বীর সুভাষের রচিত পথে

Social Share

 

আশরাফুল ইসলাম

স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শোকাবহ হত্যাকান্ড বাঙালি জাতিকেই কেবল দিশাহীন করেনি, প্রকৃত ইতিহাসচর্চার পথকেও করেছে রুদ্ধ। অখ- ভারতবর্ষের স্বাধীনতার প্রশ্নে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর যে সর্বাত্মক সংগ্রাম তা পথ দেখিয়েছিল বাংলাদেশের জনককেও। জীবদ্দশায় শেখ মুজিব তাঁর রাজনীতির আদর্শপুরুষ নেতাজিকে অমোঘ শ্রদ্ধায় স্মরণ করতেন। সরকারপ্রধান বঙ্গবন্ধুর সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনকি গণভবনেও সাড়ম্বরে উদ্যাপিত হয়েছিল নেতইজর জন্মোৎসব। প্রিয় নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনে অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিমকে তিনি পাঠিয়েছিলেন কলকাতায় নেতাজি ভবনে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র একাধিক স্থানেও উৎকীর্ণ নেতাজি-বন্দনা।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজের রক্তাক্ত সংগ্রাম একই চেতনাকে ধারণ করে। সিঙ্গাপুর থেকে নেতাজির বেতার-ভাষণ চঞ্চল করে তুলেছিল তরুণ মুজিবকেও। স্বদেশের জন্য নেতাজির সর্বস্ব ত্যাগ করার মহান আদর্শ পরে মুজিবকে বঙ্গবন্ধু করে তোলে। স্বাধীনতা সংগ্রামের এই যে পরম্পরা, তার চর্চা পরবর্তী সময়ে রীতিমতো উপেক্ষিত। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষার স্তরগুলোয় বাঙালির সুদীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের যে ইতিহাস বিধৃত হতে পারত, তা সন্নিবেশিত হয়নি। শেখ মুজিবের প্রেরণা, তাঁর ‘প্রদীপ্ত ভাস্কর’ নেতাজি ও আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো গবেষণার উদ্যোগও জানা নেই। প্রজন্মের কাছে একজন ‘নেতাজি’র পরিচয় তুলে ধরতে ভূমিকা রাখেননি রাজনীতিকরাও। তবে প্রজন্মের কাছে শিকড়ের আত্মপরিচয় মেলে ধরতেই ঢাকার নেতাজিপ্রেমী গণমাধ্যম ‘বহুমাত্রিক ডটকম’ ২০১৮ সালে আয়োজন করে নেতাজির জন্মোৎসবের। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর সম্ভবত এটিই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে জাতীয় স্তরে নেতাজির দেশপ্রেমের ইতিহাস তুলে ধরার প্রথম প্রয়াস। প্রথমবারের আয়োজন তরুণদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। এ আগ্রহ ক্রমে চর্চায় পরিণত হয়। পরবর্তী আয়োজনের সংকলনের জন্য এই তরুণদের কাছ থেকে মেলে নেতাজিকে নিয়ে আবেগমথিত সব লেখা। কাঁটাতারের সীমানা ডিঙিয়ে ওপারের নেতাজিপ্রেমীরাও শামিল হন বাংলাদেশে নেতাজির এ চর্চায়। দেশপ্রেমের এই অভিন্ন চেতনা একাকার করে দেয় সব বাধা-ব্যবধান। মুজিবের জন্মশতবর্ষ সামনে রেখে দ্বিতীয়বারে নেতাজির জন্মোৎসবে এবারের আয়োজন ছিল ‘বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে নেতাজি ও বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনার। নেতাজির ১২৩তম জন্মবার্ষিকীর প্রাক্কালে ঢাকার জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে এ সেমিনারে মিলেছিলেন দুই বাংলার অগণিত নেতাজি গবেষক-অনুরাগী। তাদের মিলিত কণ্ঠে সেদিন ছিল ‘আমার সোনার বাংলা’, ‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে’। ছিল অভিন্ন আহ্বান, ‘দুই দেশের তরুণদের মাঝেই ছড়িয়ে দিতে হবে নেতাজি ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ’। আধুনিকতার জোয়ারে গা ভাসিয়ে দেওয়া তরুণ প্রজন্মের দিশাহীন পথচলায় দেশপ্রেমের চেতনা ও প্রত্যয় সৃষ্টি অত্যন্ত জরুরি। নেতাজির জন্মোৎসবের এ সেমিনার ছিল তাদের কাছে সেই বার্তা পৌঁছে দেওয়ারই প্রয়াস। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের কিংবদন্তি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উভয়ের জন্মই পরাধীন ভারতে। ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের নিষ্পেষণ কতটা নির্মম তা চাক্ষুষ করেছেন দুই নেতাই। দুই নেতাই মনে করতেন, স্বাধীনতা এমনি এমনি আসবে না। দুই নেতার আদর্শিক সংহতিও উল্লেখযোগ্য। নেতাজির ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব’ আর বঙ্গবন্ধুর ‘রক্ত অনেক দিয়েছি, প্রয়োজনে আরও রক্ত দেব… তবু এ দেশকে মুক্ত করে ছাড়ব’ উক্তির মাঝে যে বিরাট সাযুজ্য তা চিত্রিত করার প্রয়াস ছিল সেমিনারে। বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী, জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক, ভারতীয় হাইকমিশনারসহ বিশিষ্টজনদের হাতে সেদিন পাঠোন্মোচন করা হয় ‘মুক্তিপথের অগ্রদূত নেতাজি সুভাষ’ গ্রন্থের। নেতাজিকে নিয়ে তরুণ ও জ্যেষ্ঠ লেখকদের লেখায় সমৃদ্ধ এ সংকলন গ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধ ও আজাদ হিন্দের সংগ্রাম, সুভাষ-মুজিব সম্পর্ক, সুভাষ-নজরুল সম্পর্ক ছাড়াও নেতাজির বর্ণাঢ্য জীবনের নানা দিক তুলে ধরার প্রয়াস। গ্রন্থটি অধ্যয়নে তরুণদের মাঝে সৃষ্ট আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে ভার্চুয়াল দুনিয়ায়। ফেসবুকে বহু তরুণ এ নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনার অবতারণা করেছেন, যেখানে একরকম ভুলে যাওয়া নেতাজির নাম উচ্চারিত হচ্ছে সগৌরবে। মহামহিম এই স্বাধীনতা সংগ্রামীর বিরল আত্মত্যাগের মহিমা-কীর্তনে চলছে স্ট্যাটাসের পর স্ট্যাটাস। যে ঢাকা, রাজশাহী, কুমিল্লা, বরিশাল কিংবা চট্টগ্রামে নেতাজির পুণ্যপদস্পর্শে ধন্য হয়েছে, তাঁর হিমালয়সম ব্যক্তিত্বের সামনে লুটিয়েছে অগণিত তরুণ, যাঁর কণ্ঠের জাদুকরীতে মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছে আবালবৃদ্ধবনিতা সেই জনপদে ফের উড়ছে তাঁরই বিজয়কেতন। নেতাজির জন্মোৎসবের এসব আয়োজনকে ঘিরে এই আশাবাদ জন্মেছে, বাংলাদেশ ও ভারতের ঐতিহাসিক মৈত্রীর বন্ধনকে চিরস্থায়ী রূপ দিতে নেতাজির আদর্শের উপস্থিতিই হতে পারে অন্যতম নিয়ামক। বাঙালির চিরকালের গর্ব ভারতমাতার সূর্যসন্তান বীর সুভাষচন্দ্র বসুর আদর্শই জাতপাতের সংকীর্ণতা থেকে টেনে তুলে বাঙালি জাতিকে দিশা দিতে পারে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ‘প্রদীপ্ত ভাস্কর’, গান্ধীজির ‘দেশপ্রেমিকদের রাজপুত্র’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ‘দেশনায়ক’-কে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নতুন করে জেগে উঠুক। সাত দশক ধরে তাকে ব্রাত্য করে রাখার কালো ইতিহাসের যবনিকা পড়ুক- আমাদের এই আন্তরিক প্রত্যাশা। আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস রাখি, তরুণদের মাঝে নবযুগের যে অবশ্যম্ভাবী গণজাগরণ অপেক্ষা করছে তা বীর সুভাষের আদর্শকে ধারণ করেই। কেননা দেশপ্রেমের প্রশ্নে রক্তশপথে যে পথ রচিত হয়, বিলম্বে হলেও তার পদচুম্বনে সাড়া দেবেই তরুণরা।

লেখক : প্রধান সম্পাদক
বহুমাত্রিক ডটকম ও নেতাজি গবেষক।