বিশিষ্ট নাট্যকার ও নাট্য পরিচালক আতিকুল হক চৌধুরী

114
Social Share

বিশেষ প্রতিনিধি: বাংলাদেশের গণমাধ্যমে সবচেয়ে জ্যেষ্ঠতম ব্যক্তিতব ‘নেপথ্য নায়ক’ আতিকুল হক চৌধুরী বেতার ও টেলিভিশন-এর মুকুটহীন সম্রাটের মতো গত ৪৭ বছর ধরে রাজত্ব করে চলেছেন। শুধু সমাজ সচেতন নয়, সমাজ পরিবর্তনের অঙ্গীকারাবদ্ধ নাট্যকার ও নাট্য পরিচালক হলেন আতিকুল হক চৌধুরী।

বরিশাল জেলার বিখ্যাত উলানীয়া জমিদার বাড়ির সন্তান আতিকুল হক চৌধুরীর জন্ম ভোলা জেলায়, তার মামা বাড়ি বাটামারা সৈয়দ বাড়িতে ১৯৩১ সালের ১৫ই ডিসেম্বর। পিতা মরহুম সেরাজুল হক চৌধুরী প্রাক্তন ডিস্ট্রিক্ট রেজিস্ট্রার, মাতা মরহুম সৈয়দা রওশন আরা বেগম। ফরিদপুর জেলার উৎরাইল নিবাসী প্রাক্তণ এ.ডি.সি জহরুল হক চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ কন্যা জহুরা বেগম লিলির সঙ্গে ১৯৫৫ সালে ৬ ডিসেম্বর আতিকুল হক চৌধুরী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বড় ছেলে এনামুল হক চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রের সিনসিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক। একমাত্র মেয়ে আসা ফিয়া ইসলাম ওয়েস্ট ভার্জিনিয়াতে ব্যাংকে কর্মরত। ছোট ছেলে মইনুল হক চৌধুরী পরলোকগত।

১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন আতিকুল হক। ষাট দশকের গোড়ার দিকে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানে যোগদান করেন। আতিকুল হক চৌধুরী বেতারে নাটক বিভাগের প্রযোজক এবং ঢাকা চট্টগ্রাম বেতারে অনুষ্ঠান সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। সক্রিয়াভাবে নতুন আঙ্গিকে অর্ধ শতকের বেশি বেতার নাটক রচনা ও প্রযোজনা করেন। আব্দুল্লাহ আল মামুন ও আমজাদ হোসেনের মতো নাট্যকার বেতারে উপহার দেন তিনি। শওকত আকবর, শবনম, ফেরদৌসী মজুমদার, খলিল-এর নতুন মুখ তিনি বেতারে উপহার দেন। (নাজমূল আলম রচিত নাটক ‘সারে’ প্রযোজনা করে) তিনি বেতার নাটকে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেন। নদীবক্ষে পানকৌড়ি, নাটকটি লঞ্চে নির্মাণ করে। এই নাটকটি সম্পর্কে তৎকালীন পাকিস্তান অবজারভারের সম্পাদক আব্দুস সালাম উপ-সম্পাদকীয় লিখেছিলেন। বেতার থেকে তিনি ১৯৬৬ সালে সরাসরি টেলিভিশনে যোগদান করেন। উপ-মহাপরিচালক অনুষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করে ১৯৯১ সালে টেলিভিশন থেকে অবসর গ্রহণ করে।

তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ ১০ বছর ও নাটক তত্ত্ব বিভাগে শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেন। একুশে টিভিতে ২০০৩ সালে পরিচালক অনুষ্ঠান পদে যোগদান করেন।সর্বশেষ তিনি একুশে টিভিতে উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বিটিভিতে তিনি ৩০০-এর মতো নাটক প্রযোজনা করেছেন। রচনা করেছেন ‘বাবার কলম কোথায়’, ‘দূরবীন দিয়ে দেখুন’, ‘সার্কাস দেখুন’, ‘জুলেখার ঘর’-এর মতো পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে নাটক। শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও টলস্টয়ের অগণিত বিখ্যাত নাটকের সার্থক নাট্যরূপ দিয়ে ও প্রযোজনা করে তিনি দেশ-বিদেশে বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বাংলাদেশ টিভির প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য নাটক শাহজাদীর কালোনেকাব আবদুল্লাহ আল মামুণের ও প্রথম একালের নাটক শরৎচন্দ্রের ‘বড় দিদি’র প্রযোজক ছিলেন তিনি। তার প্রযোজিত টিভি নাটক ‘ঞরফধষ ঞৎধমবফু’ ১৯৬৯-এ হিলভার সাম টিভি থেকে প্রচারিত প্রথম বাংলা নাটক। তার পরিচালিত নেপথ্যের নায়িকা রাওয়ালপিন্ডি স্টেশন থেকে পরিবেশিত প্রথম বাংলা নাটক। নাট্যকার কাজী মাহমুদুর রহমান রচিত ও আতিকুল হক চৌধুরী পরিচালিত ‘স্বর্ণ তোরণ’ নাটকটি দেখে তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী শ্রী সত্যজিৎ রায়। রামপুরায় বিটিভির উদ্বোধনী নাটক ছিল ‘দূরদর্শিনী’ আতিকুল হক চৌধুরীর রচন ও প্রযোজনায়। বাংরাদেশে প্রথম প্যাকেজ নাটক ১৯৯৪ সালের ৮ ডিসেম্বর প্রচারিত ‘প্রাচীর পেরিয়ে’ ছিল তারই পরিচালনায়।

বেতারে ও টিভিতে তিনি সেলিম আলদীন এর মতো অগণিত নাট্যকার ও হুমায়ুন ফরীদি, শর্মিলী, সম্পারেজা, দিলশাদ রেজা, দিলারা জামান ও শমী কায়সার-এর মতো ১০২ জন নতুন নাট্য শিল্পী উপহার দিয়েছেন। যে জন্য একমাত্র আতিকুল হক চৌধুরীকেই বলা হয়ে থাকে ‘তারকা আবিষ্কারক ও তারকা নির্মাণের উজ্জ্বল তারকা’। বেতার টিভির যদি ইতিহাস রচিত হয় তবে আতিকুল হক চৌধুরীর নাম স্বর্ণ অক্ষরে রেখা থাকবে এ মন্তব্য ছিল কবি শামসুর রাহমানের। বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটকের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৯০ সারে নয়াদিল্লিস্থ বিশ্ব উন্নয়ন সংসদ কর্তৃক সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করে আতিকুল হক চৌধুরী।

বাংলাদেশে তিনি এ পর্যন্ত ১৮টি পুরস্কারে ভূষিত হন। তবে আতিকুল হক চৌধুরীর শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দর্শক-শ্রোতার অকুণ্ঠ ভালবাসা ও বিশ্বাস ব্যক্তিজীবনে তিনি এই ভালবাসা ও বিশ্বাস এবং তার নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে বাংলাদেশের নাট্য ভুবনকে এখনও আলোকিত করে চলেছেন। বাংলাদেশের অতুলনীয় নাট্য ব্যক্তিত্ব আতিকুল হক চৌধুরী ভ্রমণ করেছেন ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, জাপান ও হল্যান্ডস বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। সন্ধান করেছেন অগণিত মানুষের জীবন ও মনের রহস্য। জীবনের গৌধূলি লগ্নে বৃক্ষসহ মানুষের শেকড়ে শেকড়ে শাখায়-প্রশাখায়, পাতায়-পাতায়, লতায়-লতায় খঁজে ফিরছেন। তিনি জীবনের রসসম্ভার নাটকের মাধ্যমে তার দর্শক-শ্রোতাকে উপহার দিতে।

আতিকুল হক চৌধুরী প্রোস্টেট ক্যানসার, ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত রোগে অনেক দিন থেকেই ভুগছিলেন। আতিকুল হক চৌধুরী ২০১৩ সালের ১৭ জুন সোমবার রাত নয়টা ৪৫ মিনিটে রাজধানীর শমরিতা হাসপাতালে ৮২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।