বিচারের আগেই রায় প্রদান এটি মেনে নেবার মতো নয়: ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া

Social Share

ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া। মানবিক চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত। ছাত্রজীবন থেকেই প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। রয়েছে দীর্ঘ ত্যাগ-সংগ্রামের ইতিহাস। রীতিমত ময়লার ভাগাড়, মাদক আর সন্ত্রাসের গ্রাস থেকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে চিকিৎসা সেবার এক অনন্য প্রতিষ্ঠানে পরিনত করেছেন। সোহরাওয়ার্দী একাধিক বার অর্জন করেছেন শ্রেষ্ঠ হাসপাতালের পুরস্কার। সেই ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া দূর্নীতির অভিযোগে ওএসডি হলে বিস্মিত হন অনেকেই। এমনকি ডা. বড়ুয়া নিজেও। তার বিরুদ্ধে সকল অভিযোগ আর ওএসডি হওয়া নিয়ে ‘আজ সারাবেলা’ মুখোমুখি হয়েছিল সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সদ্য ওএসডি হওয়া পরিচালক ডা. উত্তম কুমার ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়ার। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের ১ম পর্ব এটি।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জব্বার হোসেন ও রবিউল ইসলাম রবি

আজ সারাবেলা: সম্প্রতি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেশিনারী ক্রয়সংক্রান্ত বিষয়ে দূর্নীতির অভিযোগে আপনাকে ওএসডি করা হয়েছে। আপনি বলেছেন, বিধি মোতাবেকও তা হয়নি। আপনার বক্তব্য কী?

ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া: মন্ত্রণালয় থেকে আমাকে তিনটা ভারী মেশিনারী ক্রয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা রজু করা হয়েছে। ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তার উত্তর দেবার জন্য একটি নোটিস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত কার্যদিবস অতিক্রম হবার আগেই আমাকে ওএসডি করা হয়েছে। আত্নপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়েও তা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আর বিচারের আগেই রায় প্রদান এটি মেনে নেবার মতো নয়।

আজ সারাবেলা: আপনি বলছিলেন, আপনি মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার। সেটা কীভাবে?

ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া: যুগান্তরের একটি প্রতিবেদনে আমাকে অভিযুক্ত করা হয়। অথচ আমার বক্তব্য নেবার প্রয়োজন মনে করেনি তারা। আমি তখন চট্টগ্রামে। আমার বড় ভাইয়ের স্ত্রী লাইফ সাপোর্টে। সেখানে জীবন-মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করছিলাম। তখন জানতে পারি আমার ফাইল তলব করা হয়েছে। তখনও ফাইলে স্বাক্ষর হয়নি। কিন্তু একটি অনলাইন পত্রিকায় আমাকে বরখাস্ত করা হচ্ছে সেই খবর প্রকাশিত হয়। আবার ওএসডি যখন করা হচ্ছে, অধিদপ্তরের অনলাইনে ওএসডি হবার চিঠি আপলোড হবার আগেই সেই অনলাইন পত্রিকা আমার ওএসডি হবার চিঠিসহ খবর প্রকাশ করেছে। এমনকি আমাকে ওএসডি করার আগেও জানানো হয়নি। বোঝা যায় এর পিছনে বড় ষড়যন্ত্র রয়েছে। ষড়যন্ত্র করে আমার বিরুদ্ধে মনগড়া তদন্ত করা হয়েছে।

আজ সারাবেলা: মেশিনারী ক্রয়ের অনিয়মের বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া: আমি একজন চিকিৎসক। সরকারি কর্মকর্তা। হাসপাতাল পরিচালনার জন্য একজন দক্ষ প্রশাসকের প্রয়োজন হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আমার মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী আমাকে যোগ্য মনে করেই এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আমার দায়িত্ব রোগীদের শতভাগ চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা। প্রায় শতভাগ আমি সফল। আর হাসপাতালের উন্নয়নের কথা না-ই-বা বললাম। প্রকিউরমেন্ট আমাদের প্রধান কাজ নয় তবে প্রসাশনিক দায়িত্ব। প্রকিউরমেন্ট -এর জন্য সরকারি বিধিমালা রয়েছে- পিপিআর রুল-২০০৬ ও বিধিমালা ২০০৮। যেটির নিড়িখেই আমরা সমস্ত ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে থাকি। দীর্ঘ পাঁচ বছর আমি সকল নিয়ম মেনে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মঞ্জুরি স্বাপেক্ষেই সকল ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছি।

