বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের সশস্ত্র বিপ্লবী বাঘা যতীন

19
Social Share

বিশেষ প্রতিনিধি: (১৮৮৩-১৯১৫) বাঘা যতীনের হলদিঘাট বুড়ি বালামের তীরের বীরত্বপুর্ণ সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন-
বাঙালির রণ দেখে যারে তোরা
রাজপুত, শিখ্, মারাঠী জাত
বালাশোর, বুড়ি বালামের তীর
নবভারতের হলদি ঘাট।

এই মরণপন সংগ্রামের যিনি নেতৃত্বে দিয়েছিলেন, তার নাম যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, সংক্ষেপে যিনি আজ বাঘা যতীন নামেই সমধিক পরিচিত। বাঘা যতীন এবং তার অনুসারীরা মারণাস্ত্র হাতে উল্লিখিত জীবন মরণ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন ১৯১৫ সালে। তারা ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে একসঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

জন্ম ও বাল্য জীবন :
বাঘা যতীনের জন্ম বাংলাদেশের (অবিভক্ত বঙ্গদেশ) কুষ্টিয়া জেলার কয়া গ্রামে ১৮৮০ সালের ৮ ডিসেম্বর। তার পিতার নাম উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় এবং মায়ের নাম শরৎশশী দেবী। বাল্যকালেই পিতৃহারা হয়েছিলেন বাঘা যতীন। জ্ঞান হওয়ার অবধি মা-ই ছিলেন তার সব। সত্যি বলতে কী, দেশপ্রেমমূলক দুঃসাহসিক কাজ করার শিক্ষা তার মা-ই তাকে দিয়েছিলেন।
কথিত আছে, বাল্যকালেই মা তাকে গড়াই নদীতে ছুড়ে ফেলে দিতেন। তারপর আবার নিজেই সাঁতরে গিয়ে তুলতে আনতেন ছেলেকে। এমনি করে বর্ষার ভরা নদীতে সাঁতার শিখেছিলেন যতীন। নদী সাঁতারে এপার ওপার করতে শিখেছিলেন বাল্যকালেই। মায়ের তত্ত্বাবধানে এভাবেই দেশপ্রেমিক যতীন্দ্রনাথ পরিণত হয়েছিলেন বাঘা যতীন-এ।

শিক্ষা জীবন:
কয়া গ্রামের এক প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হলেও বাঘা যতীনের সত্যিকার শিক্ষাজীবন শুরু হয় কৃষ্ণনগরে মামার বাড়িতে এসে। এখানেই তিনি স্কুলের শিক্ষাজীবন শেষ করেছিলেন। তবে স্কুলের পড়াশোনার চেয়ে খেলাধুলা আর শরীরচর্চাতেই বেশ উৎসাহ ছিল তার। স্কুলে পড়ার সময়ই এক পাগলা ঘোড়াকে জব্দ করে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি।


তার শরীরে মনে গুয়ারতুমি ভাব থাকলেও স্নেহে মায়া মমতার ঘাটতি ছিল না। কারো উপকার করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করতেন। তার পরোপকারের বহু ঘটনা আজো কিংবদন্তির মতো হয়ে আছে। তবে তাকে বাঘা যতীন নামটি কে দিয়েছিলেন, তা অবশ্য জানা যায় না। এ নিয়ে একটি কিংবদন্তি প্রচলিত আছে।
সেবার তিনি নিজের গ্রামে এসেছিলেন। এসেই শুনলেন গ্রামে বাঘ পড়েছে। গ্রামবাসী বাঘটাকে মারার জন্য চেষ্টা করছিল। তাদের সঙ্গে ছিলেন যতীন্দ্রনাথেরই এক জ্ঞাতিভাই। তার হাতে বন্দুক।
খবর শুনে যতীনও ভিড়ে গেলেন বাঘ শিকারিদের দলে। একজনের হাতে শুধু বন্দুক। আর সকলের হাতে লাঠি, বল্লম আর দা। যতীনের হাতে এসবের কিছুই নেই। তার হাতে শুধু একটি পেনসিল কাটার ছুরি। ওটা নিয়েই যতীন বাঘ শিকারীদের দলে শামিল হলেন।


