বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম কর্ণধার ব্যক্তিত্ব সুভাষ দত্ত

119
Social Share

বিশেষ প্রতিনিধি: বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম কর্ণধার ব্যক্তিত্ব সুভাষ দত্ত। প্রায় ৫১ বছর ধরে চলচ্চিত্রে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন খ্যাতনামা এই ব্যক্তি। ছিমছাম, গোছানো ব্যক্তিত্ব নিয়েই তিনি বেড়ে উঠেছেন ছোটবেলা থেকে দুরন্তপনা আর সৃজনশীলতাকে সঙ্গী করে। তিনি খুব অল্প বয়সে সাধারণ থেকে কিছুটা ভিন্ন জীবনের পথে পা বাড়ান। সফলতার সবটুকু স্পর্শ করে এই পড়ন্ত বয়সে এসেও তিনি থেমে থাকেননি। এখনও ছুটে চলেছেন স্রোথধারার মতো।

সুভাষ দত্ত ৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩০ সালে এই মহান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের জন্ম হয় মুন্সিপাড়া, দিনাজপুর মামাবাড়িতে। পিতা স্বর্গীয় প্রভাস চন্দ্র দত্ত, মাতা স্বর্গীয় প্রফুল্ল নলিনী দত্ত। দুই ভাই তিন বোনের মধ্যে সুভাষ দত্ত সবার বড়। সুভাষ দত্তের পৈত্রিক বাড়ি বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার চকরতি গ্রামে। তার ২ ছেলে শিবাজী দত্ত ও রানাজী দত্ত এবং ২ মেয়ে শিল্পী দাস ও শতাব্দী মজুমদার। স্ত্রী সীমা দত্ত ২০০১ সালের অক্টোবরে প্রয়াত হন। শেষ দিন পর্যন্ত ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনের নিজ বাড়িতে বসবাস করতেন।

তার হাত ধরে এ দেশের চলচ্চিত্র বিষয়বস্তু নির্মাণ আঙ্গিকে বৈচিত্র্যতা এসেছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সুনাম ও স্বীকৃতিও এসেছিল এই এই কৃতী চলচ্চিত্রকারের মাধ্যমে। সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে সুভাষ দত্তের পরিবারের ইচ্ছা ছিল সে বড় হয়ে ডাক্তার হবেন। ডাক্তার হওয়ার ভয়ে ১৯৫০ সালে আইএসসি পরীক্ষা দেয়ার পর বাড়ি থেকে পালিয়ে বোম্বে চলে যান। সেখানে একটি চলচ্চিত্র পাবলিসিটির স্টুডিওতে মাত্র ত্রিশ টাকা মাসিক বেতনে কাজ শুরু করেন। তবে সেখানেও মন না বসায় ১৯৫৩ সালে ভারত থেকে ঢাকায় ফিরে প্রচার সংস্থা এভারগ্রিনে যোগ দেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায় ১৯৫৭ সালে ভারতের হাই কমিশনের উদ্যোগে ওয়ারিতে একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে। সেখানে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’ দেখে চলচ্চিত্র নির্মাণে অনুপ্রাণিত হন। পোস্টার আঁকার মাধ্যমে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে সুভাষ দত্তের কর্মজীবনের শুরু হয়েছিল। দেশের প্রথম চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ এর পোস্টার ডিজাইনার ছিলেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় মাটির ‘পাহাড়’ চলচ্চিত্রের আর্ট ডিরেকশনের মাধ্যমে তার পরিচালনা জীবন শুরু হয়। এরপর তিনি ৯৫৮ সালে এহতেশাম পরিচালিত ‘এ দেশ তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয় করেন। আর পরিচালক হিসেবে অভিষিক্ত হন ১৯৬৪ সালে ‘সুতরাং’ চলচ্চিত্র দিয়ে। এরপর একে একে রাজধানীর বুকে, সূর্যস্নান, চান্দা, তালাশ, হারানো দিন, নতুন সুর, রূপবান, মিলন, নদী ও নারী, ভাইয়া, চলো মান গ্যাায়ে, ফিরমিলেঙ্গে হাত দোনো, ক্যায়সে কহু, আখিরী স্টেশন, সাগর, পায়সে, সোনার কাজল, দুই দিগন্ত, সমাধান, কলকাতা-৭১, নয়া মিছিল প্রভৃতি ছবিতে অত্যন্ত সফলার সঙ্গে অভিনয় করেছেন সুভাষ দত্ত। পরবর্তীতে অভিনয়সহ পরিচালনা করেছেন সুতরাং, কাগজের নৌকা, আয়না ও অবশিষ্ট আবির্ভাব, পালাবদল, আলিঙ্গন, বিনিময়, আকাক্সক্ষার মতো বাণিজ্য সফল ছবি। তার পরিচালিত ছবিগুলো হলো বসন্ধুরা, ডুমুরের ফুল, অরুণোদরে অগ্নিসাক্ষী, বলাকা মন, সবুজ সাথী, সকাল-সন্ধ্যা, নাজমা, স্বামী-স্ত্রী, ফুলশয্যা, আগমন, সোহাগ মিলন, সহধর্মিণী, আবদার ও আমার ছেলে প্রভৃতি। প্যাকেজ প্রোগ্রামেও রয়েছে তার অসামান্য অবদান। তার নির্মিত প্যাকেজ নাটকসমূহ আমি ভালো আছি, হৃদয়ের কাছে, আংটি, গ-ি, একটি মুক্তা, যেদিন জীবনে এবং ভালবাসা, আর কোনদিন, শেষ কথা, লক্ষ্মী সরদারণী প্রভৃতি। ব্যক্তি জীবনে তিনি দুই ছেলে ও দুই মেয়ের গর্বিত পিতা। স্ত্রী স্বর্গীয় সীমা দত্ত।

