প্রান্তজনের সখা বঙ্গবন্ধু

ড. আতিউর রহমান

Social Share

এবারে শোকের মাস আগস্ট এসেছে ভিন্ন এক বাড়তি বিষণœতা নিয়ে। এমনিতেই এ মাসে বাঙালির হৃদয়ে গভীর রক্তক্ষরণ ঘটে বঙ্গবন্ধুকে হারানোর ব্যথায়। তার ওপর এ বছর যুক্ত হয়েছে অভূতপূর্ব করোনা সংকট। পাশাপাশি এসেছে অপেক্ষাকৃত প্রলম্বিত বন্যা। বন্যার্ত মানুষের কতই না কষ্ট। কভিড-১৯-এর আক্রমণে অনেক মানুষেরই আয়-রোজগার কমে গেছে। শহরে অনানুষ্ঠানিক খাতে যারা কাজ করে গ্রামে পরিবারের সদস্যদের অর্থ পাঠাতেন তারা এখন নিজেরাই গ্রামে চলে গেছেন। গ্রামে গিয়েও যারা বানভাসি তাদের আসলেই বিপদের শেষ নেই। শোকের এই মাসে এবার দুঃখী মানুষের দুঃখ মোচনে সরকার তার সাধ্যমতো চেষ্টা করছে। কিন্তু আমাদের চিরদিনের চেনা সমাজ কেন জানি তেমন সচেষ্ট নয় এদের কষ্ট নিবারণে। আগে যেমন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে সচ্ছল মানুষ দ্রুত এগিয়ে যেত বিপর্যস্ত মানুষের সাহায্য করার জন্য, এখন তেমন আর দেখি না। মনে হয় সরকারই সব করবে- এমন একটি ভাব নিয়ে সমাজ নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে আছে। স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও আগের মতো প্রান্তজনের প্রাপ্য ত্রাণ ও সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে তেমন তৎপর নয়। উল্টো খবর পাই, এখন কত স্থানীয় নেতা গরিবের প্রাপ্য নিজের আত্মীয়স্বজনকে দিয়ে দিচ্ছেন। দুর্নীতির অভিযোগ এলে সরকার তাদের পদ থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। কাউকে কাউকে জেলেও দিচ্ছে। তাতেও সমাজের ভিতরের শুভশক্তির বিকাশ ঘটছে না। অথচ দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানের স্বপ্ন নিরন্তর বয়ে বেড়াতেন বঙ্গবন্ধু। ক্ষুধামুক্ত, দ্রারিদ্র্যমুক্ত, শোষণমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার কাজে জীবনের শেষ মুহূর্তটি তিনি বিলিয়ে দিয়ে গেছেন স্বদেশের এই দুঃখী মানুষের জন্য। ১৫ আগস্টের ওই কলঙ্কজনক নির্মমতায় প্রান্তজনের এই সখা যদি হঠাৎ শারীরিকভাবে তাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন না হতেন তাহলে এদ্দিনে সত্যি সত্যি সোনার বাংলার দ্বারপ্রান্তে আমরা পৌঁছে যেতাম। একেবারে বাল্যকাল থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মুক্তির কথাই ভেবেছেন। ৯ মে, ১৯৭২। সেদিন তিনি তাঁর মনের গহিন থেকে উচ্চারণ করেছিলেন কেমন বাংলাদেশ তিনি চেয়েছিলেন। তাঁর নিজের কথায় :

‘আমি কী চাই? আমি চাই বাংলার মানুষ পেট ভরে খাক। আমি কী চাই? আমার বাংলার বেকার কাজ পাক। আমি কী চাই? আমার বাংলার মানুষ সুখী হোক। আমি কী চাই? আমার বাংলার মানুষ হেসেখেলে বেড়াক। আমি কী চাই? আমার সোনার বাংলার মানুষ আবার প্রাণভরে হাসুক।’

