বাংলাদেশে ‘দুগ্ধশিল্প’ বিকশিত না হওয়ার নেপথ্যে

37
Social Share

ড. মো: আওলাদ হোসেন: দুধ (গরষশ) একটি আদর্শ ও সুষম পানীয়। মহান আল্লাহ তাআলার অনন্য নেয়ামতের মধ্যে দুধ একটি। শুধুমাত্র ‘ভিটামিন সি’-র ঘাটতি ছাড়া দুধে খাদ্যের সকল উপাদান সুষম অবস্থায় বিরাজ করে। সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ২৫০ মিলি দুধ খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে দুধকে সুস্বাস্থ্যের জন্য অতুলনীয় পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাবার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
হাদিসে বর্নিত আছে, মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) বলেছেন, ‘দুধ ছাড়া আর কোনো (খাবার) জিনিস নেই, যা একই সঙ্গে খাবার ও পানীয় উভয়টির জন্য যথেষ্ট হয়’(আবু দাউদ)।
প্রানীসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে দৈনিক ২৯,২৬০ মেট্রিক টন তরল দুধ উৎপাদিত হয়। তন্মধ্যে ৫% প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করা হয়। ৮১% তরল দুধ সাধারন চা ও মিষ্টির দোকানে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া ১৪% বাড়ি বাড়ি গ্রাহকরা ক্রয় করে ব্যবহার করে থাকে। অর্থ্যাৎ মোট উৎপাদিত তরল দুধের চারপঞ্চমাংশেরও বেশী পরিমান মিষ্টির দোকানে বিক্রয় হয়। ফলে বেশীরভাগ দুগ্ধ খামারীদের ব্যবসা, বিনিয়োগ, বিপনন মিষ্টির দোকানদারদের মর্জির উপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক পরিবেশ বা সামাজিক অস্থিরতা বা অন্য কোন কারনে মিষ্টির দোকানদাররা দুধ ক্রয় না করলে খামারীরা বিপাকে পড়ে যায়।
২০১৫ সালে টানা অবরোধ-হরতালে পাবনা জেলার ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলার দুগ্ধ খামারিরা চরম বিপাকে পড়েছিল। ক্রয়কেন্দ্রগুলো নিয়মিত দুধ না কেনায় ৫০ টাকা দরের প্রতি লিটার দুধ বিক্রি করতে হয়েছিল ১২ থেকে ১৫ টাকায়। ভাঙ্গুড়া উপজেলার বিক্ষুব্ধ খামারিরা প্রায় দুই হাজার লিটার দুধ মহাসড়কে ঢেলে দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
২০১৮ সালে একটি আন্তর্জাতিক গুড়াদুধ কোম্পানী বাংলাদেশে গুড়া দুধের নামে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ভ্যাজিটেবল ফ্যাট মিশ্রিত নকল গুড়াদুধের ব্যবসা করার প্রস্তাব দিয়েছিল। গণমানুষের নেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার আন্তর্জাতিক গুড়াদুধ কোম্পানীর ঐ গনস্বার্থ বিরোধী প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিলেন। তারই ফলশ্রুতিতে ঐ আন্তর্জাতিক গুড়াদুধ ব্যবসায়ীদের সুক্ষ্ম ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ২০১৯ সালে জনৈক অধ্যাপকের নেতৃত্বে গবেষকরা মিল্ক ভিটা, প্রাণ, আড়ং, ইগলু, ফার্ম, ফ্রেশসহ অন্যান্য কোম্পানিগুলোর দুধের নমুনা পরীক্ষা করেন এবং দুধে মানবদেহে ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিক এর উপস্থিতি খুঁজে পেয়েছিল। ঐ ষড়যন্ত্রমূলক গবেষণার ফলাফল নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর করা রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে শুনানি শেষে রুলসহ আদেশ আসে হাইকোর্ট থেকে। সেই আদেশে মহামান্য হাইকোর্ট দুধে এন্টিবায়োটিক উপস্থিতির প্রেক্ষিতে বিএসটিআই’র অনুমোদনপ্রাপ্ত ১৪টি কোম্পানির পাস্তুরিত দুধ উৎপাদন ও বিপণনে পাঁচ সপ্তাহের নিষেধাজ্ঞা জারি করায় ঐ প্রতিষ্ঠানগুলো খামারিদের কাছ থেকে দুধ ক্রয় করা বন্ধ করে দেয়। ফলে পাবনার ভাঙ্গুরা উপজেলায় রাস্তায় দুধ ঢেলে প্রতিবাদ করেছেন দুগ্ধ খামারিরা।
