পুরুষতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে এত তোড়জোড়

20
Social Share

তসলিমা নাসরিন: নারীরা বিয়ের কাজি বা রেজিস্ট্রার হতে পারবে না- এই রায়ের পর চারদিকে প্রশ্ন ওঠা শুরু করেছে।

পরিবারে এবং সমাজে পুরুষের যা অধিকার, সেই অধিকার কি নারীর আছে? আমরা সকলেই জানি নেই। পুরুষের নানা কিছু হওয়ার, নানা কিছু করার, নানাভাবে চলার, নানা কিছু বলার অধিকার আছে, নারীর সে অধিকার নেই। আমি জানি না নারীরা মুসলিম বিয়ের কাজি হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, এতে নারীরা রাগ করছে কেন? মনে হচ্ছে এই প্রথম বুঝি নারীদের কিছু থেকে বঞ্চিত করা হলো, যেন এই প্রথম নারীদের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি হলো। নারীরা কি উত্তরাধিকার আইনে বঞ্চিত হয় না, বিবাহ এবং বিবাহ বিচ্ছেদ আইনে বঞ্চিত হয় না? বিবাহ বিচ্ছেদের পর সন্তানের অভিভাবকত্বের অধিকার পুরুষের যত, তত কি নারীকে দিয়েছে আইন? এসবের উত্তর ওই একটিই, না।

আইন পুরুষদের বঞ্চিত করে না, নারীকে বঞ্চিত করে কারণ তারা নারী। পুরুষের অধিকার আছে বিয়ের কাজি হওয়ার, নারীর সেই অধিকার নেই। এতে অবাক হওয়ার কী আছে? বরং অবাক হই, ধর্মান্ধতা এবং পুরুষতান্ত্রিকতায় টইটম্বুর দেশটিতে একজন নারী কী করে প্রধানমন্ত্রী হন।

আদালত বলেছে, ‘বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের দ্বারা নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়।’ কেন সম্ভব নয়? তাদের মতে, নারীর ঋতুস্রাবই বিয়ের কাজি হওয়ার ক্ষেত্রে নারীর জন্য প্রধান অন্তরায়। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে, ঋতুস্রাব যদি নারীর না হয়ে পুরুষের হতো, তাহলে কি ঋতুস্রাবের দোহাই দিয়ে পুরুষকে এভাবে বঞ্চিত করা হতো? ঋতুস্রাব কি কখনও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নারীর শ্রমে, কর্মে, ভ্রমণে? বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নারীর দক্ষতায়, পারদর্শিতায়, নারীর বিদ্যা বুদ্ধি বিচক্ষণতায়? এর উত্তর একটিই, না। বরং যে হরমোন ঋতুস্রাব ঘটায়, সে হরমোনের কারণ নারীর শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য পুরুষের চেয়ে ভালো থাকে, নারীর হাড়মজ্জা ভালো থাকে, শিরদাঁড়া ভালো থাকে, হৃৎপি- ভালো থাকে। এই ঋতুস্রাবকে অপবিত্র ঘোষণা করা মূর্খতার চূড়ান্ত।

বিয়ের কাজি হতে পারবে না কোনও ঋতুমতী নারী। কিন্তু বিয়ের পাত্রীকে ঋতুমতী হতেই হবে। কাজি-নারীকে তাড়িয়ে পাত্রী-নারীকে স্বাগত জানানো হচ্ছে। এতে নারীবিদ্বেষ রইলো, আবার নারীর জন্য কামনাও রইলো। ঠিক যেমন ধর্ষণে থাকে। শুধু কামনা থাকলে যৌনতা ঘটে, আর কামনার সঙ্গে নারীবিদ্বেষ যোগ হলে ধর্ষণ ঘটে।

সরকারি নিয়োগ লাভে সুযোগের সমতা বিষয়ে বাংলাদেশ সংবিধানের ২৯(২) অনুচ্ছেদে লেখা আছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনও নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাঁহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।’ তাহলে এইবেলা সুযোগের সমতায় কেন বাধা পড়িতেছে? বৈষম্য প্রদর্শন করা হইতেছে কেন? হয় সংবিধানের বদলে শরিয়া আইন নিয়ে আসা হোক, অথবা নারীবিরোধী আইনগুলো ছুড়ে ফেলে সংবিধান মানা হোক। কিছু একটা তো করা হোক। আমরা নারী-পুরুষের সমতার কথা মুখে বলবো, কিন্তু কাজে মানবো না-এ আর কতকাল চলবে? ভয়াল স্রোতের নদীতে দুই নৌকোয় পা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে লাভ তো হয় না, বরং ডুবে মরার আশংকা থেকে যায়।

বিয়ে নিবন্ধন করার কাজে নারীকে নিষিদ্ধ করার আদেশটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ, নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্য দূর করার সনদ এবং নারী উন্নয়নের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। নারীকে দাবিয়ে রেখে দেশকে সভ্য করা যায় না, শিক্ষিত করাও যায় না। নারীকে বৈষম্যের শিকার করে দেশের সত্যিকার উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব নয়। যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন আজ বাংলাদেশে ঘটেছে বলে মানুষ গৌরব করে, সে উন্নয়ন নিতান্তই অন্তঃসারশূন্য, যদি জনতার অর্ধেকই তাদের প্রাপ্য অধিকার না পায়।

