বাঙালি কূটনীতিকের চোখে বার্মার প্রথম পর্যায়ের সেনাশাসন

21
Social Share

বর্ণিল জীবনের অধিকারী (আইনজীবী, রাজনীতিক) কামরুদ্দীন আহমদ (১৯১২-১৯৮২) ১৯৫৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৬১ সালের জুলাই পর্যন্ত বার্মায় (বর্তমান মিয়ানমার) পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মিয়ানমারের তৎকালীন অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থা ও দেশজুড়ে ব্যাপক বিশৃঙ্খলার পরিপ্রেক্ষিতে জেনারেল নে উইনের নেতৃত্বে মিয়ানমার সেনাবাহিনী (নির্বাচনের আগে) কেয়ারটেকার সরকারের দায়িত্ব পালনের জন্য ক্ষমতা গ্রহণ (১৯৫৮) করেছিল। রাষ্ট্রদূত হিসেবে দেখা সেই এক ধরনের সেনাশাসনের (১৯৫৮-১৯৬০) চমৎকার ও বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে কামরুদ্দীন আহমদর আত্মভাষ্যমূলক অসাধারণ গ্রন্থ ‘বাংলার এক মধ্যবিত্তের আত্মকাহিনী’-তে। সম্প্রতি মিয়ানমারে সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পুনরায় দখলের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫৮-১৯৬০ সালে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতির তুলনা ও রোহিঙ্গা সমস্যা এখনো প্রাসঙ্গিক।

রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় তিন সপ্তাহ পরের ঘটনা।সেদিন কামরুদ্দীন আহমদ রেঙ্গুনে (ইয়াঙ্গুন) নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ওয়ালটার ম্যাকনঘির বাড়িতে নিমন্ত্রিত হয়েছেন। অপরূপ ইনিয়া হ্রদের কাছে ফুলে ভরা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ম্যানসনে যখন তিনি পৌঁছলেন তখন রাত ৮টা। গাড়ি থেকে নেমে একাকী হেঁটে ভেতরে যেতেই আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী ডরথি ম্যাকনঘি অতিথিকে ওপরে নিয়ে গেলেন। তিনি গিয়ে দেখেন সেখানে ব্রিটেন, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিপাইনের রাষ্ট্রদূতরা উপস্থিত। পরিবেশ দেখে তিনি বুঝতে পারলেন যে সবাই একটি গোপনীয় আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন। আলোচনায় জানা গেল মিয়ানমারের রাজনীতিতে একটা আশু পরিবর্তন আসছে। এখানে যখন ডিনার পার্টি চলছিল তখন মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী উনু তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের ডেকেছেন এবং সেনাবাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের প্রস্তাবের বিষয়ে আলোচনা করছেন। আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ওয়ালটার ম্যাকনঘি জানালেন, ‘যদি উনু শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর না করেন তবে রক্তপাত হবে।’

এর তিনদিন পরই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে।এ বিষয়ে কামরুদ্দীন আহমদের পর্যবেক্ষণ: ‘২৭শে সেপ্টেম্বর (১৯৫৮) আমরা সকালবেলা শুনতে পারলাম যে জেনারেল নে উইন শর্তসাপেক্ষে ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন এবং এও শোনা গেল যে উনু মাথা মুড়িয়েছেন এবং শিগগিরই গেরুয়া পরে রাস্তায় বেরোবেন। একথা আমি বললে কোনো অত্যুক্তি হবে না যে সেনাবাহিনী বার্মার শাসনভার গ্রহণ করাতে আমি খুব আশ্চর্যান্বিত হয়েছি। কারণ সেনাবাহিনীর মধ্যে আদর্শের সংঘাত রয়েছে।…রাজনীতি এদের হাতে সমর্পণ করার অর্থ দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করা।’

সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর মিয়ানমারে অনেক পরিবর্তন আসে।এ প্রসঙ্গে লেখকের বর্ণনা: ‘সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর যেটা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল, সেটা হচ্ছে পরিচ্ছন্ন রেঙ্গুন শহর। রাস্তাঘর পরিষ্কার ব্যবস্থা, প্রতিদিন আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়…। সেনাবাহিনী শাসনভার গ্রহণের পর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামই কেবল কমে গেল না, বিলাসদ্রব্যের দামও কমে গেল। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বাজারে ঘাটতি দেখা গেল…। …কিন্তু সাধারণ লোকজন নিয়মানুবর্তিতার বাড়াবাড়িতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। জনসাধারণের যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হতে লাগল। যে রেঙ্গুন শহরে চলছিল আনন্দের ঢেউ, নাচ-গান যাদের ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী, তাদের কেউ কোনো কথা বলতে পারছিল না। সমস্ত শহরে যেন নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে রইল। তবুও মানুষ বলছিল, আমরা উনুর যুগ থেকে ভালো আছি। খুনাখুনি, গুণ্ডা কর্তৃক অপহরণ এবং লক্ষ টাকার বিনিময়ে তাকে ছেড়ে দেয়া, যা ছিল রেঙ্গুনের দৈনিক ঘটনা, তা থেকে শহর মুক্ত…। সবাই গুপ্তসন্ধানীর ভয়ে ভীত। চারদিকে না তাকিয়ে কেউ কথা বলে না।’

শাসনভার গ্রহণ করার কিছুদিন পর প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান জেনারেল নে উইন কামরুদ্দীন আহমদকে দেখা করতে অনুরোধ করেন।‘জেনারেল বেশ হাসিমুখে করমর্দন করলেন। আমাদের দুদেশের মধ্যে সমস্যা নিয়ে আলোচনা হলো। দুটি কথা তিনি উপস্থাপন করলেন, একটি পাকিস্তানি নাগরিকদের আরাকানে বেআইনি প্রবেশ, আর একটি নাফ নদীতে চাল পাচার সম্পর্কে। তিনি নিজেই আবার বললেন যে এখনই সময় যখন দুদেশের মধ্যে আলোচনা করে এর একটা সুরাহা করা সম্ভব।’

এভাবেই কেটে গেল প্রায় দেড় বছর।এরপর সামরিক সরকারের তত্ত্বাবধানে ১৯৬০ সালের এপ্রিলে মিয়ানমারে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নির্বাচনে উনুর রাজনৈতিক দল ইউনিয়ন পার্টি আশ্চর্যজনকভাবে ৯৮ শতাংশ আসন পায়। ফলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন জাতীয়তাবাদী নেতা উনু।

১৯৬০-এর ডিসেম্বরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মিয়ানমার সফর করেছিলেন।সফরসূচি নিয়ে আলোচনাকালে প্রধানমন্ত্রী উনু রাষ্ট্রদূত কামরুদ্দীন আহমদকে সেনাবাহিনী যে পুনরায় শাসনভার গ্রহণ করতে পারে তার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ‘…আমাদের দার্শনিক রাজনীতির দিন অনুন্নত স্বাধীন দেশে শেষ হয়ে আসছে। আপনার দেশের (পাকিস্তানের) যেমন আর অসামরিক সরকার হবার সম্ভাবনা কম তেমনি আমার দেশেও। ‘…আমাকে বললেন যে আমি যেন আমাদের নাগরিকদের বলি, তারা যেন শিগগিরিই তাদের ব্যবসা গুটিয়ে টাকা-পয়সা নিয়ে দেশে গিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করে। …কারণ আমাদের (বার্মা) এখানে অসামরিক শাসন বেশি দিন স্থায়ী হবে না। সেনাবাহিনীর যেসব অফিসার মার্শাল ল’র সুযোগ গ্রহণ করছে, এক বছরের মধ্যে তারা নে উইনকে বাধ্য করবে আবার তাদের ক্ষমতা ও সুবিধাগুলো ফিরিয়ে দিতে। সেনাবাহিনী আবার ক্ষমতায় এলে ভারত এবং পাকিস্তানি ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের এক কাপড়ে বার্মা ছাড়তে হবে।’