উল্লেখ্য, ডিম ও মাংসে আয়োডিন বা ভিটামিন বা অন্য কোনো উপাদান বৃদ্ধির প্রয়োজনে হাঁস-মুরগি পালনকালে আয়োডিন বা ভিটামিন বা প্রয়োজনীয় উপাদান মিশ্রিত খাবার খাওয়ানো হয়। অধিক পরিমাণ কেরোটিনযুক্ত খাবার খাওয়ানো হলে ডিমের কুসুমের রং গাঢ় হলুদ হয়। অসুস্থ দুধাল গাভীকে চিকিৎসার জন্য এন্টিবায়োটিক বা ঔষধ সেবন করানো হলে, ঐ গাভীর দুধে সেবনকৃত এন্টিবায়োটিক বা ঔষধের নির্যাসের উপস্থিতি অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু এবিষয়ে বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিলের জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে করা গবেষণালব্ধ ফলাফল নিয়ে এমন ঘোলাটে পরিস্থিতির সৃষ্টি করা অন্যায় ও বাংলাদেশে দুগ্ধশিল্পের বিরূদ্ধে সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিবিএস এর তথ্য অনুযায়ী ২০১৮ সালে ২,৬২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১,৩৮,০০০ মেট্রিক টন গুড়া দুধ আমদানী করা হয়েছে। যাতে একদিকে যেমন দেশের ডেইরী শিল্পের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিবছর প্রচুর পরিমানে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। এছাড়া আমদানি করা এসব দুধের মান (য়ঁধষরঃু/ ংঃধহফধৎফ) নিয়ে জনমনে সংশয় আছে। এমনি বাস্তবতায় বর্তমানে দেশের দুধ উৎপাদনকারী খামারীরা ৮১% তরল দুধের যথাযথ মূল্য পাচ্ছে না। প্রাকৃতিক পরিবেশ বা সামাজিক অস্থিরতার কারণে বা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে বা যে কোন কারনে দুধ বিক্রি করতে বাধাগ্রস্ত হয়।
আমার স্পষ্ট মনে পরে, আশির দশকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় বাংলাদেশ ভেটেরিনারি এসোসিয়েশনের তৎকালীন মহাসচিব (মরহুম) ডাঃ ফজলুল হক সাহেবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের দুগ্ধশিল্প বিকাশের স্বার্থে গুড়াদুধ আমদানি নিরুৎসাহিত করার জন্য গুড়া দুধ আমদানীতে ট্যাক্স বৃদ্ধি করার দাবিতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের সাথে দেখা করি। উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘ শুধু ট্যাক্স কমানো কেন, আমিতো চাই গুড়াদুধ আমদানি বন্ধ করতে। কিন্তু পারি না। আমার উপর অনেক চাপ’। বর্তমানেও সরকার কর্তৃক পরিচালিত সমবায় প্রতিষ্ঠান ‘মিল্ক ভিটা’ কর্তৃপক্ষ নিজেদের প্রস্তুতকৃত গুড়াদুধ বাজারজাত করা এবং চাহিদামত উৎপাদন বাড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। বিদেশ থেকে গুড়াদুধ আমদানি নিরুৎসাহিত করতে, সরকারের কাছে বার বার অনুরোধ করছেন এখাতে ট্যাক্স বৃদ্ধি করার জন্য, সফলকাম হতে পারছেন না।
