বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন: স্মৃতিচারণায় পঙ্কজ সাহা

15
Social Share

ডেস্ক রিপোর্ট: আজ ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। পাকিস্তানের বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৭২ সালের এই দিনেই স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন বঙ্গবন্ধু।
আর এই দিনটিতেই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ভারতের ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’ (আকাশবাণী) এর প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং কলকাতার দুরদর্শন কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক পঙ্কজ সাহা।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পঙ্কজ সাহাই ছিলেন আকাশবাণী কলকাতার সাংবাদিক। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পক্ষে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আকাশবাণীর সংবাদ সংগ্রহ এবং বঙ্গবন্ধু-মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন রেডিও অনুষ্ঠান করে মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন তিনি। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকারের তরফে পঙ্কজ সাহাকে ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ পদক দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে কলকাতায় বসে এদিন পঙ্কজ সাহা বলেন, ‘১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। এই দিনটার কথা কোন বাঙালিই ভুলতে পারবে না। এই দিনটির সাথে আমার নিজের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশে ফেরার জন্য ওই বছরের ৯ জানুয়ারি ভোর ছয়টায় তিনি লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। সেখান থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকা। হিথরো বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে তার সাথে দেখা করেন ভারতের উর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা ও ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধিরা। সেখানেই বঙ্গবন্ধুর সাথে টেলিফোনে আধা ঘণ্টা কথা হয় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর। মাঝে কিছু বিরতির পর ফের এক ঘণ্টা তাদের উভয়ের মধ্যে টেলিফোনে কথা বার্তা হয়। এরপর বঙ্গবন্ধু দিল্লি হয়ে ঢাকায় ফেরেন। এই যাত্রাপথে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গী হয়েছিলেন ভারতীয় কূটনীতিক শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জি, ভারতীয় হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেন ও তার স্ত্রী।’
‘ঢাকায় ফেরার আগে দিল্লিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনসভা হয়। সেখানে একই মঞ্চ থেকে ইন্দিরা ও বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা করেন। ভারতের তরফে বিশেষ করে ইন্দিরা গান্ধী সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।’
‘যাই হোক স্বাভাবিক ভাবেই বঙ্গবন্ধু দেশের ফেরার ব্যাপারে খুবই উৎফুল্ল ছিলেন। তিনি অস্থির হয়ে উঠেছিলেন যে কত তাড়াতাড়ি তিনি দেশের মাটিতে পা রাখবেন। তিনি মাঝে মধ্যেই বলছিলেন যে, স্বাধীন বাংলা আমার বাংলা।’

‘একটা সময় বঙ্গবন্ধু উঠে দাঁড়িয়ে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’ এই গানটা গাইতে শুরু করেন। সেখানে তার সাথে যেকজন বাঙালি ছিলেন তাদেরকেও সেই গানটি গাইতে অনুরোধ করেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ওই বিমান যাত্রাপথেই এই গানটা হওয়ার পর বিমানে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দেন এই গানটিই হবে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। যেটা আমার কাছে খুব উল্লেখযোগ্য ঘটনা বলে মনে হয়।’

