প্রস্তাবিত বাজেট বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান তৈরি ও জীবিকার সুরক্ষা দেবে : অর্থমন্ত্রী

35
Social Share

২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ব্যবসা বান্ধব উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, নতুন বাজেটে করহার কমানোর পাশাপাশি ব্যবসা সহজীকরণে নানা উদ্যোগ থাকায় দেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। যেসব করনীতি নেয়া হয়েছে তা বেসরকারিখাতের উৎপাদন বাড়াতে বিশেষ সহায়ক হবে।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য, কৃষি ও সামাজিক কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরসারি খাতের জন্য সেব উৎসাহব্যঞ্জক নীতি সহায়তার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তাতে প্রস্তাবিত বাজেট করোনায় বিপর্যস্ত মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে।
শুক্রবার ভার্চ্যুয়াল প্ল্যাটফর্মে আয়োজিত বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী এসব আশার কথা শোনান। এর আগে গতকাল(বৃহস্পতিবার) মুস্তফা কামাল ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন। সংবাদ সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ও প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে অর্থমন্ত্রীকে সহযোগিতা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর ফজলে কবীর, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম ও পরিকল্পনা কমিশনের সিনিয়র সদস্য ড. শামসুল আলম। এছাড়া সংবাদ সম্মেলনে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব ফাতেমা ইয়াসমিন উপস্থিত ছিলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘কর হার হ্রাস করার পাশাপাশি ব্যবসায় পরিবেশের উন্নয়নে আমরা এবার যেসব উদ্যোগ নিয়েছি-এর উদ্দেশ্য হলো ব্যবসায়ীরা যেন এই সুযোগ নিয়ে উৎপাদন বাড়াতে পারে। যেখানে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠি কাজ পাবে।’
তিনি বলেন, কর্মসৃজন তৈরির মূল চালিকাশক্তি বেসরকারিখাত। কর আইন সহজ করে বেসরকারি খাতে অধিকতর প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি বিশেষ করে দ্রুততার সঙ্গে দেশীয় শিল্পায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে করদাতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে।
এক প্রশ্নের উত্তরে অর্থসচিব আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, করোনা অতিমারির মধ্যেও এবার বাজেট সম্প্রসারণমূলক করা হয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাড়ানো হয়েছে। এর কারণ হলো এডিপি বাস্তবায়ন হলে মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি কর পদক্ষেপের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান তৈরির উদ্যোগ আছে। তিনি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়ে দৃঢ় আশা প্রকাশ করে বলেন, এবার সরকারের ব্যয় পরিকল্পনা ও রাজস্ব সংগ্রহ, দুই দিকে কর্মসৃজনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
দেশীয় শিল্প প্রসারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নেয়া নীতি ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগলাইনকে অত্যন্ত ভাল পদক্ষেপ উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বলেন, ‘দেশীয় শিল্প প্রসারে আমরা কর হার বাড়াতে চাই না। কমাতে চাই। সেভাবে নীতি প্রণয়ন হবে। এর ফলে আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং অর্থনীতি এগিয়ে যাবে।’
অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করা সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী বলেন, অপ্রদর্শিত অর্থ ও কালো টাকা এক নয়। দুটোর মধ্যে বিস্তর তফাৎ রয়েছে। কালো টাকা হলো-অবৈধ বা দূর্ণীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ। অন্যদিকে অপ্রদর্শিত অর্থ হলো কর পরিশোধ করা হয়নি এমন অর্থ। আমাদের দেশে অপ্রদর্শিত অর্থ মূলত পদ্ধতিগত দূর্বলতার কারণে তৈরি হয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি জানান, অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করার বিষয়ে যে নীতিগত দূর্বলতা ছিল সেটা এবার সহজ করে সার্বজনীন করা হয়েছে।
মুস্তফা কামাল বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে টিকাদানসহ সামগ্রিকভাবে করোনায় মোকাবেলায় ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, সেটি যথেষ্ট। তবে প্রয়োজন হলে আরও অর্থের সংস্থান করা হবে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, টিকা কর্মসূচি জোরদারে আমাদের পক্ষ থেকে প্রস্তুত রয়েছি। একাধিক উৎস থেকে টিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতি মাসে ২৫ লাখ করে টিকা দেয়া হবে, বিষয়টি এমন নয়। অন্তত ২৫ লাখ করে দেয়ার পরিকল্পনা। বড় আকারে সেটি যাতে দেয়া যায়, তার সর্বাত্বক প্রচেস্টা রয়েছে।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠির সুরক্ষা প্রদানের বিষয়ে মুস্তফা কামাল জানান, সরকারের অভিপ্রায় হলো প্রান্তিক মানুষ যেন কষ্টে না থাকে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাস্তুহারা প্রান্তিক মানুষকে খুঁজে বের করে ঘর দেয়া হচ্ছে। প্রত্যেকটি গৃহহীন মানুষকে ঘর দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জানান, আগামী অর্থবছরে যে ঘাটতি বাজেট ধরা হয়েছে বিশেষ করে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থের সংস্থান, সেটি পেতে কোন সমস্যা হবে না। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী বলেন, কোভিড শুরুর আগে আমাদের এডিপি বাস্তবায়নের হার যথেষ্ট ভাল ছিল। আমরা যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতাম, সেটি অর্জিত হতো। গত দুইবছর কোভিডের কারণে বাস্তবায়ন কম হয়েছে। তবে আগামী অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়ন ও অর্থ ব্যয় করার ক্ষেত্রে কোন সমস্যা হবে না বলে তিনি জানান।
কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কৃষি উৎপাদন বাড়াতে বরাবরের মত এবারের বাজেটেও নানাবিধ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। করোনাকালীন সময়ে আমরা স্বাস্থ্য ও কৃষিখাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছি। আর অর্থমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা হলো বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি পাশর্^বর্তী দেশগুলোতে যেন খাদ্য রপ্তানি করতে পারি। তিনি বলেন, বাজেট প্রণয়নের সময় কৃষিখাতকে সেভাবেই গুরুত্ব দেয়া হয়। কৃষি অবকাঠামো উন্নয়নকে সর্বাধিক প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে।
মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির বিষয়ে মুস্তফা কামাল বলেন, সারাবিশ^ যখন করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিপর্যস্ত, তখন বাংলাদেশের অর্থনীতির অধিকাংশ সূচকের অগ্রগতি হয়েছে। আমরা ৬ শতাংশের উপর প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছি। আশা করি আগামীবছর প্রস্তাবিত ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারব।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান খুলনার পাইকগাছা ও কয়রার মত প্রাকৃতিক দূর্যোগ প্রবণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।