বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন : আলোর পথে নবতর যাত্রা

210
Social Share

জয়ন্ত আচার্য: 

হাজার বছর ধরে আযর্, দ্রবিড়, নিশাদ, মোঘল পাঠান জাতির সংমিশ্রনে গড়্ ওেঠা বাঙ্গালী এক শংকর জাতি। তার সাংস্কৃতি বিশ্ব সংস্কৃতিই সংমিশ্রন। তবে ইতিহাসের কোন পাকেই বাঙ্গালী কোন জাতি রাষ্ট্র গঠন করতে পারেনি। হাজার বছরের বাঙ্গালীর ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুই প্রথম বাঙ্গালীর জন্য বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করেন। বাঙালির জন্য একটি স্বাধীন দেশের তিনিই প্রথম রূপকার। প্রাচীন বাংলা এমনকি মধ্যযুগেও অনেকে এই ভুখন্ডে স্বাধীন রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছিলেন । তারা কেউই বাঙ্গালী ছিলেন না ।


সেদিক থেকে বঙ্গবন্ধু প্রথম বাঙালি যিনি স্বাধীন বাংলার প্রথম নৃপতি। বাঙালিদের স্বাধীন ভূমি এনে দেওয়ার প্রয়াস ছিল অনেক বাঙালি নেতারই এবং বাঙালিকে ভালোবেসেছিলেন অনেক জননেতাই। বাশের কেল্লার তিতুমীর, মাষ্টারদা সূর্যসেন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, নেতাজী সুভাষ বসু, এ কে ফজলুল হক প্রমুখের অবদান বাঙালি সমাজে চিরস্মরণীয়। স্মরনীয় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তারা বাঙ্গালী জাগিয়েছে। উজ্জীবীত করেছেন বাঙ্গালী সত্ত্বার বিকাশে ও স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখাতে । কিন্ত বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের বাঙ্গালীর সকল মনিষীকে চেতনা ধারণ করে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। বাঙ্গালীকে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন একটি রাষ্ট্র দিয়ে গিয়েছেন। বাঙ্গালীর হাজার বছরের সাংস্কৃতির অসাম্প্রদায়িক ধারাকে লালন করে ধর্মনিরপেক্ষ ও উন্নত রাষ্ট্রের রূপরেখাও তিনি দিয়ে গিয়েছেন। তাইতো তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী । কার্যত ‘বঙ্গবন্ধু’র সব খেতাবকে ছাড়িয়ে গেছেন এবং তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে আছে বিশ্বময়। বিশ্বের বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর মধ্যে স্থান লাভ করেছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চেও ভাষণ। এ ভাষণের অন্য নাম ‘বজ্রকণ্ঠ’। এ কণ্ঠ কাঁপিয়ে দিয়েছিল সমগ্র দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষকেও। তাই বিশ্বের বড় বড় জননেতাকেও ছাড়িয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু। একারণেই বিবিসির বাংলা সার্ভিসের জরিপে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত ঘোষণায় সর্বত্র আনন্দের ঢেউ উঠেছিল। বঙ্গবন্ধুর স্থান বাংলাদেশ ও বাঙালির ইতিহাসে নির্ধারিত হয়ে আছে। কেউ ইচ্ছে করলেই তাঁকে ইতিহাস থেকে নির্বাসিত করতে পারবে না। মহাত্মা গান্ধীকে বাদ দিয়ে যেমন ভারতের ইতিহাস লেখা যায় না, মাও সেতুংকে বাদ দিয়ে চীনের, হো চি মিনকে বাদ দিয়ে ভিয়েতনামের ইতিহাস লেখা যায় না, জর্জ ওয়াশিংটনকে বাদ দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস লেখা যায় না, তেমনি বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা যায় না। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যত কাব্য, মহাকাব্য ও অন্যান্য সাহিত্য কিংবা প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও গবেষণা হয়েছে, দুনিয়ার আর কোনো জননেতা সম্পর্কে হয়তো এত রচনা এখনো রচিত হয় নি। তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের মহিমা কেউ ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। তিনি তাই অনন্য, অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব।


রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বাঙ্গালী জাতির জাতীয়তাবাদের চেনার উন্মেষ ঘটায়। ৫৪ যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তার প্রতিফলন ঘটে। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর আয়োজিত এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ’। তিনি বলেন, “একসময় এদেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে ‘বাংলা’ কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকুও চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে। … একমাত্র ‘বঙ্গোপসাগর’ ছাড়া আর কোন কিছুর নামের সঙ্গে ‘বাংলা’ কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। … জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি- আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে শুধুমাত্র বাংলাদেশ”।


১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তার দল আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়লাভ করে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং প্রদেশিক পরিষদের ৩১০টি আসনের মধ্যে ৩০৫টি আসন লাভ করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মুজিবের স্বায়ত্বশাসনের নীতির পুরোপুরি বিপক্ষে ছিলো। আওয়ামী লীগের সরকার গঠন ঠেকাতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সংসদের অধিবেশন ডাকা নিয়ে টালবাহানা শুরু করেন। বঙ্গবন্ধু তখনই বুঝে যান যে, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের দুঃশাসনের অবসান ঘটাতে লড়াইয়ের কোনো বিকল্প নেই।
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দেন। রেসকোর্সের জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। ঐতিহাসিক এ ভাষণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে শৃংখল মুক্তির আহ্বান জানিয়ে ঘোষণা করেন, “রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্। ২৫ মার্চ পাকিস্তানী বাহিনীর সারা দেশে চালায় নির্মম হত্যাযজ্ঞ । পাকিস্তানী সেনা বাহিনীর হাতে প্রেফতারের আগে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এ ঘোষণাই তিনি বলেন, এটাই হয়ত আমার শেষ বানী । আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন । বাংলাদেশের জনগণ যে যেখানে আছে এবং তাদেও কাছে যা কিছু আছে তা দিয়ে দথলদার সেনাবাহিনীকে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। বাংলাদেশের মাটি থেকে পাকিস্তানের দখলদার সেনাবাহিনীকে তাড়িয়ে দিয়ে চুড়ান্ত বিজয় লাভ না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। জয় বাংলা ।


মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ২৫ মার্চ, ১৯৭১ সালে তাঁকে গ্রেফতার করে পাকিস্তান সরকার। তাঁর দেশে ফেরার প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯৭১ সালের ২৪ ডিসেম্বর থেকে। ১৯৭২ সালের সাত জানুয়ারি ভোররাতে তাকে নিয়ে একটি উড়োজাহাজ যাত্রা করে লন্ডনে। ৮ জানুয়ারি লন্ডনে পৌঁছান বঙ্গবন্ধু। সেখানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে বৈঠক করে পরদিন দেশের উদ্দেশে রওনা দেন তিনি। ফেরার পথে ভারতে যাত্রাবিরতি দিয়ে অবশেষে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে পৌঁছান বাঙালির মহানায়ক।

১০ জানুয়ারি দুপুর ১টা ৪১ মিনিটে তেজগাঁও বিমানবন্দরে নামেন জাতির জনক। সেখানকার জনসমুদ্র সাঁতরে রাজনীতির মহাকবি পৌঁছে যান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। লাখো জনতা সেখানে তাঁকে স্বাগত জানায়। ১৯৭২ সালের ১৬ জানুয়ারি নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সাংবাদিক সিডনি শ্যানবার্গকে বঙ্গবন্ধু একটি সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি তুলে ধরেন তার বন্দিজীবনের বৃত্তান্ত। ১৮ জানুয়ারি নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত সেই সাক্ষাৎকারের শিরোনাম ছিল, ‘তিনি নিজের গ্রেফতার ও বন্দিদশার পূর্ণ বিবরণ দিলেন।’বঙ্গবন্ধুর উদ্ধৃতি দিয়ে শ্যানবার্গ লেখেন, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি ঘেরাও করে পাকিস্তান সেনারা অবিরাম গুলিবর্ষণ করে। পরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন মেজর বঙ্গবন্ধুকে জানান, তাঁকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিদায় জানাতে তাঁকে কয়েক মুহূর্তেও অনুমতি দেওয়া হয়। পরিবারের সবাইকে ডেকে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘ওরা আমাকে হত্যা করতে পারে। কিন্তু জানবে, একদিন আমার মানুষ মুক্ত হবে। আমার আত্মা তা দেখে শাস্তি পাবে।’

