পাকিস্তানে হিন্দু মন্দিরে হামলা: সরকার কি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের রক্ষা করতে পারছে?

49
Social Share

পাকিস্তানে এক দল উচ্ছৃঙ্খল মুসলিম ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে শতাব্দী-প্রাচীন একটি হিন্দু মন্দির ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আর আগে আরো একবার এই মন্দিরে ভাঙচুর চালানো হয়েছিল।

এর পরেই পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় কারাক জেলায় শ্রী পরম হংসজি মহারাজ সমাধি মন্দিরটি পুননির্মাণের জন্য কর্মকর্তাদের আদেশ দেয়। কিন্তু এই হামলার ফলে দেশটির সংখ্যালঘু হিন্দু সমাজের মধ্যে নতুন করে ভয়ভীতি তৈরি হয়েছে। একই সাথে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের রক্ষা করতে তারা ব্যর্থ হচ্ছে।

পাকিস্তানে মোটামুটি সবাই মুসলিম। দেশটির মোট জনসংখ্যার দুই শতাংশেরও কম হিন্দু জনগোষ্ঠী। হিন্দুদের বিরুদ্ধে সমাজের ধারণাও প্রায় বদ্ধমূল। এর আগে ১৯৯৭ সালে এই শ্রী পরম হংসজি মহারাজ সমাধি মন্দিরে প্রথম হামলা চালানো হয়। এর ১৮ বছর পর ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট আদেশ দেয় মন্দিরটি পুনরায় নির্মাণ করার জন্য। যেসব হিন্দু এই মন্দিরে যেতেন তারা এখনও সেই কাজ শেষ করতে পারেননি।

সুপ্রিম কোর্টের আদেশের পর স্থানীয় হিন্দুরা মন্দিরটির পাশের আরেকটি বাড়ি ক্রয় করে সেটি মেরামতের কাজ শুরু করে। এই বাড়িটি তারা কিনেছিল হিন্দু পুণ্যার্থীদের বিশ্রামের জন্য একটু জায়গা তৈরি করতে। এর ফলে স্থানীয় মুসলিমরা আরো বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং তারা মনে করে যে মন্দিরটি আরো বড় করার কাজ চলছে। এর প্রতিবাদে ডিসেম্বরে একটি সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সেখানে আগত মুসলিমরা খুব দ্রুত উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়ে এবং মন্দিরে গিয়ে ভাঙচুর চালায়।

কীভাবে হামলা চালানো হয়

মন্দিরের কাছে প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয় ৩০শে ডিসেম্বর। স্থানীয় একজন ধর্মীয় নেতা মৌলভী মোহাম্মদ শরীফ এতে নেতৃত্ব দেন। তিনি জমিয়াতে উলেমায়ে ইসলাম নামের একটি ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের সাথেও জড়িত। মন্দিরটির ওপর এর আগে ১৯৯৭ সালে যে আক্রমণ হয়েছিল তাতেও তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে এই ধর্মীয় নেতা এবারও সমাবেশে আগত লোকজনকে উস্কানি দিয়ে তাদেরকে উত্তেজিত করে তোলেন। এক পর্যায়ে তারা হাতুড়ি দিয়ে মন্দিরের দেওয়াল ভেঙে ফেলে এবং পরে মন্দিরটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

হামলার পর পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করে যে কমিশন তারা একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে যে মন্দিরের ভেতরে মূল্যবান সব সামগ্রী ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে নকশা করা দরজা ও জানালা যেগুলো বার্মা কাঠ দিয়ে তৈরি। এছাড়াও শ্বেত পাথরে বাঁধাই করা হিন্দু সাধুর সমাধিও ভেঙে ফেলা হয়েছে। “সব মিলিয়ে চিত্রটি হল এরকম…সেখানে সবকিছুই ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে,” বলা হয়েছে কমিশনের রিপোর্টে।

সমাবেশ চলাকালে মন্দিরে পুলিশ ও নিরাপত্তা রক্ষী মোতায়েন করা হয়েছিল কিন্তু তারা উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। হামলার পর পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি গুলজার আহমেদ বলেছেন, “কোন ধরনের বাধা ছাড়াই তারা একাজ করেছে।”

