বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা

659
Social Share
  • ডাঃ কামরুল হাসান খান:

১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতার স্বপ্ন ভাংতে পূর্ব বাংলার বাঙালীদের বেশি সময় লাগেনি। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানীদের মনোভাব স্পষ্ট হয়ে যায়। নতুন স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া তো দূরের কথা আবার নতুন করে অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে নামতে হয় বাঙালী জাতিকে। তখন নেতৃত্ব দিয়েছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মৌলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী প্রমুখ। সে সময় পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে তরুণ নেতাদের উত্থান হয়। সাহস, উদ্যোগ, পরিশ্রম, আন্তরিকতা ও স্পষ্ট বক্তব্য প্রদানের জন্য সকলের দৃষ্টি কাড়েন তরুণ ছাত্র নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। শৈশব-কৈশোর থেকেই যিনি দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হয়ে উঠেন। সে সময়ে তিনটি বিষয় তাঁকে দারুণভাবে আলোড়িত-অনুপ্রাণিত করে-১) বাংলার রূপ-প্রকৃতি আকৃষ্ট করে তাঁর মাঝে জাগিয়ে তুলে গভীর দেশপ্রেম ২) বাংলার দুখী মানুষের কষ্ট-যন্ত্রণা-বঞ্চনা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করে তুলে ৩) পরিবারের অসাধারণ সহযোগিতা-বাবা-মা-স্ত্রী-সন্তান কখনও পারিবারিক বন্ধন বা ভালবাসার আবেগ দিয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি বরং সকল সময় বাড়িয়ে দিয়েছেন সহযোগিতার হাত নিজেদের বঞ্চিত করে। বাবার একটি কথা ‘ঝরহপবৎরঃু ড়ভ ঢ়ঁৎঢ়ড়ংব ধহফ যড়হবংঃু ড়ভ ঢ়ঁৎঢ়ড়ংব’ বঙ্গবন্ধুর চিরকালের প্রেরণা হয়ে ছিল। সেই থেকে বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেন এবং লক্ষ্য নির্ধারণ করেন বাংলার মানুষের মুক্তি, বাংলার স্বাধীনতা এবং দুখী মানুষের মুখে হাসি ফুটানো। এ লক্ষ্যেই তাঁর সকল ধ্যান-জ্ঞ্যান-জীবন-যাপন, কর্মকা- পরিচালিত হয়েছে।

১৯৬২ সালের ২৪ মার্চ মাঝরাতে দৈনিক ইত্তেফাকে শেখ মুজিব, মানিক মিয়া এবং ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় উপহাইকমিশনের পলিটিক্যাল অফিসার শশাংক শেখর ব্যানার্জীর একটি বৈঠক হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা আলোচনার পর শেখ মুজিব ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছানের জন্য একটি চিঠি ব্যানার্জীর হাতে দিলেন। চিঠিটি নানা নিয়ম মেনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরুর কাছে পৌঁছানো হয়েছিল। চিঠিতে বলা হয়েছিল- পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৬৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চের মধ্যে শেখ মুজিব লন্ডনে স্বাধীনতার ঘোষণা করে প্রবাসী সরকার গঠন করবেন। ভারত তখন চীনের সঙ্গে যুদ্ধে বিপর্যস্ত। দিল্লী থেকে খবর পাঠানো হলো, মুজিবের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনায় আছে। তবে তাঁকে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। মুজিব ভাবলেন, ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের আমলাদের কারণেই দেরি হচ্ছে। তিনি কৌশল পাল্টালেন। ১৯৬৩ সালের ২৭ জানুয়ারি শেখ মুজিব গোপনে আগরতলা গিয়ে ১৫ দিন অবস্থান করেন। ত্রিপুরায় মুখ্যমন্ত্রী শচিন্দ্রলাল সিংহের সঙ্গে তাঁর কয়েক দফা বৈঠক হয়। শেখ মুজিবের প্রস্তাব অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রী দিল্লী গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে দেখা করে প্রস্তাবটি পেশ করেন। প্রধানমন্ত্রী মুজিবকে জানিয়ে দেন, তাঁকে সাহায্য দেয়ার ব্যাপারে সম্মতি আছে। কিন্তু সবকিছু ঢাকা ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমেই যোগাযোগ রাখতে হবে, আগরতলার মাধ্যমে নয়। ১৯৬৩ সালের পর তিনি আর আগরতলা যাননি বলে জানা যায়। ভারতের সাহায্য নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করার কৌশল সম্ভবত তিনি পরিবর্তন করেছিলেন।

