বিশ্ববিশ্র“ত শাস্ত্রজ্ঞ বৌদ্ধপণ্ডিত মহাস্থবির শীলভদ্র

52
Social Share

মহাস্থবির শীলভদ্র বৌদ্ধজগতে একজন শাস্ত্রজ্ঞ দার্শনিক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলেন। কেবল একজন সুপণ্ডিত হিসেবেই নন, একজন শিক্ষা সংগঠক হিসেবেও দেশ বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। নালন্দা মহাবিহার বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যক্ষ ছিলেন তিনি।
জন্ম ৫২৯ খ্রিষ্টাব্দে সমতট রাজ্যভুক্ত বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্গত কুমিল্লা জেলার চান্দিনাতে এক ব্রাহ্মণ রাজপরিবারে। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অধ্যয়নপ্রিয়। জ্ঞান অন্বেষণে ধর্মীয় গুরুর সন্ধানে তিনি সেই কালের অবিভক্ত ভারবর্ষের বিভিন্ন রাজ্য ও অঞ্চল পরিভ্রমণ করেন। অবশেষে মগধের নালন্দা মহাবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত হন। এখানে তিনি মহাবিহারের অধ্যক্ষ আচার্য ধর্মপালের অধীনে শিক্ষালাভ করেন। তাঁর কাছেই তিনি বৌদ্ধধর্মের সারমর্ম গ্রহণ করেন। অর্জন করেন ওই শাস্ত্রের দুরূহ অংশের ব্যাখ্যায় পারদর্শিতা।
এই সময় দক্ষিণ ভারতের একজন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ধর্মপালের পাণ্ডিত্য ও ধর্মীয় জ্ঞানবত্তার ঐশ্বর্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে তাঁকে ধর্মের বিষয়াদি নিয়ে তর্কযুদ্ধের আহ্বান জানান। স্থানীয় রাজার অনুরোধে গুরু ধর্মপাল এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। এ কথা শোনার পর শীলভদ্র স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে তাঁর গুরুর পরিবর্তে নিজে তর্কযুদ্ধে অংশ নেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩০ বছর। তবু এই তর্কযুদ্ধে তিনি জয়ী হন এবং পুরস্কারস্বরূপ রাজা তাকে একটি শহর উপহার দেন। সেখানে তিনি একটি বিহার গড়ে তোলেন। ধর্মপালের মৃত্যুর পর (৫৬১? অথবা ৬৩৫?) নালন্দা মহাবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান (আশার্য) নিযুক্ত হন শীলভদ্র। তাঁর পাণ্ডিত্য এত গভীর আর স্বীকৃত ছিল যে, নালন্দা মহাবিহারের অধিবাসীরা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবশত কখনো তাঁর নাম উচ্চারণ করতেন না। তাঁকে সম্বোধন করতেন তারা ‘ধর্মনিধি’ বলে।
শীলভদ্রের জীবন সম্পর্কে খুব বেশি কিছু ভারতীয় কোনো গ্রন্থের মাধ্যমে পাওয়া যায় না, যতটা পাওয়া যায় চীনা পর্যটক ও ধর্মশাস্ত্রবিদ হিউয়েন সাঙের বিবরণ থেকে।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যে সব স্বনামধন্য অধ্যাপক এই মহাবিহারে অধ্যাপনা করতে এসেছিলেন, তাঁদের শ্রেষ্ঠ ছিলেন শীলভদ্র- এই মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ। তিনি ছিলেন বাঙালি। একদিন তিনি স্বপ্নে দেখেন মহাবিহারে হিউয়েন সাঙ এসেছেন। তাই হিউয়েণ সাঙ সেখানে এলে তাঁকে সাদরে অভ্যর্থনা জানান। এখানে তিনি শীলভদ্রের কাছে ২২ মাস ধরে যাবতীয় শাস্ত্র অধ্যায়ন করেন এবং রচনা করেন ‘সিদ্ধি’ নামে একটি গ্রন্থ। শুধু তাই নয়, তিনি সংস্কৃত শিখে আয়ত্ব করেছিলেন হিন্দু দর্শনশাস্ত্র।
শীলভদ্র প্রকৃতিগতভাবেই ছিলেন খুবই বিনয়ী, সজ্জন, প্রজ্ঞাবান, মহাজ্ঞানী এবং নির্লোভী। রাজপুত্র হয়েও ত্যাগ করেছিলেন অর্থ ও ক্ষমতার প্রতিপত্তি। মগধের রাজা যখন তাকে নগর উপহার দিতে চান, তখন তিনি তা খুবই বিনয়সহকারে প্রত্যাখ্যান করেন।
জীবনের পরম অর্থ তিনি খুুঁজে পেয়েছিলেন। আজীবন অবিবাহিত থেকে তিনি শুধু জ্ঞানই আহরণ করে গেছেন এবং সমভাবে তা বিতরণও করেছেন। কিন্তু দঃখের বিষয়, তিনি শত শত গ্রন্থ রচনা করলেও সে সবের কোন নিদর্শন আর পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেছে কেবল একটি গ্রন্থ। বৌদ্ধধর্ম ও দর্শনের ওপর রচিত তার সেই গ্রন্থটির নাম ‘আর্য- বুদ্ধভূমি ব্যাখ্যান’।
তিনি যে অতি উঁচু দরের শিক্ষা সংগঠক ছিলেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘শীলভদ্র সংঘারাম বিহার’ প্রতিষ্ঠার ঘটনা থেকে। নি:সন্দেহে শীলভদ্র তাঁর সমকালীন যুগে সুযোগ্যতম এবং সবচেয়ে বড় পণ্ডিত ছিলেন।
আমরা শীলভদ্রের জীবন থেকে দেখি, এখন থেকে ১৪শ বছর আগে তাঁর মাধ্যমেই প্রথম বৌদ্ধধর্মের বাণী চীনের জনগণের কাছে পৌঁছে এবং তা বহন করে নিয়ে যান তাঁরই ছাত্র বিখ্যাত চীনা পর্যটক হিউয়েন সাঙ। বৌদ্ধধর্ম ছড়িয়ে পড়ে প্রাচ্যের অন্যান্য দেশে।
শীলভদ্র দীর্ঘ আয়ুর অধিকারী মহাপুরুষ ছিলেন। বেঁচে ছিলেন ১২৫ বছর। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ৬৫৪ খ্রিষ্টাব্দে।