বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড নিয়ে কমিশন গঠন ও বাস্তবতা

Social Share

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে যারা সরাসরি হত্যা করে তাদের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। কয়েকজনের ফাঁসির দন্ডাদেশ কার্যকর হয়েছে। কয়েকজন বিদেশে পলাতক থাকায় তাদের দন্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। সংগত কারণেই এ একটি ঘটনা নিয়ে যত লেখালেখি ও বই-প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে অন্য কোনো ঘটনা নিয়ে তা হয়নি। কিন্তু এতদসত্ত্বেও এ হত্যাকান্ডের সামান্যই আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা জানতে পেরেছি। তাই আমাদের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করা এবং এ ধরনের মহাবিপর্যয়কারী ঘটনা বাংলাদেশে যাতে আর না ঘটে তার জন্য এর সবকিছুই উপযুক্ত সময়ে উন্মোচিত হওয়া প্রয়োজন। সময়ের আগে ডেলিভারি চাইলে বিকলাঙ্গ শিশু জন্মাতে পারে। যার জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতো না তার হত্যাকান্ডের শুধু সম্মুখসারির হত্যাকারী নয়, এর নেপথ্যের সব কাহিনি এবং সব ষড়যন্ত্রকারীর মুখোশ উন্মোচন বাংলাদেশের মানুষ চায়। কারণ, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা মানে বাংলাদেশকে হত্যা করা। পঁচাত্তরের অব্যবহিত পর যারা ক্ষমতায় এসেছে তারা এবং তাদের নতুন প্রতিভূদের সব কর্মকান্ডই সাক্ষ্য দেয় তারা এ হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে হত্যা করতে চেয়েছে। এ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন কোন বিদেশি রাষ্ট্র জড়িত ছিল তাও এখন সবাই জানেন। সুতরাং বিদেশি রাষ্ট্র, ব্যক্তিবর্গ যারা জড়িত ছিল এবং তার সঙ্গে ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্র প্রস্তুতিতে দেশের ভিতর থেকে যাদের কর্মকান্ড দায়ী, সবার মুখোশ উন্মোচিত হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেমন সব সত্য জানতে পারবে, তেমনি এ ধরনের কর্মকান্ড আগামীতে বাংলাদেশে যাতে না ঘটে সে ব্যাপারে সতর্ক হতে এবং প্রতিহত করতে পারবে। আর সত্য ও সঠিক ইতিহাস সেটি যত তিক্ত হোক তা রাষ্ট্রের সম্পদ। পঁচাত্তরের পরে ক্ষমতায় আসা দুই সামরিক শাসক ও তাদের নতুন প্রতিভূরা কীভাবে ইতিহাস বিকৃত এবং ঐতিহাসিক সত্যকে আড়াল ও মিথ্যাচার করেছে তা এখন সবাই জানেন। জওহরলাল নেহেরু একবার বলেছিলেন, ইংরেজরা প্রায় ২০০ বছর শাসন করে ভারতবর্ষের যত ক্ষতি করেছে তার চেয়ে শতগুণ বেশি ক্ষতি করেছে ইতিহাস বিকৃত করে। সুতরাং গত বছর থেকে অনেকেই কমিশন গঠনের কথা বলছেন। এটি যেমন সংগত, তেমনি তাৎক্ষণিক জনপ্রিয় কথা। কিন্তু সেটি কখন