১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট পাকিস্তান গণপরিষদে শেখ মুজিব স্পীকারের উদ্দেশে বলেছিলেন: ‘মহোদয়, আপনি দেখবেন যে, ‘পূর্ব বাংলা’ নামের বদলে তাঁরা ‘পূর্ব পাকিস্তান’ বসাতে চায়। আমরা কতবার দাবি জানিয়েছি যে এটা হবে ‘বাংলা’। বাংলার একটা ইতিহাস আছে, এর নিজস্ব ঐতিহ্য আছে। জনগণের সঙ্গে আলোচনা করেই কেবল এটা বদলানো যায়। যদি আপনারা এটা পরিবর্তন করতে চান, তাহলে আমরা বাংলায় ফিরে যাব এবং মানুষকে বলব তাঁরা এটা গ্রহণ করবে কিনা।’ ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তানে নতুন সংবিধান চালু হলো। পাকিস্তান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলো। সংবিধানে উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেয়া হয়। নতুন সংবিধান চালু হওয়ায় পর পূর্ব বাংলা আনুষ্ঠানিকভাবে হয়ে গেল পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব বাংলা নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান রাখার ব্যাপারে শেখ মুজিবের ঘোরতর আপত্তি ছিল।

১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু দিবসে তাঁর সমাধি প্রাঙ্গণে এক আলোচনা সভায় শেখ মুজিব একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন- ‘একসময় দেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে ‘বাংলা’ কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকু মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে, আমি ঘোষণা করিতেছি- আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম হইবে পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে শুধু ‘বাংলাদেশ’। (ইত্তেফাক, ৬ ডিসেম্বর ১৯৬৯)। ১৯৭০ সালের এপ্রিল মাসে ইয়াহিয়াকে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন দেখানো হয়। এর সঙ্গে ছিল টেপে ধারণকৃত বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ। তিনি বলছেন, ‘আমার লক্ষ্য বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। নির্বাচন হয়ে গেলে আমি এলএফও ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করে ফেলব। নির্বাচনের পরে কে আমাকে চ্যালেঞ্জ করবে?’ ইয়াহিয়া শেখ মুজিবের কণ্ঠস্বর চিনতে পেরেছিলেন।

১৯৭০ সালের ৭ জুন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার কাজ শুরু করেন। সভায় তিনি ঘোষণা করেন, ‘আইয়ুব নগর এখন থেকে হবে শেরেবাংলা নগর, রেসকোর্স হবে সোরওয়ার্দী উদ্যান।’ এই জনসভায় বঙ্গবন্ধু প্রথমবার ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উচ্চারণ করেন।

১৯৭১ সালের রক্তস্নাত ২৫ মার্চের কালরাত। বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়ি। সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, গাজী গোলাম মোস্তফা ও অন্য নেতৃবৃন্দকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু প্রায় সারাক্ষণ লাইব্রেরি রুমে বসেছিলেন। সেদিন সবার চোখে-মুখে ছিল উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার ছাপ। একমাত্র বঙ্গবন্ধুই মুখে সেনাপতির সুদৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে সবার সঙ্গে আলাপ করছেন। এরই মাঝে বঙ্গবন্ধু অন্যান্য ছাত্র ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ এবং নির্দেশ দিয়ে এক এক করে বিদায় দেন। রহস্যের ব্যাপার, সেদিন খন্দকার মোশতাক আহমেদকে কখনও দেখা যায়নি। বঙ্গবন্ধুর বন্ধুরা তাঁকে ঢাকা ছেড়ে যেতে সম্মত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি রাজি হননি। তিনি সাংবাদিকদের পরে বলেছিলেন ‘আমার জনগণকে রক্ষা করবার দায়িত্ব ছিল। আমি যদি সেখানে না থাকতাম তবে আমার খোঁজে ইয়াহিয়া খান গোটা শহর জ্বালিয়ে দিত।’