শ্যানবার্গ আরও লেখেন, ‘তাঁকে জাতীয় পরিষদ ভবনে আনার পর বসার জন্য একটি চেয়ার দেওয়া হলো। “তারপর তারা আমাকে চা খেতে অনুরোধ করলো”, তা শুনে বঙ্গবন্ধু ঠাট্টার সুরে বললেন, ‘চমৎকার, এখনই তো আমার জীবনের চা খাওয়ার সেরা সময়।’
এরপর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় সামরিক ছাউনির একটি স্কুলের নোংরা ও অন্ধকার ঘরে। ছয় দিন সেই ঘরে কাটান। মধ্যরাত থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত তাঁকে থাকতে দেওয়া হলো জেনারেল টিক্কা খানের একটি ঘরে। সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু শ্যানবার্গকে আরও জানান, ১ এপ্রিল তাঁকে বিমানে করে নিয়ে যাওয়া হয় রাওয়ালপিন্ডিতে। তারপর তাঁকে সরিয়ে আনা হয় মিয়ানওয়ালির কারাগারে। থাকতে দেওয়া হয় ফাঁসির আসামিদের জন্য নির্ধারিত সেলে। মুক্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁকে সেখানে ও পাঞ্জাবের উত্তরে লায়ালপুর ও শাহিওয়ালের দুটি কারাগারে কাটাতে হয়। এই সময় পাকিস্তান সামরিক সরকার তাঁর বিরদ্ধে ১২টি অভিযোগ এনে ‘বিচার’ শুরু করে। ১২টি অভিযোগের ছয়টির দন্ড ছিল মৃত্যু এবং অভিযোগগুলোর একটি ছিল ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা’। টাইমসে লেখা হয়, ‘ইয়াহিয়া তার সেনা কর্তাদের রাওয়ালপিন্ডি ডেকে পাঠিয়ে গুলি করে শেখ মুজিবকে হত্যার দ্রুত প্রস্তুতির নির্দেশ দিলেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় তাঁকে ব্যস্ত হয়ে পড়তে হলো।’
৭ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুকে মিয়ানওয়ালিতে ফিরিয়ে আনা হয়। ১৫ ডিসেম্বর, ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণের একদিন আগে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য ইয়াহিয়ার যে পরিকল্পনা ছিল তা বাস্তবায়নওে আগে চূড়ান্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৫ ডিসেম্বর জেলখানার দায়িত্বরতদের জানানো হয়, নিয়াজিকে পূর্ব পাকিস্তনের বাঙালিরা হত্যা করেছে, তার প্রতিশোধ হিসেবে পরদিন সকালেই মুজিবকে হত্যা করা হবে। সে প্রস্তাবে সবাই এককথায় রাজি হয়। পরদিন ভোররাত চারটায় বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য নির্ধারিত সময়ের দুই ঘণ্টা আগে জেলের সুপার বঙ্গবন্ধুর সেলের দরজা খুলে ঢোকেন। বঙ্গবন্ধু জানতে চান, ‘আমাকে কি ফাঁসির জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?’ তিনি আগেই দেখেছিলেন তাঁর সেলের বাইরে কবর খোঁড়া হয়েছে। তাঁকে বলা হয়েছিল, তাঁর নিরাপত্তার জন্য পরিখা খনন করা হয়েছে। জেল সুপার জানালেন, তাঁকে ফাঁসির জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না। তবু সন্দেহ যায় না বঙ্গবন্ধুর। তাঁর ভাষ্যে, ‘আমি তাঁকে বললাম, যদি ফাঁসিই দেওয়া হয়, তাহলে আমাকে প্রার্থনার জন্য কয়েক মিনিট সময় দিন।’ সুপার বললেন, ‘না না, একদম সময় নেই। আপনাকে এখনই আমার সঙ্গে আসতে হবে, জলদি।’