‘পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় ওই বিমান যাত্রা পথেই বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করেন যে কলকাতার মানুষ আপনাকে দেখতে চাইছে। তারা সকলেই অস্থির হয়ে আছে। আপনি কলকাতায় একবারটি পা রাখুন। সেইমাত্রই আমাদের সংবাদমাধ্যমের কাছে খবর এল যে তিনি কলকাতায় নামতে চলেছেন। দমদম বিমানবন্দরেও প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। বিমানবন্দরেই মঞ্চ বাধা হল যে তিনি সেখানে বক্তৃতা রাখবেন। আমি তখন আকাশবাণীর তরুণতম প্রযোজক। আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিবিড় ভাবে যুক্ত হয়ে আছি। যেহেতু আমার পরিবারও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে। সেক্ষেত্রে আমিও জন্মভূমি হিসাবে বাংলাদেশকে দেখি। তাই আমার আবেগটাও একটু অন্যরকম ছিল। শুধু পেশাদারী নয়, তার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত আবেগও জড়িয়ে গিয়েছিল। যাইহোক আমাকে যখন বলা হলো যে বঙ্গবন্ধু আসবেন এবং বিমানবন্দরে নামবেন। আমিও সেখানে চলে যাই অনুষ্ঠান কভার করতে। আমি তখন টেপ রেকর্ডার নিয়ে বিমান বন্দরের দিকে ছুটলাম। সেখানে দেখলাম মঞ্চ বাধা হয়েছে এবং ধীরে ধীরে জনতা বাড়ছে। ক্রমেই বিপুল জনসমাগমে পরিণত হল বিমানবন্দর চত্বর। তারা সকলেই ধ্বনি দিতে লাগলো ‘শেখ মুজিব ফিরে এসো, শেখ মুজিব ফিরে এসো। জয় বাংলা, জয় শেখ মুজিবুর রহমান।’ তখনও আমাদের এখানে বঙ্গবন্ধু বলে সম্মোধন করাটা চালু হয়নি। তখন শেখ মুজিব বা শেখ মুজিবুর রহমান বলে ডাকা হতো। আমি সেখানে পৌঁছে সাধারণ মানুষের ইন্টারভিউ করতে লাগলাম। তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম যে আপনারা কে কোথা থেকে এসেছেন, আপনাদের কেন এসেছেন, আপনাদের কি প্রত্যাশ্যা। লোকেরাও তাদের নানা মতামত জানালো। আমি যখন রেকর্ড করছি ঠিক সেইসময়ই বিমাবন্দর কর্তৃপক্ষের তরফে এক ব্যক্তি আমাকে আমার পরিচয় জানতে চাইলো যে আমি আকাশবাণীর প্রতিনিধি কি না। এরপরই তিনি বললেন এক্ষুনি আপনাকে যেতে হবে। একটা বার্তা আসবে এবং সেটা রেকর্ড করতে হবে। কিন্তু কার বার্তা আসবে তা পরিস্কার ছিল না। আমিও টেপ রেকর্ডার নিয়ে গ্রাউন্ড কন্ট্রোলে পৌঁছালাম। আমি টেপ রেকর্ডার অন করলাম এরপরই আকাশ থেকে বঙ্গবন্ধুর সেই কন্ঠস্বর ভেসে আসলো। সেখানে তিনি বললেন আমি আপনাদের অপেক্ষার কথা জেনেছি। আপনারা আমার জন্য দীর্ঘক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন। আপনাদের সবাইকে আমার অসীম কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা। মায়েরা, বন্ধুরা, আপনাদের কলকাতার মানুষ, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, ভারতের  মানুষ… আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে যে সাহায্য, ত্যাগ স্বীকার করেছেন সেই জন্য আমাদের তরফ থেকে কৃতজ্ঞতা। তবে কলকাতার আকাশে এসে আজকে আমার ভীষণ ইচ্ছা করছে যে সবার আগে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করি। আপনাদের আমি নিরাশ করলাম কিন্তু আমি প্রথম সুযোগেই আসবো। এরপর আমি সেই রেকর্ডিংটি মাইক্রোফোনের সামনে সমস্ত মানুষকে শোনালাম। বঙ্গবন্ধুর এই বার্তা শুনে মানুষ খুব হতাশ হলেন। তখন আমার মনে হলো আগে যে সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিল সেটা কি বিফলে যাবে? তাই আমি পরে আরও বেশ কিছু মানুষকে জিজ্ঞাসা করলাম। তারা তাদের হতাশার কথা তুলে ধরলো। এরপর সন্ধ্যাবেলায় আমরা আকাশবাণীতে ‘প্রত্যাশা এবং হতাশা’ নামে একটি অনুষ্ঠান করেছিলাম।’