আস্তানা ঘেরাও দিতেই বাঘটি বের হয়ে আসে হুংকার দিয়ে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হলো। কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো সেইগুলি। বাঘটা গেল খেপে। ক্রুদ্ধ বাঘ ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল একলা দাঁড়িয়ে থাকা যতীনেরই ওপর। কিন্তু যতীন ঘাবড়ে যাবার ছেলে নন। তিনি তার হাতের পেনসিল কাটা ছুরি গিয়েই বাঘের সঙ্গে লড়াই করে যেতে লাগলেন। বাঘকে ক্ষত বিক্ষত করতে করতে নিজেও ক্ষত বিক্ষত হলেন। কিন্তু ছাড়লেন না। ছুরির ঘা মেরেই বাঘকে এক সময় পরাস্ত করলেন। সাঙ্গ করে দিলেন তার জীবনলীলা। তিনি অবশ্য এরপর চিকিৎসার জন্য বেশ কয়েকদিন হাসপাতালে ছিলেন। তার এই দুঃসাহসিক অভিযানের পরই তার নামের আগে বাঘা শব্দটি যুক্ত হয়ে যায়। তিনি যতীন থেকে হলেন বাঘা যতীন।


১৮৯৮ সালে তিনি প্রবেশিকা পাস করে কোলকাতার সেন্ট্রাল কলেজে ভর্তি হলেন। কিন্তু কলেজে পড়া তার বেশিদুর অগ্রসর হলো না। তিনি পড়া ছেড়ে দিয়ে স্টেনোগ্রফি শিক্ষা করতে লাগলেন। পরে তিনি বাংলা সরকারের সেক্রেটারী হুইলার সাহেবের স্টেনোগ্রাফার হন। এইভাবে শুরু হয় তার কর্মজীবন।
১৯০৫ সালে দেশব্যাপী শুরু হয়ে যায় বঙ্গভঙ্গরোধকারী আন্দোলন। এই আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিলেন যতীন্দ্র নাথ নিজেও। তিনি অনুশীলন সমিতির সদস্য হলেন। এভাবেই বৈপ্লবিক আন্দোলনের সংস্পর্শে আসেন তিনি। শুরু হয় তার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম।


আলিপুর বোমা মামলার তদন্তকারী অফিসার ছিলন মৌলভী শামসুল আলম। ১৯১০ সালে এই সিআইডি অফিসারকে হত্যা করলেন বীরেন্দ্র দত্ত গুপ্ত নামে এক যুবক। পরে বীরেন্দ্র ধরা পড়ে। তার স্বীকারোক্তি থেকেই পুলিশ জানতে পারেন, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য নায়ক আসলে যতীন্দ্রনাথ। অনেকের সঙ্গে পুলিশ তাকেও গ্রেফতার করে। কিন্তু তার কাছ থেকে কোন রকম স্বীকারোক্তি আদায় করতে না পারায় তাকে চালান দেওয়া হয় আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে। এই ঘটনাকে ঘিরে যে মামলার শুরু হয়, তা হাওড়া ষড়যন্ত্র মামলা নামে খ্যাত।
বাঘা যতীন এক বছর জেলে ছিলেন। পরে প্রধান বিচারপতি জেঙ্কিন্সের বিচারে তিনি খালাস পেয়ে যান। কিন্তু খালাস পেলেও সেদিন থেকে সরকারি সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তালিকায় যতীন্দ্রনাথের নাম উঠে যায়। ফলে হুইলার সাহেবের চাকরি থেকে বরখাস্ত হন। পরে তিনি জেলা বোর্ডের কন্ট্রাকটরির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু সেখানেও স্বস্তিতে থাকতে পারলেন না। সর্বক্ষণ পুলিশের টিকটিকি তার পেছনে লেগে থাকত। সর্বক্ষণ তার ওপর নজরদারি করা হতো। ব্যাপারটা তার কাছে শেষে একেবারে অসহ্য হয়ে দাড়াল। যতই তার বিরক্তি বাড়তে লাগল, ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদে বিরুদ্ধে তার মনও ততই বিতৃষ্ণায় ভরে উঠতে লাগল। শেষত এই ঘৃণা রূপ পরিগ্রহ করে বিদ্রোহে।