সোনার বাংলা গড়ার এ স্বপ্ন তিলে তিলে তাঁর মনোজগতে ঠাঁই করে নিয়েছিল। ছিলেন তিনি প্রকৃত বাঙালি। চলনে-বলনে, চিন্তায়-মননে ছিলেন বাঙালি। তাঁর শিকড় ছিল প্রোথিত এ দেশের গ্রামীণ সমাজে এবং সেখান থেকে বেড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত তথা পেশাজীবীদের মাঝে। মাটি ও মানুষের কাছাকাছি থাকা শেখ মুজিবের ছিল অসাধারণ সাংগঠনিক সক্ষমতা। সে সক্ষমতা তিনি কাজে লাগিয়েছেন বঞ্চিত মানুষের কল্যাণে। ছাত্রজীবনে ‘মুসলিম ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’ গঠন, দুর্ভিক্ষের সময় লঙ্গরখানা পরিচালনা এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় ত্রাণশিবির চালু করে তিনি তাঁর মানসিক নেতৃত্বের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। যাদের পাশে দাঁড়াবার কেউ নেই তাদের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়েই তরুণ মুজিব রাজনীতিতে যোগদান করেছিলেন। লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট। বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়। শাসক শ্রেণির কাছে বঞ্চিতজনের ন্যায্য দাবি নিয়মমতোই তুলে ধরতেন। তারা সেসব দাবি মানতে না চাইলে নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদ বা আন্দোলন গড়ে তুলতেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের পক্ষে উপাচার্যের সঙ্গে দফায় দফায় সভা করেছেন। কর্তৃপক্ষ চালাকি করলে তিনি আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। তাঁর সহযোগীরা আপস করলেও তিনি ছিলেন অনড়। বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে ‘মুচলেকা’ দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি তিনি। দারুণ আত্মসম্মানবোধ ছিল তাঁর। আর রাজনৈতিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে তিনি বারবার জেলে গেছেন। নির্বাচনের সুযোগ এলে তাতে অংশগ্রহণ করেছেন। মন্ত্রিত্বও করেছেন। গণপরিষদে যোগ দিয়ে বাঙালির স্বার্থ বিশেষ করে কৃষক ও শ্রমিকের স্বার্থের কথা তুলে ধরতেন। নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন নস্যাৎ করার উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি প্রথমে অসহযোগ এবং পরে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতার ডাক দেন। অথচ এই শেখ মুজিব একসময় জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হবে, বাঙালি মধ্যবিত্তের সন্তানরা শিক্ষা ও চাকরি পাবে এমন প্রত্যাশা নিয়েই সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু যেমন পাকিস্তান চেয়েছিলেন তা যে হওয়ার নয় সে বিষয়টি বুঝতে তাঁর খুব বেশি সময় লাগেনি। পাকিস্তানের কুহেলিকা দ্রুতই কেটে যায় তাঁর মন থেকে। কলকাতা থেকে ঢাকায় এসেই প্রগতিপন্থি মুসলিম লীগ কর্মীদের জড়ো করে গড়ে তোলেন আওয়ামী মুসলিম লীগ। তবে তার আগে গড়ে তোলেন ছাত্রলীগ। তারও আগে অবশ্য ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগে’ কিছুদিন থেকে জনগণের চেতনার স্তর অনুভব করে গড়ে তোলেন মূলধারার বিরোধী শক্তি। অসামান্য গণবোধ এবং রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণে বাস্তবতা ও নমনীয়তা তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা সুউচ্চ অবস্থানে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের প্রথম পর্যায়ে তিনি ছিলেন সম্মুখসারির নেতা। সে কারণে জেলেও যান। জেল থেকে মুক্তি পেয়েই ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ভাষা আন্দোলনের সাংগঠনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বায়ান্নর আন্দোলনের আগ দিয়ে তিনি জেল থেকেই তাঁর সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। ঢাকা মেডিকেলে স্থানান্তরিত হওয়ার পর সেই সংযোগ আরও গভীর হয়। সে কারণেই আগে থেকে পরিকল্পনামাফিক তিনি অনশনের ঘোষণা দেন। দ্রুত তাঁকে ও মহিউদ্দিনকে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তর করা হয়। ঠিকই তিনি অনশন শুরু করে দেন। অনশন থাকা অবস্থায় ঘটে যায় একুশে ফেব্রুয়ারি মর্মান্তিক ঘটনা। অনশনে প্রাণ যায় যায়। কর্তৃপক্ষ ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে তাঁকে মুক্তি দেন। ২৭ ফেব্রুয়ারি স্টেচারে করে জেল থেকে বের করা হয় তাঁকে। কিছুদিন স্বগ্রামে থেকে ঢাকায় ফিরে আসেন। ফের শুরু করেন দল গোছানো।