বঙ্গবন্ধু বাড়িতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ তাঁর জীবনে গ্রেফতার কোন নতুন বিষয় ছিল না। তাঁকে হতোদ্যম করার জন্য বহুবারই কারাগারে আটক করা হয়েছে। কিন্তু সামরিক শাসকদের চক্রান্ত সব সময়ই ব্যর্থ প্রমাণ হয়েছে। এবার তারা তাঁকে মেরে ফেলতেও পারে, তবে সেটা তাঁর কাছে গৌণ ব্যাপার ছিল। একটি দেশের নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা পালিয়ে যেতে পারেন না। সে রাতে এত উত্তেজনার মাঝেও বঙ্গবন্ধু শান্তভাবে পাইপ টানছিলেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, তাঁর যা কিছু করণীয়, সবই তিনি করেছেন। ইতোমধ্যে সারা পূর্ববঙ্গের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত তিনি বাঙালী জনগণকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করে ফেলেন। শুধু গ্রেফতার কেন, যে কোন পরিস্থিতির জন্য তিনি অপেক্ষা করছিলেন। ২৫ মার্চের কালরাতে একটি দেশের জন্মের প্রসববেদনার সময় আতুর ঘরে ফেলে কি কখনও কোন জনক চলে যেতে পারে? উদ্ধৃত ঘটনা এবং কথার মধ্য থেকে বোঝা যায় জনকের দায়িত্ববোধ, চূড়ান্ত ঈড়সসরঃসবহঃ, সর্বোচ্চ ত্যাগ এবং ঝুঁকি নেয়ার অসম সাহস। একা একটা মানুষ পাকিস্তান নামক একটি রক্ত পিপাসু সামরিক জান্তার দেশের মুখোমুখি। তাঁকে উড়িয়ে দিতে পারত, নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারত- এসব তিনি কিছুই ভাবেননি। তিনি প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছেন তেইশ বছরের তিলে তিলে গড়ে ওঠা স্বাধীনতার গর্ভপাত- গোলাবারুদ, আগুন, কান্না আর মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। এটি কেবল সম্ভব ছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পক্ষেই। তিনিই সঠিক পিতা।

‘কায়হান ইন্টারন্যাশনাল’ পত্রিকার সাংবাদিক আমির তাহেরি একাত্তরের জুলাই মাস নাগাদ জেনারেল টিক্কা খানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করেছিলেন কেন? টিক্কা খান জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমার কো-অর্ডিনেশন অফিসার একটি তিন ব্যান্ড রেডিও নিয়ে ছুটতে ছুটতে এসে বলেছিল, স্যার শুনুন, শেখ সাহেব স্বাধীনতার ঘোষণা করছেন।’ আমি নিজে রেডিওর এক বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সিতে সেই স্বাধীনতার ঘোষণা শুনি। তাই তাঁকে গ্রেফতার করা ছাড়া আর কোন বিকল্প ছিল না। সাংবাদিক আরও জানতে চাইলেন, ‘তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে শেখ মুজিবও যদি ভারতে যেতেন তবে সেক্ষেত্রে আপনি কি করতেন স্যার? উত্তরে টিক্কা খান বলেছিলেন, আমি খুব ভাল করে জানি মুজিবের মতো একজন নেতা তাঁর জনগণকে পরিত্যাগ করবে না। আমি গোটা ঢাকা শহরে তাঁকে খুঁজে বেড়াতাম এবং একটি বাড়িও তল্লাশির বাইরে রাখতাম না। তাজউদ্দীন অথবা তাঁর মতো অন্য নেতাদের গ্রেফতারের কোন অভিপ্রায় আমার ছিল না। সে কারণেই তাঁরা এত সহজে ঢাকা ছেড়ে যেতে পেরেছিলেন। জেনারেল টিক্কার এই উক্তি থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, বঙ্গবন্ধুই তাদের চিন্তার প্রধান কারণ ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে গ্রেফতারের ঘটনা সম্পর্কে মেজর সিদ্দিক সালেক তাঁর ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ নামক গ্রন্থে লিখেছেন, ‘যখন প্রথম গুলিবর্ষণ করা হয় তখন রেডিও পাকিস্তানে ক্ষীণভাবে শেখ মুজিবের কণ্ঠ শোনা যায়। মনে হলো পূর্বে রেকর্ডকৃত বাণী। শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ ঘোষণা করেছেন। কয়েক মিনিট পর ৫৭ ব্রিগেডের মেজর জাফর তার বেতার কণ্ঠ শুনতে পেলেন (বিগ বার্ড ইন দ্য কেজ)।

