীভাবে বিশ্বকে আর্থিকভাবে লাভবান করা যায়, পরিবেশ ঠিক রাখা যায় সেই আলোচনায় বসবেন বিশ্বনেতারা। দেশগুলো কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অবদান রাখতে পারে, এই সম্মেলনে সেই বিষয়গুলো ঠিক করার একটা সুযোগ রাখতে বিশ্বনেতাদের গুরুত্ব দিতে বলেছেন বাইডেন।

বাইডেনের জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ দূত জন কেরি ৯ এপ্রিল(২০২১) ঢাকা সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। কেরি বলেছেন, বাইডেনের অনুরোধে তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর শুভেচ্ছা নিয়ে এসেছেন। একইদিন যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গারা বন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে। তিনি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় উদ্যোগ প্রত্যাশা করেন। সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবছর ১০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু তহবিল সংগ্রহের জন্য কেরির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন। এছাড়া গ্লাসগোতে ২০২১ এর শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় কপ-২৬ সম্মেলনের ফাঁকে উচ্চ পর্যায়ের একটি অনুষ্ঠান আয়োজনেও বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চেয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য দায়ী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জন কেরি স্পষ্টভাবে বলেছেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রতি অসাধারণ সহযোগিতার যে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তার জন্য প্রেসিডেন্ট বাইডেন অনেক কৃতজ্ঞ। এটি অসাধারণ মানবতা। তবে এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এক্ষেত্রে বিশ্বসম্প্রদায়ের উদ্যোগ বাড়ানো উচিত। এটি কেবল বাংলাদেশের দায়িত্ব নয়, জাতিসংঘের ভূমিকাও দরকার।বাংলাদেশ সহযোগিতার হাত বাড়ানো অন্যতম মহান রাষ্ট্র, যে তাদের (রোহিঙ্গাদের) একটি দ্বীপ দিয়েছে। বাংলাদেশ তাদের সহযোগিতা করছে। কিন্তু এটি তাদের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নয়।’

মূলত জন কেরির সফরে জলবায়ু নেতৃত্বে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। অবশ্য এর আগে আমেরিকার বিভিন্ন কর্তা ব্যক্তির সফরে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, আঞ্চলিক বিষয়াবলী, শান্তিরক্ষা মিশন এবং জঙ্গি ও সন্ত্রাস দম বিষয়ে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সন্ত্রাসবাদ বিরোধী দক্ষতা বৃদ্ধিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ পুলিশের সহযোগিতায় নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে আসছে।

২.
জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলির বিশ্ব ফোরামে স্বল্পোন্নত দেশসমূহের মুখপাত্র হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সংকট। এর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় অবদান রাখার পাশাপাশি বিশ্বজনীন আলোচনায় স্বীয় স্বার্থ সংরক্ষণে সদা সচেষ্ট রয়েছে বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রতিকূলতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অনন্য দক্ষতা ও সাফল্য প্রদর্শনের সুবাদে বিশ্বের অনেক দেশের কাছে আজ একটি রোল মডেল হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে বাংলাদেশ। উল্লেখ্য, ক্ষমতায় আসার পর জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অগ্রণী সৈনিক হিসেবে ২০০৯ সালে নিজস্ব অর্থায়নে ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি ক্লাইমেট ট্রাস্ট তহবিল গঠন করার মধ্য দিয়ে বিশ্বের নজর এবং প্রশংসা কেড়ে নেয় বাংলাদেশ।