একবার ফোর্ট উইলিয়ামের কাছে গোড়াবাজারে অন্যায় কাজের জন্য এক গোরা সৈনিককে ধরে বেধড়ক পিটুনি দেন তিনি। আর একবার দার্জিলিং যাওয়ার পথে এক রেলষ্টেশনে কয়েকজন ইংরেজ সৈনিকের সঙ্গে তার খুব মারামারি হয়। অসম্ভব দৈহিক শক্তির অধিকারী ছিলেন বাঘা যতীন। কয়েকজন সৈনিককে একাই পিটিয়ে নাস্তানাবুদ করে ছাড়েন।
নিজের ব্যবসা দেখার পাশাপাশি তিনি গুপ্ত সমিতিরও কাজ করে যেতে থাকেন। অনুশীলন ও যুগান্তর প্রভৃতি গুপ্ত সমিতির হয়েই তিনি চালাতেন তর সমস্ত তৎপরতা।
আলীপুর বোমা মামলায় অনেক বিপ্লবীর জেল হয়ে যায়। ফলে দলের এই দুঃসময়ে বাঘা যতীনই সব কিছুর নেতৃত্বে দিতেন থাকেন। ক্রমে তার মনে এই বোধ দৃঢ় হয়ে ওঠে যে, ইংরেজদেরকে মাতৃভূমি ভারত থেকে উৎখাত করতে হলে তাদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ও বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান গড়ে তোলা প্রয়োজন। তাই তিনি সবগুলো গুপ্ত সমিতিকে একত্রিত করার চেষ্টা করতে লাগলেন। তার আরো মনে হয়, এই কাজে তারা ইংরেজ বিরোধী রাষ্ট্রগুলোরও সহযোগিতা পেতে পারেন। এতদিন বিপ্লবী আন্দোলনগুলো যে সংকীর্ণ খঅতে ধরে চলছিল, যতীন্দ্রনাথই তাকে আন্তর্জাতিকমুখী করে গড়ে তোলার প্রয়াস পান। তিনি নিজেই বৈদেশিক সাহায্য পাওয়ার জন্য চেষ্টা চালাতে লাগলেন।
এই সময় বঙ্গলক্ষ¥ী কটন মিলসে কাজ করতেন অবনী মুখার্জি নামের এক বিপ্লবী। যতীন্দ্রনাথ তাকেই এবার কাছে টানলেন। তিনি তাকে জাপানে পাঠানোর প্রস্তাব দিলেন।
তখন জাপান ছিল ব্রিটিশ বিরোধী দেশগুলোর অন্যতম। তাই যতীন্দ্রনাথের ধারনা হয়েছিল ইংরেজ বিরোধী তৎপরতায় হয়ত তাদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়া যেতে পারে।
যতীন্দ্রনাথের পরামর্শে অবনী মুখার্জি ১৯১০ সালে জাপান রওনা হন। কিন্তু তিনি লক্ষ্য অর্জনে তেমন সুবিধা করতে পারলেন না। ফলে তাকে নিরাশ হয়ে ফিরে আসতে হলো।
তারপর ১৯১৪ সালে শুরু হলো প্রথম মহাযুদ্ধ। জার্মানির সঙ্গে ইংরেজদের যুদ্ধ বেধে যায়। ইতিমধ্যে জার্মানিতে ভারতীয় ছাত্রদের উদ্যোগে স্বাধীনতা আন্দোলন চালানোর উদ্দেশ্যে গঠিত হয় একটি সমিতি। এই সমিতির নাম ছিল বার্লিন কমিটি। এদের সঙ্গে যোগাযোগ করে যতীন্দ্রনাথ আবার ১৯১৫ সালে জাপানে পাঠান অবনী মুখার্জিকে। এভাবেই ক্রমাগত চেস্টা চালিয়ে চীনের নেতা সানাইয়াৎ সেনের কাছ থেকে পাওয়া যায় ৫০টি পিস্তল, ৪৬ হাজার গুলি এবং চল্লিশ হাজার নগদ টাকা। দেশের নানা বিপ্লবী সংগঠনে মধ্যে এই অস্ত্র ও টাকা বন্টন করে দেওয়া হয়।
ইতিমধ্যে বিপ্লবী নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ওরফে মানবেন্দ্রনাথ রায় ও জিতেন্দ্রনাথ লাহিড়ীর মধ্যে যোগাযোগের ফলে জার্মান সরকার বিপ্লবীদের জন্য পাঠান এক জাহাজ অস্ত্রশস্ত্র এবং কিছু নগদ অর্থ। স্থির হয়েছিল এই অস্ত্র নামিয়ে দেওয়া হবে হাতিয়া, সন্দ্বীপ, বলাকা ও বালেশ্বর- এই তিন জায়গায়। কিন্তু অস্ত্র ভর্তি এই জাহাজ আর এসে পৌছতে পারেনি। ১৯১৫ সালের জুন মাসে ওয়াশিংটনে খানাতল্লাশির ফলে সব অস্ত্রশস্ত্র আমেরিকা সরকার বাজেয়াপ্ত করে ফেলে। এরপর জার্মানি আরো তিন হাজার অস্ত্রশস্ত্র পাঠানোর চেষ্টা করেছিল।
