বাড়ছে আমদানি পণ্যের দাম, সঙ্গে দেশি পণ্যেরও

68
Social Share

আমদানি করা পণ্যের পাশাপাশি দেশে উৎপাদিত পণ্যের দামও বাড়ছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের আগে দেশের বাজারে নিত্যপণ্যের যে দাম ছিল, তার মধ্যে বেশ কিছু পণ্যের দাম এখন কেজিতে ১০ টাকা থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

নিত্যপণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভোজ্য তেল, আটা, ময়দা, ডাল, রসুনসহ বেশ কিছু আমদানীকৃত পণ্যের দাম। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় এসব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।

আবার বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়েকটি যৌক্তিক কারণ বাদ দিলে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে চলেছেন। এ অবস্থায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন বাজার ও টিসিবির বাজারদরের তথ্যানুযায়ী, গতকাল রবিবার খোলা ও প্যাকেট আটা কেজিপ্রতি বিক্রি হয়েছে ৪৫ টাকায়। খোলা আটার দাম বাড়লেও প্যাকেটজাত আটার দাম বাড়েনি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাড়তি দামের প্যাকেটজাত আটা এখনো বাজারে আসেনি। এর আগে গত ১ মে খোলা আটা প্রতি কেজি ৪০ ও প্যাকেটজাত আটা ৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। ইউক্রেন যুদ্ধের আগে ২৩ ফেব্রুয়ারি খোলা আটা ৩২ও প্যাকেট আটা ৩৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছিল।

গতকাল খোলা ময়দা ৬৫ টাকা ও প্যাকেট ময়দা ৭০ টাকা কেজি দামে বিক্রি হয়েছে। গত ১ মে খোলা ময়দার কেজি ৫৫ ও প্যাকেট ময়দার কেজি ৬০ টাকা ছিল। যুদ্ধের আগে ২৩ ফেব্রুয়ারি খোলা ময়দা ৪৮ টাকা ও প্যাকেট ময়দা ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।

রাজধানীর জোয়ার সাহারা বাজারের ভাই ভাই স্টোরের ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি পাইকারি দোকান থেকে গত সপ্তাহে আটার কেজির বস্তা ১৭৫০ টাকায় এবং ময়দার বস্তা ৩০৫০ টাকায় কিনে এনেছিলাম। আজ (গতকাল) আমাকে আটা ও ময়দার বস্তাপ্রতি আরো ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনে আনতে হয়েছে। ’

আমদানি করা মোটা মসুর ডাল গতকাল খুচরায় ১১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে দেখা যায়। ১ মে যা ছিল ১০০ টাকা। আর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি এই ডালের দাম ছিল কেজিপ্রতি ৯৫ টাকা।

কারওয়ান বাজারের মেসার্স নূরজাহান স্টোরের ব্যবসায়ী মো. তারেক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আটা-ময়দা ও মসুর ডালের দাম আবার নতুন করে বেড়েছে। গত সপ্তাহে খোলা আটা ৪০ টাকা কেজি ছিল, এখন কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে ৪৫ টাকা হয়েছে। ময়দা ৬০ টাকা কেজি ছিল, কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে ৬৫ টাকা হয়েছে। মসুর ডাল কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে দেশি ১৪০ এবং মোটা ডাল ১১০ টাকা হয়েছে। ’ তিনি বলেন, ‘ভারত থেকে গম বন্ধের ঘোষণায় বস্তাপ্রতি আটা-ময়দার দাম প্রায় ২০০ টাকা বেড়ে গেছে। ’

দাম বেড়েছে সয়াবিন তেলেরও। গতকাল বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৮ টাকা লিটারে বিক্রি হয়েছে। গত ১ মে এই তেল লিটারপ্রতি বিক্রি হয় ১৬০ টাকায়। আর যুদ্ধের আগে ২৩ ফেব্রুয়ারিতে এর দর ছিল ১৬৮ টাকা লিটার।

