বাংলাদেশ – ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কেও সুবর্ণজয়ন্তী

75
Social Share

এই মার্চ মাসেই ভারত বঙ্গবন্ধুকে ‘গান্ধী শান্তি পুরস্কার’ দিয়েছে। কারণ বঙ্গবন্ধু দুই দেশের সম্পর্ক ও জোরালো অংশীদারের ভিত্তি গড়েছিলেন। ২০২০ সালের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করতে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, মানবাধিকার ও স্বাধীনতার কাণ্ডারি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ভারতীয়দের কাছেও তিনি নায়ক। বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকার ও অনুপ্রেরণা দুই দেশের ঐতিহ্যকেও ঋদ্ধ করেছে। তার দেখানো পথেই দুই দেশের বন্ধুত্ব, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে।’

নয়াদিল্লিতে গত ২৪ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেছেন, ‘সম্ভাব্য চুক্তি ও সমঝোতাগুলোও গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সফরের মূল বিষয় হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর এবং মুজিববর্ষ। তিনি বলেছেন, ১৯৭১ সালে ভারতীয়রাও বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়েছে। একটি দেশ স্বাধীন করতে প্রতিবেশী দুই দেশের একসঙ্গে হয়ে রক্তদান ও আত্মত্যাগ বিরল।’

মোদির সফরের গুরুত্ব তুলে ধরে শ্রিংলা আরও বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ আলাদা রাষ্ট্র ঘোষণা করেছিলেন। এই দিনটি উদযাপন অনুষ্ঠানে আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। গত ডিসেম্বর মাসেও শেখ হাসিনা-নরেন্দ্র মোদি ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলন করেছিলেন। সেখানেও সমঝোতা হয়েছিল। এবারও হবে। কিন্তু এবারের সফরের যে বিশেষ তাৎপর্য, তা থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না।’

প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ককে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু বার বার বলে গেছেন ভারতের কথা। কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি। যেমন- ‘‘আমি ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী এবং ভারত, সোভিয়েট ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও আমেরিকার জনসাধারণের প্রতি আমাদের এই মুক্তি সংগ্রামে সমর্থনদানের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। বর্বর পাকিস্তানি সৈন্যদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আমার দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ ঘর বাড়ি ছেড়ে মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। ভারত সরকার ও তার জনসাধারণ নিজেদের অনেক অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও এই ছিন্নমূল মানুষদের দীর্ঘ নয় মাস ধরে আশ্রয় দিয়েছে, খাদ্য দিয়েছে। এজন্য আমি ভারত সরকার ও ভারতের জনসাধারণকে আমার দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের পক্ষ থেকে আমার অন্তরের অন্তস্থল হতে ধন্যবাদ জানাই।’’ (১০/১/১৯৭২)

এরপর ১৯৭২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু একইভাবে বলেন-

‘‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চিরদিন অটুট থাকবে। বিশ্বের কোনো শক্তিই পারবে না এই মৈত্রীতে ফাটল ধরাতে। ভারত-বাংলাদেশ ভূখণ্ডে আর সাম্রাজ্যবাদের কোনো খেলা চলতে দেওয়া হবে না।’’

এই মার্চ মাসেই ভারত বঙ্গবন্ধুকে ‘গান্ধী শান্তি পুরস্কার’ দিয়েছে। কারণ বঙ্গবন্ধু দুই দেশের সম্পর্ক ও জোরালো অংশীদারের ভিত্তি গড়েছিলেন। ২০২০ সালের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করতে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, মানবাধিকার ও স্বাধীনতার কাণ্ডারি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ভারতীয়দের কাছেও তিনি নায়ক। বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকার ও অনুপ্রেরণা দুই দেশের ঐতিহ্যকেও ঋদ্ধ করেছে। তার দেখানো পথেই দুই দেশের বন্ধুত্ব, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে।’

প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধু অনুসৃত কূটনৈতিক সম্পর্কের পথেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাঁটছেন। তার আমন্ত্রণেই মোদি ঢাকা সফরে পৌঁছাবেন ২৬ মার্চ। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এগিয়ে নিতে দুই দেশেরই জোরালো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সময়ে এ সম্পর্ক সত্যিকার অর্থেই ‘সোনালি অধ্যায়ে’ পরিণত হয়েছে।