পাশাপাশি, জলবায়ু বিষয়ক সর্বোচ্চ বিশ্ব ফোরাম জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (ইউএনএফসিসিসি)-এর কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (সিওপি)-এ ২০১৫- এ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। একই অধিবেশনে ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) প্রধানমন্ত্রীকে ‘আইসিটিজ ইন সাসটেইনেবল ডেভলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তার ভাষণে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বাংলাদেশের দৃঢ় সংকল্পের কথা উল্লেখ করে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একযোগে কাজ করার লক্ষ্যে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সবসময় তিনি তার বক্তব্যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবিলায় বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধ এবং অভিযোজন বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের নানা পদক্ষেপ ও কর্মসূচি তুলে ধরেন। বিশেষত প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশসমূহের অভিযোজন, প্রশমন, জলবায়ু অর্থায়ন, লস-অ্যান্ড-ড্যামেজ, প্রযুক্তি আহরণ ও হস্তান্তরসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়। অন্যদিকে তার সঙ্গে থাকা বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল এসব আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে বিশ্ব অঙ্গনে জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান ও স্বার্থসমূহ তুলে ধরেন। অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রমে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ঋণের পরিবর্তে পর্যাপ্ত ও সহজলভ্য অর্থ মঞ্জুির সহায়তা হিসাবে প্রদানের জন্য সবসময় ধনী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানায় বাংলাদেশ, যা বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে সব সম্মেলনে। আসলে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সমন্বয়ক হিসেবে স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় প্যারিস চুক্তির বিবেচনাধীন খসড়ার নেগোসিয়েশনের অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে বাংলাদেশ।

এজন্য ২০১৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট জন এফ কেরির বাংলাদেশ সফরে এসে বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বাংলাদেশের উদ্যোগের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে তিনি ধন্যবাদ জানান। তার সফরের মধ্য দিয়ে দু’দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ও সহযোগিতার বিষয় ছাড়াও জাতীয়, বহুপক্ষীয় এবং দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র জোরদার হয়। সেসময় সেক্রেটারি কেরি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং অন্যান্য আর্থসামাজিক খাতে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল মরক্কোর মারাকেশ শহরে ২০১৬ সালের ৭-১৮ নভেম্বর সিওপি-২২ সম্মেলনে অংশ নেন। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা প্যারিস চুক্তির প্রায়োগিক বিষয়টি কার্যকর হওয়ার ব্যাপারে গভীর আস্থা ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবপ্রসূত ক্ষতির মোকাবিলায় বহুপক্ষীয় সহযোগিতা ও রাষ্ট্রসমূহের সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকার ব্যাপারেও দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশসহ জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশসমূহে পানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। সীমিত এ প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার রোধ এবং সকলের প্রয়োজন মেটাতে পানির আহরণ, উন্নয়ন ও ব্যবহার সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে নিশ্চিত করা আবশ্যক। এ লক্ষ্যে শুরু হওয়া বৈশ্বিক আলোচনার অংশ হিসেবে ২০১৬ সালের ২১ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ‘হাই লেভেল প্যানেল অন ওয়াটার’ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী যোগদান করেন। স্বল্পোন্নত দেশসমূহের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য এই প্যানেল কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

আগেই বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়েছে উন্নয়নশীল দেশসমূহের উন্নয়ন কার্যক্রম বিষয়টির প্রতি বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশসহ জলবায়ু ঝুঁকিপ্রবণ দেশসমূহের সমন্বিত উদ্যোগে গঠিত হয়েছে ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম (সিভিএফ)। অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে এর গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সিভিএফের আওতায় গঠিত হয়েছে ভি২০ উদ্যোগ; জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা ২০টি দেশ এর সদস্য। ভি২০ উদ্যোগের মাধ্যমে জলবায়ু অর্থায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দেশগুলোর কাছ থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে মোকাবিলায় অভিযোজন ও প্রশমনের প্রচেষ্টাসমূহে নিবিড়ভাবে কাজ করে চলেছে বাংলাদেশ।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্সে (আইএসএ) যোগ দিয়েছে বাংলাদেশ। এখনপর্যন্ত বিশ্বের ১২১টি দেশ এ উদ্যোগে সম্পৃক্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে মরক্কোর মারাকেশে সিওপি২২ চলাকালীন ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট অন আইএসওতে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। আইএসওতে যোগদানের সুবাদে সৌর প্রযুক্তি গবেষণা ও অর্থায়নের ক্ষেত্র এবং উন্নততর প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে জলবিদ্যুৎ বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে আমাদের কাছে। এজন্য ৯ এপ্রিল(২০২১)প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জন কেরিকে বলেছেন, ‘আমরা আমাদের দেশের উন্নয়ন চাই। এ কারণে আমাদের জ্বালানি প্রয়োজন।’ তিনি বিশুদ্ধ জ্বালানির উৎস হিসেবে জলবিদ্যুতের ওপর জোর দেন।

৩.

