বিলুপ্তির পথে মাটির ঘর গরমে ঠান্ডা এবং শীতে গরম হওয়া

38
Social Share

কাজল আর্য,স্টাফ রিপোর্টার:
এক সময় এলাকাভেদে মাটির তৈরি ছিল বাসস্থানের একমাত্র অবলম্বন। শীত গরমে ঘরগুলো আরামদায়ক বাসস্থান। দৃষ্টিনন্দন ঘরগুলো ঐতিহ্যও বহন করে। টাঙ্গাইলের মধুপুর, ধনবাড়ী, ঘাটাইল ও মির্জাপুর উপজেলায় বিশেষ করে পাহাড়ী অঞ্চলে মাটির ঘর তৈরি হতো। তবে কালের ¯্রােতে আজ বিলুপ্তের পথে।
উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আর্থিক স্বচ্ছলতার কারণে মাটির ঘর নির্মাণে আগ্রহ নেই মানুষের। উপজেলার পাহাড়ী এলাকার ধনী গরিব প্রায় প্রতিটি বাড়িতে মাটির ঘর ছিল।
জানা যায়, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বন-জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ী এলাকায় চোর ডাকাতের খুব উপদ্রব ছিল। বাঘ-ভাল্লুকসহ নানা হিংস্র প্রাণীর ভয়ও ছিল বেশি। ছিল না বিদ্যুৎ সংযোগ। ইট বালু সিমেন্টের ব্যবহার না থাকায় সে সময় নিরাপত্ত্বার জন্য পাহাড়ী অঞ্চলের মানুষ মাটির ঘর তৈরি করতেন। কোঠাঘরের আরেকটি বিশেষত্ব ছিল। গরমের সময় ঠান্ডা এবং শীতের সময় গরম অনুভূত হওয়া। এছাড়া খুব সহজেই তৈরী করা যেতো এ ঘর। প্রয়োজন হতো এঁটেল দো-আঁশ মাটি। তেমন কোন খরচ হতো না। কৃষাণ-কৃষাণী ও তাদের ছেলে-মেয়েরা মিলেই অল্প কয়েক দিনেই তৈরি করতেন। মাটিতে কোদাল দিয়ে ভালো করে গুড়িয়ে নেওয়া হতো। তারপর পরিমাণ মতো পানি মিশিয়ে থকথকে কাঁদা বানাতেন। সেই মাটি দিয়েই হয় ঘর। অল্প-অল্প করে কাঁদা মাটি বসিয়ে ৬ ফুট থেকে ৭ ফুট উচ্চতার পূর্ণাঙ্গ ঘর তৈরী করতে সময় লাগতো মাত্র মাস খানেক। সম্পূর্ণ হলে তার উপর ছাউনি হিসেবে ব্যবহার হয় ধানের খড়। এমনভাবে ছাউনি দেয়া হয় যেন ঝড়-বৃষ্টি কোন আঘাতেই তেমন একটা ক্ষতি করতে না পারে।
আবার ধনীদের বাড়ীতে থাকতো বিভিন্ন নকশা করা দু‘তালা ঘর। কারো কারো বাড়িতে শত বছরের মাটির তৈরী দু‘তলা বাড়ী লক্ষ্য করা যায়। মির্জাপুরের আজগানা ইউনিয়নের বেলতৈল গ্রামের আমান উদ্দিন সিকদার ও আব্দুর রাজ্জাক মেম্বার জানান তাদের বাড়িতে দুতলাসহ একাধিক মাটির ঘর ছিল। আর্থিক স্বচ্ছলতা এবং এলাকায় ইট ভাটার কারনে বাপ-দাদার আমলের দোতলা মাটির ঘরটিও ভেঙে পাকাঘর তৈরি করেছেন। তবে তাদের এলাকায় এখনও অনেক বাড়িতে মাটির ঘর রয়েছে।
অনেক বাড়ীতে শত বছরের পুরনো দোতালা বেশ কয়েকটি মাটির ঘর ছিল। এলাকায় শিল্পকারখানা হওয়ায় লোকসমাগম বেড়ে গেছে। সেকারণে তা ভেঙে পাকাঘর ঘরে সবাই ভাড়া দিয়েছে। যারা ধন-সম্পদের মালিক থাকতো তারাই দোতালা মাটির ঘর করে বাড়ী বানাতো।
জেলার পাহাড়ী এলাকায় ঘুরে মাটির ঘর লক্ষৗ করা গেলেও পরিমানে সেটা খুবই কম। যাদের সামর্থ্য একেবারেই নেই তারাই এখনও মাটির ঘরে বাস করেন। ইদানিং নতুন করে কেউ আর মাটির ঘর তৈরি করেন না। ফলে কালে বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে চিরায়ত বাংলার মাটির তৈরি।
মির্জাপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মীর এনায়েত হোসেন মন্টু জানান, এক সময় প্রায় বাড়ীতেই মাটির ঘর ছিল। সে-সময়ে ধনী গরিবের এতো ভেদাভেদ ছিল না। মাটির ঘরে আলাদা স্বস্থি ছিল। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, আধুনিক জীবন যাপন ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়া মাটির বাড়ী-ঘর ভেঙ্গে সবাই ইটের বাড়ী বানাচ্ছেন।
বিশিষ্টজনেরা বলেন এসব মাটির ঘর আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু শতাব্দীর নগরায়নে আমরা হারিয়ে ফেলছি। এক সময় ছবি দেখিয়ে নতুন প্রজন্মকে মাটির ঘর চেনাতে হবে। ওরাও অবাক হবে এ মাটির ঘরে মানুষ আবার থাকতো নাকি!