এবং কীভাবে হলে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে তা আবার অন্য কথা। এ দেশের মানুষ, কিছু কুলাঙ্গার ছাড়া সবাই বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসে, ধারণ করে। সুতরাং এ রকম একটা দাবির সঙ্গে গড্ডলিকা প্রবাহের মতো একটা সুর শোনা যাবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন ও নির্মম। তার চেয়ে দুর্গম ও নির্মম হচ্ছে রাজনীতি। রাজনীতির বাস্তবতা ও নির্মমতা ইতিহাসের শিক্ষা ও সত্যকে কেবলই প্রান্তিক করে ফেলে। গতকালের চরম শত্রু, আজকের মিত্র, আর মিত্র হয়ে যাচ্ছে কঠিন শত্রু। রাজনীতিতে ইনোসেন্ট বা সহজ-সরল চিন্তার কোনো জায়গা নেই। কৌটিল্য আর মেকিয়াভেলির অনুসারীরাই রাজনীতিতে বেশি সফল। শত দুঃখের পাথর বুকে ধারণ করে রাজনীতিক, বিশেষ করে শীর্ষ নেতৃত্বকে কখনো কখনো শত্রুর পাশে বসে- মিডিয়া ও মানুষের সামনে হাসি দিয়ে কথা বলতে হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই বলে থাকেন কত বিশাল বেদনা বুকে নিয়ে শুধু জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার জন্য তিনি কঠিন পথ পাড়ি দিচ্ছেন। তিনি এত দিনে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন পঁচাত্তরের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন কোন বিদেশি রাষ্ট্র জড়িত ছিল এবং এখন ওইসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে অবস্থান ও গুরুত্ব কেবল তিনিই অনুধাবন করতে পারবেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভিতর থেকে কারা ষড়যন্ত্রে যোগ দিয়েছে, কারা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে জানতে-অজান্তে নিজেদের উচ্চাকাক্সক্ষা চরিতার্থ করতে ষড়যন্ত্রকারীদের পথ প্রশস্তকরণে ভূমিকা রেখেছে, দলের মধ্যে অনৈক্য ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে, কারা কীভাবে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে ষড়যন্ত্রে ইন্ধন জুগিয়েছে এবং তারা কীভাবে এত বড় গুরুত্বপূর্ণ পদে এলো ইত্যাদি। কমিশন দ্বারা তদন্ত হলে তখন দল, সরকার ও প্রশাসন এবং অন্যান্য দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দ প্রত্যেকের ভূমিকা নির্মোহভাবে লিপিবদ্ধ হবে। শুধু ষড়যন্ত্রকারী নয়, কারা ষড়যন্ত্র ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে, সবার নামধামসহ সবকিছু বের হয়ে আসবে। এটা প্রয়োজন। কিন্তু সময়ের উপযুক্ততার কথা স্মরণে রাখতে হবে। আধাআধি কাজ করা ঠিক নয়, তাতে আরও দুর্নাম হয়। শুধু কোনো ব্যক্তি, ব্যক্তিবর্গ বা রাষ্ট্রকে টার্গেট করে কমিশন হওয়া ঠিক নয়। জন্ম আর মৃত্যুর মতো সব কাজেরই একটা সময় আছে। সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। যার জন্য দেখা যায় অনেক বড় বড় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ইতিহাসের অংশ ও সাক্ষী হিসেবে অনেক কিছু লিপিবদ্ধ করেছেন বটে, কিন্তু বলেছেন তার মৃত্যুর পর অথবা একটা নির্দিষ্ট দীর্ঘ সময়ের পর তা প্রকাশ করতে হবে। কারণ তিনি উপলব্ধি করেছেন যত সত্যই হোক না কেন, উপযুক্ত সময়ের আগে প্রকাশিত হলে তা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হবে। উদাহরণ হিসেবে মাওলানা আবুল কালাম আজাদের ‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’ গ্রন্থের কথা বলা যায়। আবার এমনও আছে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য শত বছরেও অনেক ঘটনার সবকিছু প্রকাশিত হয় না। সুতরাং কমিশন গঠনের বিষয়টি সমর্থন করলেও আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে- এখনই উপযুক্ত সময় কিনা। পঁচাত্তরের ঘটনার সময় অথবা আগে পরে যারা আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন, অন্য যারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন এবং যারা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের শীর্ষ অবস্থানে ছিলেন এদের অনেকেই এখনো সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আছেন। এদের সবার ভূমিকা কমিশনের প্রতিবেদনে লিপিবদ্ধ হবে, বিচার-বিশ্লেষণ হবে। পঁচাত্তরের মতোই ষড়যন্ত্র এখনো অব্যাহত আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটানা ১১-১২ বছর ক্ষমতায় থেকে অনেক বড় বড় কণ্টকপূর্ণ বাধা মাড়িয়ে রাষ্ট্রকে একটা টেকসই ও শক্তিশালী জায়গায় নিয়ে যাওয়ার মাঝপথে আছেন। সবকিছু টেকসই করার জায়গায় পৌঁছাতে এখনো অনেক পথ যেতে হবে। পথিমধ্যে বড় ধরনের সংকটের মধ্যে না পড়লে গন্তব্যে পৌঁছাবেন বলে আমার মনে হয়। সবকিছুই রাজনীতির অংশ। বড় রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের জন্য রাজনীতির প্রধান ক্ষেত্র তিনটি। নিজস্ব দলের ইন্টারনাল রাজনীতি, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ের পাওয়ার পলিটিকস। এর মধ্যে দলের ইন্টারনাল রাজনীতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি ঠিক থাকলে বাকি দুই ক্ষেত্রের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ সহজে ঘায়েল করতে পারে না। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি কয়েকটি ভালো বই লিখেছেন। প্রথমটি ‘দ্য ড্রামেটিক ডিকেড – দ্য ইন্দিরা গান্ধী ইয়ারস’, তারপরের দুটি ‘দ্য টার্ব্যুলেন্ট ইয়ারস’ ও ‘দ্য কয়োশিন ইয়ারস’। তিনটি বই তাঁর প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ধারাবাহিক বর্ণনা ও বিচার-বিশ্লেষণে সমৃদ্ধ। তা থেকে বোঝা যায় ইন্দিরা গান্ধীর জন্য সত্তর দশকের মাঝামাঝিতে নিজ দল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির টালমাটাল অবস্থার সুযোগ নিয়েছে দেশের অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ এবং সে সময়ে তাঁর প্রতিকূল থাকা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির পাওয়ার পলিটিকসের খেলোয়াড়বৃন্দ।

ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৫ সালের জুনে দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা জারি করতে বাধ্য হন। এটাই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ’৭৭ সালে নির্বাচনে হেরে জেলে পর্যন্ত যেতে হয়। তাতে মনেও হয় তিনি বাস্তবতাকে নতুন করে উপলব্ধি করেন। মাত্র তিন বছরের মাথায় ’৮০ সালে বিপুলভাবে বিজয়ী হয়ে সক্ষমতায় ফিরে আসেন। কিন্তু আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পাওয়ার পলিটিকসের প্রতিকূলতায় ’৮৪ সালে পাঞ্জাবের স্বর্ণমন্দির ক্রাইসিস এবং তার পথ ধরে সে বছর ৩১ অক্টোবর নিজ বাসভবনে দীর্ঘ পরীক্ষিত দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার কিছু দেশ বাদ দিলে বাকি দেশের মতো বাংলাদেশের জন্য যে সত্যটি প্রযোজ্য তা হলো- দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অনেক কিছুই নির্ভর করে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির বাস্তবতার ওপর। চীন, ভারত ও আমেরিকা- তিনটি প্রভাবশালী দেশের ত্রিমুখী, যা পরস্পরবিরোধী পাওয়ার পলিটিকসের মধ্যে থেকে বাংলাদেশকে বর্তমানে এগোতে হচ্ছে। শেখ হাসিনা একটা ভারসাম্য রক্ষা করে ভালোভাবেই এগোচ্ছেন। এ তিনটি দেশই একাত্তর থেকে পঁচাত্তর এবং তার পরবর্তী সময়ে বহুবিধভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে জড়িত। একেকটি অধ্যায়ে তাদের অবস্থান একেক রকম দেখেছি। ফিরে আসি কমিশন গঠনের কথায়। দেশ এখন অতিবঙ্গবন্ধু-প্রেমিক ও অতি-আওয়ামী লীগারে পরিপূর্ণ। এর মধ্যে একটা শ্রেণি বঙ্গবন্ধু নামের অপবিত্রতা কীভাবে করছে তার কিছু উদাহরণ সাম্প্রতিক সময়েও দেখা গেছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চিন্তার বিস্তার আগামী প্রজন্মের মধ্যে কীভাবে হবে তা নিয়ে কেউ কাজ করতে চায় না। শুধু মিডিয়ায় বড় বড় বাগাড়ম্বরপূর্ণ কথা বলে কিছু হাতিয়ে নিতে চায়। তাৎক্ষণিক জনপ্রিয় দাবি সব সময় রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না। এর বহু উদাহরণ দেশে-বিদেশে সর্বত্রই রয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড ঘিরে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও যেসব ব্যক্তি জড়িত বলে আমরা শুনি অথবা সব সময় আমরা যা আলোচনা করি, কেবল সেগুলোকে এক করে আনুষ্ঠানিকভাবে কয়েক শ পৃষ্ঠার একটা প্রতিবেদন দিলে তা হবে হাস্যকর। এর কোনো ঐতিহাসিক মূল্য থাকবে না। দেশি-বিদেশি সংশ্লিষ্টতার বহু কিছুই এখনো আমাদের জানার বাইরে আছে। সেগুলো বের করতে হলে অনেক দূর যেতে হবে, সেটি এই সময়ে কতটুকু বাস্তবসম্মত এবং সম্ভব হবে তা আগের থেকেই ভাবতে হবে। কমিশন শুরু করে মাঝপথে বন্ধ করা হবে আত্মঘাতী। এ লেখায় আমি যতটুকু বলতে পেরেছি তার সঙ্গে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা ইতিহাসের রক্ত পলাশ গ্রন্থের অন্তত ৩৩ থেকে ৮৩ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ভালো করে পড়লে আরও কিছুর আভাস পাওয়া যেতে পারে, যার জন্য আমার কাছে মনে হচ্ছে কমিশনের জন্য সময়টি বোধহয় এখনো পরিপক্ব হয়নি। আলোচিত কমিশন অবশ্যই একদিন হতে হবে আমাদের জাতীয় স্বার্থে। কিন্তু তার সঠিক সময় এখন হয়েছে বলে আমার মনে হয় না।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

[email protected]