বিদেশি সাংবাদিকের চোখে বঙ্গবন্ধু

7
Social Share

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে জাতিসত্তায় পরিণত ও জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। বিশেষ করে বাঙালির স্বায়ত্তশাসনসহ ছয় দফা দাবি থেকে সৃষ্ট ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ‘৭০ সালের নির্বাচন এবং ‘৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অবিস্মরণীয় ঘটনাগুলোর সংবাদ সংগ্রহ করার জন্য বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যমগুলো তাদের প্রতিনিধি ঢাকায় প্রেরণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, টাইম ম্যাগাজিন, দ্য টাইমস, ইভিনিং স্টার, লন্ডন অবজারভার, বিবিসি একাধিক সাংবাদিক পাঠায়। ফলে এসব গণমাধ্যমে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের ওপর সরেজমিন প্রতিবেদন যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়।

একাত্তরের মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা লাভের আগেই পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশে কোর্ট, কাচারি, সরকারি অফিস পরিচালিত হওয়ার ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তারা সংবাদ প্রকাশ করে। বাঙালির এই অবিসংবাদিত নেতা সম্পর্কে কোনো কোনো গণমাধ্যম ‘বেঙ্গলস নিউ হিরো’, ‘হিরো অব ইস্ট পাকিস্তানিস’, ‘মুজিবুর :দ্য ভার্চুয়াল রুলার অব ইস্ট পাকিস্তান’ ‘আনডিসপুটেড লিডার অব বেঙ্গলিস’ শীর্ষক শিরোনাম দিয়ে বক্স আইটেম করে। মুদ্রিত সংবাদমাধ্যমে ছোট ছোট বাক্যে আকর্ষণীয় শিরোনামগুলো গভীর অর্থবোধক। এসব আকর্ষণীয় শিরোনাম দিয়ে বিদেশি সাংবাদিকরা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের বহুমাত্রিক গুণাবলির বিশ্নেষণ করেছেন। তাদের বিশ্নেষণে উঠে আসে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর জনমত সংগঠিত করার এক অদ্ভুত জাদুকরী শক্তির কথা। আরও উঠে আসে তার দূরদর্শিতা, ত্যাগ, সততা, নেতৃত্ব কৌশল, সাহস, ক্যারিশমা, মানুষের প্রতি ভালোবাসার কথা। এমনকি বঙ্গবন্ধুর বিদেশ নীতির প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়। বিদেশি গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের মূল্যায়নের কথা বিস্তারিত তুলে ধরা হলে এ লেখার পরিসর আরও বড় হবে। তাদের মূল্যায়নের কিছু চুম্বক অংশ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই আমার নিবন্ধের অবতারণা।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত দ্য অবজারভারের ২৮ মার্চ ১৯৭১ সংখ্যায় ‘বেঙ্গলস নিউ হিরো’ শিরোনামে সিরিল ডান লিখেছেন, ‘হোয়াটএভার মে বি সেইড অ্যাগেইনস্ট হিম, হি ইজ নট এ পলিটিক্যাল অপরচুনিস্ট’। অর্থাৎ শেখ-এর বিরুদ্ধে যা কিছু বলা হোক না কেন তিনি রাজনৈতিক সুবিধাবাদী নন। সিরিল ডান তার লেখায় অন্যান্য প্রসঙ্গের সঙ্গে পাকিস্তান সৃষ্টির এক বছরেরও কম সময়ে শেখ মুজিবের বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু করা, আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগে তার কথা বলার ভঙ্গিমা, মানুষকে সংগঠিত ও উদ্বুদ্ধ করার অসাধারণ ক্ষমতার ওপর আলোকপাত করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘শেখ কোনো অর্থেই একজন উগ্র মানুষ নন। তিনি জনগণের ওপর নির্ভর করেছেন। বক্তৃতার মাধ্যমে জনমতকে সংগঠিত করেছেন। যেভাবে উইলসোনিয়ান পাইপ তুলে নিয়ে বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতেন এবং ইমপ্রেসড করতেন, তা বর্তমান ব্রিটিশ লেবার পার্টির কোনো নেতার চেয়ে তাকে উত্তেজক (এক্সাইটিং) বলে মনে হয় না, যা প্রশংসার দাবি রাখে।’

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের ৯ ডিসেম্বর ১৯৭০ সংখ্যায় ‘আনডিসপুটেড লিডার অব দ্য বেঙ্গলিস’ শিরোনামে র‌্যালফ ব্লুমেন্টাল লিখেছেন, ‘দুই দশক ধরে তিনি তার দলের প্রতি মানুষের সমর্থন আদায় করেছেন, মানুষের আস্থা সৃষ্টি করেছেন।’ একজন ব্যক্তির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কথা বলার ভঙ্গিমা, কণ্ঠস্বর নিয়ে চমৎকার মন্তব্য তুলে ধরেছেন র‌্যালফ। একজন কূটনীতিককে উদ্ধৃত করে তিনি লিখেছেন, ‘শেখ মুজিব যদি একজন ব্যক্তির সঙ্গেও কথা বলেন, মনে হবে ইয়াংকি স্টেডিয়ামে ৬০ হাজার মানুষের উদ্দেশে বক্তৃতা করছেন।’ উল্লেখ্য, ইয়াংকি স্টেডিয়াম নিউইয়র্কে। র‌্যালফ প্রতিবেদনটি প্রণয়নের জন্য বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলেন। প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধুকে উদ্ধৃত করে তার মন্তব্য প্রকাশ করেছেন এভাবে- ‘ইতিহাসে খুব কম নেতাই আছেন, যারা দশ লাখ মানুষের জনসভায় বক্তব্য রেখেছেন। কিন্তু আমি পেরেছি।’ দ্য নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার একাধিক সাংবাদিক ঢাকায় আসেন। তাদেরই একজন টিলম্যান ডুরডিন। ৫ মার্চ ১৯৭১ পত্রিকাটিতে ‘হিরো অব দ্য ইস্ট পাকিস্তানিজ’ শিরোনামে তিনি লিখেছেন, ‘ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ ও মেলামেশায় তিনি অত্যন্ত হাসিখুশি ও প্রাণোচ্ছল একজন মানুষ।’