শ্রেষ্ঠ কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। তার মধ্যে আছে ফ্রাঙ্কফুট চলচ্চিত্র উৎসবে দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ছবি পুরস্কার ১৯৬৫ সাল, পাকিস্তান চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেতা ১৯৬৫ সাল, মস্কো চলচ্চিত্র উৎসব পুরস্কার ১৯৬৭ সাল, ১৯৬৮ সালে নমপেন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয় সুভাষ দত্তের চলচ্চিত্র। কম্বোডিয়া নমপেন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে কম্বোডিয়ার রানীর পক্ষ থেকে বিশেষ পুরস্কার সার্টিফিকেট অফ ম্যারিট ১৯৬৯ সাল, মস্কো চলচ্চিত উৎসব পুরস্কার ১৯৭৩ সাল, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার শ্রেষ্ঠ পরিচালক ১৯৭৭ সাল, বাচসস পুরস্কার শ্রেষ্ঠ প্রযোজক ও পরিচালক ১৯৭৯ সাল, প্রযোজক সমিতির পুরস্কার, শ্রেষ্ঠ কস্টিউম ডিজাইনার ও একুশ পদকপ্রাপ্ত ১৯৯৯ সাল। এছাড়া বহু ক্রেস্ট পুরস্কারও তিনি পেয়েছেন। তার মধ্যে সাংস্কৃতিক জোটের বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, জহির রায়হান পুরস্কারও তিনি পেয়েছেন। তার মধ্যে সাংস্কৃতিক জোটের বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, জহির রায়হান পুরস্কার, আব্দুল জব্বার খান স্মৃতি পুরস্কার, আই.ডি.ই এবং এস.এম পারভেজ পুরস্কার, মেরিল প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা পুরস্কার ২০৩, গীতাঞ্জলী সম্মাননা পদক ২০০৪, শেলটেক পুরস্কার ২০০৫, টি.ডি পুরস্কার ২০০৬, শেরে বাংলা পুরস্কার ২০০৭, জাপান-বাংলাদেশ কালচারাল ফোরাম পুরস্কার ২০০৭, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনি শেরে বাংলা ফজলুল হক স্বর্ণপদক ২০০৭ (চলচ্চিত্রে অবদান), লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ২০০৭, চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব আয়োজন জার্নালিম ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন ওয়ারিদ অ্যাওয়ার্ড পুরস্কার ২০০৭, ফজলুল হক স্মৃতি পুরস্কার ২০০৭ (শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক ও অভিনেতা), বিশিষ্ট চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে অনন্যা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী আজীবন সম্মাননা ২০০৭, লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট পদক ২০০৮, বাংলাদেশ হিন্দু ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম ২০০৮, ফোকাস বাংলাদেশ শাইনিং পার্সোনালিটি অ্যাওয়ার্ড, বীরশ্রেষ্ট রুহুল আমীন স্বাধীনতা স্বর্ণপদক ২০০৮ খুলনা, আলোড়ন সাতিহ্য সাংস্কৃতিক সংসদ পুরস্কার ২০০৮।