এ সময়টায় ভাষা আন্দোলনের পেছনে যে আর্থ-সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত তথা শোষণ-বঞ্চনা ছিল গভীর, সে কথাগুলো গুছিয়ে বলতে থাকেন দেশজুড়ে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলোয় স্পষ্টতই বেরিয়ে আসে যে, শেখ মুজিবই হতে যাচ্ছেন পূর্ব বাংলার জনগণের প্রধান মুখপাত্র। সেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই পাকিস্তানের দুই অংশের অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা ‘দুই অর্থনীতি’র প্রয়োজনীয়তার আলোকে বলতে থাকেন। পনের শ মাইলের ব্যবধানের দুটো অঞ্চলে যে এক অর্থনীতি চলতে পারে না সে কথাটি তিনি হাড়ে হাড়ে অনুভব করেন ’৫৪ ও ’৫৬ সালে প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী হওয়ার পর। তাঁর এই অর্থনৈতিক বৈষম্য ভাবনাকে আরও স্পষ্ট করে সামনে আনতে থাকেন পূর্ব বাংলার অর্থনীতিবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা তাঁদের বিভিন্ন কমিটির কর্মকান্ডের ভিতর দিয়ে। দ্রুতই পঞ্চাশের দশকে দুই অঞ্চলে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল চোখে পড়ার মতো। পূর্ব পাকিস্তান মোট রাজস্বের ৬০% জোগান দিত। আর এ অঞ্চলে রাজস্ব ব্যয় হতো ২৫%। বৈদেশিক সহায়তার মাত্র ৪% পেত পূর্ব পাকিস্তান। রপ্তানি আয়ের ৫৯% জোগান দিত পূর্ব পাকিস্তান (মূলত পাটের কারণে)। আর মোট আমদানির ভাগ পেত ৩০%। এই দশকে পূর্বাঞ্চলের চেয়ে ৩.৫ থেকে ৫ গুণ বেশি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু ব্যয়। জনপ্রশাসনের মাত্র ১৫% পদে ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকরা। সশস্ত্র বাহিনীর মোট জনবলের ৫% ছিল পূর্ব পাকিস্তানের। ১৬ জন জেনারেলের মাত্র একজন ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানি। আর তাই শেখ মুজিব দাবি করেন দুই ভূখন্ডের জন্য আলাদা অর্থনীতি গঠনের কোনো বিকল্প নেই। এ ধারণাকেই আরও শানিত করে ’৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে ঘোষণা করেন ঐতিহাসিক ছয় দফা। সংসদীয় গণতন্ত্র, প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা, অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন, কর আহরণে প্রাদেশিক সরকারের কর্তৃত্ব, আলাদা বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং প্রদেশের নিজস্ব মিলিশিয়া বা প্যারামিলিটারি বাহিনী গঠনের মূল দাবি স্থান পেয়েছিল ছয় দফায়। সারা পূর্ব বাংলার এ ছয় দফা গণদাবিতে রূপান্তরের জন্য প্রদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত চষে বেড়ান তিনি। মাঝেমধ্যেই গ্রেফতার হন। জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার জনসভা করেন। আবার গ্রেফতার হন। জেলে থাকা অবস্থায়ই ডাক দেন ৭ জুনের ধর্মঘটের। খুবই সফল সেই ধর্মঘটে প্রাণ যায় বেশ কয়েকজন তরুণ ও শ্রমিকের। বাঙালির ক্ষোভ তখন চরমে। শেখ মুজিবকে আগরতলা মামলায় রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে নতুন করে বন্দী দেখানো হয়। পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতা ব্যাপক সমাবেশ করে ঊনসত্তরে। শুরু হয় গণঅভ্যুত্থান। আইয়ুব খান ওই মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁকে বঙ্গবন্ধু গণউপাধিতে ভূষিত করে।

