বর্জ্য

289
বর্জ্য
Social Share

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, পৃথিবীতে যা কিছু বর্জ্য তার সিংহভাগই প্রাণী সৃষ্ট। আর প্রাণীদের মধ্যে মানুষ যেহেতু শ্রেষ্ঠ, যে কারণে তার বর্জ্যও সবচেয়ে বেশি। প্রকৃতির বর্জ্য প্রকৃতির মতোই বিশাল। আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরিত গলিত লাভা, দাবানল-দহনে সৃষ্ট ছাইভস্ম, ভূমিকম্পের ধ্বংসলীলা, ঝড়-তুফানের তাণ্ডবে সৃষ্ট ঘরবাড়ি, গাছপালা, মানুষ-প্রাণিজগতের বিপুল বর্জ্য, প্লাবনের আগ্রাসনে ঘরবাড়ি ডোবানোর ফলে সৃষ্ট বর্জ্য, এ রকম আরও অনেক দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। কিন্তু এগুলো প্রাত্যহিক ব্যাপার নয়, কখনো সখনো ওই ধ্বংসের বর্জ্য আমরা দেখি। অন্যদিকে মানুষের বর্জ্য প্রতিদিনের। মানুষের নিক্ষিপ্ত বর্জ্যে নদী-খাল সব বুজে যায়, পানি দূষিত হয়ে ওঠে। শহরে বন্দরে অনেক সময় দেখা যায় বর্জ্য দিয়ে নিচু জায়গা ভরাট করা কিংবা রাস্তা করা হয়। সেখানেই গড়ে ওঠে সুরম্য অট্টালিকা এবং প্রশস্ত বাঁধানো পাকা রাস্তা। গ্রিক পুরাণে হারকিউলিস নদীর ধারা বইয়ে দিয়ে ‘অজিয়ন’ আস্তাবল পারিষ্কার করেছিল।

পেটের বায়ু পর্দ বা উদগার, মুখ দিয়ে বেরোলে উদগার বা ঢেঁকুর, পায়ু দিয়ে বেরোলে পর্দ।

পর্দ নিয়েই যত সব বিপত্তি। এটি নিঃশব্দে নির্গত হলে এবং কুবাসিত না হলে কেউ টের পায় না, কিন্তু মানব সমাগমে সশব্দ হলেই সবাই সচকিত হয়, দায়ী ব্যক্তি মুহূর্তে শরমিন্দা হয়ে যায়। মঝে মাঝে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি অনির্দেশ্যভাবে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে যেন এ রকম তার দ্বারা সম্পন্ন হয়নি। প্রাচ্য দেশে এ রকম কাণ্ড কৌতুকের খোরাক, কিন্তু পাশ্চাত্য দেশে এ নিয়ে কেউ দৃকপাতও করে না। পাশ্চাত্যের মনুষেরা মুখ দিয়ে বায়ু নিঃসরণ করলে অর্থাৎ উদগার দিলেই কেবল আপত্তিকর মনে করে। যে দেশের যে রীতি! পর্দের গল্প কেবল গোপাল ভাঁড়ীয় নয়, এটি মাহাকাব্যিকও। মহাভারতের ইল্বল বাতাপি দুই রাক্ষস ভ্রাতার গল্প স্মরণ করুন। ওই দুই রাক্ষস অভিনব উপায়ে মুণি ঋষিদের হত্যা করে খেয়ে ফেলত। বড় ভাই ইল্বল আশ্রয়প্রার্থী মুণি ঋষিদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করত, পরে ছোট ভাই বাতাপিকে মেষ বানিয়ে বর্ধ করে টুকরো করে কেটে রান্না করে অতিথিকে খেতে দিত। অতিথি তৃপ্তির সঙ্গে খেয়ে ঢেঁকুর তুলত। গভীর রাতে ইল্বল ‘বাতাপি, বাতাপি’ করে ডাকলে বাতাপি ঋষির পেট চিরে বেরিয়ে আসত। তখন দুই ভাই মহানন্দে ঋষিকে খেয়ে ফেলত। এভাবে অসংখ্য মুণি ঋষি রাক্ষসের খাদ্য হলো। এ খবর মহামুণি অগস্ত্যের কাছে পৌঁছলে তিনি মহাকুপিত হয়ে একদিন ইল্বল বাতাপির এলাকায় গেলেন। উল্বল যথারীতি অতিথি সৎকার করলেন, বাতাপিকে মেরে তাকে খেতে দিলেন। অগস্ত্যও খেয়ে-দেয়ে মহাতৃপ্ত। গভীর রাতে ইল্বল আগের মতোই ‘বাতাপি, বাতাপি’ বলে ডাকল। কিন্তু অগস্ত্যের পেট চিরে বাতাপি আর বের হলো না। অগস্ত্য মুণি আড়মোড়া ভেঙে উঠে বললেন- কোথায় বাতাপি, আমি তো তাকে হজম করে ফেলেছি, হা হা হা। পুরোহিত ধৌম্য পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাসে যাওয়ার আগে উপদেশে বলেছিলেন, নিষ্ঠীবন অর্থাৎ থুতু ফেলতে কিংবা বায়ু নিঃসরণের সময় কোনোরকম শব্দ করা চলবে না, তাহলে বিপদে পড়ে যাবে। ধৌম্য পাণ্ডবদের কীরকম কঠিন কাজ দিয়েছিলেন তা একবার ভাবুন। বাংলাদেশের মুসল্লিরা ওজু করে পাকসাফ হওয়ার পর যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে বায়ু নিঃসরণ করে তাহলে নামাজ পড়তে বা কোনো ধর্মীয় কাজ করতে চাইলে তাকে আবার ওজু করতে হয়।

