বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন এবং জলদস্যুদের জীবনে ফেরার গল্প: আনোয়ার ফরিদী

46
Social Share

সুন্দরবন! নামটি শুনলেই শরীরে একরকম রোমাঞ্চকর অনুভূতি জেগে ওঠে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারখ্যাত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বা জঙ্গল। সুন্দরী, কেওড়া, গোলপাতা ইত্যাদি নানারকম গাছের পাশাপাশি রয়েছে অজস্র নাম না জানা গুল্মলতা।

জঙ্গলে অবাধে বিচরণ করে চিত্রা হরিণ। রয়েছে নানা প্রজাতির সরীসৃপ। এই বনের ভিতর ছড়িয়ে আছে নানা নামের নদী-নালা-খাল-বিল। যার আনুমানিক সংখ্যা তিন শতাধিক। এসব নদীতে রয়েছে নানা প্রজাতির মাছ। রয়েছে হিংস্র কামট বা কুমির। এছাড়াও রয়েছে নানা ধরনের কাঁকড়া। সুন্দরবনের বর্তমান আয়তন ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার (৩,৫০,০০০ একর)। এরমধ্যে বাংলাদেশের ভাগে পড়েছে ৬০১৭ বর্গকিলোমিটার। বাকিটা পড়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে। এখন থেকে দু’শ বছর আগেও সুন্দরবনের মোট আয়তন ছিল ১৬০০০ হাজার বর্গকিলোমিটার। মানুষ তার বসতি গড়ার প্রয়োজনে ধ্বংস করেছে ৬০০০ হাজার বর্গকিলোমিটার বনাঞ্চল।
এই বনকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করে বাওয়ালি, মৌয়ালী, মৎস্যজীবী, কাঠুরে, কাঁকড়া সংগ্রহকারীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী শ্রেণির মানুষ। যার আনুমানিক সংখ্যা প্রায় সাত লক্ষ।

হাজার বছর ধরেই সুন্দরবন জলদস্যুদের অভয়ারণ্যে। পর্তুগিজ, মগসহ তৎকালীন ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা জলদস্যুরা এখানে ঘাঁটি গেড়ে বাংলাদেশসহ নানা জায়গায় ডাকাতি করে বেড়াতো।

খুলনা ছাড়াও দক্ষিণাঞ্চলের বাগেরহাট, সাতক্ষীরা পিরোজপুর এবং পটুয়াখালী জেলার কিছু অংশ সুন্দরবনকে জড়িয়ে রেখেছে। এখন থেকে ৩৫/৪০ বছর আগেও এই বনে চার-পাঁচশ রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্ব ছিল। অবৈধ শিকারীদের লালসার শিকার হয়ে পরিসংখ্যান অনুযায়ী সেই সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে ১০৭টিতে। প্রাকৃতিক দুর্যোগেও সুন্দরবনের ভূমিকা অপরিসীম। সিডর, আইলা ইত্যাদি ভয়ংকর সব ঝড়ে সু্ন্দরবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশ নামের এই ভূখণ্ডকে আগলে রেখেছে অনেকটা মাতৃস্নেহে।

আশির দশকের মধ্যবর্তী সময়ে তৎকালীন স্বনামখ্যাত পত্রিকা সাপ্তাহিক বিচিত্রা’র সাংবাদিক আমার প্রিয় খসরু চৌধুরী সুন্দরবনকে নিয়ে লিখতে শুরু করেন। সেসময় তিনি মানুষখেকো বাঘ শিকারী পচাব্দী গাজীকে নিয়ে বিচিত্রায় একটি কভার স্টোরি করে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন। সাধারণ মানুষ প্রকৃত অর্থেই সুন্দরবন সম্পর্কে তেমন কিছু জানতো না। সুন্দরবনকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ। বহু বিদেশি গবেষক তাঁর সহায়তা নিয়েই কাজ করতেন।
পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে সুন্দরবন আবারও হয়ে ওঠে জলদস্যুদের নিরাপদ আবাসস্থল। তবে এসব ডাকাতদের সঙ্গে প্রাচীনকালের ডাকাতদের একটু পার্থক্য রয়েছে।