বঙ্গবন্ধুকে কয়েক মাইল দূরে এক অজ্ঞাত স্থানে কয়েক দিনের জন্য সরিয়ে নেন জেল সুপার। সেখানে নয় দিনের মতো কাটান তিনি। জেলের কর্মকর্তারা জেল সুপারকে বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান। এরপর এক পুলিশ অফিসার সেই সুপারকে জানান, বঙ্গবন্ধুকে লুকিয়ে রাখার আর প্রয়োজন নেই, জুলফিকার আলি ভুট্টো ১৯ ডিসেম্বর পাকিস্তানের শাসনভার গ্রহণ করেছেন, তিনি মুজিবের সঙ্গে কথা বলতে চান।

গোপন আস্তানা থেকে বেরিয়ে আসার পর রাওয়ালপিন্ডিতে নিয়ে যাওয়া হয় বঙ্গবন্ধুকে। সেখানে রাষ্ট্রপতির ভবনে তাঁকে গৃহবন্দি করা হয়। ২৪ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে আসেন ভুট্টো। বঙ্গবন্ধুর উদ্ধৃতি দিয়ে শ্যানবার্গ বলেন, ভুট্টোর মনে হয়েছিল, মুজিবকে হত্যা করা হলে বাংলাদেশে আটকে পড়া প্রায় এক লাখ পাকিস্তানী সেনাদের হত্যা করা হতে পারে। এ কাজের জন্য সবাই তাকে অর্থাৎ ভুট্টোকেই দায়ী করবে। তাই তাকে হত্যা করা হয়নি।

“মুজিব জানালেন, ভুট্টো তাঁকে পাকিস্তানের দুই প্রদেশের মধ্যে কোনও রকম একটা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য জোরাজুরি করেন। মুজিব বলেন, ‘আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি মুক্ত না এখনও বন্দি? আমি যদি মুক্ত হই তাহলে আমাকে যেতে দিন। আর যদি বন্দি হই তাহলে কোনও কথা বলতে প্রস্তুত নই’।”
৭ জানুয়ারি তৃতীয় ও শেষবারের মতো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন ভুট্টো। বঙ্গবন্ধু তাঁকে বলেন, ‘আজ রাতেই আমাকে মুক্তি দিতে হবে, এ নিয়ে অযথা বিলম্বের সময় নেই। হয় আমাকে মুক্তি দিন অথবা মেরে ফেলুন।’ ভুট্টো তাঁকে বলেন, এত দ্রুত সব আয়োজন করা কঠিন। শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে লন্ডনে পাঠাতে সম্মত হন ভুট্টো।
বাংলাদেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য পাকিস্তানের সামরিক জান্তারা চাপ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ৬৭টি দেশের সরকার প্রধানকে চিঠি দেন। ৮ জানুয়ারি সকাল ৭টায় বিবিসির ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে প্রচারিত খবরে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বিমানযোগে লন্ডনে আসছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই উড়োজাহাজটি লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে অবতরণ করবে।’
অবতরণের পরপরই ব্রিটিশ বৈদেশিক দফতরের কর্মকর্তারা রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদা দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানান। ব্রিটিশ সরকারের সম্মানিত অতিথি হিসেবে লন্ডনের ক্ল্যারিজেস হোটেলে নিয়ে আসা হয় তাঁকে। বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতির কথা জেনে হাজার হাজার বাঙালি ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোাগানে লন্ডনের আকাশ-বাতাস মুখর করে তোলে। দুপুরের দিকে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘এক মুহূর্তের জন্য আমি বাংলাদেশের কথা ভুলিনি। আমি ধরে নিয়েছিলাম ওরা আমাকে হত্যা করবে। আমি আপনাদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাবো না। কিন্তু আমার জনগণ মুক্তি অর্জন করবে।’

বঙ্গবন্ধু যখন লন্ডনে পৌঁছান, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাডওয়ার্ড হিথ তখন ছিলেন লন্ডনের বাইরে। বঙ্গবন্ধুর পৌঁছানোর কথা শুনে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি বাতিল করে প্রধানমন্ত্রী হিথ ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে ছুটে আসেন এবং বঙ্গবন্ধুকে নজিরবিহীন সম্মান দেখান। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তার কার্যালয়ের বাইরে এসে গাড়ির দরজা খুলে ততক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন, যতক্ষণ না বঙ্গবন্ধু গাড়ি থেকে বেরিয়ে না এলেন। ৮ জানুয়ারি রাতে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে স্বীকৃতির বিষয়টি উত্থাপন করেন।
৯ জানুয়ারি সকালে লন্ডনে বসেই টেলিফোনে ইন্দিরা গান্ধী-বঙ্গবন্ধুর মধ্যে আধাঘণ্টা আলোচনা হয়। বঙ্গবন্ধুকে অভিনন্দন জানান ইন্দিরা গান্ধী এবং অনুরোধ করেন, ঢাকার পথে যেন তিনি দিল্লিতে যাত্রাবিরতি করেন। বঙ্গবন্ধু আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন এবং দিল্লির উদ্দেশে রওনা হন।
দিল্লির ‘এক্সপ্রেস’ পত্রিকার বিবরণ অনুযায়ী, ‘কালো-ধূসর ওভারকোট পরে বঙ্গবন্ধু উড়োজাহাজের সিঁড়ি বেয়ে নামলেন। প্রেসিডেন্ট ভি. ভি. গিরি বঙ্গবন্ধুকে আলিঙ্গন করলেন। পাশে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী স্বাগত জানাচ্ছিলেন। তখন ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে অভিনন্দন জানানো হয়। শুভেচ্ছা পর্ব শেষে বঙ্গবন্ধু তিন বাহিনীর ১৫০ সদস্যের গার্ড অব অনার পরিদর্শন করেন এবং পরে ভিআইপি প্যান্ডেলে যান। সেখানে তাঁকে ফুল ছিটিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়।
১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ঢাকা ফিরে আসেন বেলা ১টা ৪১ মিনিটে। বিমানবন্দর ও রাস্তায় দুপাশে তখন অপেক্ষমাণ লাখো জনতা। সবার কণ্ঠে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’ অবতরণের আগে কমেট বিমানটি বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রায় ৪৫ মিনিট বিমানবন্দরের ওপর চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। উপর থেকে সোনার বাংলাকে অবলোকন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। মাটিতে পা রেখেই আবেগে কেঁদে ফেলেন বঙ্গবন্ধু। বিমানবন্দরে অস্থায়ী সরকারের সদস্য, মুক্তিযোদ্ধাসহ মুক্তিকামী সব বাঙালি অশ্রুসজল নয়নে বরণ করেন ইতিহাসের বরপুত্রকে। সেখান থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেশবাসীর সামনে প্রায় ৩৫ মিনিট দিকনির্দেশনামূলক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ শেষে বাড়ি ফেরেন জাতির জনক।
ভারতীয় কূটনীতিক শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জি লন্ডন থেকে বঙ্গবন্ধুর সহযাত্রী হয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘৯ জানুয়ারি ১৯৭২, ভোর ছয়টা। লন্ডন হিথরো বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে পৌঁছান বঙ্গবন্ধু। তাঁকে স্বাগত জানালেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিভাগের কর্মকর্তা ইয়ান সাদারল্যান্ড ও লন্ডনে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার আপা বি পন্থ। আমাকে দেখে আবেগাপ্লুত শেখ মুজিব বলেন, ‘ব্যানার্জি, এখানেও আছেন!’ ব্যানার্জি লিখেন, “ফেরার পথে বিমানের সিটে সামনের টেবিলে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় সুগন্ধময় এরিনমোর তামাক, আর সেই বিখ্যাত পাইপ রাখা ছিল। দেশে ফেরার জন্য উৎফুল্ল মুজিবের তখন তর সইছে না’। আবেকময় কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ।’ তিনি ধন্যবাদ জানালেন দীর্ঘদিন তাঁকে সহযোগিতার জন্য। বললেন, ‘ব্যানার্জি, এবার একটি বিশেষ সহযোগিতা চাই।” শশাঙ্ক বললেন, ‘আয়ত্তের মধ্যে হলে অবশ্যই চেষ্টা করবো।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘দিল্লিতে ইন্দিরার সঙ্গে বৈঠকের আগেই তাঁর কাছে একটি খবর পৌঁছানো দরকার। বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় মিত্রবাহিনী সদস্যদের ৩১ মার্চ ১৯৭২ সালের মধ্যে ভারতে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি চূড়াস্ত করতে হবে।’ তিনি বলেন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর এ বিষয়ে কথা হয়েছে। ভারতীয় মিত্রবাহিনী চলে গেলে ব্রিটিশ সরকারের স্বীকৃতি পেতে বাংলাদেশের আর বাধা থাকবে না। শশাঙ্ক ব্যানার্জি বলেন, “উড়োজাহাজ আকাশে থাকতেই বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে গাইতে লাগলেন, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’। এরপর বঙ্গবন্ধু চোখের পানি লুকানোর চেষ্টা করে বললেন, ‘যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আরও কঠোর সংগ্রাম অপেক্ষা করে আছে। বুকে শুধু একটাই বল, আমার দেশের আপামর মানুষ।’
১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ফিরে আসার আনন্দে আত্মহারা লাখ লাখ মানুষ ঢাকা বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত তাঁকে স্বতঃস্ফূর্ত সংবর্ধনা জানান। বিকাল পাঁচটায় রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১০ লাখ লোকের উপস্থিতিতে তিনি ভাষণ দেন। পরের দিন দৈনিক ইত্তেফাক, সংবাদসহ বিভিন্ন পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে এভাবেই লেখা হয়Ñ ‘স্বদেশের মাটি ছুঁয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের নির্মাতা শিশুর মতো আবেগে আকুল হলেন। আনন্দ-বেদনার অশ্রুধারা নামলো তার দু’চোখ বেয়ে। প্রিয় নেতাকে ফিরে পেয়ে সেদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালি আনন্দাশ্রুতে সিক্ত হয়ে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনিতে প্রকম্পিত করে তোলে বাংলার আকাশ বাতাস। জনগণ-মন-নন্দিত শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দাঁড়িয়ে তাঁর ঐতিহাসিক ধ্রুপদী বক্তৃতায় বলেন, ‘যে মাটিকে আমি এত ভালবাসি, যে মানুষকে আমি এত ভালবাসি, যে জাতিকে আমি এত ভালবাসি, আমি জানতাম না সে বাংলায় আমি যেতে পারবো কিনা। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি বাংলার ভাইয়েদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।’ সশ্রদ্ধচিত্তে তিনি সবার ত্যাগের কথা স্মরণ করেন, সবাইকে দেশ গড়ার কাজে উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি তার ভাষণে জোরালো কন্ঠে ঘোষণা দেন , আগামীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা কৈউ হরণ করতে পারবে না। বাংলাদেশ হবে সমাজতান্ত্রিক গনতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র । এ লক্ষ্য নিয়েই সংবিধান প্রনয়ন করেন তিনি। কার্যত এদিনের ভাষণেই তিনি দিয়েছিলেন বাংলাদেশ বির্নিমানের দিক নির্দেশনা।
বঙ্গবন্ধু তার অন্তবর্তী সংসদকে একটি নতুন সংবিধান রচনার দায়িত্ব দেন এবং বাঙ্গালী “জাতীয়তাবাদ , ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র” মূল ভিত্তি করে সংবিধান রচিত হয় । ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর থেকে নতুন সংবিধান কার্যকর করা হয় । তিনি শতাধিক পরিত্যাক্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানি রাষ্ট্রীয়করণ করেন এবং ভূমি পূনর্বণ্টনের মাধ্যমে কৃষকদের সাহায্যের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী প্রায় ১ কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসনের জন্য বড় পদক্ষেপ নেন। এর ফলে অর্থনৈতিক সঙ্কট অবসান হতে শুরু করে ।
তিনি প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, খাদ্য, স্বাস্থ্য, পানি ও বিদ্যুত সরবরাহ নিশ্চিতকল্পে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালে প্রণীত বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চ-বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃষি, গ্রামীণ অবকাঠামো ও কুটির শিল্প উন্নয়নে অগ্রধিকারমূলক সরকারি অর্থ বরাদ্দের নির্দেশ দেন। বঙ্গবন্ধু এদেশের জনগণের রাজনৈতিক স্বাধীনতার সাথে অর্খনৈতিক মুক্তির জন্য অজীবন সংগ্রাম করে গিয়েছেন। ঘোষণা করেছিলেন দ্বিতীয় বিপ্লবের। ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত সোনার বাংলা গড়ারই ছিল তার জীবনের মুল লক্ষ্য । কার্যত বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক বৈষম্যহীন উন্নত দেশ বিনির্মানের জন্য নিয়েছিলেন সর্বাত্মক উদ্যাগো । তার রাজনৈতিক দর্শন ছিল , বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক বৈষম্যহীন , ধর্মনিরপেক্ষ অধুনিক উন্নত রাষ্ট্র গড়ে তোলা ।
একটি স্বাধীন-সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সর্বাধিক অবদান ও আত্মত্যাগ যে মহামানবের, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নিজের জীবনের সর্বস্ব বিলীন করে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও যিনি অবিচল চিত্তে শিল্পে উন্নত করে বাংলাদেশকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের জাতির জনক, বাঙালির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান ।
বঙ্গবন্ধু শুধু বাঙ্গালীর নেতা ছিলেন না, ছিলেন বিশ্বনেতা । বিশ্ব মানবতার আগ্রদূত। বঙ্গবন্ধুকে গিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে কিউবার প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মহনায়ক ফিডিল কাষ্ট্র আলজিয়াজে আনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎ পেয়ে অবেগে উচ্ছ্বাসিত হয়ে বলেছিলেন, আমি কখনও সামনা সামনি হিমালয় দেখিনি। আমি দেখেছি শেখ মুজিবকে। ব্যাক্তিত্বে ও সাহসে এই মানুষটি যেন হিমালয়সম।
ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি ছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক প্রণব মুখাজি। তার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এর আগে তিনি ভারতের অর্থ, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মদিনে তাকে নিয়ে লিখেছেন ভারতের সাবেক এই রাষ্ট্রপতি। তিনি লিখেছেন, কালের শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর দূরদৃষ্টি, নেতৃত্ব, মানবিকতা এবং আত্মত্যাগই ‘সোনার বাংলা’ গঠনের স্বপ্নের সৃষ্টি। আজ বাংলাদেশ সেই স্বপ্ন পূরণের পথে অগ্রগামী দেখে যারপরনাই খুশি আমরা। মুজিবুর রহমান সম্পর্কে একটি প্রবন্ধে পড়েছিলাম, হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাসে তিনি নক্ষত্রের অক্ষরে রচিত একটি নাম; যা নিজ আলোতেই ভাস্বর হয়ে থাকবে। তিনি এক অসাম্প্রদায়িক আদর্শের প্রবর্তক। যা আজকের দিনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতেই লিখেছেন, সেই সময়ের প্রধান নেতাদের উল্লেখ করেছিলেন হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের ঐক্যের কথা। তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ আজকের দিনে অন্যতম পাথেয় হওয়া উচিত সব সমাজ নেতাদের কাছে।
কার্যত বঙ্গবন্ধুর জীবন পর্যালোচনায় দেখা যায়, মূলত তার জীবনটাই বাঙালি জাতির ভাগ্য রচনার এক সুদীর্ঘ অধ্যায়। একটি স্বাধীন ভূমির জন্য বঙ্গবন্ধু অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। বছরের পর বছর তাকে কারাগারে কাটাতে হয়েছে। দেশের প্রতি, দেশের মাটির প্রতি তার ভালোবাসা ছিল বলেই তিনি এটা পেরেছেন। তিনি যে বাঙালির ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন তার প্রমাণ তার জীবনের প্রতিটি ঘটনা পরম্পরার মধ্যেই সুস্পষ্ট।
আজ তার সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নির্দেশিত পথেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে চলছেন। নিরন্তন চেষ্টা করছেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক দারিদ্রমুক্ত উন্নত বাংলাদেশ বির্নিমানে । প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ পৌছে গেছে অনন্য উচ্চতায় । বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল ।
নতুন প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শনকে সামনে রেখে এগিয়ে যেতে হবে।তার কর্মময় জীবন হোক আমাদের এগিয়ে চলার আলোক বর্তিকা। আজ ১০ জানুয়ারি তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস । জাতির জনকের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি ।

লেখক: সম্পাদক Vnewsbd.com.. সদস্য – কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক বিষয়ক উপ-কমিটি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ছাত্রলীগের সাবেক নেতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।