‘সুতরাং’ চলচ্চিত্রে ফ্রাঙ্কফুটে পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য সত্যজিৎ রায় শ্রী সুভাষ দত্তকে অভিনন্দন জানান ১৯৬৫ সালে, ফজলুল হক স্মৃতি কমিটি সম্মাননা স্মৃতি পুরস্কার ২০০৭, সাপ্তাহিক ‘দি নর্থ বেঙ্গল’ এক্সপেস-এর বেগম রোকেয়া সম্মাননা পদক ২০০৮, বিশিষ্ট চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে বন্ধন লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ২০০৮। শিশু নাট্যোৎসব সম্মাননা প্রদান অনিয়মিত লিটন ইউনিট, মুন্সীগঞ্জ ২০০৮।

চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে সুভাষ দত্ত একজন শিল্পী গড়ার কারিগর হিসেবে দেশীয় চলচ্চিত্রে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তার হাত ধরেই কবরী, সুচন্দা, উজ্জল, শর্মিলী আহমেদ, ইলিয়াস কাঞ্চন, আহমেদ শরীফ ও মন্দিরার চলচ্চিত্রে আগমন ঘটে।

তিনি সময় নিয়মের মধ্যে থাকতে পছন্দ করেন। আর এ কারণেই সকাল ১০টা পর্যন্ত তিনি কারো সােেথ কথা বলেন না। ভারতের যত তীর্থ স্থান আছে এমনকি অমরনাথে সেখানে তিনি ৫০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে গেছেন।
তিনি সময় ও নিয়মের মধ্যে থাকতে পছন্দ করেন। আর এ কারণেই সকাল ১০টা পর্যন্ত তিনি কারো সাথে কথা বলেন না। ভারতের যত তীর্থ আছে এমনকি অমরনাথে সেখানে তিনি ৫০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে গেছেন।

২০০৪ সালে নিউইয়র্কে কেএমপি-এ রঅনুষ্ঠানে জুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে গিয়েছিলেন। এছাড়াও ২০০৪ সাল থেকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে জুরি বোর্ডের সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বর্তমানে লালন ফকিরের উপর একটি ডকুমেন্টারি করেছেন এবং বিজ্ঞাপন নির্মাতা হিসেবে কাজ করছেন। UODA তে Introduction to film production–এ টিচিং দেন তিনি। কাজের সুবাদে তিনি আমেরিকা, কানাডা, লন্ডন, প্যারিস, মস্কো, হংকং, কম্বোডিয়া, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, ইন্ডিয়া, থাইল্যান্ড, চীনসহ অনেক দেশ সফর করেছেন। বাকি দিনগুলো তিনি সকলের ভালোবাসানিয়ে থাকতে চান।

বাঙ্গালীর জাতির প্রিয় এই বিশিষ্ট অভিনেতা, চলচ্চিত্রকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব একুশে পদকপ্রাপ্ত অবশেষে ২০১২ সালের ১৬ নভেম্বর ৮২ বছর বয়সে পারি জমান না ফেরার দেশে।