অধ্যাপক বিদেশি ছাত্রছাত্রীদের বাংলা পড়ান। এক ছাত্রী কোরীয়। বিবাহিতা ও বাচ্চা-কাচ্চার মা। তবে দেখতে সে সুন্দর। সে নিয়মিত ক্লাস করত। কিন্তু একবার দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থেকে পরীক্ষার আগে যখন সে ছাত্রী ছাত্রত্ব রক্ষার জন্য ফিরল, তখন অধ্যাপক তাকে প্রথমে একটু বকাঝকা করলেন। তার দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলল, সে এনজিও কর্মী হিসেবে কাজ নিয়েছে, এ জন্য দিনাজপুর না রংপুরের গ্রামাঞ্চলে তাকে কাজ করতে হয়। সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেশার প্রয়োজনে সে ওইসব এলাকার আঞ্চলিক ভাষাও মোটামুটি রপ্ত করছে, জীবনরীতিও বুঝে নিয়েছে এবং সর্বোপরি কুরআন পড়া শিখে নিয়েছে। তাকে কুরআন পড়াত এক ছোকরা মৌলবি। অল্প দাড়ি, মাথায় টুপি। অধ্যাপক ছাত্রীটির কাছে জানতে চাইলেন, সে ভিন্নধর্মী ও মুসলমান না হয়ে কীভাবে কুরআন পড়ত। তখন ছাত্রীটি জানাল এ জন্য তাকে ওজু করতে হতো, ওই ছোকরা মৌলবিই ওজুর নিয়ম-কানুন শিখিয়ে দিয়েছে, মাথা ওড়না দিয়ে ঢেকে দিতে হতো। তারপর কুরআন পড়া শুরু হতো, কিছুক্ষণ পড়ার মধ্যেই ‘আমার ওজু চলে গেছে’ বলে মৌলবি মসজিদ সংলগ্ন পুকুরঘাটে আবার ওজু করতে যেত এবং কিছুক্ষণ পরপরই সে ওজু করত। ছাত্রী জানতে চাইল ‘শিক্ষক, আমি তো বুঝতে পারিনি ওজু চলে যাওয়া মানে কী?’ অধ্যাপক তাকে বললেন পেটের বায়ু বের হলে ওজু চলে যায়, ছাত্রী বলল তবে এত ঘনঘন কেন? অধ্যাপক বললেন, সম্ভবত মৌলবির পেটে গ্যাস হয়েছিল, তবে মনে মনে বললেন, ওহে বিদেশি ছাত্রী অন্য কারণেও ওজু চলে যায় এবং তা ঘনঘনই যায়; এটাও বর্জ্য; অধ্যাপক দেখলেন, পাশে উপবিষ্ট চীনা ছাত্রীটি মুচকি মুচকি হাসছে।