প্রানীসম্পদ উন্নয়ন: অনলাইন প্রানীসেবা ব্যবস্থা প্রবর্তন ও প্রানীসম্পদ উন্নয়ন করপোরেশন গঠন জরুরী

Social Share

পৃথিবীতে যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অর্থনৈতিক মন্দায় অন্যান্য বিপর্যয়ের পাশাপাশি কৃষি ও প্রানীসম্পদের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। যা পরোক্ষভাবে মানুষের খাদ্যাভাবের সৃষ্টি করে। TBSnews.net এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারনে বাংলাদেশে গরুর দুধের বাজারমূল্য হ্রাস পেয়েছে। ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ও চীনে দুধে মেলামাইন সংকট দেখা দিলে দুধের মূল্য বিশ্ববাজারের তুলনায় বাংলাদেশে ২০% কমে যায়। ২০১১ সালে গরুর অ্যানথ্রাক্স রোগ মহামারী আঁকার ধারন করায় গরুর দুধের ও মাংসের গ্রাহক সংখ্যা কমে গিয়েছিল। ফলে বাংলাদেশে গরুর দুধের দাম বিশ্ববাজারের তুলনায় ১০% কম ছিল। ২০১৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিহত করতে বিএনপি-জামাত জোটের পেট্রোল বোমায় জ্বালাও-পোড়াও কর্মকান্ডে সারাদেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। ফলে বিশ্ববাজারের তুলনায় বাংলাদেশে গরুর দুধের মূল্য ১৬% কম ছিল। ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৯০ দিনের ধর্মঘটের কারণে বিশ্ববাজারের তুলনায় বাংলাদেশে গরুর দুধের মূল্য ৭% কম ছিল।

কোভিড-১৯ বা করোনা সংকটের প্রাথমিক পর্যায়ে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) অনুমান করে বলেছিল, “করোনা প্রতিরোধে লকডাউনের কারণে শুধু শিল্প নয়, কৃষিতেও উৎপাদন কম হবে, ফলে বিশ্বে ৩ কোটি মানুষ অনাহারে মারা যেতে পারে।’ কোভিড-১৯ সারাবিশ্বে মানব সভ্যতাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। কৃষি, শিল্পসহ সকল ক্ষেত্রে বিপুল পরিমান আর্থিক ক্ষতিসাধন হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও প্রানীসম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রানীসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দুধ উৎপাদনে হ্রাস-১৬%, দুধের মূল্য হ্রাস-২২%, মোট ক্ষতি ১২,৩২০ কোটি টাকা। পোল্ট্রি সেক্টরেও ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত খামারীদের সহায়তায় মৎস্য ও প্রানীসম্পদ মন্ত্রনালয় এবং প্রানীসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাধ্যমে সারাদেশ থেকে ডেইরী ও পোল্ট্রি খামারের উৎপাদিত পণ্যের পরিবহন ও বিপননের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ভ্রাম্যমান বিপনন কেন্দ্রের মাধ্যমে ৫,২৮২.৫ কোটি টাকার উৎপাদিত পন্য বিক্রয় হয়েছিল। এছাড়া সারা দেশে অনলাইনে ৫,৮৯৫ কোটি টাকার পণ্য বিক্রয় করা হয়েছে। সারাদেশে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে টেলিমেডিসিনে ৫০ লক্ষ গবাদিপশু ও ৩.৫১ কোটি হাঁস-মুরগীর চিকিৎসা দেওয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত খামারীদের ৫,০০০ কোটি টাকা প্রনোদনা দেওয়া হয়। এছাড়া বিভাগীয় বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমেও বিপুল পরিমান আর্থিক সহযোগীতা দেওয়া হয়। দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারের গৃহীত কর্মসুচিসমূহ যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই পদক্ষেপ সমূহ ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ইশতাহারে ঘোষিত ‘পুষ্টি নিরপত্তা নিশ্চিতকরণ’ কর্মসুচি বাস্তবায়নে এদেশে মাইলফলক হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

