ফালুর ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাবেক উপদেষ্টা মোসাদ্দেক আলী ফালুর প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় আদালতের আদেশের পরপরই গতকাল বৃহস্পতিবার ফালুর সম্পত্তি ক্রোক করার জন্য মাঠে নামে দুদক। দিনভর অভিযান চালিয়ে ফালুর সব সম্পত্তি জব্দ করা হয়।

দুদকের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য বলেন, ‘মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধানের নেতৃত্বে দুদকের একটি টিম অভিযান চালিয়ে ফালুর ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পত্তি জব্দ করেছে। আদালতের আদেশ পেয়ে কমিশনের অনুমতি নিয়ে তাঁর সম্পত্তি জব্দ করা হয়।’

ফালুর ক্রোক করা সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে—পুঁজিবাজারে তাঁর মালিকানাধীন রাকীন ডেভেলপমেন্ট কম্পানি বিডি লিমিটেডের ২০ শতাংশ শেয়ার, যার বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা, রোজা প্রপার্টিজ লিমিটেডের ৯৩ লাখ শেয়ার, যার বাজারমূল্য ৯৩ কোটি টাকা। তিনি রোজা প্রপার্টিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। আরো রয়েছে—রোজা এন্টারটেইনমেন্ট এফজেডইর ২০ লাখ টাকার শেয়ার, রোজা ইনভেস্টমেন্ট এলএলসির পরিচালক হিসেবে ২৯ লাখ ৪০ হাজার টাকার শেয়ার, রাজধানীর কাকরাইলে প্রায় ৫০ কোটি টাকা মূল্যের ২৩ শতাংশ জমিতে বাণিজ্যিক প্লট। এ ছাড়া আইএফআইসি ব্যাংকের কারওয়ান বাজার শাখায় রোজা প্রপার্টিজের নামে রক্ষিত অর্থও জব্দ করা হচ্ছে।

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০১৭ সালের ১৫ মে ফালুর বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা করে দুদক। একই অভিযোগে ওই বছরের ১০ আগস্ট ফালুর স্ত্রী মাহবুবা সুলতানার বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তাঁদের বিরুদ্ধে আলাদাভাবে অভিযোগপত্র অনুমোদন দেয় দুদক; সেখানে প্রায় ২২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।

এরপর দুদকের আবেদনে আদালত ফালু দম্পতির সব স্থাবর-অবস্থাবর সম্পদ জব্দের আদেশ দেন। ওই আদেশের ভিত্তিতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাজধানীর উত্তরখানের দুটি স্থানে ফালুর মালিকানায় থাকা মোট ৬৭ শতাংশ জমি, বড় মগবাজারের পাঁচ স্থানে ৪৫ শতাংশ জমি, বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দুটি দোকান, কাকরাইলের দুই জায়গায় ১৮ শতাংশ জমি, বাউনিয়ায় সাড়ে ৮২ শতাংশ নিচু জমি, তেজগাঁও শিল্প এলাকায় ৬.৫০ শতাংশ জমি এবং দক্ষিণ শাহজাহানপুরে একটি ফ্ল্যাট জব্দ করা হয়।

এ ছাড়া ফালুর মালিকানাধীন ইন্টারন্যাশনাল টেলিভিশন চ্যানেল লিমিটেড (এনটিভি), রোজা অ্যাগ্রো লিমিটেড, রোজা প্রপার্টিজ লিমিটেড ও স্টার পোরসিলিন প্রাইভেট লিমিটেডের শেয়ারও জব্দ করা হয়। অন্যদিকে আদালতের আদেশে ফালুর স্ত্রী মাহবুবা সুলতানার নামে থাকা গুলশান সাবরেজিস্ট্রি অফিস এলাকায় ছয়তলা বাড়ি, এনটিভি, রোজা অ্যাগ্রো লিমিটেড ও এমএএইচ সিকিউরিটিজ লিমিটেডের সব শেয়ার সে সময় জব্দ করা হয়। এরপর কমিশনের তদন্তে ওই দম্পতির আরো কিছু সম্পদের তথ্য পাওয়া গেলে সেগুলোও জব্দ করার আবেদন করা হয়। ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ কে এম ইমরুল কায়েশ অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে তা মঞ্জুর করায় দুদক ফালুর সম্পত্তি জব্দ করে।

শুধু অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলাই নয়, বন বিভাগের জমি দখল এবং বিদেশে টাকা পাচারের মামলাও রয়েছে ফালুর বিরুদ্ধে। বনের জমি দখলের অভিযোগে ফালুসহ জড়িত সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং দুদক থেকে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। ময়মনসিংহের ভালুকা থানার পালগাঁও মৌজায় ছয়টি দলিলের মাধ্যমে ৯ দশমিক ৬৪ একর জমি বেআইনিভাবে ফালুর নামে রেজিস্ট্রি করার অভিযোগে ২০১৭ সালের ২৯ অক্টোবর স্থানীয় থানায় ছয়টি মামলা করে দুদক। ওই জমির দলিল করতে সহায়তার অভিযোগে আরো ১৫ জনকে এসব মামলায় আসামি করা হয়।

জমি দখলের পাশাপাশি বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে ফালুর বিরুদ্ধে। অর্থপাচারের ঘটনায় ফালু, এস এ কে ইকরামুজ্জামানসহ চার ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে দুদক মামলাও করে। অফশোর কম্পানি খুলে ১৮৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা দুবাইয়ে পাচারের অভিযোগে মামলা করে দুদক। দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান বাদী হয়ে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করেছিলেন।

ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য থাকাকালে সরকারিভাবে গরিব মানুষের জন্য চার লাখ টাকার টিন বরাদ্দ হয়। ফালু তা গরিবদের মধ্যে বিতরণ না করে নিজস্ব লোকজনের মধ্যে বিতরণের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেন—এই অভিযোগে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও মামলা হয় ফালুর বিরুদ্ধে। ২০০৮ সালের ২ জুন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬ ফালুকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে পাঁচ লাখ ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন আদালত। এই সাজার বিরুদ্ধে আপিল করলে উচ্চ আদালত থেকে খালাস পান তিনি।