নির্মূল কমিটির ওয়েবিনারে জামায়াত-হেফাজত নিষিদ্ধের দাবি

29
Social Share

জামায়াত-হেফাজতের সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী সন্ত্রাসী রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। সোমবার (৩ মে) বিকেল ৩টায় শহীদজননী জাহানারা ইমামের ৯২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে নির্মূল কমিটি এক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারের আয়োজন করে। সেখানে বক্তারা এ দাবি জানান।

ওয়েবিনার এর বিষয় ছিল, ‘সকল কওমি মাদ্রাসা সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে’। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি (এমপি)। সভাপতিত্ব করেন ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির।

আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নির্মূল কমিটির সহ সভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা ও ডাকসুর প্রাক্তন ভিপি অধ্যাপিকা মাহফুজা খানম, নির্মূল কমিটির সহ সভাপতি শিক্ষাবিদ কলাম লেখক মমতাজ লতিফ, নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য কথাশিল্পী অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, বাংলাদেশ সম্মিলিত ইসলামী জোট -এর সভাপতি হাফেজ মওলানা জিয়াউল হাসান, জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলন বাংলাদেশ-এর মহাসচিব মাওলানা হাসান রফিক, নির্মূল কমিটির বহুভাষিক সাময়িকী জাগরণ -এর যুগ্ম সম্পাদক সুইডেন প্রবাসী লেখক সাংবাদিক সাব্বির খান, নির্মূল কমিটির সর্ব ইউরোপীয় শাখার সাধারণ সম্পাদক যুক্তরাজ্যের মানবাধিকার কর্মী আনসার আহমদউল্লা, নির্মূল কমিটির অস্ট্রেলিয়া শাখার সভাপতি মানবাধিকার কর্মী একরাম চৌধুরী, নির্মূল কমিটির ফিনল্যান্ড শাখার আহ্বায়ক শিক্ষাবিদ ড. মুজিবুর দফতরী ও নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল।

আলোচনা সভার সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব বানচালের উদ্দেশ্যে হেফাজত-জামায়াতের দেশব্যাপী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হয়েছে, জাহানারা ইমামের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ার নাগরিক আন্দোলন এখনও কতটা জরুরি। তবে জঙ্গী মৌলবাদী সন্ত্রাসের বিষবৃক্ষ জামায়াত-হেফাজতের রাজনীতি নিষিদ্ধ না হলে বাংলাদেশ থেকে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস নির্মূল করা যাবে না।

শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, জামায়াত-হেফাজতীরা বাংলাদেশকে আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের মতো জঙ্গী মৌলবাদী সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বানাবার জন্য কওমি মাদ্রাসার নিরীহ ছাত্রদের ব্যবহার করছে। পঁচিশ হাজারের বেশি কওমি মাদ্রাসার তিরিশ লক্ষাধিক ছাত্র-শিক্ষককে আমরা জামায়াত-হেফাজতের সন্ত্রাসী রাজনীতিক অভিলাষ পূরণের জন্য তাদের কাছে জিম্মি রাখতে পারি না। হেফাজতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসায় সরকারের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশে পৃথক পৃথক আলিয়া-কওমি-নূরানি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার কোনও প্রয়োজন নেই। সব মাদ্রাসায় একই পাঠ্যসূচি প্রচলন করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-চেতনা, জাতির পিতার জীবনী, বাংলাদেশের সংবিধান, বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য পাঠ, জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন সকল মাদ্রাসায় বাধ্যতামূলক করতে হবে।’

প্রধান অতিথির ভাষণে শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনি বলেন, আমরা যখন কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন, ২০১০ সালের শিক্ষানীতি অনুসরণ করার চেষ্টা করছি তখন কওমি মাদ্রাসা গুলোতে শিক্ষার্থীদের জাতিবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী নারী বিদ্বেষী গুজবের কারখানা হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চূড়ান্ত অপব্যবহার করছে স্বাধীনতা বিরোধী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা একমুখী, বিজ্ঞান ভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা ব্যবস্থার চিন্তা দেখতে পাই। কিন্তু সেই শিক্ষা ভাবনা নিয়ে আমরা আর এগুতে পারিনি ’৭৫ -এর বঙ্গবন্ধু হত্যার পর স্বাধীনতাবিরোধী, একাত্তরের পরাজিত মৌলবাদী গোষ্ঠী রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের মাধ্যমে দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক শিক্ষার বিস্তার ঘটায়।