করোনা’র সংক্রমণ রোধে লকডাউন কর্মসুচি, চলাচল নিয়ন্ত্রণ, আঞ্চলিক ও রাষ্ট্রীয় সীমানা নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি বিধিনিষেধ জারী করার ফলে স্বাভাবিক জনজীবন-জীবনযাত্রা ব্যাহত ও বিপর্যস্ত হয়েছিল। এমনি পরিস্থিতিতে প্রানীকুলের দৈনন্দিন স্বাভাবিক কর্মকান্ড ব্যাহত হলেও প্রাকৃতিকভাবে পরিচালিত গাভীর ওলানে নিয়মিত দুধ উৎপাদন বন্ধ করার উপায় না থাকায়, মুরগীর ডিম পাড়া/উৎপাদন বন্ধ করার উপায় না থাকায় এসব পণ্যের উৎপাদন যথারীতি হয়েছে। পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকার কারনে খামার থেকে উৎপাদিত পণ্য (দুধ, ডিম, মাংস) বাজারজাতকরণ সম্ভব হয় নাই। ফলে খামারীরা পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় উৎপাদিত পচনশীল পণ্যের মজুত বেড়ে যায়, খামারীরা স্থানীয়ভাবে কমমূল্যে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হয়। অনেকক্ষেত্রে উৎপাদিত পণ্য ধ্বংস করারও দৃষ্টান্ত রয়েছে, কোন কোন এলাকায় ছোট ছোট দুদ্ধখামারীরা রাস্তায় দুধ ফেলে দিয়েছে।

FAO এর রিপোর্ট অনুযায়ী করোনাকালে( February-April ২০২০)সময়ে কৃষিজাত দ্রব্যের উৎপাদিত মূল্য ৪.৩% কমে যায়। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী বানিজ্য সংকটের কারণে কৃষিজাত দ্রব্যের উৎপাদন ২.৬-৭% কমে যায়। পরিবহন খাতে খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় খাদ্য আমদানী-রপ্তানী ১৩-২৫% কমে যায়। করোনা সংক্রমনের প্রাথমিক পর্যায়ে টেলিভিশনসহ বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে ঘোষণা করা হয়েছিল, গবাদিপশু ও পোষা প্রানীর শরীর স্পর্শ করা যাবে না। ফলে খামারসমূহে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করায় দিনমজুর, গোয়ালা অন্যান্য নিয়মিত কর্মচারি ও ভেটেরিনারীয়ানরা খামারে প্রবেশ করতে না পারায় খামারের প্রানীকুলের পরিচর্যার কাজ ও নিয়মিত টিকাদান  কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। ফলে গবাদিপশু বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছে, গোয়ালারা নিয়মিত দুধ দোহন না করায় গাভীর ওলান ফুলা (Mastitis) রোগসহ অন্যান্য রোগ দেখা দিয়েছে।

ভেটেরিনারীয়ানগণ গবাদিপশুর যথাযথ চিকিৎসা দিতে না পারায় জটিলতার সৃষ্টি হয়। প্রানীকুলের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে, সেই প্রানীগুলো দুর্বল হয়ে যায়। এছাড়া দুধ থেকে পণ্য উৎপাদন, প্রস্তুতকরণ ও বাজারজাতকরণ ব্যাহত হয়েছে। মুরগীর বাচ্চা উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ছোট খামারগুলো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অনেক খামার বন্ধ হয়ে গেছে।

করোনা মোকাবিলায় কৃষকবান্ধব মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ডেইরী ও পোল্ট্রী শিল্পের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে মৎস্য ও প্রানীসম্পদ মন্ত্রনালয় কর্তৃক গৃহীত প্রতিটি কর্মসুচি প্রশংসনীয় হয়েছে। করোনা সংক্রমণ রোধে মানবদেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় মাংস,মাছ, দুধ, ডিম সংযোজন করার সরকারি পরামর্শ, প্রান্তিকভাবে উৎপাদিত মাংস, দুধ, ডিম সরকারীভাবে ক্রয় করার মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকের সহায়তা ও ক্রয়কৃত দ্রব্যাদি ভ্রাম্যমান বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে লকডাউনে বাসায় আটকেপরা মানুষের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দিয়ে দৈনন্দিন খাবারে পুষ্টি সংযোজনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অনলাইনে ৫০ লক্ষ গবাদিপশু ও ৩.৫১ কোটি হাঁস-মুরগীর চিকিৎসা প্রদানের মাধ্যমে ভেটেরিনারী পেশার নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। করোনা মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত সময়োপযোগী কর্মসুচি  কোভিড-১৯ বা করোনা সংকটের প্রাথমিক পর্যায়ে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) অনুমান ‘বিশ্বে ৩ কোটি মানুষ অনাহারে মারা যেতে পারে’ বাংলাদেশে মিথ্যা প্রমানিত করেছে।