দায়িত্বে থাকাকালীন প্রতি বছরই প্রকিউমেন্টের বাজেট থেকে টেন্ডার পযর্ন্ত সকল নথি বই আকারে লিপিবদ্ধ করে রেখেছি। কোন বছর ৫টি, কোন বছর ৭টি বই। সেখানে নতুন করে পাতা সংযোজন-বিয়োজনের সুযোগ নেই। যে কোনো তদন্তের জন্য এই বইগুলোই যথেষ্ট। আমি সকল আইনি প্রক্রিয়া এবং সরকারি বিধি মেনেই ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছি।

আজ সারাবেলা: আপনি বলছেন সকল কেনাকাটা নিয়ম মেনে হয়েছে। তাহলে এই অভিযোগ কেন?

ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া: হাসপাতালের শয্যা প্রতি মাল্টিপ্লাই করে বাৎসরিক বরাদ্দ দেওয়া হয়। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির কারণে পণ্য প্রতি দু-তিন বছর পর পর ৫ থেকে ৬ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়। এখানে বাড়তি দর বা মূল্যে কোন পণ্য ক্রয় করার সুযোগ নেই। কারণ, এখানে মূল্য নির্ধারণ করা থাকে। যদি কোনো পণ্যের বাজার দর উল্লেখ না থাকে সেক্ষেত্রে পিপিআর রুলানুযায়ী ক্রয় কমিটি বাজার মূল্য যাচাই করে আমাকে রিপোর্ট দেয়। সেই রিপোর্ট বা কমিটির সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। রিপোর্টানুযায়ী আমি মন্ত্রনালয়ে রিপোর্ট প্রেরণ করি সেখান থেকে ব্যয় মঞ্জুরী করা হয়। তারপর ক্রয়কৃত সামগ্রী ঠিকঠাক আছে কিনা নিশ্চিত হবার পর মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে ক্রয়কৃত মেডিকেল সামগ্রীর অর্থ অবমুক্ত করা হয়।

বলা হয়ে থাকে ওমুক হাসপাতালকে ৪০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। হয়তো হাসপাতালের পরিচালক সেই অর্থ তসরুফ করেছেন। তাহলে প্রতিদিন দেড় হাজারের মতো রোগীর সেবা, ওষুধ, অপারেশন, খাবার, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি ইত্যাদি খরচ কীভাবে মেটানো হয় বারো মাস? এই সেবার মান নিশ্চিত করেই আমার সেরা হাসপাতাল হয়েছি। আমাদের বছরে ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকা দেওয়া হওয়া হয় তার অর্ধেকতো চলে যায় বেতন ভাতায়। সরকারি পরিসেবার মূল্য পরিশোধ করতে হয়। সঙ্গে রয়েছে জমির ট্যাক্স। ইডিসিএল -এর সরকারি ওষুধের ৭০ শতাংশ মূল্য পরিশোধ করতে হয়। তাহলে আর থাকে কী? কোত্থেকে লোপাট করবে পরিচালক?

আজ সারাবেলা: তাহলে যন্ত্রপাতি ক্রয়ে দূর্নীতির অভিযোগ উঠলো কেন?

ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া: আমাদের সাধারণত তিন ধরণের কেনাকাটা। ওসিসি, এমএসআর এবং হেভি ইকুইপমেন্ট। বাৎসরিক বরাদ্দের মধ্যেই ওসিসি এবং এমএসআর খরচ অন্তর্ভূক্ত। অফিস সরঞ্জাম, ওষুধ, অপারেশন, খাবার, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী, বেডসিট, বালিশ, বেন্ডেজ, গজ, সুই-সুতা, মাস্ক, পিপিই ইত্যাদি ওসিসি ও এমএসআর -এর আওতায় পরে। আরেকটি হলো ভারী যন্ত্রপাতি বা মেশিনারী ক্রয় যেটা হেভি ইকুইপমেন্ট। যার আলাদা বরাদ্দ থাকে। গত বছর আমার বরাদ্দ ছিল ৮ কোটি টাকা। কোনো ভারি যন্ত্রপাতি কেনার প্রয়োজন হয়নি তাই বরাদ্দের ৮ কোটি টাকা আমি সরকারকে ফেরত দিয়েছি। এই খানে কিছু দূর্বলতা রয়েছে। ভারি যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে দর বা মূল্য নির্ধারণ করা থাকে না। সেখানে সিএমএসডি কর্তৃক প্রনোদিত একটি গাইডলাইন রয়েছে। যেটিকে আরও সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। একটা হাসপাতালে কি কি মেশিনারী প্রয়োজন; কোন অরিজিনে তার মূল্য কত হতে পারে তা নির্ধারিত নেই। যার ফলে যেকোনো হাসপাতালের পরিচালককে সহজেই দূর্নীতিবাজ বলে দেওয়া সম্ভব। ভারী যন্ত্রপাতিতে এত এত দূর্নীতির কথা বলা হচ্ছে তাহলে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই কেন? একটি হাসপাতালে কতটুকু সিলিং হবে, কত বেডের জন্য কত টাকা বরাদ্দ পাবে তা নির্ধারিত; এর বাইরে গেলে এর অনুমোদন কে দিচ্ছে? হয় অধিদপ্তর অথবা মন্ত্রনালয়। অনুমোদন দেবার আগে দেখা হচ্ছে না নীতিমালার মধ্যে আছে কী নেই। এটা দেখা দরকার। এই জায়গাগুলো যতদিন পযর্ন্ত সুনির্দিষ্ট না হবে ততদিন পযর্ন্ত শুভঙ্করের ফাঁকি থাকবেই।

এখানে ব্র্যান্ড এবং নন ব্র্যান্ড, কোন দেশের অরিজিন, সার্ভিস-মেইনটেন্স, বিভিন্ন ফিচার, ওয়ারেন্টি-গ্যারান্টি এবং যন্ত্রের কোয়ালিটির ওপর তারতম্য হয়। এশিয়ান অরিজিন আর জার্মান বা আমেরিকান অরিজিনের মূল্য এক হবে না। অনেক পরিচালক এসব মেডিকেল যন্ত্রপাতির সঙ্গে বাড়তি এক্সেসরিজ কিনেন। যার ফলে দামের তারতম্য ঘটে। নিরবিচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করার জন্য একটা এন্ড্রোসকপি বা কোলোনসকপি মেশিনের সাথে এক্সটা ২০টা প্রোব নেন। যেন একটি নষ্ট হলে অন্যটি ব্যবহার করে যায়। আবার মেশিন পরিচালনার জন্য টেনিং বা প্রশিক্ষন ব্যয়ের কারণে মোট খরচে তারতম্য হয়। এখন আপনি পণ্যের মান দেখবেন না, সার্ভিস দেখবেন না, হাওয়ার ওপর বলে দিলেন দূর্নীতি হয়েছে! আবার অনেকে তুলনা করেন সিএমএসডি’র সাথে। সেখানে ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডে টেন্ডার হয়। ২২ থেকে ২৩ শতাংশ ভ্যাট অন্তর্ভূক্ত করতে হয় না। আমাদের হাসপাতালগুলিতে টেন্ডারের সাথে ভ্যাট অন্তর্ভূক্ত। এসব বিবেচনায় আনবে কে?

[২য় পর্ব আসছে…]

-আজসারাবেলা