বঙ্গবন্ধু না ফিরলে স্বাধীনতা বিপন্ন হতে পারত

51
Social Share

আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে পদার্পণ করেছি। ২০২১ সালের যাত্রার শুরুতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও সংকটের কথা নিয়ে যখন ভাবছি তখন দেখলাম এই লেখাটি ছাপা হওয়ার আগের দিন ১০ জানুয়ারি। সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারির কথা, যেদিন পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এলেন। একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক হওয়ার জন্য যার গর্ব হবে, তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে গভীর শ্রদ্ধায় অবনত হবেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি, যার জন্ম না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না এবং তিনি সে সময়ে ফিরে না এলে সদ্য অর্জিত স্বাধীনতা আমরা টিকিয়ে রাখতে পারতাম কিনা সেটা নিয়ে এখনো যখন বিচার-বিশ্লেষণে বসি তখন সন্দেহ জাগে। শুকরিয়া আদায় করি তিনি ফিরে এসেছিলেন। যদি একাত্তর সালে বাংলাদেশ স্বাধীন না হতো, অথবা মুক্তিযুদ্ধ শুরু না হতো এবং তা যদি আরও নয়টি বছর পিছিয়ে গিয়ে ১৯৭৯ সালের আগে মুক্তিযুদ্ধ শুরু এবং সম্পন্ন না হতো তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের সম্ভাবনা একেবারে ক্ষীণ হয়ে যেত। কারণ, ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বর মাসে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক আফগানিস্তান দখলের মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে যে প্যারাডিম শিফট সূচিত হয় তার ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে ভারতের সর্বাত্মক সমর্থন ও সহযোগিতা যেভাবে পাওয়া গেছে তা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না। তারপর সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, আমেরিকার একচ্ছত্র পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভাব এবং চীনের উত্থান ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ইত্যাদি বিশ্লেষণ করলে ১৯৭৯ সালের পরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের কথা ভাবাই যায় না। সুতরাং ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধুর বাঙালি জাতির শীর্ষ নেতৃত্বে আরোহণ এবং একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর হুকুম তিনি দিয়েছিলেন বলেই আজ বাংলাদেশ স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র, অন্যথায় আমাদের স্বাধীনতা অর্জন হয়ে যেত সুদূর পরাহত। তারপর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা না আসার শঙ্কায় সবকিছুর ওপর ঘনীভূত কালো মেঘ, বঙ্গবন্ধু ফিরে না এলে সেগুলো আরও ঘনীভূত হয়ে অপ্রত্যাশিত ঘূর্ণিঝড়ের প্রলয়ে সবকিছু তছনছ হয়ে যেতে পারত। ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১০ জানয়ারি ১৯৭২, ২৫ দিনে ভারত-ভুটান ব্যতীত আর কেউ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। জামায়াত নেতা গোলাম আযম পাকিস্তান হয়ে লন্ডনে যান এবং সেখান থেকে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার আন্দোলন শুরু করেন। বঙ্গোপসাগরে অপেক্ষমাণ আমেরিকার রণতরী সপ্তম নৌবহর যে কোনো একটি অজুহাতে হস্তক্ষেপ করলেই বাংলাদেশ ভিয়েতনামে পরিণত হতো। এখানে ভারত এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। পাকিস্তানের প্রায় ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দী এবং পশ্চিম ফ্রন্টে ৫ হাজার ১৩৯ বর্গমাইল এলাকা একাত্তরের যুদ্ধে ভারতের দখলে আসা, এই দুটি বড় তুরুপের তাস ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন বলেই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পাকিস্তান দ্বিতীয় কোনো চিন্তা করার সুযোগ পায়নি। দ্বিজাতি তত্ত্বে বিশ্বাসী কিছু অকৃতজ্ঞ মানুষ যখন বলে একটি তাঁবেদার রাষ্ট্র বানাবার জন্যই ভারত মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দিয়েছিল, সে কথা খন্ডিত হয়ে যায় ইন্দিরা গান্ধীর উপরোক্ত ভূমিকার মধ্য দিয়ে। ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে ভালো করে জানতেন, চিনতেন। বাংলাদেশকে নিয়ে অন্য কোনো চিন্তা থাকলে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য এতকিছু ভারত করত না। বাংলাদেশ থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের জন্য বঙ্গবন্ধুর দ্রুত ফিরে আসাটা ভারতের জন্যও অপরিহার্য ছিল। বঙ্গবন্ধু ফিরে আসার ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও বিভাজন দ্রুত নিরসন হয়ে যায়, বিশ্বের সব প্রান্ত থেকে স্বীকৃতি আসতে থাকে এবং ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় বসে অভূতপূর্ব ভারত-বাংলাদেশ ২৫ বছর মেয়াদি মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মধ্য দিয়ে আমেরিকান সপ্তম নৌবহরের অজুহাত সৃষ্টির সব পথ বন্ধ হয়ে যায় বলেই ভারত তাদের সেনাবাহিনী মার্চ মাসেই ফেরত নিতে সক্ষম হয়। তাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ভারতের ক্রেডিবেলিটি বা গ্রহণযোগ্যতা ভীষণভাবে বৃদ্ধি পায় এবং জামায়াত নেতা গোলাম আযমসহ সব পরাজিত পক্ষের অপপ্রচারের আর কোনো মূল্য থাকে না। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ফেরত না এলে উপরোক্ত কার্যাদি সম্পন্ন হতো না এবং সবকিছুই বিপদগ্রস্ত হতে পারত। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। বিংশ শতাব্দী পেরিয়ে একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশ যেন আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক এবং বৈশ্বিক বাস্তবতায় একটি প্রাসঙ্গিক রাষ্ট্র হিসেবে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারে সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই গণপরিষদ ও সংবিধান প্রণয়ন কমিটিকে বঙ্গবন্ধু দিক-নির্দেশনা দেন। বাহাত্তর সালের সে সময়ে ইউরোপের অন্ধকার যুগ এবং সমৃদ্ধির ইতিহাস, দুটোই বঙ্গবন্ধুর সামনে ছিল। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন, ভ্রান্ত দ্বিজাতি তত্ত্বের পরিণতিতে সাতচল্লিশের কয়েক মাসের মধ্যে ২০ লাখ মানুষের রক্তে ঝিলাম-গঙ্গা-যমুনার পানি রঞ্জিত হওয়ার ভয়াবহতা এবং ধর্ম রক্ষার মিথ্যা অজুহাতে ২৩ বছর পাকিস্তানি শাসকদের নির্যাতন ও বৈষম্যের স্টিমরোলার ইত্যাদি সব ইতিহাসের শিক্ষার আলোকেই রচিত হয় বাহাত্তরের সংবিধান। মহাত্মা গান্ধীর জীবন ও রাষ্ট্র দর্শনের প্রতিফলন ঘটে বাহাত্তরের সংবিধানে। গান্ধী ব্যক্তিগত জীবনে একান্ত ধর্মনিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু রাজনীতি থেকে ধর্মকে সম্পূর্ণ দূরে রেখেছিলেন। লেবাসধারী ধর্ম গুরুরা নিজস্ব ও গোষ্ঠী স্বার্থ উদ্ধারের জন্য কতখানি অপধর্ম করতে পারে তার বর্ণনা পাওয়া যায় গান্ধীর লেখা আত্মজীবনী ‘দ্য স্টরি অব মাই এক্সপেরিমেন্ট উইথ ট্রুথ’ গ্রন্থে। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে আসার পর কংগ্রেস রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িত হওয়ার আগে সমাজের চলমান বাস্তবতা দেখার জন্য গান্ধী সারা ভারতবর্ষ সফর করেন। উপরোক্ত বইয়ের ৭৪ নম্বর অধ্যায়ে ১৫২-১৫৪ পৃষ্ঠায় কাশী বিশ্বনাথ মন্দির পরিদর্শনের অভিজ্ঞতার বর্ণনা লিখেছেন গান্ধী। বলেছেন, মন্দিরের প্রবেশ পথ থেকে ধর্মগুরুর দর্শন ও কথাবার্তায় ঈশ্বর ও ধর্মের কিছুই দেখতে পেলাম না। ধর্মগুরুর সামনে রক্ষিত পাত্রে সব দর্শনার্থীর গুরু দক্ষিণা প্রদানের প্রথা রক্ষায় চরম অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটি মাত্র পয়সা রাখার সঙ্গে সঙ্গে উপবিষ্ট ধর্মগুরু বেদম ক্ষেপে অভিশাপ দিলেন। ধর্মের প্রতি অবজ্ঞার জন্য দোজখে নিক্ষিপ্ত হওয়ার অভিশাপসহ আরও গালাগালি এবং পয়সাটি ছুড়ে ফেলে দিলেন। এক পয়সা অপচয় রক্ষা হওয়ার আনন্দে পয়সাটি তুলে নিয়ে আমি রওনা হতেই পিছন থেকে ধর্মগুরুর ডাক পড়ল। বললেন, তোমার অমঙ্গল ঠেকাতেই পয়সাটি ফেরত দেওয়া ঠিক হবে না, ওটা রেখে যাও। চুপচাপ পয়সাটি আবার ফেলে দিয়ে বের হয়ে আসি। গান্ধীর পরবর্তী মন্তব্য, ঈশ্বর এবং ধর্মের নামে ভন্ডামি আর অধর্ম কীভাবে হতে পারে তা দেখতে চাইলে এরকম পবিত্রতম জায়গায় আসার বিকল্প নেই। নজরুল ইসলামের কবিতায় গান্ধীর কথারই প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। ‘মানুষ’ কবিতায় নজরুল বলেছেন, “তব মসজিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবি/ মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবী।” ‘দ্য পিটি অব পার্টিশন’ গ্রন্থের একেবারে প্রারম্ভে তিন ভাগ থেকে পাঁচ পৃষ্ঠায় ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার হৃদয়বিদারক বর্ণনা দিয়েছেন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক আয়েশা জালাল। ২০ লাখ নারী-পুরুষ শিশুর নির্মম হত্যাকান্ড ও প্রায় দেড় কোটি মানুষ চৌদ্দপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে এপার-ওপার স্থানান্তরের চরম হিংসা-প্রতিহিংসার পরিণতিতে এবং তার জের ধরে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশে এখনো ধর্মের নামে যেরকম রক্তরক্ষণ চলছে তার কারণেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ান ব্লক থেকে অনেক বেশি সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়া সেরকম ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে না। বহুল প্রত্যাশিত সার্ক এখন ভেন্টিলেশনে কাতরাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু যদি আর ১০-১৫টি বছর বেঁচে থাকতেন তাহলে ইন্দিরা গান্ধীকে ওরকম নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হতে হতো না এবং বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র দর্শনের প্রভাবে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার চিত্রটি আজ একেবারে ভিন্ন রকম হতো। কিন্তু পাকিস্তানের প্রতিহিংসা পরায়ণতার শিকার হলেন বঙ্গবন্ধু এবং ইন্দিরা গান্ধী, দুজনই। তাতেই সব সম্ভাবনার অপমৃত্যু হলো। বাংলাদেশের দুই সামরিক শাসক ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ ১৫ বছর বন্দুকের জোরে ক্ষমতায় থেকে সংবিধানকে তছনছ করাসহ যা করেছেন সেটি কোনো বিচারেই বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের কাজ বলা যায় না। ক্ষমতার অন্ধ মোহে তারা পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রতিশোধ পরায়ণতার এজেন্ডাই বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করেছেন। সেই পথ ধরে জামায়াত-মুসলিম লীগসহ ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠী বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে যায়। তারপর দুই সামরিক শাসক ও তাদের পরবর্তী প্রতিভূদের পৃষ্ঠপোষকতায় তারা আজ দানবীয় রূপ ধারণ করেছে। এটাই আজ বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখন্ডতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। এই অপশক্তির কবল থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে চাইলে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর দেশে ফিরে আসার তাৎপর্য ও মহিমা তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। এটাই হোক স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মহোত্তম কাজ।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

[email protected]