২৫ মার্চ রাতে যখন প্রায় বারোটা বাজে, এমন সময় একটা টেলিফোন আসল, বঙ্গবন্ধুর পার্সোনাল এইড হাজী গোলাম মোরশেদ টেলিফোন ধরলে ওপাশ থেকে বলেন যে, বঙ্গবন্ধুকে বলেন, মেসেজ পাঠানো হয়ে গিয়েছে। মেশিন নিয়ে কি করব? তখন বঙ্গবন্ধু হাজী গোলাম মোরশেদকে বললেন যে, ওই ব্যক্তিকে বল মেশিন ভেঙ্গে সে যেন পালিয়ে যায়। লন্ডনের দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফের সাংবাদিক ও দক্ষিণ এশিয়ার করেস্পন্ডেন্ট ডেভিড লোশাক, যিনি সর্বপ্রথম বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ভাষণটি উল্লেখ করেন, তিনি লিখেছিলেন, গলার আওয়াজ খুব ক্ষীণ ছিল এবং যাতে মনে হচ্ছিল খুব সম্ভবত ওটা আগেই রেকর্ড করা ছিল। পাকবাহিনী ট্রান্সমিটার খুঁজতে ইস্টার্ন ওয়ারলেস ডিভিশনের ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার প্রকৌশলী নূরুল হকের ওয়ারলেস কলোনির বাসা ঘেরাও করে এবং ২৯ মার্চ উনাকে বাসা থেকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। উনি আর ফিরে আসেননি।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে সামরিক বাহিনীর আক্রমণের অব্যবহিত পূর্বে এবং পাকিস্তান বাহিনী কর্তৃক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারের প্রাক্কালে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা ছিল : ‘এটিই সম্ভবত আমার শেষ বার্তা : আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণের নিকট আমার আহ্বান, আপনারা যে যেখানেই থাকুন এবং আপনাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করুন। যতদিন পাক হানাদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটি বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত না হয় এবং যতদিন আমাদের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হয় ততদিন সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন।’

শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার বার্তাটি পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশে প্রচারের জন্য মধ্যরাতের কিছুক্ষণ পরে চট্টগ্রামে প্রেরণ করা হয়। মার্চ মাসের ২৬ ও ২৭ তারিখে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র (পরের নামকরণ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র) থেকে বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার আরও দুটি ঘোষণা প্রচার করা হয়।

গণপরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যগণ ১০ এপ্রিল কলকাতায় মিলিত হয়ে একটি প্রবাসী আইন পরিষদ গঠন করে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের খসড়া প্রণয়ন করেন। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী বৈদ্যনাথতলায় (পরবর্তী নাম মুজিবনগর) এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে গণপরিষদ সদস্য অধ্যাপক এম ইউসুফ আলী আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এ ঘোষণার মাধ্যমে নবগঠিত আইন পরিষদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে। এ ঘোষণায় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন এবং ২৬ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা কার্যকর বলে ঘোষণা করা হয়। এ ঘোষণাবলে প্রবাসী মুজিবনগর সরকার বৈধ বলে বিবেচিত হয় এবং এ ঘোষণায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকলের মধ্যে চেইন অব কমান্ড স্থাপনের নির্দেশ দেয়া বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের ঢাকার পরিস্থিতি ও শেখ মুজিবকে আটক ও স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদানের ঘটনা ২৭ মার্চেই বিশ্বের অন্তত ২৫টি দেশের পত্রিকা বা সংবাদ সংস্থার খবরে প্রকাশিত হয়।

২৬ মার্চ থেকে হোয়াইট হাউসে প্রতিনিয়ত একদিন দুদিন পর পর রিপোর্ট এবং পূর্ব পাকিস্তানের বিষয় নিয়ে মিটিং হতে থাকে। মার্চের ২৯ তারিখে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সঙ্গে কিসিঞ্জারের আলাপে নিক্সনের ইয়াহিয়ার প্রতি সমর্থনের কথা প্রকাশ্যে উঠে আসে। ২৬ মার্চের ইমারজেন্সি ওয়াশিংটন বিশেষ কর্মসূচী গ্রুপ মিটিং- এ বলা হয় পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করা বঙ্গবন্ধুর সকল প্রস্তুতি ছিল। মোক্ষম সময়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে প্রয়োজনে তিনি কারাবরণ করবেন। করেছেনও তাই। ২৫ মার্চ ঢাকা শহরে গোলাগুলি শুরু হয়ে গেলে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা সংবলিত বাণী পাঠান, যা তিনটা মাধ্যম থেকে প্রচারিত হয়েছিল।

