বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অনন্য উদাহরণ

597
Social Share

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)  :

দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের সম্পর্ক কত গভীর হতে পারে তার প্রতিফলন গত ২৬ জানুয়ারি দিল্লির রাজপথে দেখা গেছে। ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের সামরিক কুচকাওয়াজে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর একটি দল সর্বাগ্রে। বিশ্বে বিরল ও অনন্য অসাধারণ ঘটনা। মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি ভারত যে সম্মান ও শ্রদ্ধা দেখাল, তা দুই দেশের সম্পর্কের রাস্তায় ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এর জন্য ভারতের জনগণ, সরকার, সশস্ত্র বাহিনী এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাই। অভিনন্দন জানাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে, যাঁর নেতৃত্বগুণে বাংলাদেশ আজ এমন অসাধারণ বিরল সম্মান পেল। কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, সব রাজনৈতিক দলের নেতা, দেশি-বিদেশি অতিথি ও হাজার হাজার ভারতীয় সাধারণ মানুষ প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করে কুচকাওয়াজ দেখেছে, উপভোগ করেছে। ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর সব শাখা, আধাসামরিক বাহিনীসহ অন্য সব বাহিনীর নির্ধারিত দলের সবচেয়ে সামনে, অর্থাৎ প্রথম দল হিসেবে মার্চ করেছে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর দল। তাই সংগত কারণেই ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজ অন্য বছরের তুলনায় এবার ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। দর্শকসাধারণের কাছে অতিরিক্ত আকর্ষণ ছিল বাংলাদেশ দল। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, সশস্ত্র বাহিনী, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর পতাকা সামনে নিয়ে দৃপ্ত পদক্ষেপে যখন বাংলাদেশ দল মার্চ করে যাচ্ছিল তখন দর্শক সারিতে বসা হাজার হাজার ভারতীয় জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুহুর্মুহু স্লোগান দিয়েছে ‘জয় বাংলা, জয় হিন্দ’। কুচকাওয়াজের ধারা বর্ণনায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতাসহ শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও সম্মিলিত বিজয়ের কথা এসেছে ধারা বর্ণনায়। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতের সেনা সদস্য, যাঁরা বাংলাদেশের মাটিতে জীবন দিয়েছেন তাঁদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধক্ষেত্রে যৌথ বাহিনী গঠন, একসঙ্গে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান ও বিজয়ের মধ্য দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রটি রচিত হয়। মাত্র তিন মাসের মাথায় বাহাত্তরের মার্চ মাসে কুচকাওয়াজের মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সালাম জানিয়ে ভারতীয় মিত্র বাহিনী বাংলাদেশ থেকে ফেরত চলে যায়।

বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী স্বাক্ষর করেন ২৫ বছর মেয়াদি অসাধারণ মৈত্রী চুক্তি। সেই চুক্তির মধ্যে দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো উল্লেখ ছিল। চুক্তির মোট ১২টি অনুচ্ছেদের মধ্যে ৮ ও ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়, দুই দেশের কোনো একটি দেশ যদি অন্য দেশ কর্তৃক আক্রান্ত হয়, তাহলে উভয় দেশ একত্র হয়ে সেই আগ্রাসন মোকাবেল করবে। সদ্যঃস্বাধীন দেশ, সব কিছু বিধ্বস্ত, সশস্ত্র বাহিনী অসংগঠিত, এ অবস্থায় বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত করার জন্য চুক্তির ওই ধারাগুলো তখন একান্ত অপরিহার্য ছিল। একই রকম ধারাসংবলিত আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট। ভারত-সোভিয়েত চুক্তির ফলেই পাকিস্তানকে সব রকম আশ্বাস দিয়েও একাত্তরের ডিসেম্বরে চীন সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো থেকে পিছু হটে যায়। তারপর ভারত-বাংলাদেশ চুক্তির ফলে ভারত-সোভিয়েত-বাংলাদেশ মিলে যে অবস্থানের সৃষ্টি হয় তার কারণেই আমেরিকার সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগর থেকে ফেরত চলে যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার শুরু থেকেই একাত্তর এবং তার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় দর্শন ও আদর্শের অভিন্নতা দুই দেশের সম্পর্কের মৌলিক অবলম্বন হিসেবে কাজ করেছে। ৫০ বছরের লিগ্যাসি সাক্ষ্য দেয়, যখনই এর ব্যত্যয় ঘটেছে তখনই সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। বিগত ৫০ বছর দুই দেশের সম্পর্ক যদি একাত্তরের পর্যায়ে থাকত তাহলে শুধু ভারত-বাংলাদেশ নয়, পুরো উপমহাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার চিত্রটি আজ ভিন্ন হতো এবং তাহলে আঞ্চলিক সহযোগিতার উদাহরণ হতে পারত দক্ষিণ এশিয়া।

