বাংলাদেশের নাট্য ভুবনে মমতাজউদদীন আহমদ উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো

50
Social Share

বিশেষ প্রতিনিধি: বাংলাদেশের নাট্য ভুবনে মমতাজউদদীনের অবস্থান উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো। দেশের শীর্ষস্থানীয় অন্যতম নাট্যব্যক্তিত্ব তিনি। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি বিরাট অংশ জুড়ে আছে তার সাহিত্যকর্ম। তিনি সমাজ, রাজনীতি এবং রাষ্ট্রনীতির বিবিধ অসঙ্গতিকে রূপকের আবহে হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে রূপায়িত করেন তাঁর নাটকে। নিজেও যেহেতু অভিনয় কলার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত, সেহেতু মঞ্চোপযোগী করে তিনি নির্মাণ করেছেন তাঁর নাটক। এছাড়াও একজন দক্ষ অভিনেতার পরিচয় নিয়ে দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে মঞ্চ, টেলিভিশন বেতার চলচ্চিত্রে দক্ষতার সাথে অভিনয় করে যাচ্ছেন।

মহান, উদার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মমতাজউদদীন আহমদ ভারতের মালদহে ১৯৩৫ সালে ১৮ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা কলিমউদদীন আহমদ, মাতা সখিনা খাতুন। পরবর্তীতে রাজশাহী চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবং বর্তমানে ঢাকার মিরপুরে বসবাসরত মমতাজউদদীন আহমদ বাংলাভাষা ও সাহিত্যে এমএ করেন (অনার্সসহ)। শিক্ষাজীবনে তাঁর নিউইয়র্কে লিংকন সেন্টারে নাট্যকলা বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও পরিদর্শন করেছেন। বেসরকারি এবং সরকারি কলেজে পঁয়ত্রিশ বছর বাংলা ভাষা সাহিত্য এবং বাংলা সংস্কৃতি এবং ইউরোপীয় নাট্য সাহিত্য বিষয় অধ্যাপনা করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিষয়ে খ-কালীন শিক্ষক। কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর রচনা ‘বিবাহ’ ও ‘কী চাহ শঙ্খচিল’ পাঠ্য তালিকাভুক্ত।
জাপানে টোকিও এবং ওসাকা শহরের নাট্যকলা, মাইম, পুতুলনাচ ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং পরিদর্শন ছাড়াও তাঁর রচিত পাঠ্যপুস্তক বাংলাদেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে তালিকাভুক্ত। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে নাট্যকলা বিষয়ে পাঠ্যপুস্তক রচনার অন্যতম লেখক। অসংখ্য লেখনি ছড়িয়ে আছে তাঁর শিল্পকর্মের মধ্যে টেলিভিশন, বেতার, মঞ্চ, চলচ্চিত্র অনুবাদ সাহিত্যেও আছে তাঁর শিল্প সার্থকতার পরিচয়। স্বল্প পরিসরে তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যকর্ম রূপায়ন করা সম্ভব হবে না। মঞ্চ, বেতার, টেলিভিশন ও অনুবাদসহ তাঁর প্রায় ৭০টি নাট্য রচনা। স্পার্টাকাস বিষয়ক জটিলতা, বর্ণচোরা, ফলাফল নিম্নচাপ, হরিণ চিতা চিল, কী চাহ শঙ্খচিল, চয়ন তোমার ভালবাসা, ইদানীং শুভ বিবাহ, রাজা অনুঃস্বারের পালা, প্রেম প্রেম, সাতঘাটের কানাকড়ি, হৃদয় ঘটিত ব্যাপার-স্যাপার, দৃষ্টি, দক্ষিণের জানালা, রাক্ষুসী, একটি কালো স্যুটকেট, স্বপ্ন বিলাস, সুভা, কূল নাই কিনারা নাই প্রভৃতি। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুইবোন’-এর নাট্যরূপ দিয়েছেন। নবনাট্যায়ন করেছেন দীনবন্ধুমিত্রের ‘নীল দর্পণ’, মীর মুশাররফ হোসেনের ‘জমিদার দর্পণ’। নজরুলের ‘রাক্ষুসী’ গল্প অবলম্বনে রাক্ষুসীসহ রুশ নাট্যকার আন্তন চেখভের The Proposal ‘The Jubilic & ‘The Bear’-এর অনুবাদ যথাক্রমে ‘এই রোদ এই বৃষ্টি’ বুড়িগঙ্গায় সিলভার জুবিলী এবং হৃদয় ঘটিত ব্যাপার স্যাপার, ‘ক্ষত-বিক্ষত’ (জার্মান নাট্যকার হাইনরিষভন ক্লাইস্টর অনুসরণে) ‘খামাখা খামাখা’, শেক্সপীয়রের মাচ অ্যাডো অ্যাবাউট নাথিং অনুসরণে এবং অলসওয়েল দ্যাট অ্যান্ডস ওয়েল অবলম্বনে হাস্য লাস্য ভাষ্য মমতাজউদদীন রূপান্তরিত নাট্যকর্ম আমাদের কমেডি ভুবনকে নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর কিশোর উপযোগী নাটক ‘বকুলপুরের স্বাধীনতা’ একটি মহৎ সৃষ্টি।
অভিনেতা হিসেবে তাঁর মঞ্চের কাজ স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা, কবর, দুইবোন, হৃদয় ঘটিত ব্যাপার স্যাপার, সেনাপতি, জমিদার দর্পণ, হাস্য লাস্য ভাষ্য, খামাখা, বটবৃক্ষের ধরম করম প্রভৃতি। বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্রের উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে দৃষ্টি, বিবাহ, তখন মধুমাস, লজ্জা, কী চাহ শঙ্খছিল, ইদানীং শুভবিবাহ, একটি কালো স্যুটকেস, নন্দিত নরকে, অরণ্যের দিনরাত্রি, বহতা এষানা, টেনশন, ওহে পরবাসী, অন্যরকম ভালোবাসা, তাহারা দম্পতি, তথাপি, সহচর, খোঁজ উল্লেখযোগ্য। এমিলির গোয়েন্দা কাহিনী, শঙ্খনীল কারাগার, চিত্রানদীর পারে, হাসনরাজা, নদীর নাম মধুমতি প্রভৃতি ছায়াছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন। এছাড়াও চিত্রনাট্য গদ্য রচনা ও নাট্যবিষয়ক আলোচনাতেও রয়েছে তার অসামান্য অবদান।
তিনি বিবাহিত। স্ত্রী কামরুন্নেসা মমতাজ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক। তিয়াসা, তিতাস, তমাল, তাহিতি চার সন্তানের তিনি সৌভাগ্যবান পিতা।
ভালো কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এগুলো হলো- বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার ১৯৭৬, শিশু একাডেমী অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার, মাহবুবউল্লাহ জেবুন্নেসা ট্রাস্ট স্বর্ণপদক, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, বাচসাস চলচ্চিত্র টেলিভিশন ও চিত্রনাট্য পুরস্কার, সিকোয়েন্স অভিনয় ও নাট্য রচনা পুরস্কার, দেওয়ান গোলাম মোর্তজা সাহিত্য পুরস্কার ১৯৯৫, বঙ্গবন্ধু সাহিত্য পুরস্কার, চট্টগ্রাম ত্রিতরঙ্গ স্বর্ণপদক ১৯৯৬, রাজশাহী লেখক পরিষদ পদক ১৯৯৩, কলকাতার সমলয় পুরস্কার ১৯৯৬, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক (নাটক) ১৯৯৭, শিল্পকলা একাডেমী পদক ২০০৮। সেতার ও সারোদ বাদ্যযন্ত্র এবং রবীন্দ্র সংগীত তার প্রিয়। খাবারের মধ্যে আছে ভাত-মাছ, ডাল। পোশাকের মধ্যে পাঞ্জাবি-পায়জামা।
মমতাজউদদীন আহমদ ভবিষ্যৎ ক্যানভাসে স্বপ্ন দেখেন তাঁর নাটক বিশ্বমানে পৌঁছাবে। আর মৃত্যুর পর বেঁচে থাকতে চান, তিনি, এই তার স্বপ্ন। ২০১৯ সালের ২ জুন রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মমতাজউদদীন আহমদ চলে গেলেন না-ফেরার দেশে।