আমদানি করা পেঁয়াজ গতকাল ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। গত ১ মে পেঁয়াজ কেজিতে বিক্রি হয়েছিল ৩০ টাকা। অবশ্য ২৩ ফেব্রুয়ারি এই দাম ছিল ৫০ টাকা। পাইকারি বাজারে দাম কমলেও তার প্রভাব পড়ছে না খুচরা বাজারে। রাজধানীর শ্যামবাজার পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও পেঁয়াজ আমদানিকারক হাজি মো. মাজেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত তিন দিনের তুলনায় পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দাম কমেছে। গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার আমরা পাইকারি পেঁয়াজ বিক্রি করেছি ৩০-৩২ টাকা কেজি। আজ (গতকাল) আমরা পেঁয়াজ বিক্রি করেছি ২৮ টাকা কেজি দরে। ’ তিনি বলেন, ‘দেশের বাজারে পেঁয়াজ সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই। সরবরাহ প্রচুর রয়েছে। তাই দাম বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ’

বাজারে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে আমদানি করা রসুনের। কেজিতে বেড়েছে ৪০ টাকা। গতকাল আমদানি করা রসুন ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। গত ১ মে এই রসুন ১২০ টাকায় কেনা যেত। যুদ্ধের আগে ২৩ ফেব্রুয়ারি এই রসুন পাওয়া যেত ১০০ টাকা কেজিতে।

কারওয়ান বাজারের ভোগ্য পণ্য ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের পর এক সপ্তাহে বেশ কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম আরো এক দফা বেড়েছে। এর আগে ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই বেশির ভাগ ভোগ্য পণ্যের দাম ছিল ঊর্ধ্বমুখী। আমদানিকারকদের কাছ থেকে প্রতিবার নতুন চালানের ভোগ্য পণ্য কিনতে বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ীরাও বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিশ্ববাজারে কোনো পণ্যের ১০ শতাংশ দাম বাড়লে আমদানিকারকরা দেশীয় বাজারে ২০ শতাংশ বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এতে বাজার অস্থিতিশীল হচ্ছে।

দেশে উৎপাদিত পণ্যের দামও বেশি

বাজারে আমদানি করা নিত্যপণ্যের সঙ্গে দেশীয় উৎপাদিত পণ্যও বাড়তি দামে বিক্রি করতে দেখা গেছে। গতকাল দেশি পেঁয়াজ ৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। গত ১ মে এই পেঁয়াজ বিক্রি হয় ৩০ টাকায়। অবশ্য যুদ্ধের আগে এই পেঁয়াজ ছিল ৫০ টাকা। একইভাবে দেশি রসুন গতকাল ৭০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। ১ মে বিক্রি হয় ৫০ টাকায় আর যুদ্ধের আগে এই দর ছিল ৪৫ টাকা কেজি।

দেশি ডাল গতকাল ১৪০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। ১ মে ১৩০ টাকায় বিক্রি হয়। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। গতকাল লাল ডিম ১২০ টাকা ডজন বিক্রি হয়েছে। ১ মে ১১০ টাকায় বিক্রি হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১১৫ টাকা ডজন বিক্রি হয়েছিল।

জানতে চাইলে ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সারা বিশ্বেই মুদ্রাস্ফীতি চলছে। তার প্রভাব আমাদের দেশেও পড়ছে। আবার একসময় ব্যবসায়ীরা এক কেজি পণ্য বিক্রি করে লাভ করতেন সর্বোচ্চ পাঁচ টাকা, এখন লাভ করতে চান ৫০ টাকা। মূল্যবৃদ্ধির এটিও একটি বড় কারণ। ’ তিনি বলেন, ‘আমদানিকারকরা সম্মিলিত হয়ে দাম বাড়িয়ে পণ্য বাজারে সরবরাহ করছেন। এদিকে বৈধ-অবৈধ নানা উপায়ে কিছু মানুষের আয় বাড়ার কারণে ব্যবসায়ীরা যে দাম চাচ্ছেন সেই দামেই পণ্য নিয়ে যাচ্ছেন। এটিও মূল্যবৃদ্ধির আরেকটি কারণ। ’