১৭ মার্চ (২০২১) জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০১তম জন্মবার্ষিকীতে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলায় টুইট করে লিখেছেন-

“মানবাধিকার ও স্বাধীনতার রক্ষক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকীতে তার প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা। সকল ভারতীয় নাগরিকের কাছেও তিনি একজন বীর হিসেবে গণ্য হন।”

অপরদিকে ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে দশ দিনের অনুষ্ঠানমালার পাঁচ দিনের আয়োজনে যোগ দিয়েছেন প্রতিবেশী পাঁচ দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান; যার মধ্যে নরেন্দ্র মোদিও আছেন। এই সফর নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে মোদি টুইটে লিখেছেন-

“এই মাসের শেষের দিকে ঐতিহাসিক মুজিববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বাংলাদেশ সফর করতে পারা আমার জন্য সম্মানের বিষয়।”

নরেন্দ্র মোদি দুই দিনের সফরে ঢাকায় আসছেন আগামীকাল ২৬ মার্চ । তার ঢাকা সফরের মধ্যে দিয়ে প্রতিবেশী দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার হবে বলে আশা করছেন বিশিষ্টজনরা। সফরের অংশ হিসেবে ২৭ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। বৈঠকে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা করবেন দুই সরকারপ্রধান। আলোচনা হবে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সব ইস্যু নিয়ে। বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে স্বাক্ষর হবে ৩টি সমঝোতা স্মারক। এসময় যৌথভাবে কয়েকটি প্রকল্পের উদ্বোধনের ঘোষণাও দিতে পারেন দুই দেশের সরকারপ্রধান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য প্রদান করবেন। সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথভাবে বঙ্গবন্ধু-বাপু ডিজিটাল প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হবে।

২৭ মার্চ সকালে তিনি টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ পরিদর্শন করে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। তাছাড়া তিনি সাতক্ষীরা ও গোপালগঞ্জে দুটি মন্দির পরিদর্শন করে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কথা বলবেন। বিকেলে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে একান্ত বৈঠক ছাড়াও ভারতের প্রধানমন্ত্রী একইসঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বের ৫০ বছর উপলক্ষে পৃথক দুটি স্মারক ডাকটিকেট উন্মোচন করবেন।এই সফরকে সামনে রেখে গত ৯ মার্চ (২০২১) সীমান্তবর্তী ফেনী নদীর ওপর একটি সেতুর উদ্বোধন করা হয়েছে। সেতুটি সরাসরি যুক্ত করেছে বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর পূর্বের রাজ্যগুলোকে। এখন ভারতের এই রাজ্যগুলো সেতু দিয়ে সহজে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে পণ্য আনা নেয়া করতে পারবে। পাঁচ বছর আগেই ভারতের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার বা ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্টের সুবিধা কার্যকর হয়েছে। মূলত স্থল সীমান্ত-বাণিজ্যে সমস্যা কমানো গেছে, কানেক্টিভিটি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নতুন জিনিস যোগ হয়েছে। এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, দু’দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে।

অপরদিকে ২০২০ ও ২০২১ সাল মহামারির জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, তবে এর মাঝেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভালো সহযোগিতামূলক লেনদেন গড়ে উঠেছে। ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা আছে। নানা ক্ষেত্রে দুই দেশের অংশীদারত্ব এগিয়ে যাচ্ছে। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ করোনা মোকাবিলায় চীনের আগে এদেশে এসেছে ভারতের জরুরি চিকিৎসা সহায়তা সরঞ্জাম। ৩০ হাজার সার্জিক্যাল মাস্ক এবং ১৫ হাজার হেড কভার ছিল আমাদের জন্য মূল্যবান। এই উপহার ছিল করোনাভাইরাস বিস্তাররোধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ। ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির অংশ হিসেবে এবং কোভিড ১৯-এর বিস্তাররোধ করার জন্য একটি সমন্বিত আঞ্চলিক উদ্যোগ নিতে ১৫ মার্চ ২০২০ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং অন্যান্য সার্ক নেতৃবৃন্দ একটি ভিডিও সম্মেলন করেন। এই অঞ্চলের প্রতি ভারতের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এটি। এই উপহারের মতো ভ্যাকসিনও উপহার পেয়েছি আমরা। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার আবিষ্কৃত কোভিশিল্ড নামের টিকা তৈরি করেছে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট। সেই কোভিশিল্ড নামের ভ্যাকসিন ২১ জানুয়ারি (২০২১) ভারতের উপহার হিসেবে ঢাকায় এসে পৌঁছায়।