তিনি আরো বলেন, “এটি পাকিস্তানের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিব্রতকর ঘটনা।” হামলার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ ১০৯ জনকে গ্রেফতার করেছে। তাদের মধ্যে মৌলভী মোহাম্মদ শরীফও রয়েছেন। একই সাথে পুলিশের ৯২ জন কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের ভেতরে হামলার সময় দায়িত্বরত দুজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাও রয়েছেন।

“সেসময় সেখানে ৯২ জন পুলিশ অফিসার কাজ করছিল। তারা ভীরুতার পরিচয় দিয়েছে। দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছে,” বলেছেন স্থানীয় পুলিশ ইন্সপেক্টর সানাউল্লাহ আব্বাসী। হামলার সময় মন্দিরের ভেতরে কোন হিন্দু ছিল না। তারা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতেই এখানে আসেন। মন্দিরে কেউ বসবাস করেন না। ফলে এই ঘটনায় কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

কেন এই বিরোধ?

যেখানে এই মন্দিরটি অবস্থিত সেটি একটি পার্বত্য মরু এলাকা। টেরি গ্রামে ১৯১৯ সালে মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান ভাগ হওয়ার বহু বছর আগেই এটি নির্মিত হয়। পরে এটি পড়ে যায় পাকিস্তানে অংশে। যার নামে এই মন্দিরটির নামকরণ করা হয়েছে সেই হিন্দু সাধু শ্রী পরম হংসজি মহারাজের প্রচুর অনুসারী পাকিস্তান, ভারত ছাড়াও সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তার সমাধিও এই মন্দিরে। ওই গ্রামের একজন শিক্ষক, সাংবাদিক ও গবেষক ওয়াসিম খাটাক বলেছেন, এক সময় সেখানে প্রচুর সংখ্যক হিন্দুর বসবাস ছিল যারা বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা বাণিজ্যের সাথে জড়িত ছিল।

তিনি জানান এই গ্রামে হিন্দু ও মুসলিমরা একসাথেই পাশাপাশি বসবাস করতো।

তিনি বলেন, “শ্রী পরম হংসজি মহারাজের কোরান মুখস্থ ছিল। এবং কোরান থেকে উদ্ধৃত করেও তিনি তার মুসলিম অনুসারীদের ধর্মীয় দিক-নির্দেশনা দিতেন।

ভেঙে ফেলা সমাধির একটি অংশ।
ভেঙে ফেলা সমাধির একটি অংশ।

তিনি জানান বিভিন্ন এলাকা থেকে হিন্দুরা এই মন্দিরে আসতো। কিন্তু ব্রিটেনের উদ্যোগে ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হয়ে যাওয়ার পর টেরি গ্রামের হিন্দুরা তাদের বাড়িঘর ফেলে রেখে অন্যত্র চলে যায়। এসব সম্পত্তি গ্রহণ ও দেখাশোনা করার জন্য পাকিস্তান সরকার একটি ট্রাস্ট গঠন করে দিয়েছিল। তার পরেও এই মন্দিরে হিন্দু লোকজনের আসা যাওয়া অব্যাহত ছিল।

সাধু শ্রী হংসজি মহারাজের একজন শিষ্য এই মন্দিরটির দেখভাল করতেন। পরে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তারপরেও মন্দিরটি দেখাশোনা করতে থাকেন। পরে ১৯৬০ এর দশকে তার মৃত্যুর পর তার ছেলেরা এই জায়গাটি স্থানীয় দুটো মুসলিম পরিবারের কাছে বিক্রি করে দেয়। এর পরে সেখানে প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