এবার ঠিক করা হয়, অস্ত্রবোঝাই জাহাজ তিনটির মধ্যে একটি বালেশ্বর, অপর দুটি গোয়া ও রায়মঙ্গলে ভিড়বে। বালেশ্বরে যে জাহাজ এসেছিল তাতে ছিল ২০০ পিস্তল, প্রচুর কার্তুজ, হাতবোমা, বিস্ফোরক ও দু লাখ টাকা। অন্য দুটো জাহাজেও একই ধরনের অস্ত্রশস্ত্র আসছিল।
দুর্ভাগ্য যে ব্রিটিশ রণতরী প্রথম জাহাজটিকে আন্দামানের কাছে ১৯১৫ সালের ১৭ নভেম্বর ডুবিয়ে দেয়। এই সংবাদ পেয়ে অন্য দুটো জাহাজ পথ ঘুরে মেক্সিকো উপসাগরের দিকে চলে যায়। বিপ্লবীরা সেখানে তারা অস্ত্রশস্ত্রগুলো স্থানীয় জলদস্যুদের কাছে বিক্রি করে ফেলে। যে ব্যক্তির বিশ্বাসঘাতকতার ফলে এই মহৎ প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল সেই নরপশুর নাম ছিল কুমুদুনাথ মুখার্জি। এই লোকটিই বিপ্লবীদের সমস্ত পরিকল্পনার কথা ইংরেজদের কাছে ফাস করে দিয়েছিল।
পুলিশের দৃষ্টি এড়াবার জন্য চারজন সঙ্গী নিয়ে বালেশ্বর এসে পৌছেন বাঘা যতীন। তার সঙ্গী চারজনর মধ্যে ছিলেন চিত্তপ্রিয়, মনোরঞ্জন, নীরেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিষচন্দ্র। বালেশ্বর এস জার্মানদের জাহাজের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন তারা। সকলেই পথশ্রমে তখন ক্লান্ত, ক্ষুধার জ্বালায় অস্থির।
কাজেই একটি খাবারের দোকান ছিল। সঙ্গীদের নিয়ে সেখানেই খেতে বসেন বাঘা যতীন। এদিকে এরা যে বিপ্লবী এই খবর দোকানি পাচার করে দিয়েছিল স্থানীয় পুলিশ ক্যাম্পে। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ কমিশনার টেগার্ট কয়েকজন পুলিশ নিয়ে ছুটে যান সেই দোকানে দিকে। ওদিকে বাঘা যতীনও তাদের বিপদ সম্পর্কে স্পর্ষ্ট আঁচ করতে পারেন। কিন্তু তারা পালাবার চেষ্টা না করে মরণপণ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ন। ঘটনাটি ১৯১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের।
পুলিশ সেই সঙ্গে সঙ্গে গুলি চালায়। শুরু হয় উভয়পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময়। বিপ্লবীরাও ছিলেন সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তারা একটি মার্টির গর্তকে পরিখা হিসেবে ব্যবহার করতে লাগলেন। বিপ্লবীদের অবিশ্রান্ত গুলিবর্ষরেণ পুলিশ বাহিনী দাড়াতে পারল না। ফলে পিছু হটতে বাধ্য হলো। এটাই বালেশ্বরের যুদ্ধ (Balasore Trench) নামে খ্যাত।
পুলিশের পিছু হটে যাওয়ার সুযোগে বিপ্লবীরা গ্রাম ছাড়িয়ে নদী পার হন। কিন্তু তারা জানতেন না ভিখিরির ছদ্মবেশে এক দারোগা তাদের অনুসরণ করছিল। নদী পার হয়ে ওপারে একটি ফাকা মাঠের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে বিপ্লবীরা একটি বড় উইঢিবির পাশে আশ্রয় নেন। এদিকে পুলিশ খবর পেয়ে সেখানেই এসে বিপ্লবীদের ঘিরে ফেলে। পুলিশের সংখ্যা ছিল তিনশ। এদের পরিচালনায় ছিলেন বালেশ্বরের জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট কিলবি, মিলিটারি লেফটেন্যান্ট ব্রাদারফোর্ড এবং পুলিশ কমিশনার টেগার্ট।
চিন্তামণি সাহু নামের এই ছদ্মবেশী দারোগাই হাতের ইশারায় দেখিয়ে দেন উইঢিবিটি। সঙ্গে সঙ্গে সেটা লক্ষ্য করে গুলিবর্ষন করতে শুরু করে পুলিশের সদস্যরা। অনেকক্ষণ ধরে গুলিবর্ষন চালানো হলেও বিপ্লবীদের পক্ষে থেকে কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। তাতে করে পুলিশের ধারণা হল বিপ্লবীদের কাছে হয়তো দুর পাল্লার কোন অস্ত্র নেই। কিন্তু ব্যাপারটা তা ছিল না। বাঘা যতীন অপেক্ষা করছিলেন সুযোগের। তার হাতে ছিল পিস্তল। সেটা প্রায় রাইফেলের মতো কাজ করে।
পুলিশ কাছাকাছি চলে আসতেই বাঘা যতীন তার সঙ্গীদের ফায়ার বলে আদেশ দিলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে এক সাথে গর্জে ওঠে পাচটি পিস্তল। অমনি লেফটেন্যান্ট ব্রাদারফোর্ডের বাহিনীর অনেক হতাহত হলো এবং তারা কাদায় গড়াগড়ি দিতে লাগল। মাত্র পাঁচ জন পিস্তলধারী বিপ্লবীর হতেই সেদিন রাইফেলধারী তিনশ পুলিশ সদস্যের প্রত্যেককেই একের পর এক মরতে হয়।
বিপ্লবীদের মধ্যে প্রথমে মাথায় গুলি লাগে চিত্তপ্রিয়র। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে শোকের বা ভাবাবেগের অবকাশ নেই। সহযোদ্ধার মৃতুদেহ পাশে নিয়েই বাকি চারজন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে লাগলেন। প্রায় তিনঘন্টা ধরে চলে এই অসম যুদ্ধ। এদিকে জ্যোতিষও তখন মারাÍকভাবে আহত। বাঘা যতীনের পেটে একটি এবং চোয়ালে একটি গুলি লেগেছে। তাদের পিস্তলের গুলিও তখন শেষ। এই রকম প্রচন্ড আহত অবস্থাতেই বাঘা যতীন পুলিশদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগলেন – The entire responsibility is mine. These boys are innocent. They have simply carried out my orders. Please see that no injustice is done to them under the British Raj.

এভাবেই যতীন্দ্রনাথ সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, যাতে করে তারা সহযোদ্ধাদের ফাঁসির হাত থেকে বাচানো যায়।
মুমুর্ষু যতীন্দ্রনাথকে বালেশ্বর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহত হওয়ার একদিন পর অর্থাৎ ১৯১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তিনি হাসপাতালে পরলোকগমন করেন। পরে বিচারে মনোরঞ্জন ও নীরেনের ফাঁসি হয় এবং জ্যোতিষের হয় যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর। যতীন্দ্রনাথ মৃত্যুর পর পুলিশ কমিশনার টেগার্ট নিজেই স্বীকার করেছেন এবং বিপ্লবী বাঘা যতীনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছিলেন

I have met the bravest Indian. I have the greatest regard for him but I had to do my duty.