এর পরের কথা আমরা জানি। আইয়ুব খান পদত্যাগ করে ইয়াহিয়া খানকে ক্ষমতা দেন। তিনি জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দেন। শেখ মুজিব ওই নির্বাচনকে গণরায়ের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। ওই নির্বাচনের আগে ’৭০ সালের ২৮ অক্টোবর বেতার ও টেলিভিষণে তাঁর ভাষণে বাঙালিদের মনের কথা বলেন। তাদের ক্ষোভের কারণগুলো চুম্বকাকারে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘যে সংকট আজ জাতিকে গ্রাস করতে চলেছে তার প্রথম কারণ দেশবাসী রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। দ্বিতীয় কারণ, জনগণের এক বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অর্থনৈতিক বৈষম্যের কবলে পতিত। তৃতীয় কারণ অঞ্চলে অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের জন্য সীমাহীন অবিচারের উপলব্ধি জন্মেছে। প্রধানত এগুলোই বাঙালির ক্ষোভ-অসন্তোষের কারণ।’ আর এ অসন্তোষের প্রতিফলন ঘটে ওই বছরের ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বের হয় আওয়ামী লীগ। নির্বাচিত প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদের সদস্যদের নিয়ে বঙ্গবন্ধু শপথ নেন ছয় দফা বাস্তবায়নের। শুরু হয় ষড়যন্ত্র। ইয়াহিয়া-ভুট্টো এক হয়ে জনগণের নির্বাচিত নেতাকে ক্ষমতায় বসতে না দেওয়ার ষড়যন্ত্রে  মেতে ওঠেন। জাতীয় পরিষদের ঢাকা অধিবেশন হঠাৎ স্থগিত করা হয়। শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। ৭ মার্চ দিলেন তিনি মুক্তির ডাক। বললেন গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে। চলে মুক্তিযুদ্ধ প্রস্তুতি পর্ব। আলাপ-আলোচনার অনেক নাটকীয়তার পর ২৫ মার্চ শুরু হয় গণহত্যা। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরেই বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দেন স্বাধীনতার। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। বন্দী হন বঙ্গবন্ধু। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও তিনি অনড় থাকেন স্বাধীনতার প্রশ্নে। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সফল সমাপ্তির পর বঙ্গবন্ধু ফিরে আসেন বিজয়ীর বেশে। শুরু করেন নয়া দেশ গড়ার এক অভাবনীয় সংগ্রাম। অর্থনৈতিক মুক্তির সেই সংগ্রাম সহজ ছিল না। শ্মশান বাংলাকে সোনার বাংলায় রূপান্তরের সেই যুদ্ধেও তিনি ছিলেন অবিচল। মাত্র ৮ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা করেন তিনি। সঞ্চয় ছিল জিডিপির ৩%। বিনিয়োগ জিডিপির ৯%। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শূন্য। এই সামান্য সম্পদ নিয়েই তাঁকে যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং ১ কোটি শরণার্থীকে পুনর্বাসনের পাশাপাশি দ্রুত তৈরি করতে হয়েছে জনবান্ধব গণতান্ত্রিক সংবিধান। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্থাপন, ব্যাংক-বীমা, শিল্প পুনরায় চালু করা, কৃষির আধুনিকায়ন এবং অভাবী মানুষের খাদ্য চাহিদা মেটানোর মতো গুরুদায়িত্ব পালন করতে হয়েছে তাঁর সরকারকে। এ সবই করতে হয়েছে প্রতিকূল প্রকৃতি এবং বিরূপ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই। সুচিন্তিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে কৃষি ও শিল্পের একই সঙ্গে উন্নয়নের এক অভূতপূর্ব কৌশল তিনি গ্রহণ করেন। সংবিধানের মৌলনীতিতে যেমন মৌলিক অধিকারগুলো পূরণের অঙ্গীকার ছিল তেমনি প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রত্যয় ঘোষিত হয়েছিল। তিনি পরিকল্পনা দলিলের মুখবন্ধে লিখেছিলেন, ‘এই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ভবিষ্যৎ বিকাশের দিকনির্দেশনা এবং উন্নয়ন অগ্রাধিকার চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে স্বল্প সময়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। … জাতি গঠনে আমাদের সবাইকে একাগ্রচিত্তে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে যেমনটি মুক্তিযুদ্ধে আমরা সাহস ও উদ্দীপনাসহ করেছিলাম।’ একই সময়ে তিনি শিল্পের জাতীয়করণ করেছিলেন। তবে ১৯৭৪-৭৫ সালে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগসীমা ২৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ কোটি টাকায় উন্নীত করেছিলেন। জেলা গভর্নর প্রথা চালুসহ প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন ও ইউজিসি গঠন করেছিলেন। সমবায়ব্যবস্থা কৃষির আধুনিকীকরণ করতে চেয়েছিলেন। প্রবল খাদ্য ঘাটতি, বৈরী কূটনীতি সত্ত্বেও দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছিল। অভাব ও অনটন ছিল। কিন্তু মাত্র চার বছরেই মাথাপিছু আয় তিন গুণ বাড়ানো সম্ভব ছিল। ’৭২-এ ৯৩ ডলারের মাথাপিছু আয় ’৭৫-এ ২৭৩ ডলারে উন্নীত হয়েছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করেই তিনি খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যাপক আয়োজন করে ফেলেছিলেন। কিন্তু তাঁর পরিশ্রমের সুফল তিনি দেখে যেতে পারেননি। আগস্টের ওই কালরাতে বাংলাদেশের শত্রুরা চরম নির্মমতায় তাঁকে শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে তাঁর প্রিয় স্বদেশবাসী থেকে। এরপর দেশ ছিটকে পড়ে এক অভাবনীয় অনিশ্চয়তার মধ্যে। ’৭৬ ও ’৭৭-এ মাথাপিছু আয় পড়ে যায় ১৩৮ ও ১২৮ ডলারে। আর মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু চেতনা হয় ধূলিসাৎ।

অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর ফের দেশ ফিরে আসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে। তাঁর সুযোগ্য কন্যার হাত ধরে দেশ এগিয়ে চলেছে প্রযুক্তিনির্ভর অন্তর্ভুক্তি উন্নয়নের পথে। হঠাৎ করোনা সংকট ও বন্যা পরিস্থিতির কারণে অনেকেই কর্মসংস্থান হারিয়ে অভাব-অনটনের মধ্যে পড়ে গেছে। বিশ^জুড়ে এই মহামারীর চাপ ও তাপ অনুভব করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছে এ সংকট মোকাবিলা করে ফের প্রগতির পথে হাঁটতে। যে সোনার বাংলার স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন তাঁর মূলে ছিল দুর্নীতিমুক্ত একটি সুখী সমাজ গড়ার প্রত্যয়। ’৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি তিনি সাধারণ মানুষের অবদানের কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘করাপশন আমার বাংলার কৃষক করে না, করাপশন আমার বাংলার মজদুর করে না। করাপশন করি আমরা, শিক্ষিত সমাজ, যারা তাদের টাকা দিয়ে লেখাপড়া করেছি।’ তাই তিনি সেদিন দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, কালোবাজারি, নতুন পয়সাওয়ালাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। বাংলার দুঃখী জনগণের কথা বঙ্গবন্ধুর সুখীসমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার অংশ হিসেবে আজও আমাদের দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তবেই না বঙ্গবন্ধুর আত্মা শান্তিতে ঘুমুতে পারবেন। আশার কথা, বঙ্গবন্ধুকন্যা ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করেছেন। আমরা এ অভিযানের সাফল্য কামনা করছি।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর।

[email protected]