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ২৬ মার্চ (২০২১) ভিডিও বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের পক্ষে বাংলাদেশের জনগণকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তিনি বলেছেন, ‘আপনারা মানবিকতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আপনারা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে নির্দ্বিধায় আশ্রয় দিয়েছেন। এই সংকট উত্তরণে যুক্তরাষ্ট্র আপনাদের পার্টনার। জলবায়ু পরিবর্তনে একযোগে কাজ করবে দুই দেশ।’ তিনি আরও বলেছেন, ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সিনেটর অ্যাডওয়ার্ডকেনেডি বলেছিলেন, সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশ সারা বিশ্বের জন্য শিক্ষা হয়ে থাকবে। আপনারা কখনও মাথা নত করেননি। শেখ মুজিবুর রহমানকে স্যালুট। এ দেশের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য অনেক ত্যাগ করেছে।’ এর আগে গত ২০ ফেব্রুয়ারি (২০২১)যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শহীদুল ইসলামের পরিচয়পত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণকালে বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার বিষয়ে আশাবাদ

ব্যক্ত করেন নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এসময় তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যকার বিদ্যমান শাক্তিশালী ও স্থায়ী বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর করতে এবং দু’দেশের অভিন্ন লক্ষ্যগুলো আরও এগিয়ে নিতে তার সরকারের আগ্রহের কথা জানান।

২০২০ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরাজিত করার পর ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি জো বাইডেন ৪৬তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। সেসময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন এবং ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত কমলা হ্যারিসকে অভিনন্দন জানান। জো বাইডেন সাবেক রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার সঙ্গে ৪৭তম ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং ২০০৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত

ওই পদে দায়িত্ব পালন করেন। বারাক ওবামা ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি ২০১২ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। শেখ হাসিনা সরকার ও বারাক ওবামার প্রশাসন একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ ঘটে। ফলে বাংলাদেশ সম্পর্কে ওবামা প্রশাসনের ইতিবাচক ধারণা ছিল সবসময়। বারাক ওবামা এদেশের মোবাইল ব্যাংকিং নিয়ে ২০১৫ সালে প্রশংসা করেন। শেখ হাসিনা সরকারের অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট হয়ে এ দেশকে তিনি এশিয়ার টাইগার আখ্যা দেন। ওবামা সরকারের সময় ২০১৪ সালে সপ্তাহব্যাপী সফরকালে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহ-সভাপতিত্ব ২৬ সেপ্টেম্বর শান্তিরক্ষা সম্মেলনে মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এবং রুয়ান্ডার রাষ্ট্রপতি পল কাগমে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদানের কথা তুলে ধরেছিলেন। এদিক থেকে আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন শেখ হাসিনাকে ভালো করেই চেনেন ও জানেন।

আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন এবং বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১২ সাল থেকে নিয়মিত যথাক্রমে নিরাপত্তা সংলাপ, অংশীদারত্ব সংলাপ, সামরিক সংলাপ, ব্যাংক সংলাপ এবং টিকফা সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ২০১৭ সালের ৩ অক্টোবর বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ৬ষ্ঠ নিরাপত্তা সংলাপ ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিজ মার্সিয়া বার্নিকাট ২০১৮ সালের ২ মে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী বরবার যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের লেখা একটি পত্র হস্তান্তর করেন। ওই পত্রে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় শেখ হাসিনার সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহের ভূয়সী প্রশংসা করেন। পাশাপাশি, মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ১৩ লক্ষাধিক মানুষকে বাংলাদেশে আশ্রয় প্রদান করায় বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। একইসঙ্গে তিনি রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পাশে থাকবে এবং মিয়ানমারের ওপর রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধে আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখবে অঙ্গীকার করেন।