১৯৬১ সালে একদিন মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী উনু ভারত ও পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতকে তার সরকারি ভবনে ডেকে পাঠালেন।একটা বিশেষ সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা তার উদ্দেশ্য। এ বিষয়ে কামরুদ্দীন আহমদ লেখেন, ‘আপাতত তিনি (প্রধানমন্ত্রী উনু) বার্মার জন্য যতটা চিন্তিত নন, তার চেয়ে বেশি চিন্তিত ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিকবৃন্দের জন্য। …গত বছর তারা দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছিল এবং নির্বাচনে বিজয় সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে সাধারণ নির্বাচন দিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনে হেরে গিয়ে যদিও তারা আপাতত গণতন্ত্রকে মেনে নিয়েছে; সুযোগ পেলেই তারা আবার গণতন্ত্রকে চিরদিনের জন্য হত্যা করবে। …তবে যেহেতু বার্মার সাধারণ লোক আমাকে চেয়েছে বিপুলসংখ্যক ভোট দিয়ে, তাই হয়তো বড়জোর দু-এক বছর তারা অপেক্ষা করবে।’ জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে বার্মায় কি গণতন্ত্রের নাম-নিশানাও মুছে যাবে? তিনি বললেন, অন্তত তার জীবদ্দশায় গণতন্ত্র আর ফিরে আসবে বলে তিনি মনে করেন না (উনু মৃত্যুবরণ করেন ১৯৯৫ সালে)। ‘তাই আজ আপনাদের ডেকেছি, আমার সরকার ক্ষমতায় থাকতে থাকতেই আপনাদের (ভারত ও পাকিস্তান) নাগরিকদের বলুন, তাদের যা প্রাপ্য তাই নিয়ে দেশে গিয়ে তারা ব্যবসা করুক। আপনাদের দুই দেশের লোকদের ভালোর জন্যই আমি আপনাদের সাবধান করে দিলাম। এখন আপনাদের ইচ্ছা।’

১৯৬১-এর ২৭ জুন প্রধানমন্ত্রী উনুর বাড়িতে বিদায়ী সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন কামরুদ্দীন আহমদ। এর বর্ণনা এসেছে এভাবে:

‘উনুকে দেখলাম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। যদিও তার ঠোঁটে সেই সুন্দর হাসিটুকু বজায় ছিল।বার্মার ও পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে তিনি খুব চিন্তিত। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে আমি কি মনে করি পাকিস্তানে আর কখনো গণতন্ত্র আসবে? তার ধারণা পাকিস্তানে কি বার্মায় কোনোদিন সেনাবাহিনী ক্ষমতা ছেড়ে দেবে না। স্বাভাবিক কারণেই সেটা তিনি অসম্ভব বলে বর্ণনা করলেন।’

প্রধানমন্ত্রী উনুর আশঙ্কা ও ভবিষ্যদ্বাণী পরবর্তী সময়ে আশ্চর্যরকমভাবে সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল।এক বছরের মধ্যেই (১৯৬২) জেনারেল নে উইন প্রধানমন্ত্রী উনুকে ক্ষমতাচ্যুত করে শাসনক্ষমতা দখল করেন। গণতন্ত্রের পরিবর্তে মিয়ানমারে নেমে আসে দীর্ঘ সেনাশাসনের গভীর অন্ধকার। এরপর নে উইন সরকারের নির্দেশে কয়েক লাখ ভারতীয় ও পাকিস্তানি নাগরিককে মিয়ানমার ত্যাগ করতে হয়। আরাকানের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী উচ্ছেদের জঘন্য নীলনকশা তখন থেকেই পরিকল্পিত হতে থাকে।

কামরুদ্দীন আহমদ তার গ্রন্থে মিয়ানমারে মুসলমানদের সমস্যা, দুই দেশের সীমান্ত সমস্যা ও আরাকানের মুসলমানদের সমস্যা (রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী) নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। আরাকানের সমস্যা সরেজমিনে দেখার জন্য তিনি আরাকানের (বর্তমান রাখাইন) আকিয়াব,  মংডু ও  বুথিডং এলাকা সফর করেন। ফেরার পথে তিনি সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ও টেকনাফ বাজারেও এসেছিলেন। আরাকান এলাকা সফরের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রদূতের পাঠানো রিপোর্টটি ওই সময়ের বাস্তবতার একটি চমত্কার দলিল।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ কূটনৈতিক ফ্রন্টে শান্তিপূর্ণভাবে আপ্রাণ লড়াই করছে। এই ‘ব্যাটল অব উইটস’-এ মিয়ানমারের ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, সামরিক বাহিনী, ধর্ম, শাসকগোষ্ঠী ও জনগণের মনোজগৎ ও মনস্তত্ত্ব ইত্যাদি জানাও বোঝা অতিগুরুত্বপূর্ণ। জ্ঞানালোকপ্রাপ্ত কামরুদ্দীন আহমদের ‘বাংলার এক মধ্যবিত্তের আত্মকাহিনী’র পুনর্পাঠ এ পথে এখনো আমাদের দিতে পারে প্রত্যাশিত আলোর সন্ধান।

মো. বায়েজিদ সরোয়ার: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, এনডিসি (অবসরপ্রাপ্ত); বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বাংলাদেশ রাইফেলসে (বর্তমানে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড) অধিনায়ক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

– বণিক বার্তা