তিনি জানান, নতুন যে কারিকুলাম হচ্ছে তার ভিত্তি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু। এই মুহূর্তে একবারে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা সম্ভব নয়। কিন্তু সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছি, একটি দেশের মধ্যে যেন দুটো জাতি গড়ে না ওঠে। যে মূল্যবোধের কারণে বাঙালি হিসেবে আমরা গর্ব করি, অসাম্প্রদায়িক মানবিকতা, পরমতসহিষ্ণুতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমরা শিক্ষা আইন ও শিক্ষানীতি প্রণয়ন করছি। লক্ষ লক্ষ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে মূলধারায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমান স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। মাদ্রাসাগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষা না জিহাদের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে সে সম্বন্ধে বাবা মাকে জানাতে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, জামায়াত-হেফাজতের একমাত্র উদ্দেশ্য ক্ষমতায় যাওয়া ও বাংলাদেশের ক্ষমতা দখল করে স্বাধীনতাকে ভূলুণ্ঠিত করা। কিন্তু ৩০ লক্ষ শহীদ ও প্রায় সোয়া ৪ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশে আমরা তা মেনে নেব না। মূলধারায় তাদের আনতে হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে বহু বছর আন্দোলন করেছি। এখন আন্দোলনে নামতে চাই-দেশবিরোধী ও স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচার করার।

অধ্যাপিকা মাহফুজা খানম বলেন, মাদ্রাসায় শিক্ষা সরকারের সুবিধাপুষ্ট, কিন্তু তারা সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। তারা কী পড়াচ্ছে, কী শেখাচ্ছে তা আমরা জানি না। এসব মাদ্রাসায় আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষার ছিটেফোঁটাও নেই। কওমি মাদ্রাসাগুলোকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি জানান তিনি।

নির্মূল কমিটির সহ সভাপতি শিক্ষাবিদ কলাম লেখক মমতাজ লতিফ বলেন, ‘এখনই সময় ‘৭২-এর সংবিধানের আলোকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার। বিজ্ঞানমনস্ক, সংস্কৃতিমনস্ক ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের জাতি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অবশ্যই মাদ্রাসাগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।’

অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, প্রকৃতপক্ষে হেফাজত রাজনৈতিক দল। সুযোগ পেলেই তারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাদের বিশাল কর্মীবাহিনী আছে। এই কর্মীবাহিনীরা হচ্ছে মাদ্রাসার ছাত্র- যাদের লেখাপড়া করার কথা। কিন্তু লেখাপড়ার বাইরে গিয়ে কওমি মাদ্রাসায় তারা ধর্মান্ধ, মৌলবাদী হিসেবে গড়ে ওঠে। এজন্য আমরা দায়ী। এ শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।

বাংলাদেশ সম্মিলিত ইসলামী জোট -এর সভাপতি হাফেজ মওলানা জিয়াউল হাসান বলেন, কুরআন অনুযায়ী ‘হেফাজত-ই ইসলাম’নামটি পরিপন্থি। কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষক ছাত্রের বৈষম্য প্রকট। কওমি মাদ্রাসায় মানবতার শিক্ষা, দেশপ্রেমের শিক্ষা দেওয়া হয় না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি যাদের আনুগত্য নেই, তাদেরকে আমরা কেন স্বীকৃতি দিলাম? শিক্ষামন্ত্রীকে আহ্বান জানাই, অবিলম্বে কওমি মাদ্রাসাগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে শিক্ষার্থীদের দেশপ্রেমিক মানবতাবাদী শিক্ষা ব্যবস্থায় গড়ে তুলতে হবে।

সভার অন্যান্য বক্তারা নতুন শিক্ষানীতিতে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনাভিত্তিক পাঠক্রম বাধ্যতামূলক করার দাবি জানান।