লেখাবাহুল্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের এখন সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। সেই সঙ্গে সহায়তার জন্য ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদান করে। সেসময় অবকাঠামোগত উন্নয়নেও সহায়তা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শেখ হাসিনার শাসনামলে আমেরিকার অন্যতম প্রধান মিত্রে পরিণত হয় বাংলাদেশ। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা, জঙ্গিবাদবিরোধী ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে এ দুই রাষ্ট্র বেশকিছু সহায়তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

ওবামা প্রশাসনের আন্তর্জাতিক উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং পরিবেশ উন্নয়নমূলক অনেক কাজে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান সহযোগী ছিল। ২০১২ সালে রাষ্ট্রদ্বয়ের মধ্যে একটি কৌশলগত চুক্তি হয়। যুক্তরাষ্ট্র ২০২০ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করে। এজন্য প্রতি তিন থেকে চার মাস পর ‘ ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফোরাম এগ্রিমেন্ট (টিকফা)’ -এর ইন্টারসেশনাল সভা করার প্রস্তাব দেয়। ওই সভায় যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের স্থগিতকৃত জিএসপি-সুবিধা পুনরায় চালুর বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগে ঘোষিত বিভিন্ন দেশের জন্য মার্কিন জিএসপি সুবিধা প্রদান প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরর্বতী প্রকল্প চালু হলে বাংলাদেশকে জিএসপি-সুবিধা প্রদানের বিষয় বিবেচনা করার সুযোগ আছে।

শেখ হাসিনা সরকার মনে করে, জো বাইডেনের সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তৈরি পোশাক, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, হেলথ প্রডাক্ট রপ্তানি, করোনাকালে তৈরি পোশাকের ক্রয় আদেশ বাতিল না করে ভ্যাকসিনসহ অন্যান্য মেডিক্যাল সামগ্রী উৎপাদন, বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প কারখানা বাংলাদেশে রিলোকেশন, কারিগরি সহযোগিতা বৃদ্ধিসহ বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানের তৈরি পণ্য সহজে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের সহযোগিতা পাবে। তবে দু’দেশের মধ্যে গত ১২ বছর ধরে সকল সহযোগিতামূলক কার্যক্রমই পরিচালিত হচ্ছে। কারণ এদেশে গণতন্ত্র আছে, আর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে এদেশের অবস্থান বিশ্বব্যাপী অভিনন্দিত। ২০১৬ সালেও বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পর সবচেয়ে বেশি মার্কিন সহায়তা লাভ করেছে।

৪.

যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সুসম্পর্কের বিষয়টি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কতটা তাৎপর্যবহ তা ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ৯ এপ্রিলের(২০২১) বক্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে। তারা জানিয়েছে, এ মাসে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর নেতৃত্বে বাংলাদেশের অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বীকৃতি পাবেন ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম ও ভালনারেবল টোয়েন্টি গ্রুপ অব ফিন্যান্স মিনিস্টার্সের চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং জলবায়ু ঝুঁকির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো ও সহনশীলতা অর্জনের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মূলত, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত প্যারিসচুক্তির বাস্তবায়ন জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্রের যে অঙ্গীকার, তার গুরুত্বই তুলে ধরেছেন বাইডেনের বিশেষ দূত জন কেরি। আবার তার আলোচনায় জলবায়ু নীতি, বিনিয়োগ, উদ্ভাবন এবং টেকসই অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে সমৃদ্ধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে সহযোগিতা গুরুত্ব পেয়েছে। জলবায়ু সংকট রোধে প্রশমন ও অভিযোজনকে সহায়তা দিতে এবং সমৃদ্ধিকে সমর্থন জোগাতে যে বিনিয়োগ দরকার, তা সংগ্রহের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনা সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফলপ্রসূ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে সক্ষম হবে বলে আমরা মনে করি। কারণজলবায়ু পরিবর্তন শীর্ষক বৈশ্বিক আলোচনা ও উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সবসময়ই বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে।

লেখক: কলাম লেখক, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।