রায়ে বলা হয়েছে নারী-কাজিরা রাতে সর্বত্র চলাফেরা করতে পারবে না। কেন পারবে না? কী অসুবিধে হয় নারী যদি রাতে রাস্তায় বেরোয়? যদি নারীকে শারীরিক অত্যাচার করা হয় রাস্তাঘাটে, সে তো নারীর দোষ নয়, দোষ যারা অত্যাচার করে তাদের। এ ক্ষেত্রে সরকারের কাজ কী? সরকারের কাজ সবার জন্য রাস্তাঘাট নিরাপদ রাখা। যেন কেউ কাউকে হেনস্তা করতে না পারে। নারীবিদ্বেষ কি শুধু রাতের বেলায় ওত পেতে থাকে নারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে? নারীবিদ্বেষ যদি সমাজে থাকে, তাহলে রাতেও যেমন ঝাঁপিয়ে পড়ে, দিনেও তেমন পড়ে। দিনে এমন ঘটনা ঘটতে থাকলে তাহলে তো কোর্ট বলে বসবে, শুধু রাতে নয়, দিনেও মেয়েদের ঘরের বাইরে বের হওয়া নিষেধ। মেয়েদের ওপর নির্যাতন সবচেয়ে বেশি ঘটে ঘরে, তাহলে মেয়েরা কি ঘরেও থাকবে না? ঘরেও থাকবে না, বাইরেও বেরোবে না? তাহলে তো আমার সেই পুরোনো কথাটিই পুনরায় বলতে হয়, তাহলে কি এই সত্য যে নারীর না মরে মুক্তি নেই?

এক প্রধানমন্ত্রী চিরকাল ক্ষমতায় থাকেন না, নতুন প্রধানমন্ত্রী আসেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন নারী, তখন তাঁর উচিত ছিল নারীর সমানাধিকারের জন্য কিছু কাজ করা। পুরুষতন্ত্রের ঘোলা জলে ডুবে থাকা সমাজকে কিছুটা ডাঙ্গায় তোলা। ধর্মভিত্তিক বিবাহ নিবন্ধন আইন বাতিল করে অভিন্ন বিবাহ নিবন্ধন আইন প্রবর্তন করা। ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইন বাতিল করে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা। যদি এই জরুরি কাজটুকু সম্ভব না হয়, তবে নারী এবং নারীবিদ্বেষী পুরুষে পার্থক্য হয়তো খুব বেশি থাকে না।

এ কথা ঠিক মেয়েরা যত শিক্ষিত এবং স্বনির্ভর হচ্ছে, তত পুরুষতন্ত্রের গায়ে আঁচড় পড়ছে, যত তারা স্বনির্ভর হচ্ছে, তত ভেঙে পড়ছে পুরুষতন্ত্র। পুরুষতন্ত্র এভাবেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারতো। কিন্তু নেতিয়ে পড়া পুরুষতন্ত্রকে গায়ে ধর্মের ঠেস দেওয়া হয়েছে। পুরুষতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে যুগে যুগে যে জিনিসটির সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়, সেটি ধর্ম। ধর্মের সামনে সকলে মাথা নত করে। যেহেতু মানুষ ধর্মভীরু তাই ধর্মকে ব্যবহার করে যা কিছু করা সম্ভব দেশজুড়ে। বৈষম্যমূলক আইনকে বৈধতা দিতে ধর্মের প্রয়োজন হয় বটে।

শুনেছি আয়েশা সিদ্দিকা নামের এক মহিলা ২০১২ সালে দিনাজপুরের ফুলবাড়িয়া পৌরসভায় বিয়ের কাজি চেয়ে যে একখানা বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল, সেটি দেখে কাজি হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। নানা রকম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় তাঁকে ডাকা হয়েছিল, তিনি সেসব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কাজি হওয়ার জন্য বিবেচিতও হয়েছিলেন। দিনাজপুর থেকে তাঁর সাফল্যের নথিপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মন্ত্রণালয় থেকে একদিন বলা হয়, এই পদের জন্য নারী যোগ্য নয়। যদিও বিজ্ঞপ্তিতে নারী নয়, পুরুষ চাই এমন কোনও বাক্যই ছিল না। এরপর আয়েশা সিদ্দিকা ২০১৪ সালে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রণার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করেন। সেই রায় বেরিয়েছে গত বছর। আদালতও মন্ত্রণালয়ের মতোই উচ্চারণ করেছে, নারী এ কাজের যোগ্য নয়। কেন যোগ্য নয়? যোগ্য নয় কারণ তাদের ঋতুস্রাব ঘটে। ঋতুস্রাব অপবিত্র, ঋতুস্রাবের নারী অপবিত্র, অপবিত্রদের তো বিয়ের মতো ধর্মীয় এবং পবিত্র কাজে অংশগ্রহণ মানায় না। সে কারণে নারীর যোগ্যতা নেই কাজি হওয়ার। ঠিক যেভাবে সমাজ নারীকে ইমাম হতে বাধা দেয় বা কোনও রকম ধর্মীয় নেত্রী হতে বাধা দেয়। আয়েশা সিদ্দিকা বলেছেন, হাইকোর্টের রায়কে তিনি চ্যালেঞ্জ করবেন। তিনি বলেন, কাজির কাজ বিয়ের রেজিস্টারে সই করা এবং পাত্র-পাত্রীকে সই করানো। সে কাজটি করতে হলে অঋতুমতী হওয়ার যুক্তি তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না।

আসলে নারীকে অবদমনের পিছনে, নারীর বিরুদ্ধে ক্রমাগত ঘটে চলা অন্যায় অত্যাচার বৈষম্য নির্যাতনের পিছনে কোনও যুক্তি নেই, শুধু থোকা থোকা বিদ্বেষ আছে, দলা দলা ঘৃণা আছে। আমি নারীর বিয়ের কাজি হওয়ার জন্য যত না অপেক্ষা করছি, তার চেয়ে বেশি অপেক্ষা করছি পুরুষের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন বিবেকবান মানুষ হয়ে ওঠার।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা