বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও সশস্ত্র বাহিনী

101
Social Share

১০ জানুয়ারী ১৯৭২,আমাদের ইতিহাসের একটি যুগান্তকারী মোড় ফেরার দিন। এই দিনেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় নয় মাস পাকিস্তানে বন্দী জীবনের পর স্বাধীন মুক্ত স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। দেশের অন্যান্য নাগরিকদের মতো বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কাছেও এটি ছিল আনন্দ মাখা, আবেগঘন একটি দিন। সেদিন মুক্তিযুদ্ধের ভেতর গড়ে ওঠা নবীন সশস্ত্র বাহিনী ৩১ বার তোপধ্বনি ও গার্ড অব অনারের মাধ্যমে প্রথাগত সামরিক ঐতিহ্যে জাতির পিতা, রাষ্ট্রপতি ও সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলার মাটিতে স্বাগত জানিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর আগমনের দিন থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সংহত হয়। বাঙালির স্বাধীনতার আকাংখাও যেন পরিপূর্ণতা লাভ করে। বাংলাদেশ ফোর্সেস (বাংলাদেশ বাহিনী) এর প্রধান সেনাপতি (কমান্ডার ইন চীফ) কর্ণেল এম এ জি ওসমানির (পরে জেনারেল) সদরদপ্তর ছিল ২৭ মিন্টু রোডে (বর্তমান ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দপ্তর)। এখানে উল্লেখ্য, ঢাকা সেনানিবাসে তখনও ভারতীয় ও পাকিস্তানি বাহিনী অবস্থান করছিল।