‘…এরপর অবশ্য ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু এলেন, তিনি কথা রাখলেন। দুদিনের জন্য তিনি কলকাতায় আসেন। ওইদিন তাকে কলকাতায় স্বাগত জানান ইন্দিরা গান্ধী। পরে ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে বিশাল জনসভা হয়। একই মঞ্চ থেকে ইন্দিরা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু দুজনেই বক্তব্য রাখলেন। আমার সৌভাগ্য যে আমাকে ওই অনুষ্ঠানের রানিং কমেন্ট্রি (চলমান ধারাভাষ্যকার) করতে বলা হয়েছিল। আমার সাথেই ছিলেন দুই শ্রদ্ধেয় এবং প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ও দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে একটা মঞ্চ করা হয়েছিল যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার সাংবাদিকরা তাদের বিবরণী দিচ্ছিলেন। এবং ওইদিনই জীবনের প্রথম এতগুলো ভাষা একসাথে শুনতে পেলাম। আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো তখনও আমাদের ভারতে টেলিভিশন আসেনি কিন্তু বাংলাদেশে এসেছে। ফলে তাদের টেলিভিশনের সাদা রঙের একটি আউটডোর ব্রডকাস্টিং (ওভি) ভ্যান আসে। সেটা আমরা দেখতে পাই। এবং বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য ভাষণ শুরু হওয়ার আগে টেলিভিশন এর কাজ কিভাবে হয় সে ব্যাপারে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়।’
‘বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা চলাকালীন মাঝেমধ্যেই তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা নিজের স্মৃতি থেকে উদার কণ্ঠে আবৃত্তি করছিলেন। আর সেটি মানুষের এতো ভালো লাগছিল যে শেখ মুজিবকে অনুরোধ করা হচ্ছিল আরও কয়েকটি কবিতা বলার জন্য এবং তিনিও তাঁর স্মৃতি থেকে আরেকটি কবিতা বলতে লাগেন। কবিতায় তার দখল ও মুখস্ত দেখে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়েছিল যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কাছে কতটা প্রেরণা ছিলেন।’

‘…এরইমধ্যে আমার অফিস থেকে ফোন করে ফিরে আসতে বলা হলো এবং আমাকে বলা হলো আজ একটা বিশেষ অনুষ্ঠান করতে হবে- যেটা একইসঙ্গে বাংলাদেশ বেতার এবং আকাশবাণী থেকে সম্প্রচারিত হবে। এর জন্য খুব অল্প সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। আমিও ঠিক করলাম যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা যেমন পরিচালক মৃণাল সেন, নাট্যকার শম্ভু মিত্র, সঙ্গীতশিল্পী পঙ্কজ কুমার মল্লিক, ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র  মজুমদার এবং বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু-দের নিয়ে ওই অনুষ্ঠান করা হবে। আমি তাদের ইন্টারভিউ নিলাম। তারাও যে যার মতো করে বললেন। কিন্তু এদের সত্যেন্দ্রনাথ বসু বলেছিলেন ‘আমি বাংলাদেশের পড়িয়েছি। আমি জানি এবার ভাইয়ে-ভাইয়ে বিবাদ শুরু হবে। আমার বলতে খারাপ লাগছে কিন্তু এটাই সত্য হবে।’

আর অন্যদিকে ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছিলেন ‘আমি দীর্ঘদিন বাংলাদেশে ছিলাম। ওখানকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য ছিলাম। আমি যদি ইতিহাস কিছুটা জানি তাহলে বলব এই যে শুভবোধ, ভাতৃত্ববোধ, মাতৃত্ববোধ- এগুলো থাকবে না। নিজেদের মধ্যে অশুভ শক্তি মাথা তুলবে এবং বাংলাদেশের মাটি রক্তাক্ত হবে। শেখ মুজিবর এর জীবন সংশয় হতে পারে।’

তার এ কথা শুনে আমি তখন চমকে উঠি। আমি তখন আমাদের স্টেশন ডিরেক্টর-কে বিষয়টা জানাই। তিনি আমাকে জানান, অতিথিরা যে বক্তব্য রেখেছেন সেটাই আমাদের সম্প্রচারিত করতে হবে। এতে আমার চাকরি থাকতেও পারে, আবার যেতেও পারে। যাইহোক আমি সেটা সম্প্রচার করেছিলাম এবং পরে চাকরিটাও বজায় ছিল। মানুষেরও সেটি খুব ভাল লেগেছিল। এমনকি বঙ্গবন্ধু সেটি শুনেছিলেন।
‘…বঙ্গবন্ধুকে রাজভবনে খবর পাঠানো হয়েছিল। পরের দিন আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাই। তাকে প্রণাম করি এবং ওই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে তার কাছে জানতে চাই। তিনি ওই অনুষ্ঠানের প্রশংসা করেন।
পরের দিন নজরুল ইসলামের দুই পুত্র কাজী সব্যসাচী এবং কাজী অনিরুদ্ধ রাজভবনে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেন। বঙ্গবন্ধু তাদের পিতা কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। পরে সে বছরই কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ যান। এবং ২৪ মে কাজী নজরুলকে জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু। যদিও পরে বাংলাদেশের মাটিতেই প্রয়াত হন।’