হিন্দু পুণ্যার্থীদেরকে তখন দুটো পরিবারের বাড়ির ভেতর দিয়ে মন্দিরের ভেতরে যেতে হতো প্রার্থনা করার জন্য। পরে স্থানীয় হিন্দু সমাজের লোকেরা মন্দিরে যাতায়াত সহজ করার জন্য ওই দুটো বাড়ির একটি কিনে নেয়। কিন্তু সেই বেচা-কেনা এমন এক সময়ে হয় যখন স্থানীয় মুসলিম নেতারা পাকিস্তান সরকারের ওপর যথেষ্ট প্রভাব তৈরি করেছিল।

১৯৯৬ সালে সেখানকার একটি বাড়ি বিক্রির খবর ছড়িয়ে পড়লে মৌলভী মোহাম্মদ শরীফ সাথে সাথেই স্থানীয় হিন্দু সমাজকে “যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের চর” হিসেবে ঘোষণা করেন এবং মন্দিরটি ভেঙে ফেলার কাজে উচ্ছৃঙ্খল মুসলিমদের নেতৃত্ব দেন।

এই হামলার ঘটনায় আদালতে বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলা ২০১৫ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে। সেবছর সুপ্রিম কোর্ট তার চূড়ান্ত রায়ে মন্দিরটি পুনরায় নির্মাণের আদেশ দেয়। যদিও ওই রায়ে আলোচিত দুটি বাড়ির একটির ভেতরে খুব ছোট্ট জায়গায় সেটি নির্মাণ করতে বলা হয়েছে।

আদালতের রায় সত্ত্বেও স্থানীয় সরকার পুনর্নির্মাণের জন্য তহবিল যোগান দিতে গড়িমসি করতে থাকে। এতে হতাশ হয়ে পাকিস্তান হিন্দু পরিষদ নিজেরাই মন্দিরটি পুনরায় নির্মাণ করে। নিজেদের অর্থ খরচ করে এই মন্দিরের সাথে সংযুক্ত রাস্তাটিও তারা প্রশস্ত ও পাকা করে।

মন্দিরের অলঙ্কৃত দরজা জানালাও ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।
মন্দিরের অলঙ্কৃত দরজা জানালাও ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।

এর পর কী হয়েছে?

মন্দিরটি পুনর্নির্মাণের আদেশ দেওয়ার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট হামলার সময় দায়িত্বরত পুলিশদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে।

সাময়িকভাবে বরখাস্ত হওয়া একজন পুলিশ অফিসার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে বলেছেন যে হামলার আগে স্থানীয় পুলিশের কাছে গোয়েন্দা রিপোর্ট ছিল যে সেখানে সমস্যা তৈরি হতে পারে। কিন্তু কেউ তখন ধর্মীয় ওই নেতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথা ভাবেনি।

“ধর্মীয় নেতারা তো এখন আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতিমালা তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত। আমরা যদি তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াই, আমরা তো চাকরি হারাতে পারি,” বলেন তিনি। “ফলে উপরের মহল থেকে যদি খুব পরিষ্কার নির্দেশনা না থাকে আমরা কোন ব্যবস্থা নেই না। তারা তখন এর সুযোগ নেয়।”

হিন্দু সমাজের সদস্যরা বলছেন, মন্দিরটি পুনরুদ্ধার করা হলেই সেখানে ধর্মীয় সম্প্রীতি ফিরে আসবে না। এজন্য স্কুলের পাঠ্যসূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। তারা বলছেন, এসব বই পুস্তক লোকজনকে অমুসলিমদের প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন করে তুলছে। “এটা সিস্টেমের ব্যর্থতা। স্থানীয় এই বিরোধ আইন ও সংবিধানের আলোকে খুব সহজেই মেটানো যেত। কিন্তু পরে সেটা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে,” বলেছেন পেশাওয়ারের এক হিন্দু নেতা সারাব দিয়াল।

ডিসেম্বরে টেরি গ্রামের মন্দিরে হামলার ঠিক এক সপ্তাহ আগে পাকিস্তানে সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষা কমিশনের এক বৈঠকে বলা হয় যে দেশটিতে যে সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণের উন্নতি হয়েছে সেটা দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। হামলার পরে এই কমিশন থেকে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে সেখানেও বলা হয়েছে, এবিষয়ে আরো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।