আগেই ভারত জানিয়েছিল, কুড়ি লাখ ডোজ টিকা বিনামূল্যে বাংলাদেশকে উপহার দেবে তারা। এই উপহার দু’দেশের একসঙ্গে সংকট মোকাবিলার অনন্য নজির। উপরন্তু ২৬ মার্চ মোদির এদেশ সফরে বাংলাদেশকে ১০৯টি অ্যাম্বুলেন্স উপহার দেবে ভারত। ২৪ মার্চ অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছে গেছে এদেশে। হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেছেন, এ যাবত ভারতের তৈরি করোনার টিকা সবচেয়ে বেশি পেয়েছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, বাংলাদেশের করোনা টিকার চাহিদা মেটাতে ভারত যথাসাধ্য চেষ্টা করবে।

দিল্লিতে শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির সরাসরি সাক্ষাৎ হয় ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে। তারপর করোনা মহামারিতে ভার্চুয়ালি একাধিক বৈঠক হয়েছে। আসলে ভারতের সঙ্গে এদেশের সংযোগ সবসময় অটুট রয়েছে। আর এজন্য তিস্তা চুক্তির বিষয়ে ভারত সরকার আন্তরিক এবং এ বিষয়ে কাজ অনেকটা এগিয়ে আছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার মতে, ‘শুধু তিস্তা চুক্তি নয়, বাকি যে আমাদের ৬টি অভিন্ন নদীর পানি নিয়েও আমরা আলোচনা করি।’

আমাদের পররাষ্ট্রনীতির পাঁচ লক্ষ্যের অন্যতম হলো- ‘ভারত ও নিকট প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্বের সকল দেশের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখা।’ এই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে চলেছে শেখ হাসিনা সরকার।

২০১১ সালে বাংলাদেশ ও ভারত স্থলসীমানা চুক্তি ১৯৭৪-এর প্রটোকল স্বাক্ষর এবং ২০১৫ সালে স্থলসীমানা চুক্তির অনুসমর্থন শেখ হাসিনার সুদীর্ঘ প্রচেষ্টারই সুফল। ইন্সট্রুমেন্ট অব রেটিফিকেশন এবং লেটার অব মোডলিটিস স্বাক্ষরের মাধ্যম তৎকালীন ১১১টি ভারতের ছিটমহল বাংলাদেশের এবং আমাদের ৫১টি ছিটমহল ভারতের অংশ হয়ে যায়। ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে এর আগে নাগরিকত্বহীন ৫০ হাজারের বেশি মানুষ তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নাগরিকত্ব লাভ করে। এই মাইলস্টোন ঘটনাটি ঘটে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমলে। তিনি ২০১৫ সালের ৬-৭ জুন বাংলাদেশ সফর করেন। এ সফরে সর্বমোট ২২টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর হয়। শেখ হাসিনা সরকারের সফল কূটনৈতিক তৎপরতায় ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত স্থলসীমানা ও সমুদ্রসীমা শান্তিপূর্ণভাবে নির্ধারিত হয়েছে। তবে মনে রাখা দরকার, ২০১১ সলের ৬-৭ সেপ্টেম্বর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফর করেন। ওই সফরের ঐতিহাসিক সাফল্য হচ্ছে, এর সুবাদেই ১৯৭৪ সালের ঐতিহাসিক স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন ঘটে যার ফলে ভারতে কংগ্রেসের উভয়পক্ষ অর্থাৎ লোকসভা ও রাজ্যসভায় চুক্তির রেটিফিকেশন সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এ সাফল্যের কারণেই দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত স্থলসীমানা নির্ধারণ ও ছিটমহল-বিনিময় শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়। অবশ্য নরেন্দ্র মোদির আমলে ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশের সুযোগের কারণে (সাফটা নেগেটিভ লিস্ট-এর ২৫ ধরনের আইটেম ব্যতীত) ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে গতিশীলতা এসেছে। দু’দেশের মধ্যে বিদ্যমান বিশাল বাণিজ্যঘাটতি নিরসনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছেন। সেসময় ভারতের প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়টির উল্লেখ করে বাণিজ্যঘাটতি নিরসনে যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেন।

