পাকিস্তানি গণহত্যার বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারও ভূমিকা রেখেছিল: সাবেক সচিব মহিউদ্দিন আহমদ

51
Social Share

ডেস্ক রিপোর্ট: যুক্তরাজ্য মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র। দেশটি বাহাত্তরের ৪ ফেব্রুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলেও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে পাকিস্তানি গণহত্যার বিরুদ্ধে তাদের সরকার ও জনগণ জনসমর্থন তৈরিসহ নানাভাবে ভূমিকা রেখেছে। বাঙালিদের পাশে দাঁড়িয়েছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও বাহাত্তরের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে প্রথম যুক্তরাজ্যই সফর করেছিলেন। পরে যুক্তরাজ্য সরকারের বিশেষ বিমানে বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

শুক্রবার ‘কারাশৃঙ্খল ভেঙে লন্ডনে বঙ্গবন্ধু : বিশ্বের মুখোমুখি ইতিহাসের মহানায়ক’ শীর্ষক স্মৃতিচারণমূলক একক স্মারক বক্তৃতায় বাংলাদেশ মিশনের তরুণ সদস্য ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মহিউদ্দিন আহমদ এ কথা বলেন।

পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বাহাত্তরের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু লন্ডনে পৌঁছালে সেদিন হিথ্রো বিমানবন্দরে প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে মহিউদ্দিন আহমদও উপস্থিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর কারামুক্তি দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর স্মৃতিচারণমূলক বিশেষ এই অনুষ্ঠান আয়োজন করে।

দুই ঘণ্টার আলাপচারিতায় মহিউদ্দিন আহমদ উপস্থিত তরুণদের নানা প্রশ্নের জবাব দিয়ে সেদিনের নানা অধ্যায় তুলে ধরেন। পরে জাদুঘর মিলনায়তনে বঙ্গবন্ধুর কারামুক্তি দিবস উপলক্ষে বিশেষ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন মহিউদ্দিন আহমদ। এতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ৪০টিরও বেশি আলোকচিত্র ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকার কাটিং প্রদর্শন করা হচ্ছে।

৮ জানুয়ারির স্মৃতিচারণ করে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ সেদিন তার নির্বাচনী এলাকায় ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আসার খবর পেয়ে তিনি দ্রুত লন্ডনে ফিরে আসেন। ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে অনুরোধ করেন। সন্ধ্যার পর ব্রিটেনের তৎকালীন বিরোধী দলের নেতা হ্যারল্ড উইলসনও ক্ল্যারিজ’স হোটেলে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ৯ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার জন্য ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে লন্ডন ত্যাগ করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আসার জন্য বিমান পাঠাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশ সরকারের বিমানেই দেশে ফিরতে চান। লন্ডন থেকে তার সফরসঙ্গী ছিলেন ভারতের দুই কূটনীতিক- ভেদ মারওয়া ও শশাঙ্ক ব্যানার্জি। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ভারতের রাজধানী দিল্লির পালাম বিমানবন্দর হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

তার মতে, বঙ্গবন্ধুকে যোগ্য সম্মান দিতে ব্রিটিশ সরকার ভুল করেনি। ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে বৈঠক শেষে সব প্রটোকল ভেঙে প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ বিদায় মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুকে নিজে গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে বিরল সম্মান জানিয়েছিলেন। যা পরদিন ব্রিটিশ গণমাধ্যমে গুরুত্বসহকারে ছাপা হয়েছিল। আসলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পর বঙ্গবন্ধুই ছিলেন এমন রাজনীতিবিদ, যিনি বাঙালির মুক্তির মহানায়ক হয়ে উঠেছিলেন। যা ব্রিটিশ সরকারও বুঝতে পেরেছিল।

বাংলাদেশ মিশনের সেই সময়ের তরুণ এই সদস্য বলেন, যুক্তরাজ্য সরকার বাংলাদেশকে বাহাত্তরের ৪ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিলেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। লন্ডনে একাত্তরের ২৭ আগস্ট বাংলাদেশ মিশনের (দূতাবাস) কার্যক্রম শুরু হলে পাকিস্তান সরকার তাতে আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার স্পষ্ট জানায়, এতে তাদের আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি। আবার একইভাবে পাকিস্তানিদের গণহত্যা যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন পাকিস্তান দূতাবাসের তৎকালীন হাইকমিশনারের কাছে যুক্তরাজ্য এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চায়। যা ছিল প্রকৃতপক্ষে এক ধরনের চাপ এবং যা স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষেই এসেছিল। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এক দিন পুরো অধিবেশনেই বাংলাদেশে গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। যদিও এতে প্রধান ভূমিকা রাখে তৎকালীন বিরোধী দল লেবার পার্টি। যার প্রধান ছিলেন হ্যারল্ড উইলসন। যিনি তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের পদত্যাগের পর প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বাঙালিদের আন্দোলন-সংগ্রামে ব্রিটিশ জনগণের ভূমিকাও ছিল অনন্য।

তার মতে, যুক্তরাজ্য প্রচ্ছন্নভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে ভূমিকা রেখেছিল। এ জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি বন্ধু হিসেবে প্রয়াত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথকে সম্মাননা দিয়েছিলেন। মহিউদ্দিন আহমদ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর লন্ডন যাত্রা নিয়ে ভারতের শশাঙ্ক ব্যানার্জিসহ কয়েকজনের কিছু ইতিহাস বিকৃতিও তুলে ধরেন।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ট্রাস্টি মফিদুল হক এবং আর্কাইভ ও প্রদর্শনী বিভাগের ব্যবস্থাপক আমেনা খাতুন।

আবারও সরব মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর : করোনা সংক্রমণজনিত পরিস্থিতিতে গত বছরের ১৭ মার্চ বন্ধ হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর শুক্রবার থেকে দর্শনার্থীদের জন্য পুনরায় খুলে দেওয়া হয়েছে। করোনা সুরক্ষায় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে এখন থেকে রোববার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাদুঘর খোলা থাকবে। শুক্রবার ছুটির দিনে জাদুঘরে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের ব্যাপক সমাগম হয়। তাদের অনেকেই বঙ্গবন্ধুর কারামুক্তি দিবস উপলক্ষে বিশেষ প্রদর্শনী ঘুরে ঘুরে দেখেন।