‘পুরো ভারতটাই কাশ্মীর হয়ে যাচ্ছে’

Social Share

ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে সহিংস বিক্ষোভ চলছে। ভারতজুড়ে জ্বলছে বিক্ষোভের আগুন। রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে দিল্লি। আর দেশটির এই আন্দোলন নিয়ে ব্যক্তিগত মতামত জানিয়েছেন দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র এবং বর্তমানে রক্স মিডিয়া কালেক্টিভের সঙ্গে একজন শিল্পী এবং কিউরেটর হিসেবে যুক্ত শুদ্ধব্রত সেনগুপ্ত। তার এই মতামতটি প্রকাশ করেছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা।

শুদ্ধব্রত সেনগুপ্ত লেখেন, দিল্লি পুলিশের সদর দপ্তরের সামনে স্বতঃস্ফূর্ত, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সমাবেশ শেষে রাতে বাড়ি ফিরলাম। হাজার হাজার তরুণ তরুণী, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, সাউথ এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়, এবং আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দিল্লির সমস্ত কেন্দ্রীয় এবং রাজ্যস্তরীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, অসংখ্য সাধারণ নাগরিক, সমাজকর্মী, এবং আরো নানা ক্ষেত্রের মানুষ, সকলেই সমবেত হয়েছিলেন, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পুলিশি বর্বরতার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই।

দিল্লিতে বেপরোয়া, বেলাগাম অমিত শাহের পুলিশ। উত্তর প্রদেশের আলিগড়ে একই রকমভাবে লাগামহীন অজয় সিং বিশ্ত, অর্থাৎ যোগি আদিত্যনাথের পুলিশ। সাহারানপুর, আলিগড় এবং মীরাট থেকে আসছে ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর। ‘কাশ্মীরকে ভারতের মূলস্রোতে ফেরানো’ হচ্ছে না, বরং পুরো ভারতটাই কাশ্মীর হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে দিল্লির শীতে সারারাত ধরে চলেছে প্রতিবাদ, থামার কোনো লক্ষণ নেই। গুরুত্বপূর্ণ রুটে বন্ধ করে দেওয়া হয় মেট্রো পরিষেবা, তালা দিয়ে দেওয়া হয় স্টেশনে। তাও আইটিও মুখী মানুষের ঢল ছিল অব্যাহত, প্রধানত পায়ে হেঁটে। সারারাত জেগেছে দিল্লি। মনে প্রশ্ন জাগে-মোদি, শাহ, দোভাল, এবং তাদের অনুগামীরা রাতে ঘুমিয়েছিলেন? তাদের ঘুমোনো প্রয়োজন। কারণ তাদের দুঃস্বপ্নের সময় শুরু হতে চলেছে।

আমি আজ লেখছি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রাক্তনী হিসেবে। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে আমি জামিয়াতে পড়তে যাই। তারপর থেকেই যোগাযোগ রয়ে গেছে সেখানকার শিক্ষক এবং ছাত্র মহলের সঙ্গে। ভারতের সবচেয়ে অবাধ, বন্ধুবৎসল, শান্তিপূর্ণ ক্যাম্পাসগুলোর একটি হলো জামিয়া, আমার অনেক বন্ধুও রয়েছে সেখানে। ভিডিওতে দেখছি, সেই ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ঢুকছে পুলিশ, ভাঙচুর চালাচ্ছে লাইব্রেরিতে, জামিয়া নগরের বাড়িতে ঢুকে পড়ে সেখানকার পেয়িং গেস্ট ছাত্রীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করছে, কোনোরকম প্ররোচণা ছাড়া টিয়ার গ্যাস এবং গুলি ছুড়ছে ছাত্রদের দিকে। দেখে আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছি।

গত ৪০ বছরে এমন একটা ঘটনাও মনে পড়ছে না যেখানে মাত্র একদিনে এই ধরনের আতঙ্ক চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ছাত্রসমাজের ওপর। আরও যা ঘৃণ্য, তা হলো আগুনে ঘি ঢালার পুলিশি প্রচেষ্টা। আমি নিজের চোখে এমন ফুটেজ দেখেছি যেখানে দেখা যাচ্ছে, বাসের কাছে তেলের ক্যান হাতে পুলিশ, এবং একটি মারাত্মক ভিডিওতে একজন পুলিশকর্মীকে দেখা যাচ্ছে বাসের ভেতরে সিটের ওপর তেল ছড়াতে, স্পষ্টতই আগুন ধরানোর আগের মুহূর্তে। আমার মতে, ‘বাসে আগুন লাগানো’র দায় পরিষ্কারভাবেই নেয় পুলিশ, এই ভেবে যে পরে তা ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে সাহায্য করবে।