বাংলাদেশের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ফুলবাড়িতে (বাংলাবান্ধার বিপরীতে) ইমিগ্রেশন সুবিধা চালু করা হয়। স্থল শুল্ক স্টেশন বা স্থল বন্দর এবং অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্যিক অবকাঠামো উন্নয়নে দু’দেশ ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নয়নে এসব পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে গত কয়েক বছরে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তি, অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল রুট সম্পর্কিত প্রটোকল, ঢাকা-গৌহাটি-শিলং এবং কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা বাস সার্ভিস, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার সম্পর্কিত সমঝোতা স্মারকসহ বিভিন্ন চুক্তি দেশ দু’টির আন্তঃযোগাযোগ সম্প্রসারণে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে। মৈত্রী এক্সপ্রেসের ঢাকা ও কলকাতায় প্রান্তীয় কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। খুলনা-কলকাতা ট্রেন সার্ভিস চলছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ও ভারত দু’দেশের মানুষেরই ভিসাপ্রাপ্তি সহজীকরণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

এখন রেল, বিমান ও বাসযাত্রার তারিখ উল্লিখিত টিকিট দিয়ে কোনো ধরনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই ভিসার জন্য আবেদন করা যায়। উপরন্তু হাইকমিশনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই ভারতের হাসপাতাল ও ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে সরাসরি মেডিক্যাল ভিসার জন্য আবেদন করা যাচ্ছে। ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ৫ বছরের মাল্টিপল ভিসা ইস্যুর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। জনযোগাযোগ তথা কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ভারত বাংলাদেশের খুলনা ও সিলেট এবং বাংলাদেশ ভারতের মুম্বাই ও গৌহাটিতে উপ-হাইকমিশন চালু করেছে।

নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে ভারতের গোয়াতে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত ব্রিকস-বিমসটেক আউটরিচ সামিটে অংশ নেন শেখ হাসিনা। ওই সম্মেলনে বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোতে মানসম্মত ও টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগের প্রয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পুনরায় ২০১৮ সালের ২৫-২৬ মে শেখ হাসিনা মোদির আমন্ত্রণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সফর করেন। এটি ছিল প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় মেয়াদের দ্বিতীয় ভারত সফর। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের অর্থায়নে নবনির্মিত ‘বাংলাদেশ ভবন’ উদ্বোধন করেন। পাশাপাশি তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত সমাবর্তনে ‘গেস্ট অব অনার’ হিসেবে যোগদান করেন। সফরকালে আসানসোলে অবস্থিত কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় এক বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনাকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার (ডি. লিট) উপাধিতে ভূষিত করে।

ভারত সফরকালে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন। শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা ও গুরুত্বারোপের ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভারতের সঙ্গে আজ আমরা সহযোগিতার এক অনন্য অবস্থানে উপনীত হয়েছি। ভারত থেকে ভেড়ামারা-বহরমপুর গ্রিডের মাধ্যমে এবং ত্রিপুরার পালাটানা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বর্তমানে ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে।

২০১৬ সালের ১৯ মার্চ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ রেলপথে ভারত থেকে ২২৬৮ মেট্রিক টন হাই-স্পিড ডিজেল আমদানি করে। ইতোমধ্যে দু’দেশের মধ্যে তেল ও গ্যাসক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণে দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। পাশাপাশি, জ্বালানি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে বিশেষত নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌর শক্তি ও পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে দু’দেশের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ভারত ও ফ্রান্সের যৌথ উদ্যোগে গঠিত আন্তর্জাতিক সোলার অ্যালায়েন্সে বাংলাদেশও যুক্ত হয়েছে। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সংরক্ষণে এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা পালন করবে।

শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত একাধিক সম্মেলনে যোগ দেন মন্ত্রী মহোদয়রাও। যেমন, ২০১৬ সালের ৩-৫ নভেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত দ্বি-বার্ষিক এশিয়ান মিনিস্ট্রিয়াল কনফারেন্স অন ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশান (এএমসিডিআরআর) অংশ নেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী। ২০১৬ সালের ৬-৭ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়ান ইকোনমিক সামিটে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন পরিকল্পনামন্ত্রী।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) এবং কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজ (সিআইআই)-এর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সভায় তিনি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি ও সাম্প্রতিক নানামুখী সাফল্য তুলে ধরেন।

ভারতের সঙ্গে ‘তিস্তাচুক্তি’ সম্পন্ন না হলেও পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং সবার জন্য সুপেয় ও নিরাপদ পানি এবং পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা নিশ্চিতকরণ বর্তমান সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এ বিবেচনায় বৈশ্বিক পরিমণ্ডলেও পানিসম্পদ-বিষয়ক আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামের আলোচনায় পানিকে অন্যতম ‘মানবাধিকার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এর মাধ্যমে মানবজাতির অস্তিত্ব সুরক্ষায় পানির অপরিহার্যতার বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। জাতিসংঘের পানি-বিষয়ক ‘হাই লেভেল প্যানেল অন ওয়াটার’-এ কথা বলেছেন শেখ হাসিনা।

২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিশ্বজুড়ে মহামারির মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক হয় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর। মহামারির মধ্যেও দুই দেশের সহযোগিতা অব্যাহত থাকার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা তখন বলেছিলেন, বছরজুড়ে রেলরুট দিয়ে বাণিজ্য, উচ্চপর্যায়ের পরিদর্শন ও সভা, সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ, কলকাতা থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতে ভারতীয় পণ্যসামগ্রীর প্রথম পরীক্ষামূলক চালান প্রেরণ এবং অবশ্যই কোভিড-১৯ বিষয়ে সহযোগিতার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছি। তিনি বলেন, করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা করতে ব্যাপক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন ব্যাপক বিঘ্ন ঘটা এবং ভোক্তাদের চাহিদা হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও আমাদের অর্থনীতি ঊর্ধ্বমুখী প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। বেশ কিছুসংখ্যক ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশের উৎপাদন ও সেবা খাতে নিযুক্ত রয়েছেন এবং তারা নিজদেশ ভারতে রেমিটেন্স পাঠিয়ে থাকেন। অপরদিকে, বাংলাদেশ থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক পর্যটক এবং চিকিৎসা সেবা গ্রহণকারীকে ভারত গ্রহণ করে।

এভাবে ৫০ বছরে গড়ে উঠেছে দু’দেশের কূটনৈতিক সেতুবন্ধন। নরেন্দ্র মোদির সফরে সেই সেতুবন্ধন আরও দৃঢ় হবে বলে সকলের প্রত্যাশা। তাছাড়া ২০১৯ সালের মে মাসে শুরু হওয়া নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় দফার মেয়াদ ২০২৪ সালে শেষ হবে। মনে করা হচ্ছে, তখন ভারত চীনকে টপকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশে পরিণত হবে, আবার এই দেশটি হবে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। আর এ কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক গুরুত্ব বহন করে। অথচ মোদির বাংলাদেশ সফর নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে একটি গোষ্ঠীকে উসকানি দিচ্ছে বিএনপি। এমন অভিযোগ করেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, মোদির বিরোধিতার আড়ালে মুজিববর্ষের বিরোধিতা করছে দলটি। অপরদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বিরোধিতা হলেও নরেন্দ্র মোদিকে সর্বোচ্চ সম্মান ও নিরাপত্তা দেবে সরকার। নরেন্দ্র মোদিকে দল-মতের ঊর্ধ্বে রেখে আঞ্চলিক সহযোগিতার অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ী নেতা হিসেবে অভিনন্দন জানানো এদেশের জনগণের কর্তব্য।

লেখক : ইউজিসি পোস্ট ডক ফেলো, কবি, লেখক, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।