বেশীরভাগ ক্ষেত্রে এখনকার ডাকাতদের মধ্যে কেউ রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, সিন্ডিকেটের আধিপত্য বিস্তার কিংবা কেউ কেউ নিতান্ত জীবন বাঁচানোর তাগিদেই এই পথ বেছে নিয়েছে। এভাবেই একে একে গড়ে ওঠে প্রায় ৪০টি জলদস্যুর দল। এদের মধ্যে কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা কিংবা মারা পড়েছে বিভিন্ন সময়ে।

খসরু চৌধুরীর পর সুন্দরবন নিয়ে দীর্ঘদিন কেউ আর কাজ করেনি। তিনি আজ সুদূর কানাডা প্রবাসী। এবারের বইমেলায় একটি বই বেরিয়েছে। বইটির নাম সুন্দরবনের জলদস্যুদের জীবনে ফেরার গল্প। লেখক যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিবেদক মোহসীন-উল হাকিম।

লেখক তার অটোগ্রাফ দেয়া একটি বই আমাকে উপহার দিয়েছিলেন বইমেলায়। বইটি বেশ সময় নিয়ে পুরোটাই পড়েছি। বইটিতে মোট দশটি অধ্যায় রয়েছে । বইটির যতই গভীরে গিয়েছি ততই রোমাঞ্চিত হয়েছি। প্রতিটি অধ্যায়ে রয়েছে শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনা। অবাক হয়েছি মোহসীনের সাহসীকতা দেখে। ২০০৮ থেকে তার সুন্দরবনে আনাগোনা। দস্যুসম্রাটদের সঙ্গে কৌশলে সখ্য গড়ে তুলেছেন। তাদেরকে বুঝিয়েছেন, এই জীবন কণ্টকাকীর্ণ। তাদের মন জয় করেছেন। তাদের আস্থা অর্জন করেছেন। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলে তিনি সরকারের সঙ্গে বোঝাপড়া করে তাদের জীবনের সুরক্ষার ব্যবস্থা করবেন, সেই আশ্বাসও দিয়েছেন তাদেরকে।

মোহসীন তার কথা রেখেছেন। তার সহযোগিতায় ২০১৫ সালের ৩১ মে থেকে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর পর্যন্ত মোট ৩২টি দস্যুদলের ৩২৮ জন সদস্য সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। এসময় তারা জমা দেয় ৪৬২টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র এবং সাড়ে ২২ হাজার গোলাগুলি। অবশেষে দস্যুমু্ক্ত হয় সুন্দরবন। সরকারও তার প্রতিশ্রুতি মোতাবেক দস্যুদলের সদস্যদের পুনর্বাসনের প্রত্যেকের জন্য এক লক্ষ করে টাকা প্রদান করে। এই টাকা দেয়া হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে।

বইটির লেখক মোহসীন-উল হাকিম ব্যক্তিজীবনে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স সম্পন্ন করেন। এরপরই কর্মজীবনে জড়িয়ে পড়েন। ইলেকট্রোনিক্স মিডিয়ার সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন চ্যানেল আই, এটিএন বাংলা, দেশ টিভি, এটিএন নিউজ এবং চ্যানেল ২৪-এ। বর্তমানে যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিবেদক হিসাবে কাজ করছেন।

উল্লেখ্য, বইটির ভূমিকা লিখেছেন সুন্দরবনের বাঘ মামাখ্যাত বর্তমানে কানাডা প্রবাসী সুপ্রিয় খসরু চৌধুরী। বইটি এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশের পর এটির পঞ্চম সংস্করণও মূদ্রিত হয়েছে বইমেলা চলাকালে। এখন চলছে ষষ্ঠ সংস্করণের পরিমার্জিত এবং পরিবর্ধনের কাজ।

লেখক: আনোয়ার ফরিদী
সূত্র: হিনী রিপোর্ট