মনে পড়ে যাচ্ছে, গোধরায় কী ধরনের সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে ট্রেনে আগুন ধরানো হয়েছিল। অনেক ভেবেচিন্তেই কথাটা বললাম। দিল্লিতে এবং অন্যান্য জায়গায় যা চলছে, তা উদ্দেশ্যহীন বিশৃঙ্খলা নয়। পরিকল্পনা মাফিকই তছনছ করা হচ্ছে সব। সেই পরিকল্পনার জাল বোনা হচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে। কিন্তু এই পরিকল্পনা সফল হতে দেওয়া চলবে না। এটা বুঝতে হবে যে অমিত শাহ এবং তার চেলাচামুন্ডারা সবরকম চেষ্টা করবেন এই বিষয়টিকে একটি সাম্প্রদায়িক অগ্নিকুণ্ডে পরিণত করার, তাদের নিশানায় জামিয়া মিলিয়া বা আলিগড়ের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা, বিশেষ করে মুসলিম ছাত্ররা। এই উস্কানির ফাঁদে পা দিলে চলবে না। অমিত শাহের নিয়ম মেনে খেলা যাবে না। এখন পর্যন্ত জামিয়া এবং দিল্লির অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা এই ‘সাম্প্রদায়িক’ খেলার বিরুদ্ধে একজোট হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

কিছুদিন আগে জামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে ছাত্রদের ওপর হানা দেয় দিল্লি পুলিশ। রবিবার তাদের লক্ষ্য ছিল লাইব্রেরিতে পড়ুয়ারা। কোনোরকম কারণ ছাড়াই। দেখে মনে হয়, বর্তমান সরকারের যেন কোনো বিশেষ শত্রুতা রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। যেন লাইব্রেরি দেখলেই মাথা খারাপ হয়ে যায়। প্রশাসনের শীর্ষে কিছু সীমিত মানসিকতার প্রতারক থাকার ফলেই বোধহয় বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রছাত্রী, এবং শিক্ষকদের কণ্ঠরোধ করার এই মরিয়া প্রচেষ্টা।

দেশের শাসকদল বিজেপি এখন পর্যন্ত সরকার পরিচালনায় তাদের নিজেদের ব্যর্থতায় নিজেরাই হতাশ হয়ে একের পর এক স্বনির্মিত সঙ্কটের সৃষ্টি করে চলেছে, এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি ও নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের (সিএএ) মতো মারাত্মক হাতিয়ার ব্যবহার করে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করে আগুন নিয়ে খেলছে। এইসব পদক্ষেপ কিন্তু গ্রাস করে নেবে আমাদের সকলের ভবিষ্যৎ। সুতরাং এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে সেই ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা সবচেয়ে চিন্তিত, সেই ছাত্রসমাজই বর্তমানে সবচেয়ে বিক্ষুব্ধ।

যেদিন তড়িঘড়ি সংসদে পাশ হয়ে মধ্যরাতে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেল নাগরিকত্ব সংশোধন আইন, সেদিন থেকে শুরু করে আমি, এবং দিল্লির হাজার হাজার সাধারণ মানুষ শান্তিপূর্ণ জমায়েত করেছি, যা ঘটেছে, তা নিয়ে আতঙ্ক প্রকাশ করতে।

দিল্লির অন্যান্য জায়গাতেও প্রতিবাদ হয়েছে। প্রতিবাদের জোয়ার তৈরি হচ্ছে। ভারতের সব বড় শহরে, অজস্র ক্যাম্পাসে। টগবগ করে ফুটছে দেশের পূর্ব এবং উত্তরপূর্ব অঞ্চল-আসাম, বাংলা, মেঘালয়, ত্রিপুরা, অরুণাচল প্রদেশ, মণিপুর। অথচ কিছুতেই এই সরকারকে আটক কেন্দ্র নির্মাণ, গণ নির্বাসন বা তার চেয়েও খারাপ কিছু, এবং ‘অ-নাগরিক’দের তালিকা তৈরি করার নারকীয় পরিকল্পনা থেকে বিরত করা যাচ্ছে না। এর চেয়ে মারাত্মক শাসকদল এর আগে ক্ষমতায় আসেনি। এদের ঔদ্ধত্য, মূর্খতা, রক্তপিপাসা, এবার খর্ব করা দরকার। ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেওয়া দরকার এই মিথ্যাচার, এই চাটুকারিতা।

রবিবার রাতে যা শুরু হয়েছে, তা বজায় থাকাও দরকার। জামিয়া মিলিয়া, জেএনইউ, আলিগড়ের সাহসী শিক্ষার্থীরা, তাদের শিক্ষক, অভিভাবক, বন্ধুবান্ধব মিলে শুরু করুক এমন প্রক্রিয়া, যা ছড়িয়ে পড়বে দাবানলের মতো। যা সাহস জোগাবে রাষ্ট্রহীনতার আতঙ্কে কুঁকড়ে থাকা সংখ্যালঘুকে, ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকা মজুরির চাপে পিষ্ট শ্রমিককে, আক্রমণের ভয়ে সঙ্কুচিত নারীকে, ক্রমাগত যুদ্ধের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন সৈনিককে, এবং আমাদের ভূখণ্ডে কাশ্মীর অথবা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অবদমিত মানুষকে, যতদিন না এই শাসনের অবসান ঘটছে।