বঙ্গবন্ধুর প্রখর স্মৃতিশক্তি ছিল। এটি ছিল তার বিশেষ গুণ। একবার যার সঙ্গে কথা বলেছেন বা দেখেছেন তাকে আর ভুলতেন না। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিশক্তি নিয়ে ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের ইভিনিং স্টার পত্রিকায় ‘শেখ মুজিবুর রহমান ওল্ড স্কুল পলিটিশিয়ান’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধুর সহযোগীদের বরাত দিয়ে বলা হয়, ‘এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের যে, একজন কৃষকের সঙ্গে কথা বললে ২০ বছর পর আবার তার সঙ্গে দেখা হলে তাকে স্মরণ করতে পারতেন।’

মানুষকে আকৃষ্ট করার সম্মোহন শক্তি ছিল তার। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে জনমতকে সংগঠিত করায় তিনি তার সম্মোহন শক্তির প্রয়োগ করেছেন। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি তার দলের প্রতি মানুষের সমর্থন আদায় করেছেন। তার নেতৃত্বের প্রতি মানুষের আস্থা সৃষ্টি করেছেন। তিনি ছিলেন একজন ভলো বাগ্মী এবং দরাজ কণ্ঠের অধিকারী। দরাজ কণ্ঠে বক্তৃতা দিতেন আর মানুষ তা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত। বক্তৃতায় তিনি পাকিস্তািন শোষণ-বৈষম্যকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা তাদের স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে। পাকিস্তানিদের শোষণ-বৈষম্যের কারণে পূর্ববাংলার জনগণ ছিল অবহেলিত ও উন্নয়নবঞ্চিত। বাঙালির শ্রম ও ঘামের সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার করে ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়। ৫ এপ্রিল ১৯৭১ টাইম ম্যাগাজিন ‘রেইজ হ্যান্ড জয়েন মি’ শিরোনামে লিখেছে, ‘ভাইয়েরা তোমরা কি জানো করাচির রাস্তা সোনা দ্বারা মুড়িয়ে রাখা হয়েছে। তোমরা কি চাও ওই সোনা ফিরিয়ে আনতে? যদি চাও তবে হাত তোল এবং আমার সঙ্গে যোগ দাও।’

১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে পূর্ববাংলা শাসিত হয়েছে মূলত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মধ্য দিয়েই তিনি বাংলাদেশ শাসনের অধিকার অর্জন করেন। সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগের বিজয় সত্ত্বেও সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধুর পরামর্শ মতে ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সংসদের অধিবেশন না ডাকা, সংখ্যালঘু নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর কথামতো ৩ মার্চ অধিবেশনের ঘোষণা এবং ১ মার্চ তা স্থগিত ঘোষণা করে। এরপর থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পূর্ব পাকিস্তান শাসিত হচ্ছিল। ওয়াশিংটন পোস্টের ১ মার্চ ১৯৭১ সংখ্যায় ‘মুজিবুর : ভার্চুয়াল রুলার অব ইস্ট পাকিস্তান’ শিরোনামে আর্নল্ড জেইটলিং লিখেছেন, ‘ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের দোতলা বাড়ি থেকে শেখ মুজিবের নির্দেশেই পূর্ব পাকিস্তান শাসিত হচ্ছিল।’

ইতিহাস বঙ্গবন্ধুকে সৃষ্টি করেনি। বঙ্গবন্ধুই ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। আর এই ইতিহাস সৃষ্টির জন্য প্রথমে তিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। এরপর পাকিস্তানি স্বৈরশাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সুদীর্ঘ ২৩ বছর ধরে সংগ্রাম করেছেন। জীবনের ১৩টি বছর কাটিয়েছেন কারাগারে। জেল-জুলুম, নির্যাতন, হত্যার হুমকি কোনো কিছুই তার লক্ষ্য অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বাংলার মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনে তিনি ছিলেন অবিচল।

তার ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালিরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে অংশ নেয়। নয় মাসের রক্তস্নাত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এ কারণেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার নায়ক, মহানায়ক। বিবিসির ২০০৪ সালে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্ধারণের জন্য বাঙালি শ্রোতা জরিপ করে। জরিপের ফলাফলেই উঠে আসে তিনি ‘শেখ মুজিব সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি।’ কেন তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বিশ্বের বাংলাভাষী শ্রোতারা নানাভাবে বিশ্নেষণ করেছেন। তবে একবাক্যে অত্যন্ত চমৎকারভাবে বললেন, বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও কলাম লেখক ডা. এস এ মালেক। তিনি বলেছেন, ‘বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে জাতিসত্তায় পরিণত করে জাতিরাষ্ট্র উপহার দিয়েছিলেন বলেই বঙ্গবন্ধু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি।’

সিনিয়র সাংবাদিক ও বাসসের সাবেক সিটি এডিটর