৮৪ বছর বয়সী মমতাজউদদীন নাট্যচর্চায় অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক পান ১৯৯৭ সালে। এছাড়া বাংলা একাডেমি পুরস্কার, শিশু একাডেমি পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।

১৯৩৫ সনে ১৮ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের মালদহে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। দেশ বিভাগের পর তার পরিবার পূর্ববঙ্গে চলে আসে।

রাজশাহী সরকারি কলেজে পড়ার সময়ই রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনে যুক্ত হন তিনি। রাজশাহীর তৎকালীন ছাত্রনেতা ভাষাসৈনিক গোলাম আরিফ টিপুর সান্নিধ্যে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে ভাষার দাবিতে আন্দোলন সংগঠনে তিনি ভূমিকা পালন করেন।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির রাতে রাজশাহী সরকারি কলেজের মুসলিম হোস্টেলের ইট কাদামাটি দিয়ে যে শহীদ মিনার গড়ে উঠেছিল, তাতে মমতাজউদ্দীনও ভূমিকা রেখেছিলেন। তখন জেল খেটেছেন একাধিকবার।

চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে বাংলার শিক্ষক হিসেবে মমতাজউদ্দীনের কর্মজীবনের শুরু। পরে তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন।

এছাড়াও মে মাসে বাংলাদেশ হারায় একুশে পদকজয়ী বাংলাদেশি নজরুল সংগীতশিল্পী ও নজরুল গবেষক খালিদ হোসেন, মঞ্চ অভিনেত্রী মায়া ঘোষ, কবি ও সাহিত্য সমালোচক হায়াৎ সাইফকে।