কোভিড-১৯ বা করোনা মোকাবিলায় প্রথম দিকে যথাযথ প্রস্তুতি না থাকলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শি নেতৃত্ব ও  দিক নির্দেশনায় কার্যকর কর্মসুচি গ্রহণ করে সম্ভাব্য ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। এই সকল দুর্ভোগের সময় গৃহীত কর্মসুচিসমূহ  সফলতার দৃষ্টান্তস্বরূপ গ্রহণ করে আগামীদিনে প্রানীসম্পদ উন্নয়নে এবং যে কোন দুর্যোগে ডেইরী ও পোল্ট্রী শিল্প নিরাপদ রাখতে সরকারিভাবে যথাযথ প্রস্তুতি রাখা প্রয়োজন। দেশের জনগণের নাগরিক চাহিদা অনুযায়ী স্বাস্থ্য সুরক্ষা করা জরুরী। মানবদেহ সুস্থ রাখতে দৈনন্দিন পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রান্তিকভাবে উৎপাদিত ডিম, দুধ, মাছ, মাংস নিয়মিত সরবরাহ করার জন্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন এর ন্যায় মৎস্য ও প্রানীসম্পদ মন্ত্রনালয়ের অধীনে ‘প্রানীসম্পদ উন্নয়ন করপোরেশন’ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

এছাড়া করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত খামারীদের আর্থিক সহযোগীতা প্রদানের ন্যায় সারাদেশে প্রানীসম্পদ উন্নয়ন করপোরেশন এর অধীনে শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত, বেকার যুবক-যুবতীগনকে সরকারি সহযোগীতায় ডেইরী ও পোল্ট্রী খামার করার জন্য উৎসাহিত করা যেতে পারে। এই সকল খামারে উৎপাদিত পন্য উক্ত করপোরেশন এর মাধ্যমে ক্রয় করে ভিন্ন আরেকটি গ্রুপের মাধ্যমে বাজারজাতকরণ করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ফলে কর্মসংস্থান হলো, পুষ্টি সরবরাহও নিশ্চিত হলো।

সম্প্রতি দীর্ঘদিনের দাবী অনুযায়ী প্রানীসম্পদ অধিদপ্তরে নতুন অর্গানোগ্রাম অনুমোদিত হয়েছে। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও  মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ‘পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ’ কর্মসুচি বাস্তবায়ন করতে প্রানীসম্পদের যথাযথ উন্নয়নের জন্য  প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা-ভেটেরিনারীয়ান ও কর্মচারীর সংখ্যার তুলনায় অপ্রতুল। ফলে অনেক সময় প্রয়োজনের তাগিদে ভেটেরিনারী হাসপাতালের কর্মচারীরাও চিকিৎসা কাজে নিয়োজিত হয়। এমনি পরিস্থিতিতে করোনাকালের অভিজ্ঞতার আলোকে সরকারি ও বেসরকারীভাবে ‘অনলাইনে ভেটেরিনারী চিকিৎসা সেবা প্রদান’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলে সেবা প্রদানে প্রতিযোগিতা বাড়বে, সেবার মান উন্নত হবে, কর্মচারি নির্ভর চিকিৎসা বন্ধ হবে, খামারীর গবাদিপশু-হাঁস মুরগী সুস্থ থাকবে, অধিক পরিমান মাংস, দুধ, ডিম উৎপাদন হবে। এর ফলে পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, জনগন সুস্থ থাকবে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে মেধাবী এক প্রজন্ম দ্বারা ।

লেখক:  ড. মো. আওলাদ হোসেন
ভেটেরিনারীয়ান, পরিবেশবিজ্ঞানী, রাজনৈতিক কর্মী।