‘১৯৭১ সালে গ্রেট ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন স্যার এডওয়ার্ড হিথ। তিনি ১৯৯৬ সালের এপ্রিল মাসে লিখিতভাবে এই মর্মে বিবৃতি দিয়েছেন, ‘১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামে নতুন দেশের নাম ঘোষণা করেন।’ সেই লিখিত দলিলে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল একটি ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ এবং গণতান্ত্রিক যুদ্ধ। বাঙালী জাতির উক্ত স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল সে সময়ের বিশ্বে সংঘটিত অন্যতম মহান ঘটনা। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে।

স্বাধীনতা অর্জনের পর ২২ মার্চ ১৯৭২ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ, ১৯৭২ (ঈড়হংঃরঃঁঃবহঃ অংংবসনষু ড়ভ ইধহমষধফবংয ড়ৎফবৎ,১৯৭২) জারির মাধ্যমে ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয় বাংলাদেশ গণপরিষদ। তবে বহিষ্কৃত ও পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য পোষণকারী সদস্যরা গণপরিষদের সদস্য পদ লাভের অযোগ্য ছিলেন। বাংলাদেশ গণপরিষদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১০ এপ্রিল, ১৯৭২।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র’ পনেরো খ-ের সিরিজ গ্রন্থের ২০০৪ সালের পুনর্মুদ্রণকৃত তৃতীয় খণ্ডের প্রথম পৃষ্ঠায় মেজর জিয়াউর রহমান ২৭ মার্চ ১৯৭১ তারিখে প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন মর্মে বর্ণনা করা হয়।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চিকিৎসক জনাব এম এ সালাম ২০০৪ সালের পুনর্মুদ্রিত বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র গ্রন্থ সিরিজের তৃতীয় খ-টি বাজেয়াপ্ত এবং বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস বিকৃতকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। বিচারপতি জনাব এ বি এম খায়রুল হক এবং বিচারপতি জনাব মোঃ মমতাজ উদ্দিন আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দ্বৈত বেঞ্চ উক্ত রিট মোকদ্দমাটি শুনানি শেষে ২১ জুন ২০০৯ তারিখের এক রায়ে ২০০৪ সালে পুনর্মুদ্রিত ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র’-এর তৃতীয় খ-ের প্রথম পৃষ্ঠায় ‘মেজর জিয়ার প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা’ শিরোনামে মুদ্রিত বর্ণনা ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তারিখের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিধায় এবং সাংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫০-এর সঙ্গেও সাংঘর্ষিক এবং সংবিধান পরিপন্থী মর্মে ঘোষণা করেন; এবং উপরোক্ত খ-টি বাজেয়াফত করার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেয়া হয়। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের উক্ত রায় সকল কর্তৃপক্ষ ও ব্যক্তির জন্য অবশ্যই পালনীয় এবং বাধ্যকর। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায়, সংবিধান, সংসদের কার্যবিবরণী এবং হাই কোর্টের রায় অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ে কোন বিতর্কের সুযোগ নেই। বাংলাদেশের মীমাংসিত বিষয় নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা দেশকে বার বার সঙ্কটে ফেলার অপপ্রয়াস। এবং কাজটি তারাই করে চলেছে যারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, যারা স্বাধীনতা বিরোধী।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ, বাংলাদেশের ইতিহাস, ঘোষণার এক অপরিহার্য অঙ্গ। জাতির পিতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। আমরা সেই দুর্ভাগা জাতির প্রমাণ দিচ্ছি। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে চলেছেন। বিশ্বের সামনে আজ বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ ত্থেকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরের ঘোষণা দিয়েছে। এখন প্রয়োজন দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। রাজনীতি বা রাজনৈতিক দল যেন দেশের উন্নয়নে-শান্তিতে বাঁধা না হয়ে দাঁড়ায় আমদের গৌরবের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে সকল রাজনৈতিক দলের কাছে এটা দেশবাসীর প্রত্যাশা।

লেখক : সাবেক উপাচার্য

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়