কৃষিবান্ধব নেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের প্রানীসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ও সচিব মহোদয়ের নেতৃত্বে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাংলাদেশের দুগ্ধশিল্প বিকাশের জন্য নিরলস কাজ করছেন। ২০২০ সালে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকার ঘোষিত লকডাউন চলাকালে প্রান্তিক খামারীদের উৎপাদিত দুধ বিক্রি ব্যহত হলে, প্রান্তিক খামারীদের বিনিয়োগের নিরাপত্তায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে প্রানীসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে খামারীদের অবিক্রিত দুধ ক্রয় করা হয় এবং ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি ত্রাণ হিসাবে দুধ দেওয়া হয়। দুধ উৎপাদন বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ছোট ছোট খামারীদের প্রনোদনা স্বরূপ নগদ অর্থ প্রদান করছেন। শুধু তাই নয়, প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদিত দুধ ক্রয়কারী ছোট ছোট ব্যবসায়ীদেরও উৎসাহিত করার জন্য নগদ অর্থ প্রদান করছেন। কিন্তু এরপর কি? এই ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের ক্রয় করা দুধ সমন্বয় করে বৃহৎ দুগ্ধশিল্প স্থাপন করে চাহিদা অনুযায়ী অধিক পরিমাণ দুধ পাস্তরিত করে প্যাকেটজাত করা যেতে পারে এবং অধিক সংখ্যক গুড়াদুধ উৎপাদনের শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে দেশের চাহিদা পূরন করা যায়। এই গুড়াদুধ দিয়ে মিষ্টি তৈরীর মুল উপাদান ‘দুধের ছানা‘ তৈরী করা যায়। এই প্রক্রিয়ায় প্রান্তিক খামারীদের উৎপাদিত দুধ উপযুক্ত মূল্যে বিক্রি নিশ্চিত হবে, প্রাকৃতিক পরিবেশ বা সামাজিক অস্থিরতার কারণে বা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে বা যে কোন কারনে দুগ্ধ খামারীদের ব্যবসা, বিনিয়োগ, বিপনন মিষ্টির দোকানদারদের মর্জির উপর নির্ভরশীল হবে না। প্রক্রিয়াজাতকরনের মাধ্যমে দুধের ‘মূল্য সংযোজন‘ (ঠধষঁব অফফ) হবে, দুধের অতিরিক্ত মূল্য পেয়ে খামারীরা গাভী পালনে আরও উৎসাহিত হবে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। নিজের দেশে উৎপাদিত মানসম্মত গুড়াদুধ দিয়ে চাহিদা মিটাতে পারলে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
অথচ ‘দেশে গুড়াদুধ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় পরিমাণ তরল দুধ নাই‘ বলে বা বিভিন্ন অজুহাতে বানিজ্যিক ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করছেন না। দুগ্ধশিল্প স্থাপনে ঋণ গ্রহণ সহজতর না করায় উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ টিভি নিউজে প্রচারিত হয়েছে, দুদক সচিব মহোদয় বলেছেন, ‘কয়েকজন গার্মেন্টস মালিক ইনভয়েস জালিয়াতির মাধ্যমে বছরে ৬৪ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে’। এই ‘ইনভয়েস জালিয়াতি‘তো ব্যাংকের মাধ্যমেই হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে দুগ্ধশিল্প স্থাপনে বানিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ গ্রহণে যত জটিলতা। প্রানীসম্পদ মন্ত্রনালয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার চেষ্টা করলেও প্রয়োজনীয় ঋণ প্রদানে ব্যাংক গুলোর সৃষ্ট জটিলতা উদ্যোক্তা সৃষ্টির সরকারী প্রচেষ্টা ব্যহত হচ্ছে। ফলে দুগ্ধশিল্প বিকশিত হতে পারছে না। এই সুযোগে সফল হচ্ছে বিদেশী গুড়াদুধের অবাধ বাজার প্রতিষ্ঠার সুক্ষ্ম ষড়যন্ত্র।