কিন্তু ১৯৭৫ সালে সব উল্টে গেল। বঙ্গবন্ধু যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর ইন্দিরা গান্ধীও নিহত হতেন না। আমার এই কথার পক্ষে ছোট করে একটা বিশ্লেষণ তুলে ধরি। এটা এখন সবাই জানেন, একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু ও ইন্দিরা গান্ধী, দুই মহান নেতার হত্যার পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে আবার বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীসমূহকে সব রকম সহযোগিতা ও সমর্থন দেওয়ার সুযোগ পায় পাকিস্তান। তাতে এক ঢিলে দুই পাখি শিকারের মতো বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে চরম প্রতিশোধ নেওয়া এবং ভারতকে শায়েস্তা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানি একজন পণ্ডিত ব্যক্তি হুসেন হাক্কানী তাঁর লিখিত ‘পাকিস্তান বিটুইন মস্ক অ্যান্ড মিলিটারি’ গ্রন্থের ৯৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘জুলফিকার আলী ভুট্টো আমেরিকার কাছে এই মর্মে অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেন, বাংলাদেশ সৃষ্টিতে সহায়তা করে ইন্দিরা গান্ধী যে উদাহরণ সৃষ্টি করলেন তার পরিণতি ভারতকেও ভোগ করতে হবে।’ ১৯৭১ সালের শেষের দিকেই পূর্ব-পাঞ্জাবে স্বাধীন খালিস্তান প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয়। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পূর্ণ শান্তি ফিরে আসায় ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ও সশস্ত্র বাহিনী পূর্ণমাত্রায় পশ্চিম ফ্রন্টে মনোনিবেশ করতে পারায় খালিস্তান আন্দোলন নিস্তেজ হয়ে পড়ে। সমগ্র উপমহাদেশে শান্তির পূর্বাভাস দেখা যায়। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সশস্ত্র বিদ্রোহ আবার চাঙ্গা হয় এবং একই সঙ্গে খালিস্তান সশস্ত্র আন্দোলন পুনরুজ্জীবন লাভ করে, কাশ্মীর উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পূর্ব-পশ্চিম দুই ফ্রন্টে আমেরিকার নীরব সমর্থনে পাকিস্তানের গোপন সশস্ত্র তৎকারতা এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চরম অস্থিরতায় ইন্দিরা গান্ধী বড়ই একা হয়ে পড়েন। এই সুযোগটিই নেয় পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা।

১৯৮৪ সালের মে মাসে শিখ সম্প্রদায়ের পবিত্র স্থান পাঞ্জাবের স্বর্ণমন্দির দখল করে নেয় খালিস্তান সশস্ত্রগোষ্ঠী। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র-এর সাবেক উপপ্রধান বি. রমণ তাঁর লিখিত ‘দ্য কাউবয়েজ অব র’ গ্রন্থের ৯৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘খালিস্তান সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সমর্থনে পাকিস্তান যে গোপন অপারেশন চালায় তার সাংকেতিক নাম ছিল ক-ক K-K (Khalistan-Kashmir)।’ উদ্দেশ্য ছিল, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তো চাপ রয়েছেই, তার সঙ্গে পূর্ব পাঞ্জাবের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টির ফলে কাশ্মীরে ভারতের সেনাবাহিনীর অবস্থান দুর্বল হবে এবং সেই সুযোগে অকস্মাৎ সামরিক অভিযান চালিয়ে কাশ্মীরকে পাকিস্তানের সঙ্গে সংযুক্ত করা যাবে। ব্যাকলাশের অভিঘাত সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও অন্য কোনো বিকল্প কাজ না করায় সব ঝুঁকি নিয়েই স্বর্ণমন্দিরে সামরিক অপারেশনের নির্দেশ দেন ইন্দিরা গান্ধী। অপারেশনের সাংকেতিক নাম দেওয়া হয় অপারেশন ব্লু স্টার। ১৯৮৪ সালের জুন মাসের ৩ থেকে ৬ তারিখের মধ্যে সেনাবাহিনী স্বর্ণমন্দির মুক্ত করে। কিন্তু এই ঘটনার জেরেই ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর নিজ বাসভবনে বহুদিনের বিশ্বস্ত শিখ সম্প্রদায়ের এক গার্ডের গুলিতে ইন্দিরা গান্ধী নিহত হন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড থেকে ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত সব ঘটনার পরম্পরা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধু নিহত না হলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল অস্থির হয়ে উঠত না এবং তাতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা, সেনাবাহিনী পাঞ্জাব ও কাশ্মীরে পূর্ণ শক্তিতে মনোনিবেশ করতে পারলে খালিস্তান সশস্ত্র বিদ্রোহ ওই পর্যায়ে যেতে পারত না। তাহলে হয়তো ইন্দিরা গান্ধী নিহত হতেন না। অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক তার ধ্রুপদি জায়গা অর্থাৎ একাত্তর-বাহাত্তরের পর্যায়ে ফিরে এসেছে। বঙ্গবন্ধুর নির্মিত রাস্তায় এখন বাংলাদেশ চলছে। বঙ্গবন্ধুর জায়গায় রয়েছেন তাঁরই মেয়ে শেখ হাসিনা। আজকে বাহাত্তর-তিয়াত্তরের মতো একটা চিত্র তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেঁচে থাকা না থাকার ওপর নির্ভর করছে আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়া কোন দিকে যাবে। সুতরাং ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর অংশগ্রহণ শুধু প্রতীকী নয়, এর সুদূরপ্রসারী তাৎকার্য রয়েছে। সম্পর্কের এই অনন্য অসাধারণ উদাহরণের পথ ধরে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে যেমন সহযোগিতার ক্ষেত্র আরো প্রসারিত হবে, তেমনি আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণেও এর প্রভাব পড়বে। বস্তুতই এটা ঐতিহাসিক ঘটনা।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক