ভিনিউজ ডেস্ক: ফ্রান্স জুড়ে চলমান বিক্ষোভ, সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনায় নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটির সরকার। রাজধানী প্যারিসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সোমবার পর্যন্ত আংশিক কারফিউ বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি মার্সেই ও লিওঁ শহরে শনিবার ও রোববার সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় দেশটির বিভিন্ন শহরে সভা-সমাবেশ, জনসমাগম ও চলাচলের ওপরও আরোপ করা হয়েছে নানা বিধিনিষেধ।
বিক্ষোভের আশঙ্কায় শনিবার প্যারিসের বিখ্যাত ল্যুভর, ওর্সে ও পিকাসো জাদুঘর বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি নিয়ে ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। শুরুতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি থাকলেও একপর্যায়ে তা সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাটে রূপ নেয়। এতে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি স্থাপনা ও ঐতিহাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্যারিস পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের অন্যতম জমায়েতস্থল প্লাস দ্য লা রিপুবলিক এবং লে আল শপিং এলাকায় সোমবার পর্যন্ত কারফিউ কার্যকর থাকবে। স্থানীয় সময় রাত ১১টা থেকে পরদিন সকাল ৬টা পর্যন্ত এসব এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল নিষিদ্ধ থাকবে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লোকর্নু ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজের নির্দেশনায় এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানিয়েছেন, যেসব এলাকায় পুরোপুরি বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়নি, সেখানে কেবল অনুমোদিত শ্রমিক সংগঠনগুলোর কর্মসূচি পালনের সুযোগ দেওয়া হবে। শ্রমিক সংগঠনের বাইরে অন্য কোনো গোষ্ঠীর বিক্ষোভ যথাসম্ভব নিষিদ্ধ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। ম্যাক্রোঁর অভিযোগ, বামপন্থি কট্টরপন্থী কিছু গোষ্ঠী রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে প্রজাতন্ত্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা করছে।
সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে এবার পুলিশের উপস্থিতি ২০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ দিদিয়ে বের্জেই জানিয়েছেন, গত সপ্তাহের তুলনায় এবার আরও বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে। গতবার পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে সরকার ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো আগাম ধারণা করতে ব্যর্থ হয়েছিল বলে সমালোচনা ওঠার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত সপ্তাহের সহিংসতার ঘটনায় দেশজুড়ে প্রায় ২ হাজার ৭০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড ডার্মানান জানিয়েছেন, দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ায় দোষী সাব্যস্ত হওয়া ২১৭ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে । এক হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করা হয়েছে । আটক ব্যক্তিদের প্রায় অর্ধেকের বিরুদ্ধে আগে কোনো অপরাধের রেকর্ড ছিল না বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সহিংসতার আশঙ্কায় মার্সেই শহরে শনিবার গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে শহরটির ৫০০টির বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দক্ষিণের নিস ও তুলোঁ, উত্তর-পশ্চিমের রুয়াঁ এবং পূর্বাঞ্চলের গ্রেনোবলেও একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। রুয়াঁ অঞ্চলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্ধারিত রাতের কারফিউ এবার সবার ক্ষেত্রে কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে প্রশাসন।
ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রও। প্যারিসে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস দেশটিতে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের বিক্ষোভ ও সংঘাতপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। জনসমাগমপূর্ণ স্থান এবং পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে এমন এলাকাতেও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত ১৭ অক্টোবর জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষার্থী ও ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকেরা এসব কর্মসূচিতে যুক্ত হন। অধিকাংশ মিছিল শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি শহরে আগুন, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। লিওঁর পর্যটন দপ্তরে আগুন দেওয়া হয়। লিমোজ শহরের সিটি হলের ঘড়ির টাওয়ার ও ছাদের অংশ আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ধসে পড়ে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ম্যাক্রোঁ সরকারের জন্য এই অস্থিরতা বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, অন্যদিকে সহিংসতা দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান, সব মিলিয়ে ফ্রান্সে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেদিকেই নজর দেশটির রাজনৈতিক মহল ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের।