৯ জানুয়ারী সকালে, কর্ণেল ওসমানি তৎকালীন এস ফোর্স কমান্ডার লেঃ কর্ণেল কে এম শফিউল্লাহকে ( পরে মেজর জেনারেল ও সেনাবাহিনী প্রধান) নির্দেশ দেন যে, বঙ্গবন্ধুর গার্ড অব অনার দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল এর অধিনায়ক মেজর মইনুল হোসেন চৌধুরী (বীর বিক্রম) এর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে ৩১ বার তোপধ্বনি প্রদানের (গান স্যালুট) জন্য ‍মুজিব ব্যাটারিকে (মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রতিষ্ঠিত প্রথম আর্টিলারি ইউনিট, পরবর্তীতে ১ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি) দায়িত্ব দেয়া হয়। সে সময় বাংলাদেশের নিয়মিত বাহিনীর ব্যাটালিয়নের মধ্যে শুধু মাত্র ২য় ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ছিল ঢাকা শহরে। (এর অস্থায়ী ক্যাম্প ছিল রেসকোর্স ময়দানের এক পাশে,বর্তমানে শাহবাগ থানা)। তখনও তিন বাহিনী আলাদাভাবে সংগঠিত হয়নি। তবে সশস্ত্রবাহিনী পূনর্গঠনের কাজ চলছিল। দিল্লি থেকে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বৃটিশ রয়াল এয়ারফোর্সের সাদা রঙের বিশেষ বিমানটি (কমেট-৪) বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বেলা ১টা ৪১ মিনিটে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর অবতরন করে। এরপর সেখানে সমবেত লাখ লাখ জনতা আনন্দ-উল্লাসে ফেটে পড়ে। তাঁরা শোকরানা জানায় মহান আল্লাহতা’লার দরবারে। বিমান বন্দরের ভেতরও ছিল হাজার হাজার মানুষ। সাদা রঙের বিশাল বিমানটি বীর বাঙালির রক্তস্নাত ঢাকার মাটি ছোয়ার পর সেনাবাহিনীর মুজিব ব্যাটারী (পরে ১ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারী) বঙ্গবন্ধুকে ৩১ বার তোপধ্বনির (গান স্যালুট) মাধ্যমে প্রানঢালা সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে। লাখ লাখ মানুষ জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানে আকাশ-বাতাস মুখর করে তোলে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রি তাজউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ বিমানের সিড়িতে উঠে গেট থেকে তাঁকে ফুলের মালা ও চোখের জল দিয়ে স্বাগত জানান। বঙ্গবন্ধু বিমান হতে অবতরনের সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের মতো জনতা সকল কর্ডন ভেদ করে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। এই ভিড়ের মধ্যেই কোনরকমে বঙ্গবন্ধুকে গার্ড অব অনারের মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন কর্ণেল ওসমানী। এরপর সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত একটি চৌকশ দল বঙ্গবন্ধুকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। এটির সার্বিক নেতৃত্বে ছিলেন ২য় ইষ্ট বেংগলের অধিনায়ক মেজর মইনুল হোসেন চৌধুরী।‍উল্লেখ্য, সেনাবাহিনীরকন্টিনজেন্ট (২য় ইস্ট বেঙ্গল) এর কমান্ডার ছিলেন ২য় ইষ্ট বেঙ্গলের ক্যাপটেন জি এইচ মোর্শেদ খান, বীর বিক্রম (পরে মেজর জেনারেল)। গার্ড অব অনার দেয়াহয় সাবেক পিআইএ’র হ্যাঙ্গার (পরে বাংলাদেশ বিমানের হ্যাঙ্গার) এর সামনে। স্বাধীন দেশে এটিই ছিল বঙ্গবন্ধুকে দেয়া সশস্ত্র বাহিনীর প্রথম গার্ড অব অনার এবংবঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর প্রথম আনুষ্ঠানিক পরিচয়। এই বিষয়ে পরবর্তীতে মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী লিখেন, “নির্দেশ পেয়ে ওই দিনই (৯ জানুয়ারী) সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রায় ৫০০ সদস্য সংগ্রহ করি। তাদের নিয়ে আমি তেজগাঁও বিমান বন্দরে গার্ড অব অনারের অনুশীলনে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।… শেখ মুজিবের জন্য তৈরী মঞ্চেও ভীড়। এ ভিড়ের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে গার্ড অব অনার দেওয়ায়ও এরকম দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়াল। যাহোক, ভিড় ঠেলেই আমরা গার্ড অব অনার দিলাম”। গার্ড অব অনার দেওয়ার সময় মঞ্চে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধান সেনানায়ক কর্ণেল ওসমানীও ছিলেন। গার্ড অব অনার শেষে শেখ মুজিব আমাকে বললেন, “তোমরা কেমন আছ?” সারা বিমানবন্দর জুড়ে গগনবিদারী শ্লোগানের জন্য তাঁর বাকি কোনো কথা শুনতে পেলাম না। …গার্ড অব অনার শেষে ভিড়ের মধ্যেই শেখ মুজিবকে জিপে তুলে রেসকোর্স ময়দানে আনা হয়। রেসকোর্স ময়দানের সার্বিক তত্ত্বাবধান ছিল আমার দায়িত্বে। কারন, আগেই বলেছি আমাদের অস্থায়ী ক্যাম্প ছিল সেখানে।” (এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য, স্বাধীনতার প্রথম দশক, মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী, বীর বিক্রম)। উল্লেখ্য বঙ্গবন্ধূর সঙ্গে ইতিপূর্বে সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত একদল সদস্যের দেখা হয়েছিল ২২ মার্চ ১৯৭১। ঐ দিন, বায়তুল মোকাররমের দক্ষিন পাশের চত্বরে বাঙালি সামরিক অফিসার ও জওয়ানদের এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ পরিচালনা করেন কর্নেল এম এ জি ওসমানী। সমাবেশ থেকে দেশের আসন্ন স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়ার  শপথ নেয়া হয়। এ সমাবেশে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইশফাকুল মজিদ উপস্থিত ছিলেন (১৯২৪ সালে কমিশনপ্রাপ্ত ও প্রথম বাঙালি মেজর জেনারেল)। এরপর কর্ণেল ওসমানী ও মেজর জেনারেল মজিদ, লেঃ কমান্ডার জেড আবদিন (নৌবাহিনী) অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের বিরাট মিছিল নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডিস্থ বাসভবনে যান। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধুকে প্রদান করলেন একটি তরবারী। বললেন, তারা আর এখন থেকে প্রাক্তন সৈনিক নন- তারা এখন বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। এয়ারপোর্ট থেকে একটি সুসজ্জিত ডজ ট্রাকে রেসকোর্স ময়দানে (পরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সৈয়দ নজরুল ইসলাম তাজউদ্দিন আহমদ ও কেন্দ্রিয় ছাত্র নেতাসহ প্রায় বিশ পচিশ জন ট্রাকের উপর বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ‍ছিলেন। লক্ষ জনতার প্রচন্ড ভিড়ে গাড়িটি অতি মন্থর গতিতে রেসকোর্স ময়দানের দিকে এগিয়ে যায়। তেজগাঁও বিমান বন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত এতটুকু রাস্তা অতিক্রম করতেই প্রায় দুই ঘন্টা সময় লেগে যায়। ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানের পথে লাখ লাখ জনতার মধ্য দিয়ে অতিক্রমকারী বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী সুউচ্চ ট্রাকটির ওপর আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম পরিহিত বঙ্গবন্ধুর জেষ্ঠ পুত্র লেঃ শেখ কামাল। উল্লেখ্য রেসকোর্স ময়দানে বক্তৃতার মঞ্চেও লেঃ শেখ কামাল উপস্থিত ছিলেন। আনন্দে আত্মহারা লাখ লাখ লোক বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে স্বতঃস্ফুর্ত সংবর্ধনা জানান। বিকেল পাঁচটায়  রেসকোর্স ময়দানে প্রায় দশ লক্ষ লোকের সামনে ভাষন দেন তিনি। শেখ মুজিব সেনাবাহিনীসহ সকল মুক্তিযোদ্ধা ও বাহিনীর ত্যাগের কথা বিশেষভাবে স্মরন করেন। সবাইকে তিনি দেশ গড়ার কাজে এগিয়ে আসার আহবান জানান। বঙ্গবন্ধু একই সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশে দেয়া প্রথম ভাষনে দূর্নীতি, চুরি, ডাকাতি ও ঘুষের বিরুদ্ধে হুশিয়ারী উচ্চারন করেছিলেন। লেখক রবার্ট পেইন এ বিখ্যাত ভাষনের বিষয়ে লিখেছেন “সেই রৌদ্রালোকিত দিনে দুরের এক শহরে রেসকোর্স ময়দানে মঞ্চে দাঁড়ানো এক ঋজু ব্যক্তি, দুনিয়ার সব নিপীড়িতজনের জন্য বয়ে এনেছিলেন আশা”। বঙ্গবন্ধুর আগমনের জন্য সমগ্র জাতি অপেক্ষা করছিল। অন্যান্যদের মতো, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যগনের অনুভূতিও তেমনিই ছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধেরভেতর গড়ে ওঠা সশস্ত্র বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের আবেগ যেন আরো গভীর ছিল। কারন দৃশ্যপটে অনুপস্থিত থেকেও বঙ্গবন্ধু তাদের পরম অনুপ্রেরনা জুগিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নামেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর অবদান ছিল অসাধারন বীরত্বময়, যা ইতিহাস সৃষ্টি করে। মাতৃভূমির জন্য এই যুদ্ধে অনেক বাঙালি সামরিক অফিসার রনাঙ্গনে পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ দেবতায় পরিনত হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন এর ঘটনাসমুহ বাংলাদেশ বেতার, (ঢাকা কেন্দ্র) সরাসরি প্রচার করেছিল। এই বেতারের মাধ্যমেই সেদিন ঢাকার বাইরের লক্ষ কোটি মানুষ ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে একাত্ব হয়েছিল। বিভিন্ন সেনানিবাস ও ক্যাম্পে অবস্থানরত সশস্ত্র বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাগনের অনেকেই বঙ্গবন্ধুর আগমন, সংবর্ধনা, গার্ড অব অনার ও ভাষনের কথা বেতার ধারা ভাষ্যের মাধ্যমে শুনেছিলেন  ও জানতে পেরেছিলেন। এমনকি সূদুর পাকিস্তানে চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় থাকা পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সদস্যগনের (প্রায় তিরিশ হাজার) অনেকেই এই ভাষন শুনেছিলেন। পাকিস্তান থেকে খুব ভালোভাবে না হলেও মোটামুটি বোঝা যাচ্ছিল ভাষ্যকারের মন্তব্য। কেউ কেউ রেডিওতে কান লাগিয়ে শুনেছিলেন। সেই সময় পাকিস্তানে অবর্ণনীয় এক মানসিক অবস্থার মধ্যে ছিলেন সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যসহ আটকে পড়া কয়েক লক্ষ বাঙালি। তবুও, সেই পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরার ঘটনা ভাগ্যহত, বিষন্ন বাঙালিদের কিছুটা হলেও উজ্জিবীত করছিলো। তাদের মনে হয়েছিল কিছুটা সময় লাগলেও একদিন তারা বাংলাদেশে নিশ্চয় ফিরে যেতে পারবেন। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেকে এগিয়েছে। তবে আমাদের দূর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন সমাজ, প্রানবন্ত গনতান্ত্রিক, মানবিক সমাজ, উদার ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গঠনে আমাদের অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। সেই যাত্রাপথে বঙ্গবন্ধুর জীবনের দৃষ্টান্ত আমাদের অনুপম অনুপ্রেরনা হতে পারে। সামনে এগিয়ে যাক আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রাণের বাংলাদেশ। উত্তোরত্তর পেশাগত উৎকর্ষতা ও সার্বিকউন্নতির দিকে এগিয়ে যাক আমাদের গর্বেরসশস্ত্র বাহিনী।

 

লেখকঃ অবসরপ্রাপ্ত বিগ্রেডিয়ার জেনারেল, গবেষক

[email protected]