বিডিআর বিদ্রোহ হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় এ মাসেই

বহুল আলোচিত ইতিহাসের জঘন্যতম বিডিআর (বাংলাদেশ রাইফেলস) বিদ্রোহের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় প্রায় দুই বছর আগে হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করলেও পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়নি। চলতি মাসেই এই রায় প্রকাশিত হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বিচারপতি মো. শওকত হোসেন, বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বৃহত্তর বেঞ্চ ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর রায় দেন। রায়ে ১৩৯ জনকে ফাঁসি, ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ২০০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় লেখা সম্পন্ন হয়েছে। তবে এই রায়ে কোনো ভুলত্রুটি রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে এক/দুই সপ্তাহ লাগতে পারে। এটা সম্পন্ন হলেই তা প্রকাশ করা হবে। এই রায় প্রকাশের মধ্য দিয়ে ছয়বছর আগে ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর নিম্ন আদালতের দেওয়া রায় অনুমোদন প্রক্রিয়া চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হবে।

জানা গেছে, এরইমধ্যে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের সিনিয়র বিচারপতি মো. শওকত হোসেন মূল রায় লিখেছেন। তিনি প্রায় সাড়ে ১১ হাজার পৃষ্ঠার রায় লিখে বেঞ্চের অপর দুই বিচারপতির কাছে পাঠান। এরপর বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী পৃথকভাবে তার অংশ লিখেছেন। তিনিও প্রায় ১৬ হাজার পৃষ্ঠা লিখেছেন। এই দুই বিচারপতির সম্মিলিত রায় হয়েছে ২৭ হাজার ৭২৪ পৃষ্ঠা। এরপর সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার লিখেছেন সাড়ে ৫শ পৃষ্ঠার ওপর। এই তিনজনের লেখা রায় একত্রিত করে তা চূড়ান্ত করার পর প্রকাশ করা হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আসামির ফাঁসির আদেশ সম্বলিত পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে।

নিয়ম অনুযায়ী হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায় প্রকাশের পর আপিল বিভাগে আপিল করতে পারবে উভয়পক্ষই। এরপর আপিলের বিচারের মধ্য দিয়ে বিচার প্রক্রিয়া চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হবে। যদিও এরপর রিভিউ আবেদন করার সুযোগ থাকবে। রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি হওয়ার পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে আবেদন করা ছাড়া আর কোনো সুযোগ থাকবে না। এই নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের কারণে ‘বিডিআর’ নামটি পরিবর্তন করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নামকরণ করা হয়েছে।

এই মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, শুনেছি হাইকোর্টের রায় লেখা শেষ পর্যায়ে। বেঞ্চের সিনিয়র দুই বিচারপতি তাদের অংশ লিখে কনিষ্ঠ বিচারপতির কাছে পাঠিয়েছেন। তার লেখা শেষ হলেই প্রকাশ করা হবে। এই রায় প্রকাশের মধ্য দিয়ে চূড়ান্তভাবে অনুমোদন হয়ে যাবে ফাঁসির রায়।

তিনি বলেন, প্রায় দুইবছর আগে সংক্ষিপ্ত রায় দিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদন করেছেন হাইকোর্ট। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকতা করা যাচ্ছে না। নিয়ম অনুযায়ী এই রায় প্রকাশের পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের রায়ের কপি সরবরাহ করা হবে। কারা কর্তৃপক্ষ তা পড়ে শোনাবে। এরপর কোনো আসামি যদি আপিল করতে চায় তবে সে সুযোগ থাকবে। কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হলে পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি লাগবেই।

তিনি বলেন, এটা ছাড়াও আরো একটি বিষয় হলো, এ রায় প্রকাশিত না হওয়ার কারণে হাইকোর্টের রায় যারা খালাস পেয়েছেন বা যাদের কম সাজা হয়েছে তারা রায়ের সুবিধা পাচ্ছেন না।

তিনি বলেন, এই মামলার কোনো কোনো আসামি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলাও আসামি। রায়ের কপি না পাওয়ার কারণে হত্যা মামলায় খালাসপ্রাপ্তরা বিস্ফোরক মামলায় জামিন আবেদন করতে পারছেন না। একইভাবে যাদের ইতিমধ্যে সাজা খাটা হয়ে গেছে তারাও মুক্তি পাচ্ছেন না। ফলে কোনো কোনো আসামি অহেতুক হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আশা করবো এ মামলায় দ্রুত রায়ের কপি প্রকাশিত হবে এবং খালাসপ্রাপ্তরা কারাগার থেকে বের হয়ে মুক্তির স্বাদ গ্রহণ করবেন।

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের সদর দপ্তর পিলখানাকে রক্তে রঞ্জিত করে একই বাহিনীর কিছু বিপদগামী সদস্য। তাদের হাতে দেশের মেধাবী সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে প্রাণ দিতে হয়। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলায় দুটিভাগে বিচার কাজ চলছে। এরইমধ্যে হত্যার বিচার শেষ পর্যায়ে। হত্যার অভিযোগে নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টে বিচার সম্পন্ন হয়েছে। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।

পিলখানা হত্যার ঘটনায় ২০০৯ সালের ৪ মার্চ লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নবজ্যোতি খীসা বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। মামলাটি পরে ৭ এপ্রিল নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তর হয়। মামলায় ডিএডি তৌহিদসহ ৬ জনকে আসামি করা হয়। অজ্ঞাতনামা আসামি দেখানো হয় প্রায় এক হাজার জওয়ানকে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি তদন্ত শেষে ২০১০ সালের ১২ জুলাই হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুটি অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেয়। হত্যা মামলায় ৮২৪ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ৮০১ জনকে আসামি করে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

এরমধ্যে হত্যা মামলায় বিচার শেষে ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর নিম্ন আদালত রায় দেয়। সে সময়কার ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক ড. মো. আক্তারুজ্জামান (বর্তমানে হাইকোর্টের বিচারপতি) বহুল আলোচিত এ মামলায় ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও ২৭৮ জনকে বেকসুর খালাস দেন। এরপর নিম্ন আদালত থেকে ফাঁসির আসামিদের সাজা অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স পাঠানো হয়। আর কারাবন্দি আসামিরাও আপিল করেন। এ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকেও আপিল করা হয়। সব আবেদনের শুনানির পর হাইকোর্ট বিচার শেষে ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর রায় দেন।

হাইকোর্টের রায়ে নিম্ন আদালতে ১৫২ জন ফাঁসির আসামির মধ্যে ১৩৯ জনের ফাঁসির আদেশ বহাল, ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ৮ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও চারজনকে খালাস, নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ১৬০ জনের মধ্যে ১৪৬ জনের জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীসহ ১২ জনকে খালাস এবং নিম্ন আদালতে খালাসপ্রাপ্ত ৩৪ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া নিম্ন আদালত ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিলেও হাইকোর্ট ২০০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন।