বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও কৃষ্টির ধারক পটিয়ার ‘বাংলাদেশ বৌদ্ধ সেবাসদন’-সরিৎ চৌধুরী সাজু

111
Social Share

বৌদ্ধরা এ দেশের কৃষ্টি, সভ্যতা ও স্বপ্ন বিণির্মাতার অংশীদার। এ দেশের বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে ও ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে বৌদ্ধদের অবদান সর্বজন স্বীকৃত । মাটি খুড়লেই বাঙালি বৌদ্ধদের হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য– সভ্যতা। বৌদ্ধ চর্যাপদকে ভিত্তি করে বাংলা ভাষার উৎপত্তি। তাই আমরা ভাষা ভিত্তিক বাঙালি জাতীয়বাদে বিশ্বাসী গর্বিত বাঙালি জাতি। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি মায়ের এ বাংলা ভাষাকে আমরা মুক্ত করি। বাংলা মায়ের দামাল ছেলে সালাম, জব্বার, রফিকসহ সকলের কাছে ঋণ স্বীকার করছি। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কালীন সময়। অনাহারী দুঃখ-দুর্দশায় র্জ্জরিত ও দুর্ভিক্ষের কবলে এ বাংলার মাটি ও মানুষ। চারিদিকে হাহাকারে অনাহারী মানুষ। তখন নিখাদ দেশপ্রেম ও সমাজ-সভ্যতা-ঐতিহ্য চেতনায় ঋদ্ধ বাঙালি সন্তান অগ্রমহাপন্ডিত প্রজ্ঞালোক মহাস্থবির মায়ানমার অর্থাৎ তৎকালিন বার্মা হতে স্বজাতির টানে ছুটে আসেন এ বাংলায়। এ মহামানবের জন্ম জনপদ বোয়ালখালীর বৈদ্যপাড়া হলেও তিনি বুদ্ধের ধর্মের গভীর অনুশীলনের জন্য বার্মায় থাকতেন। অগ্রমহাপন্ডিত প্রজ্ঞালোক মহাস্থবিরের নেতৃত্বে একদল নিবেদিত ভিক্ষু ও গৃহী নিয়ে মানবতার কল্যাণে সেবা কার্যক্রম শুরু করেন প্রতিটি বৌদ্ধ গ্রামে। প্রতিষ্ঠা করেন সেবা কমিটি, বিভিন্ন স্থানে গিয়ে নঙ্গরখানা খুলেন। ধনীদের কাছে সাহায্য চান। শুরু হলো মানব সেবার কঠিন ব্রত নিয়ে ত্রাণ বিতরণ, খিচুড়ি বিতরণ। মানুষের মুখে দিতে হবে অন্ন এ যেন তাঁর অভিষ্ট লক্ষ্য। তিনি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে গিয়ে সেবা কমিটির পক্ষ থেকে চাল-ডাল-গম ও নগদ অর্থ প্রদান করেন। যুদ্ধ বিধ্বস্ত এ বাংলায় বৌদ্ধদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন অঞ্চল ভিত্তিক যে সেবা কমিটি করা হয়েছিল তাঁদের সমন্বয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে বাংলাদেশ বৌদ্ধ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার অধীনে ” বৌদ্ধ সেবাসদন ” প্রতিষ্ঠা করেন। দায়িত্ব দেন তৎকালিন সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার সাধারণ সম্পাদক পন্ডিত ধর্মাধার মহাস্থবির মহোদয়কে। পরবর্তীতে এই দায়িত্ব পালন করেন সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার সাধারণ সম্পাদক পন্ডিত প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির, তাঁরই উপাদায়েত্বে ১৯৫৬ সালে ড. রাষ্ট্র পাল মহাথের উপসম্পদা সেবাসদন সীমাঘরে অনুষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীতে সেবাসদন কালের অতলে হারাতে বসে। তখন হৃত সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য ভূমি উদ্ধার ও সংরক্ষণ কমিটি গঠণ করা হয় সপ্তম সংঘরাজের নেতৃত্বে। তখন সভাপতি করা হয় সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার সাধারণ সম্পাদক শান্তপদ মহাস্থবির ও সাধারণ সম্পাদক করা হয় জগদীশ চৌধুরীর মহোদয়কে। এতে রচিত হয় ভূমি উদ্দারের সংগ্রামের এক বিরল ইতিহাস । ১৯৭০ ও ১৯৮০ এর দশকে বিদর্শনাচার্য ভাবনানন্দ মহাস্হবির, শীলপ্রিয় ভিক্ষু(১), ধর্মবোধি ভিক্ষু , বসুমিত্র মহাস্হবিরসহ অনেকে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ পরবর্তিতে মুকুটনাইট ধাতুচৈত্য বিহারের অধ্যক্ষ ও বর্তমান চট্টগ্রাম পূর্ণাচার আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে অধ্যক্ষ সত্যপ্রিয় মহাস্হবিরসহ অসংখ্য ভিক্ষু সংঘ ও গৃহী সংঘ অবদান রাখেন। ২০০৬ সালে কর্মবীর সত্যপ্রিয় মহাস্হবিরে শিষ্য শীলপ্রিয় স্হবিরে মহাস্হবির রূপে বরণ এবং আগমন করেন মানিকছড়ি হতে স্মৃতিমিত্র মহাস্হবির অনেক শিষ্যসংঘ নিয়ে। তিনিও কিছুদিন পর চলে যান। তখন থেকে অধ্যাবদি বিশ্বামিত্র স্হবির, আলোকমিত্র স্হবির ও শীলরত্ন ভিক্ষু (ডাঃ ভান্তে) সহ ভিক্ষু সংঘ অবদান রেখে চলেছেন। উল্লেখ্য যে সেবাসদনের আবাসিক ভিক্ষুসংঘ বিভিন্ন জায়গায় শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞা অনুশীলন করছেন।তন্মধ্যে ধম্মানন্দ স্হবির রাঙ্গামাটিস্হ গভীর অরণ্য কালা পাহাড়ে এবং তিষ্যমিত্র স্হবির ছতরপিটুয়া অরণ্য সংঘারামে ধুতাঙ্গ শীলে অধিষ্ঠান করছেন। নগর সভ্যতা থেকে একটু দূরে চট্টগ্রামের নান্দনিক প্রকৃতির লীলাভূমি কর্ণফুলি নদীর দক্ষিণপাড়স্থ চাঁনখালী খাল বেষ্টিত পটিয়া উপজেলার ধলঘাট ইউনিয়নের তেকোটা-মুকুটনাইট গ্রামের মধ্যস্থলে প্রতিষ্ঠিত এ সেবাসদন। এখানে কলকাকলীতে পাখির ডাকে মুখরিত কি সুন্দর পরিবেশ। এখানে রয়েছে ত্রিমুখী যোগাযোগ সুবিধা। রেল যোগযোগের জন্য ধলঘাট রেল স্টেশন যাওয়া চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র ৫ টাকা ভাড়ায়। ইঞ্জিন বোর্ডেও যাওয়া যায় সেবাসদনে। সেবাসদন সম্মুখে বিশাল পিচঢালা রোড। যাতায়াতে চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র ৪০ মিনিটের পথ। তাই যোগাযোগ ব্যবস্থায় অত্যন্ত সুবিধা বর্তমান। ১৯৬০ সালে সপ্তম সংঘরাজ ভদন্ত অভয়তিষ্য মহাস্থবিরের নেতৃত্বে এখানে বাংলাদেশের প্রথম ২৮ বুদ্ধ বৃহৎভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন থেকে শুরু হয় অষ্টবিংশতি বুদ্ধ মেলা। এ মেলায় বাংলার ঐতিহ্য, শিল্প, সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। তিনদিনব্যাপী এই মেলায় হাজার হাজার মানুষের মিলন মেলায় পরিণত এ অঞ্চল। বৌদ্ধ সেবাসদনের অধ্যক্ষ পন্ডিত প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবিরের নেতৃত্বে ১৯৫১ সালে সর্ববৃহৎ ভিক্ষু পরিবাসব্রত বা ওয়াইক হয়েছিল বৌদ্ধ সেবাসদনে। ভারত-বাংলা উপমহাদেশের প্রাজ্ঞ ভিক্ষুসংঘ এ পরিবাস ব্রতে অংশগ্রহণ করেন। তখন জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষের ঢল।এ সময় দশদিনব্যাপী মেলা বসেছিল। তেকোটা-মুকুটনাইটের মানুষ সেই দিনের মেলার কথা এখনও ভুলেনি। ১৯৬০ সালে সেবাসদনের অধ্যক্ষ পন্ডিত প্রজ্ঞানন্দ মহাস্হবিরের মৃত্যুর সাথে সাথে সেবাসদনের অপমৃত্যু হয়। কালক্রমে এ প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যায়। ১৯৭১ সালে বাংলার স্বাধীনতা যুদ্ধে এ প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়। এখানে কোন ভিক্ষুসংঘ থাকতে পারেনি। যুদ্ধকালীন সময়ে চাঁনখালী খালে ভেসে আসা পাঁচুরিয়া নিবাসী শহীদ জিনানন্দ ভিক্ষুর মরদেহ খালে জোয়ারে উঠে আসতো আর ভাটার সময় নামতো। এ রকম কয়েক দিন থাকার পর জগদীশ চৌধুরী তেকোটা গ্রামের কয়েকজনকে নিয়ে তুলে বাংলাদেশ বৌদ্ধ সেবাসদন এ আনেন এবং নিজে পায়ে হেটে পাচরিয়া গিয়ে খবর দেন। কেউ দেখতে আসেনি। তারপরে সেবাসদনের মাটিতেই এখানে দাহক্রিয়া করা হয়।যাঁর নামে রাষ্ট্রীয় ঢাকটিকিট ছিল। বিভিন্ন ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ত্রাসের স্থানে পরিণত হয় এ সেবাসদন। স্বাধীনতা পরবর্তী এ সেবাসদনকে বাংলাদেশ বৌদ্ধ সেবাসদন নামকরণ করা হয়। ১৯৭৪ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালিন সাধারণ সম্পাদক জগদীশ চৌধুরীর নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় বাণিজ্যমন্ত্রী এখানে তাঁত শিল্প ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তৎকালিন পটিয়ার মাননীয় সাংসদ শিল্প প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক নুরুল ইসলামের মাধ্যমে ৬টি পেন্ডুলাম মেশিন দিয়ে তাঁত শিল্প প্রতিষ্ঠা করা হয়। যা ১৯৭৫এর কালো রাত্রিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপরিবার নিহত এবং বাণিজ্যমন্ত্রী এইচ কামরুজ্জামানসহ জাতীয় চারনেতা হত্যার মধ্য দিয়ে দেশের পটপরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ বৌদ্ধ সেবাসদনের উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ হয়। এলাকার বিদ্যুৎসাহী বৌদ্ধদের অগ্রযাত্রায় অগ্রমহাপন্ডিত প্রজ্ঞালোক মহাস্থবিরের স্বপ্নের ১১ দফা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এখানে একটি ধলঘাট ইউনিয়ন হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আরো রয়েছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত বাংলাদেশ বৌদ্ধ সেবাসদন সোসাইটি, বাংলাদেশ বৌদ্ধ সেবাসদন পালি কলেজ। রয়েছে দৃষ্টিনন্দন উপগুপ্ত চৈত্য,বুূদ্ধের সিংহশয্যা প্রতিবিম্ব। সংঘসীমা ঘর, মেডিটেশন হল। পুণ্যার্থীরা তাঁদের মানসকামনায় পুকুরে বিভিন্ন মাছ অবমুক্ত করে জগতের সকল প্রাণীর সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। এখানে আবাসিক ভিক্ষু, শ্রামন ভোর ৬:৩০ মিনিটে পিন্ডচরণের মধ্য দিয়ে ছোয়াং গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বৌদ্ধরা এখানে অষ্টবিংশতী বুদ্ধ পূজা, সীবলী পূজা, উপগুপ্ত পূজা ও সংঘদান আয়োজন করে থাকে। প্রতি শুক্রবার এখানে মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয়। তাই বাংলাদেশ বৌদ্ধ সেবাসদন পর্যটক ও পুণ্যার্থীদের সমাগমে মুখরিত থাকে। (চলবে)

লেখক পরিচিতি : সরিৎ চৌধুরী সাজু মহাসচিব- বাংলাদেশ বৌদ্ধ সেবাসদন।